• 7
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    7
    Shares

Cafehouse

Content

ধারাবাহিক | জীবন অবশেষে সুন্দর | আবুল কালাম আজাদ

স্বাধীনতার মানে | সৈকত মজুমদার

মদ্যপ | দেবাঞ্জন ভৌমিক

সম্প্রীতির চিঠি | পৌলোমী ভট্টাচার্য্য

সেই রাত! | Kalyan Kumar Bhattacharjee

সুখ | চুমকি সাহা

মুখোশের আড়ালে সভ্যতা | শ্যামসুন্দর গোস্বামী

I Am Me | Mrittika Paul

প্রিয় বন্ধু | তনিমা সাহা

বৃষ্টিতে ভালোবাসা | তনিমা সাহা

লক ডাউন | অনসূয়া মুখোপাধ্যায়

ধারাবাহিক

জীবন অবশেষে সুন্দর
আবুল কালাম আজাদ

সাজিদ তৈরী হয়ে বাইরে যাচ্ছিল।
পারফিউমের সুগন্ধ ছড়িয়ে নিজের ঘর হতে বসার ঘরে পা ফেলতেই মতলুব সাহেব ডাকলেন: সাজিদ, আমার ঘরে একটু আয় তো ভাই।
মতলুব সাহেব চোখে ভাল দেখেন না। যেটুকু দেখেন তাতে ঘরের মধ্যে হাঁটা-চলা করা যায় কোনোমতে। কিন্তু তার কানের পাওয়ার খুব বেশি। ইঁদুরের ‘খুট’ শব্দটাও তার কান এড়াতে পারে না। এটা একটা বায়োলজিক্যাল বিষয়। একটা ইন্দ্রিয়ের ক্ষমতা কমে গেলে রিলেটিভ আরেকটা ইন্দ্রিয়ের ক্ষমতা বেড়ে যায়। যে কানে কম শোনে সাধারণত তার দৃষ্টিশক্তি প্রখর হয়। ডান হাত কর্ম ক্ষমতা হারালে বাম হাতের ক্ষমতা বেড়ে যায়।
সাজিদ থমকে দাঁড়াল। কিছুটা চুপসে গেল। এরই মাঝে মতলুব সাহেব আবার বললেন: কী হল, আমার ঘরে আসতে বললাম না?
সাজিদ গতি পরিবর্তন করে মতলুব সাহেবের ঘরে গেল। দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই মতলুব সাহেব বললেন: কোথায় যাচ্ছিস?
: এই একটু বাইরে যাচ্ছি।
: বাইরে কোথায়?
: এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে।
: খুব সেজেছিস মনে হচ্ছে? আগে দেখেছি, সাজলে তোকে খুব সুন্দর দেখায়। এখন তোকে নিশ্চয় আরও বেশি সুন্দর দেখায়। এখন তো চোখে সেভাবে দেখতে পাই না। পারফিউমের গন্ধে ঘরটা ভুরভুর করছে।
‘ভুরভুর’ কী শব্দ সাজিদ তা বুঝতে পারে না, তবে কিছুটা অনুমান করতে পারে। গৃীষ্মে পঁচা ডোবায় পা দিলে বা কিছু ফেললে ফুটকুরির মত উঠে। গ্রামের মানুষ বলে, ভুরভুরি উঠতেছে। তো পারফিউমের গন্ধে ভুরভুর করা বা ভুরভুরি ওঠা সম্ভব না। তুলনাটা ঠিক মানানসই হলো না যেন। পারফিউমের গন্ধে ঘরটা ভরে গেছে-এরকম বলা যায়।
সাজিদ কিছু বলার আগেই মতলুব সাহেব আবার বললেন: কীরকম বন্ধুর সাথে দেখা করতে যাচ্ছিস? মানে ছেলে বন্ধু, না মেয়ে বন্ধু?
: দাদা, আমি আপনাকে অনেকবার বলেছি যে, আমার কোনো মেয়ে বন্ধু নেই।
: এ বয়সে মেয়ে বন্ধু থাকা কি স্বাভাবিক না?
: থাকা স্বাভাবিক। কোনো কোনো সময় স্বাভাবিক কিছুও অস্বাভাবিক হয়ে থাকে।
: কেন?
: কেন সেটা আপনি জানেন দাদা। আপনি খুবই বুদ্ধিমান মানুষ। আপনার মত বুদ্ধিমান মানুষ আমি খুব কম দেখেছি।
: বুদ্ধিমান আর জ্ঞানী কিন্তু এক কথা না। কিছুটা পার্থক্য আছে। আমি কি শুধুই বুদ্ধিমান, নাকি জ্ঞানীও?
: দাদা, আপনি বুদ্ধিমান এবং জ্ঞানী।
: তাহলে এখন বল, তোর কোনো মেয়ে বন্ধু নেই কেন?
: দাদার রিটায়ার্ডের টাকায় কেনা ফ্ল্যাটে থাকছি। বাবার হোটেলে খাচ্ছি। বাবার পকেটের টাকা নিয়ে চাকরি খুঁজছি। এরকম কোনো যুবকের মেয়ে বন্ধু থাকা অসম্ভব।

: জগতে কিছুই অসম্ভব না। কেউ কেউ তো মেয়ে বন্ধুর টাকায়ও চলে।
: ব্যতিক্রম কখনো উদাহরণ হতে পারে না দাদা। এখন সময় বদলে গেছে। এখন চা-সিঙ্গারা খেয়ে গল্প করা যায় না। এখন বসতে হয় চাইনিজ রেস্টুরেন্টে। মেয়েরা রিকশায় করে ঘুরতে চায় না। ঘুরতে চায় মোটর বাইকে। উপহার দেয়ার সিস্টেমও অনেক চেঞ্জ। ডায়েরি, কলম, বই, ফুল উপহার হিসেবে অনেক মেয়েই এসব পেতে চায় না। সেলফোন, আইফোন আরও কত কিছু……..।
: তাহলে একটু বস। তোর বন্ধুকে ফোন করে বলে দে’ যে, ঘন্টা দু’য়েক পরে যাবি। মেয়ে বন্ধু হলে আমি তোকে আটকাতাম না।
সাজিদের মুখ পাংশুল হল। এরকম কিছু ঘটতে পারে সে আশংকাটা তার মনে জেগেছিল। আর আশংকা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক হয়। বন্ধুর সাথে দেখা করতে যাব-এরকম কিছু না বলে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কিছু বলা উচিত ছিল। উপস্থিতভাবে ওর মাথায় কিছু আসে না। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কথা বলতে পারে না। পারে না বলেই অনেক সময় অনেকের কাছে আটকে যায়। স্বস্তির জন্য মাঝে মাঝে এদিক-ওদিক করে কথা বলতে পারা ভাল একটা গুণ।
সাজিদ বলল: বসবো কেন দাদা?
: আমাকে কিছুক্ষণ বই পড়ে শোনা। মনটা কেমন অস্থির অস্থির লাগছে। বইপড়া শুনতে পারলে মনটা শান্ত হবে।
মতলুব সাহেব একজন বইপোকা মানুষ। তাও যেমন তেমন পোকা নন। আঁঠালি জাতীয় পোকা। আঁঠালি যেমন গরুর গায়ে লেগে থাকে, তিনিও তেমন বইয়ের সাথে লেগে থাকতে চান। কিন্তু সেভাবে সেটা পারেননি।
সরকারি চাকরি করেছেন। মোটামোটি বড় পদেই চাকরি করেছেন। একটা প্রতিষ্ঠানের সহকারি পরিচালক পদ থেকে রিটায়ার্ডে গেছেন। তবে এ পদে ছিলেন মাত্র বছর চারেক। ধাপে ধাপে প্রমোশন পেয়ে এ পদে এসেছিলেন। সৎ ও কর্মনিষ্ঠ ছিলেন বলে প্রমোশনটা হয়েছে খুব ধীর গতিতে।
তো চাকরিতে থাকার সময় অফিস থেকে ফিরে বই পড়েছেন। কিন্তু সব সময় তো সেটা পারেননি। সংসারের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। আত্মীয়-পরিজনের সাথে দেখা-সাক্ষাতও করতে হয়েছে। তারপরও বলা যায়, তিনি যথেষ্ট পড়েছেন। তবে তাতে তিনি তৃপ্ত ছিলেন না। আশা করে ছিলেন যে, অবসর গ্রহণের পর যতদিন বাঁচবেন বইয়ের সাথেই বাঁচবেন। তার সে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাগড়া দিল চোখ। শরীর-স্বাস্থ্য ভালই আছে। চোখে গ্লুকমা। অনেক চিকিৎসায়ও বই পড়ার যোগ্য দৃষ্টি শক্তি ফিরে পেলেন না। এখন তার একটাই উপায় অন্যকে দিয়ে বই পড়িয়ে শোনা।
সাজিদ কাজটা করে। অনেকটা আনন্দের সাথে করে। কারণ বই পড়ায় তার মোটামোটি আগ্রহ আছে।
মাঝে মাঝে মতলুব সাহেবকে তনিমাও বই পড়ে শোনায়। তনিমা সাজিদের ছোট বোন। ক্লাশ এইট-এ পড়ে। স্বভাবে শান্ত-শিষ্ট। চুপচাপ ধরনের। দাদার প্রতি তার অনেক ভালবাসা ও সহমর্মিতা।
তবে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তনিমা দাদাকে বই পড়ে শোনানোর সময় বেশি পায় না। তার সময় সব খেয়ে ফেলে বর্তমান সময়ের লেখাপড়ার সিস্টেম। সৃজনশীল নামে অদ্ভূত এক সিস্টেমের লেখাপড়া। বোর্ড প্রদত্ত মূল বই স্কুলে মোটামোটি পড়ায়। তবে মূল বইয়ের টপিক থেকে হুবহু প্রশ্ন আসে না। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে অন্যসব উদাহরণ দিয়ে আসে। সেই সৃজনশীল প্রশ্নের সীট পেতে তাকে ঘুরতে হয় কোচিং সেন্টারে এবং টিচারদের বাসায়। মতলুব সাহেব মাঝে মাঝে আফসোসের সুরে বলেন: এই রকম বিতিকিচ্ছিরি সিস্টেমর লেখাপড়া দেখে মরতে হবে তা কোনোদিন ভাবি নাই। ছেলেমেয়ে স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করে ফিরবে। তারপর নিজের ঘরে বসে লেখাপড়া করবে। অবসরে বই পড়বে, সৃজনশীলতার চর্চা করবে। গান গাইবে। নাচবে। আবৃত্তি করবে। অভিনয় করবে। ছবি আঁকবে।
তবে সান্টুটা দাদাকে একেবারেই সময় দেয় না। সান্টু সাজিদের ছোট ভাই, তনিমারও ছোট ভাই। বয়সে তনিমার ছোট না। তনিমা সান্টুকে ছোট ভাইয়া বলে ডাকে। আর সাজিদকে ডাকে, বড় ভাইয়া।…(চলবে)

স্বাধীনতার মানে
সৈকত মজুমদার

 

গোড়াতেই বলি, এই লেখার শিরোনামটি ধার করলাম কবি ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের একটি অসাধারণ কবিতা থেকে ।

কদিন আগেই ঘটা করে আমরা চুয়াত্তরতম স্বাধীনতা দিবস পালন করলাম কি না ! চুপিচুপি বলে রাখি, একটি অনুষ্ঠানে এই কবিতাটিই পাঠ করেছিলাম। তাই মনে হল, এর থেকে প্রাসঙ্গিক শিরোনাম আর কিই বা হতে পারে !

স্বাধীনতার মানে সত্যিই পাল্টে যায় ব্যক্তি, পরিস্থিতি ও পরিবেশ অনুযায়ী। এ কথা বোধসম্পন্ন মানুষ মাত্রই তা জানেন। এই অতিমারী আরও চোখে আঙ্গুল দিয়ে তা দেখিয়ে দিল । গত তিয়াত্তর বছর ধরেই ক্ষেত্রবিশেষে অনেক মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে, ‘ আচ্ছা, সত্যি কি আমরা স্বাধীন !’ কিন্তু এ বছর পনেরোই অগাস্ট দিনটাতে এ প্রশ্ন কি সর্বজনীন হয়ে ওঠে নি ? বাক স্বাধীনতা বা নাগরিক অধিকার প্রয়োগের স্বাধীনতার ক্ষেত্র ক্রমশঃ সঙ্কুচিত হয়ে আসছে বেশ কিছুদিন ধরেই। সে সব বিতর্কিত প্রসঙ্গের অবতারণা না করাই ভাল । কিন্তু এই অতিমারী যে নিষ্ঠুর বাস্তবের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিল, তা হল – প্রভাবশালী বা ধনশালী অথবা দুটোই না হলে সাধারণ মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার স্বাধীনতাও এখন বিপন্ন । সেবার আদর্শ আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হাসপাতালগুলো এখন সেই কসাইখানা যেখানে নিত্য বলি হচ্ছে আমার আপনার মানবিক ও নাগরিক স্বাধীনতা ।

শুধু কি তাই ! মানবিকতা বিপন্ন জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও । ভেবে দেখুন, আপনার চারপাশের এতদিনের চেনা পৃথিবীটাকে চেনা বলে ভাবার স্বাধীনতাও আপনি আস্তে আস্তে হারিয়ে ফেলছেন । আপনাকে হয়তো নিজের বাড়িতে বা নিজের পাড়াতে ঢুকতে বাধা দেবেন আপনারই পুরনো প্রতিবেশী ।

সুস্থ থাকলেও আপনি আর মনে মনেও স্বাধীন নন । বহুদিন পর ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরতেও তো এখন দ্বিধা ! ‘দো গজ কি দূঁরি’ দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকটাই ।

স্বাধীনতা খুঁজছে প্রতিটি মানুষ । মাসের পর মাস স্কুলের ডেস্কগুলো যেমন খুঁজে বেড়াচ্ছে দুষ্টুমির স্পর্শ, ঠিক তেমনই গৃহবন্দি ছোটরা শৈশবেই বুঝতে শিখে গেল পরাধীনতার মানে । কলেজের পড়াশুনো যদি বা অনলাইনে সামাল দেওয়া যায়, মন দেওয়া নেওয়ার মাধ্যম শুধু হোয়াটসঅ্যাপ ! হায় প্রেম ! কোথায় তোমার স্বাধীনতা !

হ্যামলিনের সেই বাঁশিওয়ালাকে খুঁজে চলেছি আমরা, যে আমাদের এনে দিতে পারে স্বাধীনতার সন্ধান । এক অদৃশ্য জীবাণু তো শুধু আক্রমণ করছে শরীরকে। আরও অজস্র জীবাণু যা আমাদের মনন, আমাদের বোধকে আক্রান্ত করছে, তাদের থেকেও স্বাধীনতা চাই আমাদের খুব তাড়াতাড়ি। বাঁশিওয়ালা, তুমি কোথায় ?

মদ্যপ

দেবাঞ্জন ভৌমিক

ওঠো, ভাবো, ডাইনে চলো, থামো

বাঁয়ে, দাঁড়াও, ডাইনে, কোথায় এলে?

বিন্দু, বিন্দুতে এলে।

সহস্রাব্দের হাড়মাস নিয়ে এগিয়ে চলো

চলো, ওরা পচে না, যেমনকার তেমনই থাকে

ইটের মত শক্ত, স্তম্ভের মত ঋজু

কথা বলো, কথা, অনর্গল কথা বলে চলো

তোমার মাথা পিঁপড়ের থেকেও ছোট।

তোমার ঝুলন্ত ঠোঁট দেখা যায়

ঠোঁটটাকে রবারের মত টেনে নিয়ে যাও

টানো! টা্নো! অনেক দূর এগোবে

মাতালের মত এগিয়ে চলো, নেশাতুর চোখ, কম্পমান দেহ

আঁধার ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে চলো

এগিয়ে চলো, ভেবো না কোথায় যাচ্ছ,

ভাববার চেষ্টাও করো না, খালি এগিয়ে চলো

পথে যেতে যেতে ঠেলা, গুঁতো আসবে, ভেবো না

তুমি খালি চলতে থাকো, আর দেখতে থাকো

অমন কত গুঁতই আসবে, কত ঠেলাই খাবে,

বুঝবে তুমি একা নও, সকলেই চলছে অমন মদ্যপের মত

মোহমুগ্ধ এই দুনিয়ায় আমরা প্রত্যেকে এক একটি মদ্যপ

জগৎমদিরায় প্রমত্ত হয়ে চলতে থাকি।

ইনসাইটফুলসাইট একটি ওপেন প্ল্যাটফর্ম , ঠিক যেরকম আপনারা রেলের প্ল্যাটফর্মে দৌড়ে বেড়াতে পারেন, এখানেও আপনারা নিজেদেরকে স্বাধীন ভাবে প্রকাশ করতে পারেন। গল্প, কবিতা, অনুগল্প, ভ্রমণ বিষয়ক লেখা, প্রবন্ধ, অনুবাদ – আপনারা আপনাদের লেখা পাঠাতে পারেন আমাদের ই-মেইল করে, আমরা আপনার লেখা গল্প, কবিতা অথবা প্রবন্ধ প্রকাশ করবো আমাদের এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে।

লেখা পাঠান- insightfulsite@gmail.com
সাথে থাকুন, পড়তে থাকুন।

সম্প্রীতির চিঠি

    পৌলোমী ভট্টাচার্য্য

 
প্রিয় নাফিসা,
             আজ ২২ বছর কেটে গেল, তোর খবর পাই না। কেমন আছিস তাও জানি না। শুধু এই টুকু জানি সেই শেষ রাত্রির কথা, নিকষ কালো রাতের কথা। দুর্গাষ্টমীর ভোরে তুই এসেছিলি পাড়ার মন্ডপে, সেই শেষ দেখা তোর সাথে আমার। তখন আমাদের কতোই বা বয়স হবে, এই ১৫ কিংবা ১৬।
আচ্ছা আমরা তো হাত ধরে একসঙ্গে ঠাকুর দেখেছি, তাতে কোন দোষ ছিল? ঈদের দিন তোর ঘরে পাত পেড়ে খেয়ে এসেছি তাতে কি জাত ধর্ম খোয়া গেছে আমার? বোধহয় যায়নি, যায়নি কারন আমার আর তোর যে নিবিড় সম্পর্ক, তাই। শুধু দোষ হয়ে গেল তোর সহজ সরল মনের।আমাদের দেখে পুজোর দিন তোরও শাঁখ বাজানোর ইচ্ছেটা প্রবল হল বলে।বুঝিনিরে আমি, তোর এই ভুলের জন্য তোকে আমি চিরদিনের জন্য হারাবো এভাবে।বুঝিনি কিশোরীর সারল্যও হার মানে ধর্মীয় আচারের কাছে।
 আজ স্বাধীনতার৭৪ বছর অতিক্রম করল আমাদের দেশ। বাইরে তাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুর বাজছে 
        “মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম 
                       হিন্দু মুসলমান”
মনে হচ্ছে, সত্যিই কি তাই? তাই কি আমি, নাফিসা তোকে আজও খুঁজে বেড়াই।  
                                                   ইতি 
                                                      তনিমা~

সেই রাত!

Kalyan Kumar Bhattacharjee

প্রায়ান্ধকার এক জংলী গাছের পাতা মুড়ে নালসে পিঁপড়েরা বাসা বানিয়েছে, এই ভয়ঙ্কর বর্ষায় যেন ডিমগুলো পড়ে না যায়! এই নালসে পিঁপড়ের ডিম দিয়ে মাছের ভালো চার হয়! অনেক ওপরে গাছের একডালে বসে আছে উড়ন্ত কাঠবেড়ালী, নিচে খচমচ আওয়াজ পেয়ে একগাছ থেকে অন্য গাছে লাফ দিয়ে ভেসে গেল! বক্সার এই জঙ্গলে, অজগর সাপ, লেপার্ডের সঙ্গে বড়ো গুবরে পোকা থাকে, সুন্দর লেডিবার্ড থাকে, প্রজাপতি, হরেক পাখি  আর নানান কীট পতঙ্গ৷ সর্ব্বোপরি জোঁক! বোধহয় ভুতও থাকে৷

বছর কয়েক আগে, একদিন কাজের জন্য বক্সাদুয়ার গিয়ে ফিরতে পারিনি! জঙ্গলের গায়েই এক অতি বন্ধু আদিবাসীর টিনছাওয়া কাঠের খুঁটির ওপর বাড়িতে আশ্রয় পেলাম৷ সন্ধেয় চমৎকার হাঁড়িয়া সেবনে বর্ষার ম্যাজম্যাজে ভাবটা কেটে গেছে৷ এই দিনের পর দিন ছিপছিপে বৃষ্টিতে চাপা ঠান্ডা পড়ে৷ শ্লেটের মতো ঘোলা আকাশ, ঘরের পাশেই লম্বা লম্বা শালগাছের সারি, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝিলিক! জঙ্গলের মধ্যেথেকে বিভিন্ন আওয়াজ, ব্যাঙের ডাক ভেসে আসছে! মাঝে মাঝে গ্রুম গ্রুম করে মেঘগর্জন! অন্ধকার আরও বাড়িয়ে দিয়েছে টিমটিমে লন্ঠনের আলো! জোনাকিরা উড়ছে ঝোপে৷ আমার আদিবাসি বন্ধু বিরশা ঘুম ঘুম চোখে আধা জেগে! ওর বউ বাচ্চাটাকে নিয়ে অনেক আগেই ঘরে ঢুকে গেছে৷ আমার চোখে এই সন্ধেরাত্তিরে ঘুম নেই৷ আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলাম! বিরশা অস্ফুটে কী একটা বললো কানে ঢুকলোনা৷

নিচে উঠোন পেরোলেই সামনে ঘনকালো জঙ্গল৷ হাতে মোবাইলের টর্চ ছাড়া কিছু নেই৷ এই জঙ্গলের ভালোবাসায় ভরা এক অদ্ভুত টান আছে, যাদের ওই পাগল হওয়ার রোগ আছে, তাদের নিস্তার নেই! আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম! জ্যোতিষি পই পই করে বলেছিল যে আমি একশোবছর বাঁচবো, আর সেই পাগলা ভালোমানুষ দ্বিজপদ!  দ্বিজপদ তো বলেইছে, দাদাবাবু, তোমারে কেউ বাঁচাইতে পারবেনা! 

পায় পায় জঙ্গলের দিকে এগিয়ে গেলাম৷ কিন্তু ওটা কী? প্রদীপের মতো দপদপে আলো? আমি এগিয়ে যেতেই আলো দুরে সরে যায়, আবার এগুলে আবার সরে যায়, শেষে অন্তর্হীত হলো৷ আর নেই৷ হটাৎ ঘাড়ের কাছে ঠান্ডা বরফের মতো স্পর্শ অনুভব করেই চমকে উঠলাম, মোবাইলের টর্চ জ্বালাতে গিয়ে বৃষ্টির জলে পিছলে সেটা গেল পড়ে৷ পেছনে ঘুরে কাউকেই দেখতে পেলাম না৷ অন্ধকারে কাদার মধ্যে মোবাইল খুঁজতে আরেক বিপত্তি, চশমার কাঁচ কাদাজলে যাচ্ছেতাই অবস্থা! আমি হাঁটুগেড়ে বসে মোবাইল খুঁজছি, এমন সময় আবার ঠান্ডা ছোঁয়া, যেন টানতে চাইছে৷ আবার আবার! এবার যেন দুই হাতে টেনে নেবার আপ্রান চেষ্টা! তারপর আর মনে নেই৷ 

সকালের আলো ফুটতে চোখ মেলে দেখি ঘিরে আছে কয়েকটি উৎকন্ঠিত মুখ৷ বিরশা তো জড়িয়ে ধরলো৷ উঠে বসে শুনলাম, কালকে আমি নেমে যাওয়ার পরে, বিরশার বৌ বাইরে এসে আমায় না দেখে বিরশাকে টেনে তুলে অপেক্ষা করে৷ অনেকক্ষন পরে না পেয়ে টর্চ নিয়ে নিচে নেমে ডাকাডাকি করে খুঁজতে বেরোয়৷ আমাকে পায় জঙ্গলের ভেতরে একটি গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে শোয়া অবস্থায়৷ মোবাইলটা পকেটেই ছিল৷ আমি অক্ষত ছিলাম, হয়তো কারও অদৃশ্য অঙ্গুলীহেলনে শ্বাপদ, স্বরীসৃপরা কাছে ঘেঁসেনি৷

সুখ
চুমকি সাহা

অস্থির অগোছালো সময়ে
স্বস্তির স্থিরতা ই খুঁজি
অজস্র অ-সুখের আধাঁরে
সুখের স্বপ্ন নিয়ে বাঁচি।

সুখ তুমি অন্যের আকাশে ঘুড়ি হয়ে ওড়ো
চা৺দিয়াল পেটকাটি বগ্গা
আমার আকাশে যেই এলে dear
অমনি তুরন্ত ভোকাট্টা।

হতাশার মরুভূমি পার হই
মনে আসে বহুশ্রুত বাণী
সুখ নাকি মরীচিকা সম
মায়া হয়ে দেয় হাতছানি।

দুঃখের পাহাড়েতে দাঁড়িয়ে
ভাগ্য কে দোষারোপ করি
কিছু দোষ নিজের ও তো ছিল
সেই কথা বেমালুম ভুলি।

সুখী লোক প্রজাপতি সম
রঙের বাহারে মন কাড়ে
Struggle তো তার ও বহু থাকে
সেও কভু শু৺য়োপোকা থাকে।

সুখ তুমি আমার আকাশে
আলো দিশা হয়ে খেলা কোর
Permanent না ই যদি হও
মাঝে মাঝে রামধনু এ৺কো।

মুখোশের আড়ালে সভ্যতা
শ্যামসুন্দর গোস্বামী

পোট্রেট আঁকিয়েদের ছুটি হয়ে গেছে
বহুদিন। মুখ নিয়ে যারা গবেষণা
করে তাদেরও। আমরা এখন,
মুখোশ পরে ঘুরে বেড়াই
চোখগুলো থেকে অনুভূতি পড়ি
আগেও তো পড়েছি
বুঝেছি কি?
এখন ঠোঁট আগলে রাখি
আমরা। মুখের ভাষা ছাঁকনি
ছেঁকে বেরোয়, কথাও বলছি কম।
মুখ-স্পর্শ ছাড়া ভাষা তো
স্বরলিপি!
ভালবাসাও?
এই প্রশ্ন করা মানে ২০২০-তে
কোয়ারেন্টিনে থাকা। তাই,
সিন্দুক ভরে সমস্ত আবেগ
রাখা আছে কোষ গহ্বরে।
বিশৃঙ্খলা
কেটে গেলে,
হয়ত ফিরে পাব মুখ!
না কি মুখোশের আড়ালেই
থেকে যাবে সভ্যতা !

Publish Your E-Book Now 

Send Your Book at insightfulsite@gmail.com

I Am Me

Mrittika Paul

Why do you tell me to be like everyone else when you can see that I’m not?
Why do you tell me to think the same when I have a different thought?
Why do you try to define my mind?
What do you expect to find?
Is it your mental peace, a satisfaction of some kind?
A petty consolation that doesn’t let you realize you’re still in the blind.
Cause I am not who you think I am, my mind doesn’t work the same;
My thoughts are different, ones that you can’t define or label or name.
Yes, I overthink, I am complicated,
My thinking process is diverse,
Cause my thoughts don’t align with everyone else’s,
And they certainly cannot be dictated.
A mind like that is a mind on its own,
It reads between lines, finds meaning in each word;
It thinks too much about every little thing,
Even the thing which your ear might not have heard!
It’s just so easy for you to casually say, chill out, loosen up,
When it’s trying to connect from dot to dot,
And then comes your best advice, ‘don’t think so much’,
And it’s about to blow up.
If I punch you to break your nose and tell you, ‘Stop crying,’
Will you stop? Will the pain not make you cry anymore just because I said so?
If I put two bullets through your chest and tell you ‘Stop dying,’
Will you stop? Will you not die anymore just because I said so?
Then why you do you expect me to stop thinking when you know I can’t?
Why do you expect my thoughts to be stopped dead with your irrelevant chant?
I am not the kind of person to take everything lightly,
I think differently,
My brain is hardwired to percept everything very finely;
So, don’t tell me to think the same when I have a different thought,
Don’t tell me to be like everyone else when you can see that I’m not.

   প্রিয় বন্ধু

 তনিমা সাহা

      প্রিয় বন্ধু, জানি না কেমন আছ তুমি,
      প্রিয় বন্ধু, জানি না এখনো আছি কী মনে আমি,
      প্রিয় বন্ধু, জানি না তুমি আজও কী পড়ন্ত  
      সূর্য্যের অস্ত দেখতে ভালবাস;
      প্রিয় বন্ধু,জানি না এখনো কী খোঁজে 
      তোমার চোখ আমায়,
      হোস্টেলের বারান্দায়, ক্যান্টিনের কোনায়;
      প্রিয় বন্ধু, জানো ছিল অনেক সাধ আমার, 
      ছিল অনেক অভিলাষ,
      বুকে তোমার মুখ গোঁজা হলো না আমার, 
      পান করা হলো না তোমার অধরের তৃপ্ততা;
      প্রিয় বন্ধু, অপেক্ষায় এখনো আমি চাঁপাদীঘির
      সিড়িতে ফলকরূপে,
      প্রিয় বন্ধু, জানি একদিন তোমারও ঠাঁই হবে 
      আমার নামের ফলকেরই পাশে|

Publish or Sell Your Little Magazine  

Upload Your Magazine at Zero Cost 

Sell Your E-Book 

No Listing Charges 

Publish Your Book within 15 days

গল্প:

বৃষ্টিতে ভালোবাসা

তনিমা সাহা

সেক্টর ফাইভে একটা শেডের নিচে  চুপচুপে ভেজা জামাকাপড়ে দাঁড়িয়ে বিতান মনে মনে গজরাতে থাকে,” হতচ্ছাড়া বৃষ্টি, অফিস থেকে এই শেড পর্যন্ত আসতেই ভিজিয়ে জবজবে করে দিল। এই বৃষ্টির দিনটাকে এক্কেবারেই পছন্দ করে না। চারিদিকে কাদা, নোংরা জমা জল….. ইয়াক্! “। রুমালে হাত ভালো করে মুছে ফোনটা পকেট থেকে বের করে একটা ক্যাব বুক করে নিল। “এই ভেজা কাপড়ে বাসে তো দূর কোনো শেয়ার টেক্সিতেও বসা যাবে না। উফ! তারাতারি বাড়ি পৌঁছুতে হবে।এই ভেজা গায়ে আর কিছুক্ষণ থাকলেই নির্ঘাত শরীর খারাপ করবে”, ভাবতে ভাবতেই ক্যাব চলে এলো। বিতান ঝট করে ক্যাবে বসে পড়লো,” দাদা, গড়িয়া মোড়”।

রাত তখন নয়টা। ‘রায়বাটী’তে কলিং বেল বাজলো। 
ব্রততী দেবী বললেন,” ওই বোধহয় বাবাই এলো”। দরজা খুলতেই  কাকভেজা বিতানকে দেখে বললেন,” এ কী রে ! যা,যা ঘরে গিয়ে আগে ফ্রেশ হয়ে নে।আমি চা বসাচ্ছি”। বিতান বলল,” এই পচা বৃষ্টির দিন যে কবে শেষ হবে কে জানে”। ঘরে ঢুকতেই বিতানের বাবা পীয়ূস বাবু বললেন,” অফিস যাবার সময় একটা ছাতা নিয়ে গেলেই হয়। তবেই এই বিপত্তি ঘটে না”। কথাটা না শোনার ভান করে বিতান নিজের ঘরে চলে গেল। মনে মনে ভাবলো,
” উফ্! এই ভদ্রলোকের কাছে পৃথিবীর সব প্রশ্নের উত্তর তৈরী থাকে”। পীয়ূস বাবুর পাশে বসে ব্রততী দেবী বললেন,” আগে বাবাই বৃষ্টি কী ভালোবাসতো মনে আছে। বেশ বড়ো বয়স পর্যন্তও কাগজের ভেলা বানিয়ে বৃষ্টির জমা জলে ভাসাতো। হটাৎ কয়েক বছরে কী এমন হয়ে গেল যে বৃষ্টি দেখলেই চটে যায়”। তারপর পীয়ূস বাবুকে বললেন,” চা তো ঠান্ডা হয়ে গেছে।আরেক কাপ বানিয়ে আনি”। পীয়ূস বাবু বললেন,” নাহঃ! তুমি বাবাইকে আদা, গোলমরিচ দিয়ে চা বানিয়ে দিও। ভিজে এসেছে, শরীর খারাপ না হয়ে যায়”। ব্রততী দেবী বললেন,” আল্লাদ তো উথলে পড়ছে। কথা বলার সময় অন্তত ছেলেকে একটু আল্লাদ দেখাতে পারো”,বলে রান্নাঘরে গেলেন চা বানাতে। পীয়ূস বাবু বিতান আর ব্রততী দেবীকে খ্যাপাতে খুব মজা পান। আর ওরা রেগে গেলে মিটিমিটি করে হাসতে থাকেন। এই যেমন এখন হাসছেন। চা বানিয়ে ব্রততী দেবী বিতানকে ডাকলেন,” বাবাই আয় বাবা, চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে”। বিতান স্নান করে এসে বসলো। টুকটাক কথাও হলো। কিন্তু বিতানের মনটা আজ একেবারেই ভালো নেই। চা শেষ করে বিতান বলল,” মা আমি রাতে কিছু খাবো না। অতনুর আজ ডোমেস্টিকে লাস্ট ডে ছিল,তাই খাওয়া দাওয়া ছিল।পেটটা ভরা ভরা লাগছে”,বলে কোনোমতে উঠে আসলো ওদের সামনে থেকে। এখনও বিতান মা-বাবার সামনে মিথ্যে বলতে পারে না। বিতান উঠে গেলে পীয়ূস বাবু বললেন,” জানো তো ব্রতো, বাবাইটার মনটা ভালো নেই আজ”। ব্রততী দেবী বললেন,”কই,কিছু বুঝতে পারলাম নাতো”। নিজের ঘরে এসে বিতান বিছানায় শুয়ে পড়লো। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না।বারবার পাখীর বলা কথাগুলো, পাখীর মুখটা, অতনুর দাম্ভিক হাসিটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। এইই তো সেদিনের কথা, দুপুরে অফিসে লাঞ্চের পর হঠাৎই আকাশ কালো করে বজ্র-বিদ্যুৎ সহ বৃষ্টি।বিতান ভাবলো,”যাহ!সকালের কড়কড়ে রোদ দেখে তো মনেই হয়নি এমন কিছু হবে।ভালোই হলো রাতে খিচুরি আর মাছ ভাজা খাব”। চট্ করে ফোনটা নিয়ে মাকে জানিয়ে দিল রাতের মেনু।তারপর কাজে লেগে পড়লো। কিছুক্ষণ পর ওর জুনিয়র পাখী এসে একটা ফাইল দিয়ে বলল,” বিতান দা,এটা আর্জেন্ট, টি.এল. বলেছে আজকের মধ্যেই কমপ্লিট করতে হবে।”। বিতান ঘড়িতে দেখলো পনে পাঁচটা বাজে। এই ফাইল শেষ করে উঠতে উঠতে নয়টা সাড়ে নয়টা তো বাজবেই। কিন্তু কী করার বসের যখন অর্ডার এসেছে তখন তো করতেই হবে কমপ্লিট। কাজ শেষ করে দেখলো সাড়ে আটটা বাজে। অফিসে কেউ নেই। শুধু ও ই আছে।বাইরে তখনও প্রকৃতি তান্ডব করে যাচ্ছে। সে বেড়োতে যাবে তখনি পাখী ঢুকলো।বৃষ্টিতে পুরো ভিজে গেছে। পাখী বলল,”আর বোলো না বিতানদা কী দূর্গতি। একেই ফোনে চার্য নেই, রাস্তায় বাস,অটো কিচ্ছু পাচ্ছি না,তার উপর বৃষ্টিতে ভিজে একসা। কথা বলতে বলতে পাখী বিতানের কাছাকাছি চলে এসেছিল। বিতান হাঁ করে পাখীকে দেখছিল। প্রথম দিন পাখীকে দেখেই প্রেমে পড়েছিল বিতান। আজ বারীধারায় লিপ্ত পাখী থেকে যেন চোখই সরাতে পারছে না। হঠাৎই খুব জোরে কাছেই কোথাও বিদ্যুৎ চমকালো। পাখী ভয় পেয়ে বিতানকে জড়িয়ে ধরলো। এই প্রথম বিতান কোনো নারীর ওম অনুভব করলো। এক অদ্ভূত ভালো লাগার আবেশে নিজেকে ভাসিয়ে দিল। তারপরের একবছর বেশ কেটেছিল।পাখীর মতো সুন্দরী প্রেমিকা কজনের জোটে।

একদিন অফিসে গিয়ে দেখে পাখী তার টীম মেট অতনুর সাথে কোনো কিছুতে খুব হাসছে আর বারবার অতনুর গায়ে ঢলে পড়ছে। আর অতনু ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে। বিতান তখন কিছু বলল না। বিকেলের টি ব্রেকে বিতান পাখীকে নিয়ে অফিসের বাইরে এসে বলল,” পাখী তুমি অতনুর অত কাছ ঘেঁসে বসো না।ও বারবার তোমাকে ব্যাডটাচ্ করছিল,আমার সেটা ভালো লাগছিল না”। পাখী বলল,”বিতানদা কোন্ ক্লাশে পড়ো তুমি। ব্যাডটাচ্ আবার কী। আমরা সবাই এখানে ম্যাচিওর। আর শোনো অতনুর একটা ব্রাইট ফিউচার আছে। ভবিষ্যতে বিদেশেও যাওয়ার সুযোগ আছে। তোমার মতো এঁদো বাঙালির সাথে  এ সম্পর্ক আমি টানতে পারবো না”,বলে বড়ো বড়ো পা ফেলে অফিসে ঢুকে গেল। বিতানের মুখে কোনো কথা ছিল না। এমন সময় কোত্থেকে আকাশ কালো করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টির জলে ভিজে চোখের জলকে লুকিয়ে নিল বিতান। এমনই এক বৃষ্টির দিনে সে পাখীকে পেয়েছিল আর আরেক বৃষ্টির দিনে পাখী তাকে ছেড়ে চলে গেল।

পাখী তাকে ঠকিয়েছে এটা ভাবতে খুব কষ্ট হয় বিতানের।বিছানায় শুয়ে ‌শুয়ে কাঁদতে থাকে বিতান। কেন পাখী এমন করলো তার সাথে,তবে কী পাখীকে ভালবাসা ভুল ছিল? 

রাতে ঘুম থেকে উঠেছিলেন বাথরুমে যেতে পীয়ূস বাবু। ছেলের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলেন যে বিতান হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফোঁপাচ্ছে। পীয়ূস বাবু বিতানের পাশে বসে তার কাঁধে হাত রাখলেন।আচমকা বাবার স্পর্শে চমকে উঠলেও, ঐসময় বাবাকে সামনে দেখে নিজেকে আর আটকে রাখতে পারে নি বিতান। বাবার কাঁধে মাথা রেখে সব বলে বিতান একটু হালকা অনুভব করে। পীয়ূস বাবু বলেন,”জানিস বাবাই, কঠিন সময় প্রত্যেকের জীবনেই আসে। কঠিন সময়েও যে মহীরুহের মতো ঝড়ের সব দাপট সহ্য করে স্থির থাকে তারাই কিন্তু বিজয়ী হয়। কঠিন সময় আমাদের ভেতরের গূণগুলোকে চিনতে শেখায়”। বিতান বলল,” আমার কাউকে ভালোবাসাই উচিৎ হয়নি, তাই না বাবা”। স্মিত হেসে পীয়ূসবাবু বললেন,”না রে বাবাই, ভালোবাসা টা ভুল নয়। ভালোবাসার মানুষটা ভুল ছিল। যে তোকে, তোর ভালোবাসাকে মর্যাদা দিল না তার জন্য চোখের জল ফেলার কোনো মানেই হয় না”। বিতানের মনটা এখন একটু ভালো লাগছে। সে পরম নিশ্চিন্তে পীয়ূসবাবুর কোলে মাথা রেখে বলল,”বাবা,এভাবেই সব কঠিন সময়ে আমার পাশে থেকো”। বিতানের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে পীয়ূসবাবু বললেন,”সবসময় আছি আর থাকবোও”। বাইরে পাখিদের কিচিড়-মিচির জানান দিচ্ছে যে ঘন অন্ধকার কেটে সকালের উজ্জ্বল সূর্য্য উদয় হয়েছে।

লক ডাউন
অনসূয়া মুখোপাধ্যায়

আবার লক ডাউন শুরু হয়েছে। সুতপা,সুতপার স্বামী আর দুই ছেলে।শুভায়ন ,সুমন। ছোট্ট সুখী পরিবার। শ্বাশুড়ি গত হয়েছেন দুবছর।নিরামিষের ঝঞ্ঝাট আর নেই তাই .সাতসকালে আর রান্না শুরু করতে হয়না। একটু বেলা করে ঘরের সব কাজ সেরে রান্নায় হাত দেয় সুতপা । এ কদিন বর বাড়িতেই ছিল, বাজার নিয়ে কোনো চিন্তা ছিলোনা,কিন্তু এখন লক ডাউন শুরু হলেও,ওদের অফিস খোলা ,ওদের জন্য বিশেষ ট্রেন , অফিসও যেতে হচ্ছে। বাজার এখন এক বিরাট সমস্যা। বড় ছেলে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত ,টুকটাক বাজার হাট ছোটোছেলে সুমন ই করে। মোটামুটি মুখচোরা ,লাজুক ছেলেটা মায়ের বাধ্য। মায়ের মনখারাপ হলে ,পাশে বসে বলে —-কাঁদছো কেন ?”বলতে বলতে নিজের বড় বড় চোখদুটো জলে ভোরে ওঠে।

সুতপা ঠিক করলো আলুপোস্ত আর ডিমের ঝোল করবে,দুটোই সুমনের খুব পছন্দ। তার সঙ্গে পেঁয়াজ ,লঙ্কা কুচি দিয়ে মুসুরির ডালের বড়া । রান্না করতে গিয়ে দেখলো ডিম্ ও নেই পোস্ত ও নেই.,খোঁজ পড়লো সুমনের ,তিনি একমনে ছাদের কোনে প্লাস্টিকের বোতলে মাটি ভরছেন ,সারাগায়ে মাটি ,ঝুলন্ত টব বানাবেন ,নেট থেকে উদ্বুদ্ধ। দাদা কিন্তু এইসব হাবিজাবি করেনা ,নিজের পড়া নিয়ে ব্যস্ত। সুতপার মাথাটা ঝা করে গরম হয়ে গেলো। এই সক্কালবেলা অনলাইন স্কুলের ক্লাস ছেড়ে বাগান করছে !তাও যদি ঠিকঠাক করতে পারতো। ইউ টিউবের পান্ডিত্য। এই ছেলেটা জ্বালিয়ে খেলো। পরের বছর যে উচ্চমাধ্যমিক একটুও চিন্তা আছে ? “ সুমন” চিৎকার শুনে-চমকে উঠে বললো ,”নেট নেই মা“ বাহ্ আর পায় কে.

সুতপা একটা ছোট ব্যাগ আর ৫০০ টাকার নোট সুমনকে দিয়ে বললো — “ টাকাটা আবার হারিয়ে ফেলিসনা ,কি ভাবতে থাকিস সারাদিন ভগবানই জানে ,২ দিন আগেই ১০০ টাকা নালিতে ফেলেছিস।
কাচু মাচু মুখ করে বললো “ইচ্ছা করে ফেলিনি মা ,একটা সাইকেল এসে ধাক্কা দিলো ,তাই হাত থেকে পড়ে গেল”.

রাস্তায় বেরিয়ে মাথা নীচু করে হাঁটছিলো সুমন। মাথা তুলে হাঁটতে ভাল লাগেনা । ও জানে ১৭ বছর বয়েসে ওর এই অল্প ভুঁড়ি ,৫ ফুট ২ ইঞ্চি লম্বা শরীর কারুর নজর কাড়েনা। চটি ঘষটাতে ঘষটাতে ওর হাঁটাটা খুব ক্লান্তিকর ,চোখ খুলে ও সারাদিন স্বপ্ন দেখে। একদিন ও ওর দাদার মতন সবার চোখে হিরো হয়ে উঠবে। দাদার মতন চুল ঝাঁকিয়ে মেয়েদের দিকে যখন তাকাবে ,মেয়েদের মনে শুধু তখন ও।

`‘এইই লাল্টুস কোথায় চললি ?”——“গা জ্বালা করে এমন ডাক শুনলে , উত্তর না দিয়েও উপায় নেই ,বাবার বন্ধু ,এতো বয়স্ক মানুষ,কেমন করে যে এমন হালকা ঠাট্টা করে !”পায়ের সামনের প্লাস্টিক টাকে এক লাথি মেরে মনের ঝাল মিটিয়ে মাথা তোলে সুমন। ———দোকানে –
“——–হেঁ হেঁ এই দোকান আর বাড়ি সারাদিন করে বেড়া ,পড়াশোনাতো হবেনা। “

“—পড়াশোনা হবেনা কেন !৫/২ হলে পড়াশোনা হয়না !দাদার মতন ৬ ফুট হতে হবে?তাহলেই বুঝি ৯৮.৫% নাম্বার পাওয়া যায় ? শুধু পড়াশোনা করতে হবে?খেতে ভালোবাসতে পারা যাবেনা !”চোখ জলে ভোরে আসে সুমনের।

রাস্তার ওধারে পল্টুকার দোকান ছাড়িয়ে মোড়ের মাথায় মানুষের মাথা গিজ গিজ করছে ,কারুর মাস্ক থুতনিতে কারুর কানে কারুর গলায় ,প্রচুর হৈ – হট্টগোল। কৌতূহল হচ্ছে কিন্তু যাবার সাহস নেই,দেরি হলে মা রাগ করবে। পল্টুকাকে গড়গড় করে জিনিসগুলো বলে গেল ,”পল্টুকা তাড়াতড়ি দাও,মা এখনো রান্না শুরু করেনি ,দেরি হলে রাগ করবে”–

—দাঁড়ারে ,ওরকম রেলগাড়ী চালালে হবেনা ,আজ না হয় তোদের বাড়ির রান্না একটু দেরিতেই হবে ,দেখছিস না এই লক ডাউনেও চুরি করতে বেরিয়েছে ,পাবলিকের কেলানি কাকে বলে এবার বুঝবে বাছা ধন।

সুমন ঝুঁকে দেখলো ওরই বয়সি ছেলেটা। যে যেমন পারছে হাতের সুখ করে নিচ্ছে ,.দাদারই মতন লম্বা ,পেটানো চেহারা ,ঝাঁকড়া চুল সব রক্তে মাখামাখি ,ল্যাম্পোস্টের গায়ে কেমন শক্ত করে বাঁধা, চোখগুলো ফুলে পুরো বন্ধ ,আর তাকাতে পারছেনা ,গলা ঠেলে বমি আসছে। —–পল্টুকা তুমি আমাকে দাও,দেরি হয়ে যাচ্ছে।

“ওমা!—- ছেলেটা রক্তবমি করছে ,কেউ দেখতে পাচ্ছেনা ?ওতো মারা যাবে !”ভিড় ঠেলে ঘষ্টানো চটি নিয়ে চিৎকার করতে করতে ভিড়ের মধ্যে ঢুকলো সুমন।

এই কি করছো তোমরা ,ওতো মারা যাবে !-

তুই থাম ,লালটুসের চোরের জন্য দরদ উথলে উঠলো।

না তোমরা এমন করে মারতে পারোনা ,চুরি করলে পুলিশে খবর দাও।

তুই থাম ,মেলা কপ চাস না

কে একটা ভাঙ্গা পাথড়ের চাঙ্গর ছুঁড়ে মারলো।

“এই কি করলি কি করলি ?” ভেসে এলো বাবার বন্ধুর গলা.

সমস্ত ভিড় এক নিমেষে ফাঁকা ,একটা লোকও নেই। শুধু রাস্তায় পরে আছে লাল্টুস সুমনের নিথর দেহ।

  •  
    7
    Shares
  • 7
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •