জীবন অবশেষে সুন্দর- আবুল কালাম আজাদ ধারাবাহিক (পর্ব ৯ )

জীবন অবশেষে সুন্দর- আবুল কালাম আজাদ ধারাবাহিক (পর্ব ৯ )

  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    9
    Shares

মিনিট পাঁচেক পর মাহাবুব রহমান ফিরে এলেন। নিজের নির্ধারিত আসনে বসলেন। ফিরে এসেই সুদর্শন যুবকটির মুখে বার বার তাকাচ্ছিলেন। বোঝা যাচ্ছিল, তনিমা যুবক বিষয়েই কিছু একটা বলেছে। যুবকটি চা খেতে খেতে একটু অস্বস্তি বোধ করছিল। অস্বস্তি কাটাতেই মাহাবুব রহমান বললেন: আমার মেয়ে তনিমা….।

: চমৎকার চা করেছে। যুবকটি ঝট করে বলল।

: ও আরও দুই বছর আগে থেকে চমৎকার চা করে।

: ভেরি এ্যাকটিভ গার্ল, ইনটেলিজেন্টও। আপনাকে ডেকে নিয়ে কী বললো তা আমি বুঝতে পেরেছি।

উপস্থিত সবাই একযোগে তকাল যুবকটির মুখে। কারণ, অন্য কেউই সেটা বুঝতে পারেনি। বোঝার কথাও না। যুবকটি বলল: তনিমা আমার কাছে ইংরেজি পড়তে চায়। সে ব্যাপারেই কথা বলল, তাই না?

যুবকটির অনুমান ক্ষমতায় মাহাবুব রহমান, মতলুব সাহেব এবং সাজিদ অবাক হল খুব। আজ যে এখানে ইন্টারভিউ হবে সেটা অনুমান করেই সে এসেছে। বিস্ময় কাটিয়ে মাহাবুব রহমান হেসে ফেললেন। বললেন: বর্তমানে ইংরেজি টিচার পাওয়া খুব কঠিন। কোচিং সেন্টারে হলো সীট দেয়া আর পরীক্ষা নেয়ার খেলা। বাস্তবিক এসব ওদের প্রচার। শেখানোটা সেরকম হয় না।

: আচ্ছা, আমি ওকে পড়াবো। আমার নাম মাহিন, মাহিন আহমেদ।

তারপর সে পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করে কিছু লিখলো। সেটা মাহাবুব রহমানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল: আমার ফোন নাম্বার, যোগাযোগ করবেন। চাইলে সামনে এক তারিখ থেকে পড়ানো শুরু করবো।

মাহিন আহমেদ যখন যাবার জন্য দাঁড়িয়ে গেছে তখন তনিমা আবার এল। মাহিন আহমেদ পেছন ফিরে বলল: আমি তোমাকে পড়াতে রাজি আছি। যে মেয়ে এত চমৎকার চা করতে পারে, তাকে পড়ালে লাভ আছে আবার ক্ষতিও আছে।

: ক্ষতি! ক্ষতি কী? তনিমার কন্ঠে অপার বিস্ময়।

মাহিন আহমেদ বলল: লাভ হল, চমৎকার স্বাদের চা খেতে পারব। ক্ষতি হল, পরে অন্য কারও বানানো চা আর মুখে রুচবে না।

: হিহিহি।

মাহিন আহমেদ চলে যাবার পর অন্যদের সাথে কথা বলার পালা। আসলে যারা এসেছে এ চাকরির জন্য তাদের সবাই-ই যোগ্য প্রার্থী। দূর্ভাগ্য যে, নিয়োগ পাবে মাত্র একজন।

বাম দিক থেকে কথা বলতে বলতে ছয় জনের সাথে কথা বলা হয়ে গেল। একে একে ছয়জন চলে গেল। দশ জনের দুইজন আসেনি। রইল বাকি এক। একটা সিঙ্গেল সেফায় প্রথম থেকেই সে মাথাটা ঈষত নিচু করে বসে আছে। এতক্ষণ সবাই কম বেশি কথা বলেছে, হেসেছে। একজনের সাথে কথা বলার সময় অন্যরা তাকিয়েছে প্রশ্নকর্তা বা উত্তরদাতার মুখে। এই মেয়েটার সেরকম কোনো অভিব্যক্তি ছিল কি না কে জানে। কেউ যেন তাকে খেয়ালই করেনি। ডান দিক থেকে ইন্টারভিউ শুরু করলে অবশ্য তার সাথে সবার আগে কথা বলতে হতো। 

এতক্ষণ ইন্টারভিউ নেয়ার সময় সাজিদ আর মাহাবুব রহমানই সবার সাথে কথা বলেছেন। মতলুব সাহেব নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু শেষ প্রার্থীর কাছে এসে তিনি মুখ খুলনেন। বললেন: আপনার নাম?

মেয়েটি মাথা তুলল। বাম হাতে কপাল থেকে একগুচ্ছ চুল সরিয়ে নিলো। তারপর বলল: সাফিনা আক্তার।

খুবই মৃদু কন্ঠ। পুরোটা মতলুব সাহেবের কানে পৌছুল না। বয়স হলে মানুষ কানে একটু কম শোনে। তবে মতলুব সাহেবের ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। খুবই স্বাভাবিক শ্রবণশক্তি তার। তিনি একটু দূরে ছিলেন বলে হয়তো শোনেননি। তিনি বাম হাত দিয়ে কানের পাশে এন্টেনা বানিয়ে বললেন: সাফিনা……।

: সাফিনা আক্তার।

: পড়াশোনা?

: ফিজিক্স অনার্স ফাইনাল ইয়ার।

সাজিদ এবং মাহাবুব রহমান পরস্পরের মুখে তাকালেন। বোঝালেন একে দিয়ে হবে না। ফিজিক্সের মেয়ে দিয়ে সাহিত্য পাঠ ভালোভাবে চলার কথা না।

মতলুব সাহেব বললেন: আপনার পরিবারে কে কে আছে?

ব্যক্তিগত প্রশ্ন। চাকরির ইন্টারভিউতে এ ধরনের প্রশ্ন করার কথা না। সাফিনা তাতে বিব্রত হলো না। সহজভাবে বলল: মা আর ছোট ভাই।

: বাবা?

: ছোট ভাইটার বয়স যখন চার তখন বাবা মারা গেছেন।  

: তাহলে………?

: গ্রামে কিছু জমিজমা আছে। সেসব বর্গা দিয়ে ফসল পাওয়া যায়। মামারা, চাচারা যথেষ্ট সাহায্য করেন। আমাদের দুই-ভাইবোনের পড়াশোনার জন্যই ঢাকা শহরে থাকা।

: ফিসিক্সের মতো সাবজেক্টে পড়াশোনার চাপ থাকার কথা। এখানে সময় দেয়া…..।

: পড়াশোনার চাপ আছে তা ঠিক। তারপরও এখানে আমি সময় দিতে পারবো। তা ছাড়া সাহিত্যের প্রতি আমার ভীষণ ঝোঁক। পাঠ্য বই এবং রেফারেন্স বই-ই ঠিকমতো কিনতে পারি না। সাহিত্যের বই কেনার মতো বিলাসীতা ভাবতেই পারি না। চাকরি করতে এসে যদি বই পড়া যায় সে আমার সৌভাগ্য।

  •  
    9
    Shares
  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply