• 47
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    47
    Shares
Kalyan
Peace at Last by কল্যাণ ভট্টাচার্য্য

Issue 33 | 21.02.2021

KAFE hOUSE

আজকের কলমে

ছন্দা দাশ, স্বপ্না ইসলাম ছোঁয়া, নীতুল জান্নাত নীতি, কাঞ্চন কুমার গাঙ্গুলী, নাসিমা হক মুক্তা, নাছরিন আক্তার

জল পড়ে

ছন্দা দাশ (বাংলাদেশ)

আমাকে অনেক পথ যেতে হবে
শিশুকাল থেকে শুনতে শুনতে
বড় হয়েছি।বড় হতে হতে পেছনের
দিকে তাকিয়ে মনে হলো অনেকটা
পথ এসেছি –কিন্তু কেন এলাম?
না এলেও হতো।
আমরা যা পাইনা তার জন্য কাতর
থাকি।
যা পেয়েছি তাতে সন্তুষ্ট নই।
আরও কিছু, আরও বড়, আরও বেশি
কিছু চাই।
আসলে বড় হওয়ার জন্য সব ছাড়ি
শেষে যা ছেড়ে এসেছি তার জন্য
দীর্ঘশ্বাস করতে করতে পুড়ি।

স্পষ্টত বলেছিলাম,
আমি সমুদ্র নয় পাহাড় ভালোবাসি;
তবুও দুর্নিবার আকর্ষণ দমাতে না পেরে,
অকস্মাৎ জানতে চাইলে-
“সমুদ্র কেন নয়?”
ব্যথিত আত্মার দীর্ঘশ্বাস প্রস্তরের মতো
ক্ষিপ্রগতিতে শব্দহীন মৌনতায় চিড় ধরালো;
ভাষাহীন চোখে নির্নিমেষ তাকিয়ে হঠাৎ থমকে গেলে।

স্বপ্না ইসলাম ছোঁয়া (ঢাকা, বাংলাদেশ)

একুশ এবং অষ্টাদশ

নীতুল জান্নাত নীতি

(১)
গার্লস স্কুলটিতে ছুটির ঘন্টা বাজতেই চায়ের কাপ নামিয়ে রাখে ছেলেটি। এলোমেলো কোঁকড়া চুল, লম্বাটে মুখ, তিনদিন ধরে গায়ে জড়িয়ে রাখা কোঁচকানো একই নীল শার্ট আর শেভ করতে ভুলে যাওয়া গাল দুটি। পকেট থেকে দুমড়ে থাকা পাঁচ টাকার নোটটি ছুড়ে দেয় দোকানদারের দিকে।
-“সৌরভদা, বাকিটা লিখে রেখো।”

সৌরভ সবই বুঝে। মাথা গুঁজে চায়ের কাপ ধোয়ায় মন দেয়। এমন রোডসাইড রোমিওরা কাস্টমার হিসেবে মন্দ হয় না। সময়ে অসময়ে এদের পছন্দ বদলায় হয়ত, তবুও রাস্তা বদলায় না। কখনো শিস বাজিয়ে, কখনো একটি লাল গোলাপ হাতে নিয়ে কিংবা বেসুরো গলায় একটু আধটু গান। এভাবেই তাদের প্রেম চলে। এরা একরকম বাধা কাস্টমার বলা যায়। এদের অপেক্ষা কাটে বিস্বাদের চায়ের কাপে। এদের কানে ছুটির ঘন্টাগুলো জগতের যেকোনো সংগীতের চেয়ে শ্রুতিমধুর। একেকজনের একেক গল্প। বখাটেদের কাছে -“এই বুঝি মালটা বেরোলো। আজ যা খাসা লাগছে না!”

খুব সিরিয়াস কিংবা সুসময়ের কোকিলসম প্রেমিকগণের কাছে, “এইতো,ও বেড়িয়েছে। আজ খুব বকবো। কতক্ষণ ধরে দাড়া করিয়ে রাখলো।”

আর অক্ষরের মতো ছেলেদের কাছে গল্পটা একতরফা প্রেমের, আবার সস্তা বখাটেপনারও।
“ও এখনো বের হচ্ছে না কেন? আচ্ছা, ও কি একবার তাকাবে ফিরে আজ আমার দিকে? রেগে যাবে না তো আবার? রাগলে বড্ড সুন্দর লাগে অবশ্য। ”

নিশ্চয়তা অনিশ্চয়তার দোলাচল এদের প্রধান বস্তু। অক্ষর আজ নীল শার্ট পরেছে। পকেটে থাকা শেষ পাঁচ টাকার নোটটিও চায়ের দোকানে দিয়ে এসেছে। বাড়ি হেটেই ফিরে যেতে হবে। অবশ্য হাটতে দোষ নেই। হাটলে শরীর ভালো থাকে। ঠিক তখনই নিরু বের হলো স্কুলের গেইট থেকে। দুই বেণী দুলিয়ে দুলিয়ে গল্প করছিলো বান্ধবীদের সাথে। ক্লাসের রাগী স্যারের বাজে একটি নামকরণই হচ্ছে আজ তাদের হাসির বিষয়বস্তু। এরা অল্পতেই হাসে, অল্পতেই কাঁদে। বয়সটাই এমন। অক্ষরের মত এলোমেলো ছেলেরা সত্যিকারভাবেই এলোমেলো হয় এদের মতো কারো একজনের জন্য। অক্ষর নিরুকে দেখে গাইতে শুরু করলো বেসুরে,
“তখন তোমার একুশ বছর বোধ হয়-
আমি তখন অষ্টাদশীর ছোঁওয়ায়।”

তখনই কানে আসে একটি বাক্য,
“জুতিয়ে মুখ ভেঙে দেবো। রোজ রোজ এক ক্যাচাল। বাড়িতে যেন মা বোন নেই।”

নিরু তাকিয়ে রইলো অক্ষরের দিকে ভয়ার্ত চাহনিতে। নিরুর বান্ধবী সীমা বকেই যাচ্ছিলো। আসলেই তো! রোজ রোজ কেন যায় অক্ষর এভাবে? নিরুরা চলে যাওয়ার পর অক্ষর সিগারেট ধরায়। শেষ সম্বল সিগারেটটা!
তখন ঝুম বৃষ্টি আকাশ ভেঙে। নীল শার্ট লেপ্টে রইলো গায়ে। শালার সিগারেট! এটাও গেল। এর চেয়ে বাজে বর্ষা যেন কোনকালে আসেনি আর। অক্ষর তাকিয়ে রইলো পথের দিকে শূন্য চোখে।

কানাঘুষায় শোনা যায়, এর কিছুদিন বাদেই নিরুর স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছিল। এক রাতে নিরুকে বধুবেশে চলে যেতে দেখে অক্ষর দূর থেকে তাকিয়ে থেকেছিল। নিরু অস্থির চোখে এদিক ওদিক কি খুজছিল? নীল শার্ট পরা এলোমেলো একটি যুবককে?নিরুর কানে ভীড়ের সব ধ্বনি ছাড়িয়ে একটি সুরই বাজছিলো।

“তখন তোমার একুশ বছর বোধ হয়
আমি তখন অষ্টাদশীর ছোঁওয়ায়…..”

অক্ষর মনে মনে একটি কথাই বলেছিল শেষমুহুর্তে,
“নিরুপমা, আমার আর কখনও এই গানটি গাওয়া হবে না। তোমার আমার এই ব্যর্থ প্রেমের ধ্বংসস্তূপ এখানেই আটকে থাকুক, পচে মরুক।
স্মৃতিরা বড্ড খারাপ। অনেক ভোগাবে আমায়….”

(২)

বেলা দশটা বাজে। বিছানায় তখনও অঘোরে ঘুমোচ্ছে নীল। জ্যানেট আয়নার সামনে তখন খুব যত্নের সাথে কাজল পরছিলো চোখে। প্রতিদিন সকালে পরিপাটি হয়েই জ্যানেট নীলের ঘুম ভাঙায়। নীল আবার একটু বেশিই ঘুমকাতুরে। মাঝেমাঝে রেগেও যায় জ্যানেট ওকে বেশি ডাকাডাকি করলে। জ্যানেট তখন ছবি আঁকতে বসে পরে। সে রান্নাবান্না কিচ্ছু জানে না। মাঝেমধ্যে একটু আধটু শ্বাশুড়ির কাছে শিখতে যায়। তিনি একটা কথাই বলেন, “আগে পড়াশোনাটা, তারপর এসব হবে। যাও এবার, উপরে যাও।”

জ্যানেট এখানে এসে মেয়ে হয়েই রইলো। বাড়ির বউ হয়ে ওঠা আর হলো না এই মায়ের আদরেও। আর নীল! সে বন্ধুর মতো, প্রেমিকের মতো, কখনও বা একজন বিজ্ঞ গার্ডিয়ানের মতো। জ্যানেট ভলিউম কমিয়ে গানটা ছেড়ে দেয়। কিন্নর কন্ঠে ক্যাসেট বাজতে থাকে,
“তখন তোমার একুশ বছর বোধ হয়
আমি তখন অষ্টাদশীর ছোঁওয়ায়….”

কাগজে পেন্সিল ঘষতে থাকে ক্রমাগত। স্মৃতিতে অতীতেরা আবার ডালপালা মেলতে শুরু করে দেয়। নীল গিটারে এই একটি গানই শোনাতো জ্যানেটকে। জ্যানেট তখন সত্যিই অষ্টাদশীর ঘরে। কলেজ থেকে ফিরতে দেরী হতো নীলের সাথে ঘোরাঘুরির অজুহাতে। সময় পেলেই নীল অফিসের ফাঁকে জ্যানেটের সাথে গল্পে ডুবে যেত। অপেক্ষা থাকতো রোজ সন্ধ্যের। সন্ধ্যে হলেই গিটারে সুর উঠতো। ফোনের ওপ্রান্তে জ্যানেট বিরক্ত হয়ে বলতো মাঝেমধ্যে, “কি পেয়েছো এই এক গানে বলোতো!”

নীল দার্শনিকের ভঙ্গিতে বলতো, “আঠারো আর একুশ! সুন্দর কিছু বয়স। আমি আগেই পেরিয়েছি এই বয়সের কোটা। তাই তোমাকে দেখতে চাই এই বয়সটা পার করতে খুব নিপুণভাবে। নিজেকে খুঁজে পেতে চাই নতুন করে তোমার মাঝে। বলেই গান ধরতো উঁচু গলায়,
“তখন তোমার একুশ বছর বোধ হয়
আমি তখন অষ্টাদশীর ছোঁওয়ায়।”

দিনগুলো বড্ড সুন্দর ছিল!
ঘুমন্ত নীলের দিকে তাকিয়ে জ্যানেট ভাবে, সত্যিই কি এভাবে নিজেকে খুঁজে পেতে চেয়েছিল নীল নিজেকে জ্যানেটের মাঝে? ব্যস্ত, সময়হীন এই মানুষটার মতো?

সামনের ১৩ই ডিসেম্বর জ্যানেটের বাইশতম জন্মদিন। জ্যানেট খুব অভিমানী, নীল জানে। নীল কি এখন মনে মনে হাসে জ্যানেটের ছেলেমানুষিতে? জ্যানেট সেদিন বাইশে পা রাখবে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। পেন্সিল ঘষতে থাকে ক্রমাগত স্কেচবুকে সব ভুলে যাওয়ার প্রাণপণ চেষ্টায়। অথচ একবার মুখ তুলে তাকালে জ্যানেট হয়ত সদ্য জেগে যাওয়া নীলের মায়াভরা চাহনি দেখতে পেত। নীলের ঠোঁটে মৃদু হাসি এই সুন্দর সকালে!

১৩ই ডিসেম্বর এসেই গেল দেখতে দেখতে। জ্যানেট সারাটা দিন বাগানে, ছাদে আলতো পায়চারিতেই কাটিয়ে দিলো। সন্ধ্যাবেলাতেই ঘটলো যত বিপত্তি! বাসায় ফিরে দেখে নীল সাজিয়ে রেখেছে গোটা টেবিল ফুলে ফুলে, মোমবাতিতে আর বিশাল এক কেক রেডি করে। সবাই সেজেগুজে উপস্থিত। মোমবাতিগুলো নেভানো হলো, কেক কাটা হলো। এক লহমায় সময়গুলো ফিরে এলো যেন। গিটার হাতে শেষবারের মতো গাইলো নীল,

“তখন তোমার একুশ বছর বোধ হয়
আমি তখন অষ্টাদশীর ছোঁওয়ায়,
লজ্জা জড়ানো ছন্দে কেঁপেছি
ধরা পড়ি ছিল ভয়।
তখন তোমার একুশ বছর বোধ হয়
আমি তখন অষ্টাদশীর ছোঁওয়ায়।”

ঘড়িতে ঢংঢং শব্দ তখন বারোটা বাজার ইংগিত দিচ্ছে। নীল হেসে বললো,
“এখন আর কেউই একুশে আটকে নেই আমরা। আমার আর কখনও এই গানটি গাওয়া হবে না। আমাদের সুন্দর স্মৃতিগুলো আটকে থাক এই বয়সটুকুতেই। আমি তোমাকে ভালোবাসি জ্যানেট, ভালোবেসে যেতে চাই বাকিজীবনের জন্য আরো স্মৃতি কুড়োতে।
কারণ…..
স্মৃতিরা খুব সুন্দর। ভয়ংকর সুন্দর বলেই এদের বারবার ফিরে না আসাটা কাঁদাবে আমাদের। বড্ড ভোগাবে….”

গল্পগুলো এভাবেই চক্রাকারে ঘুরবে ধনাত্মক এবং ঋণাত্মক কিছু দিক নিয়ে। প্রেক্ষাপট, ঘটনাবলী, স্মৃতিপট এক হলেও শেষটা আলাদা এবং সবসময়ই অন্যরকম।

মাতৃদুগ্ধ 

কাঞ্চন কুমার গাঙ্গুলী

রবীঠাকুর আর কাজী সাহেবের
অভাগা বঙ্গদেশ
বাংলা আজ তৃতীয় সারিতে
তাতে নেই কোন ক্ষেদ ৷

ছেলে পড়ে ইংলিশ মিডিয়ামে
বাংলা সেখানে নেই পাঠক্রমে ৷
বাংলা সে পড়তে পারে না
লেখা তো দূরঅস্ত
গর্ব করে বলি আমি তা
স্তাবকেরা বলে “বাঃ বেশ বেশ বেশ ৷”

একদিন ছেলে ঘরে এসে বলে
লেডি ডায়ানার ছবি কেন নেই ঘরে ?
ডায়ানা নাকি মাতৃ সমা
চোখের জলে ভিজিয়েছে জামা ৷
সর্বজয়ার চোখের জল
বলে, ওসব ছেলে ভোলানোর ছল ৷

চাঁদের পাহাড়, বিন্দুর ছেলে
সোকেসেতে আছে, পড়বে তা কে ?
সুকুমার রায়, শিবরাম পান
ধুলো ভরা তাকে একটুকু স্থান ৷
ঠাকুমার ঝুলি পড়ে না এরা
হ্যারি পটারে গিলেছে মাথা ৷

ছেলে পড়ে ইংলিশ মিডিয়ামে
বাবা ছেড়ে ‘ড্যাডি’ বলে, মাকে ‘মাম্মা৷
বাংলা ! আজ তৃতীয় সারিতে
” হিন্দ-রাজী ” মাতৃদুগ্ধ সমা ৷

কিশোর বেলার স্মৃতি নিয়ে…. লেখা কবিতা

মায়াবী হরিণ মন কাঁদে

নাসিমা হক মুক্তা (বাংলাদেশ)

দীঘল রাস্তা ভ্রমণের গায়ে আঁচড়ে পড়ে
শৈশবের নীলিম জ্যোৎস্না
পেছনে ফিরে তাকালেই কাঙ্ক্ষার ভেতর
শিশু আদল চিচিং ফাঁক খেলে

উর্বর মস্তিষ্কের রেশমবোলের দূরবেলা
বাতাসে গর্জন করে ” উন্মাদ হাসির মতোন “

তার সাথে বেজে ওঠে –
দুরন্তপনার এভিনিউ!
যেখানে রাখালের বাঁশি প্রকৃতির নোঙরে
স্বপ্নপ্রাসাদের শো শো হাওয়া
নিদ্রাহীন প্রহরে সওদা করতো- সহস্র সুখ জীবন

এখন সময় সুদূর পল্লীতে বন্দী
ভিনদেশী দরবারের হাহাকার করে আর্তনাদ
যা বারবারে ফিরে যেতে তারুণ্য –
কিশোরবেলার জল পদ্ম-পুকুর সাঁতারে

বয়স বাড়ছে মানুষ জীবনের, কোথায় যেন
বেদনার্ত স্বপ্নের বোঝা কাঁধে নিয়ে
মায়াবী হরিণ মন কাঁদে
পুরো অস্তিত্বের উঠোনে কলকল বিরহ ধ্বনি
টাককা দিন মাগে –
পাহাড়, নদী-খাল – বিলে
শরীর জলে নামতে চায়,
জলাধারে ডুবে মরতে চায়
দেহের ভেতর জীবনের সুখ গিলতে চায়!

স্মৃতি কথা
মেয়েবেলার বাঁদরামি

নাছরিন আক্তার (বাংলাদেশ)

তখন গাঁয়ে বেশ আয়োজন করেই সন্ধ্যা নামতো। ছায়াটা লম্বা হতে হতে সুপারি গাছের মতো লম্বা হয়ে যখন এঁকেবেঁকে যেতো, আমরা উঠোন থেকে শুকনো কাপড় তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়তাম। চুলে দু’ বেনি করে দিনের শেষ বেলায় রাতের সাজসজ্জা সারতাম। কনে দেখা আলো ছড়িয়ে সন্ধ্যা নামতো। হারিক্যানের কাঁচ ঝকঝকে করে রাখা চাই আগেই। মাগরিবের আজানের সাথে সাথে ঘরে ঘরে হারিকেনের আলো জ্বালিয়ে সান্ধ্যপ্রদীপ দেওয়া হতো। হাত-পা ধুয়ে নিজেকে পরিপাটি করে পড়তে বসা।
যারা হারিক্যানের আলোয় পড়েছেন তারা জানেন আলো চোখে যেনো না লাগে তাই চোখ বরাবর সাদা কাগজ ভাজ করে দিয়ে রাখা হতো।
বছরের কিছু সময় এত মশা হতো পড়তে বসে তখন পড়ার চেয়ে মাথায় মশা নিধনের চিন্তাই ঘুরতো বেশি। মাঝে মাঝে নিজের হাত পেতে রাখতাম আর একটা একটা করে এমন ভাবে মশা মারতাম যেনো মশার গায়ে ব্যথা না লাগে। আর একটা একটা করে মৃত মশা জমা করে রাখতাম খাতার পাতায় । সকালে দেখতাম খাতার পাতার ভাঁজে বেশ কিছু মশা জমা হয়েছে। এভাবে ক’দিনে বেশ কিছু মৃত মশা জমিয়েছি খাতার ভাঁজে।

সে সময় আমাদের বাড়িতে সবার ঘরে ঘরেই লজিং মাস্টার রাখার প্রচলন ছিলো। শহর কাছে হওয়ায় দূরের গাঁ থেকে ময়মনসিংহ শহরে, আনন্দমোহন, নাসিরাবাদ, আক্তারোজ্জামান মিন্টু কলেজে ছাত্ররা ভর্তি হতো। শহর আর আমাদের গ্রাম নদীর এপাড় ওপাড় হওয়ায় লজিং থেকে পড়া ওদের জন্য সহজ উপায় ছিল। আমরা মানে বড় মেয়েরা কাচারি ঘরে যেয়ে পড়তাম না আমাদেরকে ঘরে এসে পড়িয়ে যেতো।

একজন করে নতুন ছেলে এলেই আমরা তার নতুন নামকরণ করতাম। এই যেমন আমার টিচায় ছিলেন খুব কালো। আর তখন বিটিভিতে লেমনডিউ সাবানের খুব এ্যাড দিতো । তাই স্যারের নাম হয়ে গেলো লেমনডিউ সাবান। একজনের চুল ছিলো খুব কটা – আমরা তাকে লাল চুলি বলে ডাকতাম, একজন ছিলো খুব চিকন কেমন শরীর মুচড়িয়ে হাঁটতো তাই তাকে বাইম মাছ বলে ডাকতাম। এরকম অনেকের অনেক নাম,, তবে যাদের নামকরণ করা হতো তারা অবশ্য নিজের নামগুলো জানতো না। এটা শুধু আমাদের কয়েকজনের ভিতর সীমাবদ্ধ থাকতো।

কালোর ভিতরেও সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। তাকে দেখতে হলে চোখের মতো চোখ থাকা চাই। আমাকে যে টিচার পড়াতেন সে আমার এক চাচাতো বোনকেও পড়াতেন। একদিন দুবোন / বান্ধবী বসে গল্প করছি প্রসঙ্গ সভাবতই ‘স্যার ” ও আমাকে বললো এই তুই দেখেছিস স্যার কালো হলেও চোখ গুলো কত সুন্দর! আমি আবার একটু আলাভোলা একসাথে সবটা দেখতে পাই না, সেই গল্পের রাজার উজিরের মতো। বললাম না তো,ও বললো আজকে দেখিস। স্যার পড়াতে এসেছে স্যারের চোখ দেখবো চিন্তা মাথায় ঘুরছে, অংক করা রেখে বার বার স্যারের দিকে তাকাই। যতবার স্যারের দিকে তাকাই স্যার আমার তাকানো দেখে ফেলেন। আমার আর স্যারের চোখ দেখা হয় না। পরদিন বললাম ঠিক বলেছিস স্যারের চোখ খুব সুন্দর। ও বললো দাঁত দেখেছিস সুন্দর না! আমি বলি দাঁত দেঁখিনি তো, তাহলে আজ দাঁত দেখবো। যথারিতি স্যার পড়াতে এলে অংক করা রেখে স্যারের দিখে চোরা দৃষ্টি, স্যার স্কেল দিয়ে হাতে মেরে বলেন কি হলো আজকে পড়ায় মন কোথায়? স্যার মারে আর আমার হাসি পায় নিজের বোকামির কথা মনে পরে।
পরদিন আবার স্যারের গোফ দেখার পালা। আমার বোন বললো স্যারের গোফও নাকি সুন্দর। এই হলাম আমি –

“রাজার সেই উজিরের গল্পটা এবার বলেই ফেলি । উজির একদিন দুঃখ করে রাজাকে বললো হুজুর আমার আর মন্ত্রীর যোগ্যতা তো একই তাহলে তাকে মন্ত্রি আর আমাকে উজির করলেন কেনো?
রাজা বললেন ঠিক আছে এর উত্তর পরে দিবো তুমি আগে ঐ আম গাছের ডালে পাখি ডিম পেড়েছে দেখে আসো তো।
উজির গেলো, দেখলো ও এসে বললো ডিম পেরেছে হুজুর। রাজা বললো – কয়টা ডিম। উজির – তা তো দেখিনি, রাজা বললো দেখে আসো। উজির এসে বললো – চারটা ডিম পেড়েছে হুজুর। রাজা বললো তার ভিতর কয়টা বাচ্চা ফুটেছে? উজির বললো তাতো দেখিনি। রাজা বললো যাও দেখে আসো। উজির এসে বললো দুটা ডিম ফুটে বাচ্চা হয়েছে হুজুর। রাজা এবার মন্ত্রীকে ডেকে বললো ঐ আম গাছে পাখি ডিম পেড়েছে দেখে আসো। মন্ত্রী দেখে এসে বললো – হুজুর পাখিটা চারটা ডিম পেড়েছে তার ভিতর দুটা ফুটে বাচ্চা হয়েছে। রাজা এবার উজিরকে ডেকে বললো- এবার বুঝলে কেনো তুমি উজির আর ও কেনো মন্ত্রী!”

যাক,যে কথা বলতে এত গল্প- সেদিন স্যার সকালে পড়াতে এলেন। স্যার খাতা হাতে নিতেই ঝুরঝুর করে মৃত মশা গুলো স্যারের গায়ে ছড়িয়ে পড়লো।
বললেন- আরে এসব কি?
বললাম-মৃত মশা।
-কার কাণ্ড এটা? বীরদর্পে বললাম আমার।
তা তো দেখতেই পাচ্ছি। রাত জেগে কি পড়া হয় না মশাই মারা হয়?
স্যার দুটোই করি।
কোন ক্লাশে পড়?
একটু আবাকই হলাম স্যার আমাকে পড়ায় অথচ জানে না আমি কোন ক্লাসে পড়ি!
কপাল কুঁচকে বললাম নাইনে মানে নবম শ্রেণীতে।
তিনি বললেন – এটা কি নাইনের ছাত্রির কাজ? বড় হবে কবে?
মনে মনে বললাম আমি তো বড় হয়েই গেছি আর এক বছর পর এস এস সি দিবো,,,,

দি মিস্ট ছবি - কল্যাণ ভট্টাচার্য্য
  •  
    47
    Shares
  • 47
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •