জীবন অবশেষে সুন্দর- আবুল কালাম আজাদ ধারাবাহিক (পর্ব ৮ )

জীবন অবশেষে সুন্দর- আবুল কালাম আজাদ ধারাবাহিক (পর্ব ৮ )

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাহাবুব রহমান, মতলুব সাহেব এবং সাজিদের মন খারাপ হল। বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স ডিগ্রীধারী, নৃত্য ও সংগীতের ওপর এতটা দক্ষতা যার সে এসেছে তিন/চার হাজার টাকা দামের একটা অস্থায়ী চাকরির জন্য, যে চাকরির নেই কোনো ভবিষ্যত।

ঝুমু বলল: অন্যরা আসার আগেই আমার ইন্টারভিউ শেষ করে ফেলতে চাই। নাচ দেখবেন?

সাজিদ বলল: নাচ দেখতে হবে না। আসলে চাকরিটা তো নাচ-গান বিষয়ক না। চাকরিটা হল বই পড়ার।

: তাহলে কিছু পড়ি? আপনারা পড়তে দিবেন, নাকি আমি মুখস্থ থেকে কিছু পড়ব?

: কী মুখস্থ আছে আপনার?

: অনেক কবিতা মুখস্থ আছে আমার। সুনীলের কেউ কথা রাখেনি, আমি কি রকমভাবে বেঁচে আছি, নির্মলেন্দুগণের প্রথম অতিথী, হুমায়ূন আজাদের সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর হাড়ের ঘর, আরও অনেক। সর্বোচ্চ দুইশ’ লাইনের কবিতাও আমার মুখস্ত আছে। অনেক গল্প-উপন্যাসের কিছু কিছু অংশ আমার মুখস্থ। কোনো উপন্যাসের কোনো অংশ আমার ভালো লাগলে সে অংশ আমি বার বার পড়ি। পড়তে পড়তে মুখস্থ হয়ে যায়। বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালীর প্রায় পুরোটাই আমার মুখস্থ।

: আপনি মুখস্থ থেকেই কিছু শোনান।

: তাহলে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী থেকেই একটু শোনাই। আমার প্রিয় একটা উপন্যাস। আমার বিশ্বাস, নবেল পাওয়ার যোগ্য একটা উপন্যস। যথাসময়ে ইংরেজিতে অনুবাদ হয়ে নবেল কমিটির হাতে যেতে পারেনি এটা বাংলা সাহিত্যের জন্য দুর্ভাগ্য।

“অপু জন্মিয়া অবধি কোথাও কখনো যায় নাই। এ গাঁয়েরই বকুল তলা, গোঁসাইবাগান, চালতে তলা, নদীর ধার, বড় জোর নবাবগঞ্জ যাইবার পাকা সড়ক এই পর্যন্ত তাহার দৌড়। মাঝে মাঝে বৈশাখ কি জৈষ্ঠ্য মাসে খুব গরম পড়িলে বৈকালে দিদির সঙ্গে নদীর ঘাটে গিয়া দাঁড়াইয়া থাকিত। দিদি ঘাট হইতে উঠিলে অপু আঙুল দিয়া ঘাটের ওপাড়ের ঝাউ গাছটা দেখাইয়া বলিত-দিদি, ঐ যে ঐ গাছটার পেছনে অনেক দূর, তাই না? দিদি হাসিয়া বলিত-অনেক দূর তাই দেখাচ্ছিলি? ধুর, তুই একটা বোকা। আজ সেই অপু সর্ব প্রথম গ্রামের বাহিরে পা দিল। কয়েকদিন আগে হইতেই উৎসাহে তার রাত্রিতে ঘুম হওয়া দায় হইয়া পড়িয়াছিল। দিন গণিতে গণিতে অবশেষে যাইবার দিন আসিয়া গেল।

তাহাদের গ্রামের পথটি বাঁকিয়া নবাবগঞ্জের সড়ককে ডাইনে ফেলিয়া মাঠের বাহিরে আষাড়ু-দুর্গাপুরের কাঁচা রাস্তার সঙ্গে মিশিয়াছে। দুর্গাপুরের রাস্তায় উঠিয়াই সে বাবাকে বলিল-বাবা, যেখান দিয়ে রেল যায়, সেই রেলের রাস্তা কোন দিকে?…….”

এটুকু পড়তেই মাহাবুব রহমান বললেন: থাক, আর পড়তে হবে না। আপনার পাঠের ঢং এবং কন্ঠ খুবই সুন্দর।

: তাহলে কি আশা করতে পারি যে, চাকরিটা আমার হবে?

: সেটা তো কোনো প্রার্থীর কাছে এখনই বলা সম্ভব নয়। সবার ইন্টারভিউ হবে তারপর…। যার হবে তার কাছে নিয়োগপত্র যাবে।

: তাহলে আমি এখন উঠি।

: চা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি।

: না না, আমি এখন চা খাব না। আমার তাড়া আছে।

ঝুমুর চলে যাবার পর মাহাবুব রহমান বললেন: মেয়েটা প্রতিভাবান। নেয়া চলে।

সাজিদ বলল: বাবা, ও নাচ-গানের স্কুলেই চাকরি পাবে। সেখানে ওর প্রতিভার যথার্থ বিকাশ ঘটাতে পারবে। এখানে সময় দেয়া ওর প্রতিভার জন্য ক্ষতিকর হবে।

মতলুব সাহেব এবং তনিমা সাজিদকে সাপোর্ট করল। মাহাবুব রহমান বললেন: সাজিদ তো সঠিক সিদ্ধান্ত দিবেই। ও যেভাবে ইন্টারভিউ দিচ্ছে তাতে ওর অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে এটাই স্বাভাবিক। প্রবাদ আছে, একজন পুরনো রোগী নতুন ডাক্তারের চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ।

তারপরই এল এক যুবক। বেশ সুদর্শন যুবক। বয়স সাজিদের সমানই হবে।

সবাই অবাক হল। কোনো পুরুষকে তো ইন্টারভিউ কার্ড দেয়া হয়নি! যুবক যাতে বিশেষ বিব্রত না হয় সেজন্য মতলুব সাহেব বললেন: বসুন।

যুবক বসতে বসতে বলল: জানি আপনারা বিস্মিত হচ্ছেন যে, আমি কেমন করে এলাম। আমাকে আপনারা ইন্টারভিউকার্ড পাঠাননি। আমার মনে হল, আজ এখানে সাক্ষতকার নেয়া হতে পারে। আমাকে কেন ইন্টারভিউকার্ড পাঠানো হল না সেটা জানার জন্যই চলে এলাম। আমি এবার ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স দিচ্ছি। অনার্স-এ সেকেন্ড ক্লাশ ছিল।

মাহাবুব রহমান বললেন: আসলে আমরা কোনো পুরুষ প্রার্থীকে আমন্ত্রণ জানাইনি।

: এটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হল না। নিশ্চিত বর্ণ বৈষম্য। সব চাকরিতেই নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ থাকা আবশ্যক।

: জি, তা স্বীকার করছি। তার জন্য আমরা দুঃখিত। আমরা ভেবেছি যে, একজন অতিশয় বৃদ্ধ মানুষকে বই পড়ে শোনানোর জন্য একজন নারীই বেশি উপকারী হবে। একটু নার্সিং সুবিধা পাওয়া যাবে হয়তো। যেমন-চা বানিয়ে দেয়া, টেবিল বা বিছানাটা গুছিয়ে দেয়া।

: ও আচ্ছা। আলবেয়ার কাম্যুর আউটসাইডার এবং দি প্লেগ বই দু’টি আমি বাংলায় অনুবাদ করেছি। এম আর আখতার মুকুলের চরমপত্র বইটা ইংরেজিতে অনুবাদ করার কাজে হাত দিয়েছি। আমি মনে করি, আমাদের স্বাধীনতার এই অসাধারণ দলিলটা বিশ্ববাসীর কাছে ছড়িয়ে দেয়া দরকার।

যুবকটি গমগমে ভরাট কন্ঠ। বিশুদ্ধ উচ্চারণ। তার দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং দায়বদ্ধতা আছে। মতলুব সাহেব বললেন: আমাদের দেশে যে এমন সব সোনার সন্তান আছে তা জেনে আমার আরও কয়েকশ’ বছর বাঁচতে ইচ্ছা করছে। এই সোনার সন্তানদের এই রাষ্ট্র ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারছে না। রাষ্ট্র স্নাতকোত্তরের সনদ দিচ্ছে শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞানের জ্ঞান বিবর্জিত কুয়োর ব্যাঙ মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের। শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞানমুখি সন্তানদের অবহেলার করে ধর্মের আগাছার গোড়ায় জল ঢালতে ব্যস্ত। আমি আপনাকে নিয়োগ দিতে চাই। আপনার সান্নিধ্য আমার দরকার।

তখনই যুবকটি ফোন বেজে উঠল। সে বলল: ফোনটা কি রিসিভ করতে পারি?

মতলুব সাহেব বললেন: কেন নয়? কোনো দরকারি ফোন হতে পারে।

ফোন রিসিভ করে যুবকটা কথা শুনছিল আর তার মুখ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছিল। সে মিনিট দুয়েক মন দিয়ে কথা শুনল।

‘আচ্ছা ধন্যবাদ, অনেক ধন্যবাদ। আমি কালই যোগ দেবার চেষ্টা করব।’-এই কথা বলে মুখে প্রশস্থ হাসি টেনে যুবকটি ফোন রেখে দিয়ে বলল: আমার চাকরি হয়েছে। দেশের একটি প্রথম শ্রেণির জাতীয় দৈনিকে সাব এডিটর পদে। বেতন দশ হাজার টাকা। বছরে ৫% ইনক্রিমেন্ট আর বেতনের সমপরিমাণ তিনটা উৎসব ভাতা। আমি এরকম একটা চাকরিই চাচ্ছিলাম। লেখালেখি করার সুযোগ পাব। এছাড়া দু’টো টিউশনি করারও সুযোগ পাব। আমার বেশ চলে যাবে। ওনার জন্য নার্সিং সুবিধা দেবার মতো একটি মেয়ে হলে ভালো হবে। 

যুবকটি ঝট করে দাঁড়িয়ে গেল। মাহাবুব রহমান ব্যতিব্যস্ত হয়ে বললেন: বসুন, বসুন, চা না খেয়ে যেতে পারবেন না। যুবকটি সুবোধ বালকের মতো আবার বসে পড়ল।

আর তখনই দরজায় বেল বেজে উঠল। দরজা খুলতেই ‘শুভ অপরাহ্ন’ বলে হাসিমুখে প্রবেশ করল তিনজন যুবতী। তার একটু পরেই আরও চারজন।

তনিমা সবার জন্যই চা-বিস্কুট নিয়ে এল। কেটলি ভরে চা। কেটলির নল দিয়ে পাকিয়ে পাকিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। আর দুই পিরিচে সাজানো বিস্কুট। সেসব নামিয়ে রেখে ফিরে গেল। সাজিদ বলল: ও আমার ছোট বোন। নাম তনিমা। খুব করিৎকর্মা মেয়ে। ক্লাশ এইটে পড়ে। ক্লাশ এইটে না বলে জেএসসি পরীক্ষার্থী বলাই ভালো। রাষ্ট্র তো সব বাচ্চা-কাচ্চাকে পরীক্ষার্থী বানিয়ে রেখেছে।

একটু পর তনিমা ফিরে এল জগ ভরে পানি আর গ্লাস নিয়ে। সেসব টেবিলে নামিয়ে মাহাবুব রহমানকে বলল: বাবা, একটু আসবে আমার সাথে?

: এখন আবার কোথায়….?

: এসো, মাত্র দুই মিনিট।

মাহাবুব রহমান উঠে গেলেন। সাজিদ কাপে চা ঢালতে ঢালতে বলল: নিন, আপনারা চা খান।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply