• 25
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    25
    Shares
sharon-mccutcheon-571408-unsplash.jpg
CONTENT | ISSUE 15 - 27TH SEPT, 2020

KafeHouse

ধারাবাহিক
মিছিলে নাটকে কবিতায় গানে – আরণ্যক বসু

কবিতা / Poetry

ডাক – আবদুস সালাম
When I saw – Anjali Denandee, Mom
বিজ্ঞান পড়ান উনি – অঞ্জলি দে নন্দী, মম
রাখী – তনিমা সাহা
জলছবি – শুভজিৎ দাস
কবিতা – গার্গী চৌধুরী

গল্প / Short Story

Debit clearance – Sudeshna Halder

সহযাত্রী – শিল্পী নাজনীন

 

অন্যান্য

অবসান – Adrija Basu

আরণ্যক বসু

ডাক
আবদুস সালাম

দাঁত বের করে আছে মাটির দেওয়াল
তাতেই ভরসা সেঁকে নিই

পারিযায়ীদের মতো উড়ান শেষে ফিরে আসি উৎসমূলে
কঞ্চির বেড়া দেওয়া স্যাতসেতে উঠোন
স্মৃতির পাতা ঝালিয়ে ফিরে আসা উৎসমূলে
সম্পর্কের হাত ধরে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত হই
অন্তিম ক্ষণে নিয়ে যাবো শেষ আশির্বাদ
দেওয়ার মতো তো আর কিছু নেই
নড়বড়ে খুঁটি গুলো উপড়ে গেছে মহাকালের টানে

সেই খুঁটি ধরে পার হবো শেষ সীমানা
পথের বাঁকে বাঁকে রেখে যাবো ভালোবাসা
নিশির ডাকে অনন্ত পথে ফেলে যাবো পুরাতন জীর্ণ পুস্তক আর ভাঙা চোর অমূল্যবান আসবাবপত্র

Advertise with us

Publish your ads in Pujabarshiki 2020

Full Page- INR 600 | Half-Page- INR 300 | Classifieds INR 150

Mail your ads to insightfulsite@gmail.com

When I saw
Anjali Denandee, Mom

When I saw his eyes
Then I became surprise.
Both were as like the endless skies.
There lived countless stars.
Now also they are there.
They arise arise and arise…
But never set.
How dreamy they are!
Their their their….
Lovely hopes are endless.
They are ever starters.
In these places
I have lost my blinkings for long time.
Ultimately my eyes-water
Become endless…
With love in super consciousnesses.
Yes yes yes
This water is joy of love-tear.
And then he becomes my ever dear.
Also our lives become heart beats-rhyme.
Now our emotions become such untouchable
By which we become immortal
Also our souls are shined
With eternal realisations.
Our sensations can able
To reach in all lover-minds.
Our imaginations,
Now these are creating countless skies.
Countless Suns are rising on these.

বিজ্ঞান পড়ান উনি
অঞ্জলি দে নন্দী, মম

উনি
খুবই গুনি।
পদার্থ বিজ্ঞান পড়ান ক্লাসে।
স্টুডেন্টসদের ফুল মার্ক আসে।
এতো ভালো পড়ান উনি।
অতি সবল শিক্ষায় উনি।
শক্তিশালী হয়েও ব্রেনে,
উনি কিন্তু দুর্বল আপন মনে।
সর্বাঙ্গে জ্যোতিষ রত্ন পাথর পড়া।
জ্যোতিষীর সৎ পরামর্শেই
এ সব ধারণ করা।
নিজ নত শিরে ন্যান উনি মেনে।
গ্রহ দোষ দূর হবে,
এ সবের পরশেই।
যদিও খুব ভালো আছে
ওনার বিজ্ঞানটা পড়া।
তবে? তবে? তবে?
তবুও সাবধানী
যদি গ্রহ দোষ ধরে পাছে।
যতই হোক না ক্যানো
উন্নত আধুনিক বিজ্ঞানই,
এ সব তো আর নয় ভ্রান্ত বিশ্বাস!
বিজ্ঞান পড়ান, তাতে কি আছে?
গ্রহ রত্ন পাথর থাকুক না হয় কাছে।
যতদিন চলবে দেহের শ্বাস।
ওনার অঙ্গ থেকে
এ সব মৃত্যুর আগে
খোলা হয় না যেন।
জ্যোতিষী বলেছেন যে এঁকে।
কি জানি কি কোন না কোন গ্রহের প্রকোপ লাগে?

রাখী
তনিমা সাহা

বাবার হাত ধরে যেদিন গেলাম হাসপাতালে
বললেন বাবা আমার ছোট্ট বোনু সেদিন এসেছে
এই ধরাতলে,
গিয়ে দেখি গোল গোল চোখ,কুঁচো কুঁচো চুল,
ছোট ছোট হাত-পা, মায়ের কোলে ছোট্ট বোন আমার,
বললেন মা, মাথায় রেখে হাত,”থাকিস্ বাবা এর পাশে,
সবসময় হয়ে এক বৃহৎ অশ্বথ গাছ ” ;
দিন যায়, মাস যায়, বছরও যায় ঢলে,
আমার বোনু বড়ো হয় নৃত্যের তালে তালে;
আজ অনেক বড়ো দিন, বোনুর আমার প্রথম অনুষ্ঠান,
কিন্তু কোথায় বোনু, খুঁজে তো পাওয়া যাচ্ছে না তাকে,
খেলছে কোথায় জানি লুকোচুরি;
সবাই যখন ক্ষান্ত, অন্বেষণে দিয়েছে তালা,
বোনু হাজির তখন,হাতে নিয়ে সাজানো রাখীর থালা,
বলে,” দাদামনি, তুমি তো শেকড় আমার,
তুমিই আদি গুরু সবকিছুর আমার,
সব অনুষ্ঠানের উর্ধ্বে হলো রাখী অনুষ্ঠান আমার;
তারপর কেটে গেছে কতো কাল,কেটে গেছে কতো ঋতু,
বোনু আমার আজ এক বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী
আজও এক আনন্দাশ্রু জড়ানো দিন,
আজ যে বোনুকে পাত্রস্ত করার দিন,
দাঁড়িয়ে আমি নয়ননীরে,
বাবা-মায়ের প্রতিরূপের সম্মুখে,
চোখের জল ঢাকতে হাত রাখী মুখে;
হঠাৎ সাড়া শুনি,”দাদামনি,
তাকাও একটিবার পেছন ফিরে”―
দেখি সজলনয়নে বোনু সামনে আমার দাঁড়ায়,
রাখী নিয়ে এক সাজানো থালায়।

জলছবি
শুভজিৎ দাস


“ চাই না এই সুখ
চাই না তুলতুলে মেঘ-মল্লার দেশের রানি হয়ে বাঁচতে,
ইচ্ছা করে
গঙ্গা- ফড়িংএর মতো উড়ে গিয়ে
জলছবি হয়ে যেতে ।

এই একাকী ঘরে কী আঁকি
বোঝে না কিছুই যদিও কেউ
তবুও পিছিয়ে পড়ি অজস্র মেঘের গর্জনের ভয়ে।
তাহলে হয়তো এই জন্যই,
দ্বিধার সাথে কেটে যায় প্রহর
কেটে যায় অজস্র আমার কৌমুদি রাত ।
দূর শহরের এই নির্জনের আনমনে
নীলাভ রক্তপাত অবিরাম হয়েই চলে
আর হওয়া ওঠে না একটা সাদা কাগজের
রঙিন জলছবি।।“

Publish Your E-Book at INR 600/- 

Mail us: insightfulsite@gmail.com

1

গার্গী চৌধুরী
অন্তরের টান,বাইরে দূরত্ব,
উল্টো গতির টানাটানি ,
নতুন আলোড়নে নতুন আমি
নীল আকাশে, শুদ্ধ বাতাসে
উড়ন্ত চিলে মত্ত্ব ।

পৃথিবী যখন প্রকৃতির কাছে
নতী স্বীকার,
অসহায় পেটের ক্ষীদের যন্ত্রণা
মনকে দিচ্ছে নাড়া।

দেবতা এবার মন্দির মসজিদ
ছেড়ে সাধারণ আমিতে নিবদ্ধ,
আমিও দিনের শেষে ভরা পেটে
জীবনের কাছে কৃতজ্ঞ ।

পৃথিবী এখন বাঁচার লড়াইয়ে
জ্ঞানের আগুনে উষ্ণ,
জীবন এবার জাত ধর্মের খোলস ছেড়ে শিক্ষা,সংস্কার,যুক্তি নির্ভর।

Play Video

Book your ads for Pujabarshiki now

অবসান
Adrija Basu

বিকেলের অস্ত যাওয়া সূর্যের ম্লান হয়ে আসা রাঙা কিরণে কিরম যেন একটা মাদকতা রয়েছে… ভালোলাগা রয়েছে, আবার কিছুটা মন খারাপ মেশানো হালকা হাসিও। বারান্দার অতি পরিচিত গ্রিলে ভর দিয়ে, রোজকার এই সোনা – গলা অদ্ভুত সৌন্দর্যে নিজেকে মাতিয়ে তোলাটা নেশা হয়ে গেছে এখন। বেলা শেষে, প্রতিদিনের এই অন্তিম মুহুর্তটির সাক্ষী থাকতে বড় ভালো লাগে। দিন শেষ হয়, নতুন দিনের. আশায় – একটা সংবার রয়েছে তার। নতুনত্বের সম্ভাবনার সঙ্গে রোজ একটি দিনের অবসান ঘটে, তার সাক্ষী হই আমি। বড় ভালো লাগে।
মাঝেমধ্যেই পুরোনো স্মৃতিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ধুলো ঝেড়ে, নতুন পোশাক পরে যেন ঝকঝকে হয়ে, একদম বেহায়ার মত, দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে এক্কেবারে সামনে। এগিয়ে চলার পথটা যেন দুহাত দিয়ে আগলে দাঁড়িয়ে থাকতেই এসেছে। নিরন্তর চেষ্টার পরেও এদের বাক্স বন্দি করার উপায় হাঁতড়ে বেড়াই সর্বক্ষণ। কোথা থেকে যেন জমাট বাঁধা ক্লান্তি এসে জড়ো হয় প্রত্যেক কোষে, আচ্ছন্নতা ঘিরে ফেলে হৃত্পিণ্ডের চারিপাশ, শক্ত করে।
প্রতিটি দিনের তো অবসান ঘটে, আমার এই দিশাহীন, পথ হারানো, অনন্ত অপেক্ষার অবসান নেই? সমাপ্তি নতুনত্বের বাহক। তবে শেষ হোক এই নিরাকার, নিরুদ্দেশে বয়ে চলা অদ্ভুত বেদনার নামহীন, ঠিকানাহীন স্রোত। বড্ড নির্লজ্জের মত দিন – রাত একভাবে সে বয়ে চলেছে কোথাও না কোথাও গভীর অন্তরালে। অবসান ঘটুক তার। আমি সেটারও সাক্ষ্য বহন করি। অপরিচিত এক যন্ত্রণা, পাগল করা, ভীষণ এক নৈঃশব্দ্য যেন ঘর করে নিয়েছে এক কোনে ।
এই বেহায়া স্মৃতিগুলোর সূর্যাস্ত হোক এবার।নৈঃশব্দ্য ভেঙে, আকাশ জুড়ে সুর তুলুক পাখিরা ভোরের আগমনের। অস্ত যাওয়া সূর্যেও নেশা আছে জানি, তবে অবসানে শান্তি আছে। হোক এবার দিনের অবসান। বিদায়ধ্বনি মিশুক আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আমি সাক্ষী হবো এই সূর্যাস্তেরও।

Debit clearance

Sudeshna Halder

A bike stands in front of Golcha cinema-hall in Daryaganj, in Delhi. The cinema-hall has raunchy posters of Bhojpuri movies with promises of fiery fights and a sensual romance. The bike goes straight on the wide mainroad, take a left turn between two buildings and stops outside a gated two storey building. Early morning time. Newspaper hawkers and milkmen on bicycles pass by. Hindi songs with loud bass is played in the nearby house.
Raushan gets down from bike and goes inside. The bike stands inside the gates and is very dirty. Water splashes on the bike. Raushan starts cleaning the bike with a towel. A man in kurta passes Raushan and spits on the wall of his hpuse. Raushan startles, stands up. The man keeps walking. Disgusted, Raushan splashes water on the wall and cleans the red betel leaf juice.
Next morning, Raushan with a cup of coffee, watches TV. TV shows clips from Sridevi’s Naagin. There is a sound of spitting from the windows. Raushan peaks out of the window to see red stains of betel leaf juices flowing on the wall. The same man in kurta walks away. Raushan yells and waves hands at him. But the man walks on.
Next morning, Raushan enters the gate with a bag. Backtracks and meets the man in kurta. They wave and smile at each other. Raushan happily enters the house. The man walks, stops and spits on the wall and walks on.
Next morning, Raushan puts up a Swachha Bharat poster on the wall and stares hopefully and yet doubtfully at it and goes inside. Man in kurta comes and spits on the poster.
Next morning, Raushan, lips pursed with determination, puts up a poster with Hanumaan burning down Lanka with fire from his mouth on the wall and goes inside. Man in kurta comes and spits on the poster, touches his forehead with hands and throws a coin at the feet of the poster.
Raushan morosely dusts the house. The TV is on. TV showing a shirtless Saurav Ganguly waving his shirt in the air at Lords. Raushan dusts a photo of him with his parents and looks at it. Expression changes from sad to thoughtful to an impish smile.
Next morning, Raushan puts up a poster and goes inside. Man in kurta comes and spits and gets startled. He starts cleaning the stains. The poster shows his own face. From the roof Raushan watches and smiles. On the skies a kite cuts another kite.

সহযাত্রী
শিল্পী নাজনীন

লোকটিকে ভীষণই চেনা মনে হয়। যেন বহুকালের অালাপ পরিচয় ছিল কোনো এককালে। মাঝে ঝাপসা চর পড়েছে, অপরিচয়ের, ভুলের। এখন বিস্মৃতির সেই হালকা রুপালি চর সরিয়ে অাবার সে পরিচয়ের ভিত মাথা তুলতে চায়, দাঁড় করাতে চায় অাপন কাঠামো। সে অাড়চোখে তাকায়, বারবার। পাছে দৃষ্টিকটু হয়ে ওঠে তার এই বাহুল্য মনোযোগ, সে ভয়ে অাবার তটস্থ হয়ে ওঠে নিজেই। কেবলই মনে হতে থাকে, তার অাচরণে বিরক্ত, সন্দিগ্ধ হয়ে উঠছে লোকটি, বাহারি গোঁফের নিচে লোকটির ঠোঁটদুটি যেন বিরক্তি অার রাগে বাঁকা হয়ে উঠছে ক্রমশ।
কোথায় দেখেছি লোকটিকে? কোথায়?’ প্রশ্নটা নিজেই নিজেকে করে অার দ্রুত স্মৃতি হাতড়ে চলে অালতাফ হোসেন। তার টাকসদৃশ বৃহৎ কপালটায় এই মধ্য নভেম্বরেও বিন্দু বিন্দু ঘাম চিকচিক করে, কুঁতকুঁতে চোখের কোণে জেগে থাকা পিচুটি অারও বেশি দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে ওঠে এই হঠাৎ মনোযোগের মাত্রাতিশয্যে। শুকনো, ঝুলে পড়া ঠোঁটদুটি ঘনোঘনো নড়ে, দেখে মনে হয়, কঠিন কোনো মন্ত্রোচ্চারণে সেদুটি ঘোর ব্যস্ত। তারপর, যেন হঠাৎই ঘোর কেটে যায় তার। কিংবা সজোরে সে ভেঙে ফেলে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কঠিন দেয়াল। নিজের বোধের কাছে ধাক্কা খেয়ে লোকটি, অালতাফ হোসেন, নিজেকে যেন ফিরে পায় অাচমকা। ভূতগ্রস্তের মতো সে উঠে দাঁড়ায়, এই মধ্য-সত্তুরে এসে যতটা সোজা হওয়া সম্ভব ঠিক ততটাই টানটান, সোজা হয়ে সে লোকটির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মাফলারে জড়ানো লোকটির মুখ তখন ঈষৎ ঝুলে পড়েছে নিচের দিকে, ট্রেনের মৃদু দুলুনির তালে তালে দুলছে অল্প। লোকটির চোখ বোঁজা, অালতাফ হোসেনের বাহুল্য মনোযোগাতিশয্যকে থোড়াই কেয়ার ক’রে লোকটি ততক্ষণে নাক ডাকতে শুরু করেছে প্রায়। জানালার পাশে, ঝিরঝিরে হাওয়ার প্রকোপে সে, মাফলারটি অাচ্ছাসে বেঁধে নিয়েছে মুখ-গলা পেঁচিয়ে। তবু ট্রেনের বগিতে জ্বলা অালোয় তার খাড়া নাক, খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি নজরে পড়ে। মুখের অাদলটি কাছ থেকে চেনা মনে হয় অারও। অালতাফ হোসেন লোকটির ওপর ঝুঁকে পড়ে খানিকটা। তারপর অদ্ভুত, কাঁপা গলায় বলে ওঠে, মাধব!
নিজের কণ্ঠে নিজেই চমকে ওঠে অালতাফ হোসেন। ট্রেনের দুলুনি অগ্রাহ্য ক’রে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা শরীরটা তার ভার ছেড়ে দেয় কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই। অালতাফ হোসেনের কণ্ঠে ভ্যাবাচেকা খাওয়া লোকটি কিছু বুঝে ওঠার অাগেই তার শরীরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে অালতাফ হোসেনের পলকা শরীর। বিব্রত, বিরক্ত লোকটি হাত বাড়িয়ে ধ’রে ফেলে অালতাফ হোসেনকে। সিট ছেড়ে বসিয়ে দেয় তাকে নিজের জায়গায়।
ভারসাম্য হারানোর এই হঠাৎ বিপত্তিতে খানিকটা অপ্রস্তুত, লজ্জিত দেখায় অালতাফ হোসেনকে। বেচারা দেখায় খুব। কুঁতকুঁতে চোখে সে সামনে দাঁড়ানো লোকটির মাফলারে ঢাকা মুখের দিকে তাকায়। লোকটির বিরক্তির মাত্রাটা বোঝার চেষ্টা করে প্রাণপণ। কিন্তু মাফলারে ঢাকা মুখে তেমন কোনো অভিব্যক্তি ফোটে না। নিতান্তই ভাবলেশহীন, নৈর্বক্তিক একটি মুখের খানিকটা শুধু চোখে পড়ে ধূসর, পুরোনো মাফলারের অপ্রতুল ফোকর থেকে। অালতাফ হোসেন দ্বিধাগ্রস্ত হয় পুনরায়। তারপর ভয় অার সংশয়ের অদ্ভুত মিশেলে, ঘড়ঘড়ে, কাঁপা গলায় অাবার বলে ওঠে, তুই- অাপনি- মাধব না?

লোকটি এবার অদ্ভুত, ক্ষ্যাপাটে গলায় হেসে ওঠে। ট্রেনের দুলুনিতে, নাকি হাসির প্রকোপে ঠিক বোঝা যায় না, কেঁপে ওঠে, দুলে ওঠে লোকটির মজবুত, বয়স্ক শরীর। দুলতে দুলতে টাল সামলে নেয়, ধীরলয়ে হেঁটে গিয়ে বসে পড়ে অালতাফ হোসেনের ফেলে অাসা সিটে। অাগের মতোই অাবার মুখোমুখি দুজন, অাড়ালহীন, অাচ্ছাদনহীন। তবু অালতাফ হোসেন বিস্ফারিত চোখে চেয়ে থাকে লোকটির মাফলারে ঢাকা মুখে। ভীষণ রহস্যময় মনে হতে থাকে লোকটির অাচরণ। লোকটিকে মাধব বলে সন্দেহ নয় এখন অার, বরং লোকটি মাধব ছাড়া অন্য কেউ হতেই পারে না, তেমন ধারণা বদ্ধমূল হয় ক্রমশ।
লোকটি ততক্ষণে ঝোলা থেকে সিগারেট, লাইটার বের করে জ্বেলে নিয়েছে, অায়েশ ক’রে ধোঁয়া ছাড়ছে পৃথিবীর নাক বরাবর। ধোঁয়ায় অালতাফ হোসেন খকখক কাশে। তার সিগারেট বারণ, নেশাভাঙ ছেড়েছে সে বহুদিন। শরীরে এসব অার সয় না এখন। কাশতে কাশতেই সে অাবার বলে, তবে ফিরে এলি মাধব?
লোকটি ধোঁয়া ছাড়ে অারেকমুখ। চোখ-মুখ কুঁচকে তাকায় জানালা দিয়ে। বাইরে ছুটন্ত পৃথিবী, ফুটন্ত সকাল। অাঁধার কাটিয়ে সকালটা অালোর খই ফুটাচ্ছে খুব। জানালা গ’লে হাওয়া অাসছে হিমেল। লোকটি ক্ষণকাল অালতাফ হোসেনের মুখের দিকে গভীর চোখ রাখে, কী একটা ভাবে। শেষে গম্ভীর, বিষণ্ন গলায় বলে, কোথাও ফেরার নেই অামার। অামি অাপনার চেনা কেউ নই।
অালতাফ হোসেন বিস্মিত, বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে।
লোকটির কণ্ঠে অারও চমকিত হয়ে সে এবার পুরোপুরি নিশ্চিত হয় যে, লোকটি অার কেউ নয়, বরং সে তার অাবাল্য পরিচিত, মাধব। অালতাফ হোসেন লোকটির চোখে চোখ রাখে। কিছু একটা খোঁজে। হয়তো সে অাপনার হারিয়ে যাওয়া শৈশব খোঁজে, কিংবা খোঁজে যৌবনের সেই অমোচনীয় কালির দাগ। কিন্তু সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করে, কিছুই নেই, ভাবলেশহীন, সাদা সেই চোখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, মাছের চোখের মতো পলকহীন, মৃত সেই চোখ। অালতাফ হোসেন ভাবনায় পড়ে এবার। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভাবে, হয়তো সত্যিই কোথাও ভুল হচ্ছে তার, লোকটি হয়তো সত্যিই মাধব নয়, অন্য কেউ। ভাবনাটা তাকে বহুবছর অাগে নিয়ে যায়। জানালার ওপাশে ছুটন্ত পৃথিবী অার ফুটন্ত সকালকে পাশ কাটিয়ে, সামনে বসে থাকা মাধবসদৃশ লোকটিকে উপেক্ষা ক’রে, সেইসাথে চলন্ত ট্রেনের গর্জন অার তার ভেতরের কোলাহল ফেলে অালতাফ হোসেন চ’লে যায় বহুবছর অাগের পৃথিবীতে। যেখানে মাধবের সাথে তার নিত্য খুনসুটি, বন্ধুত্বের নিবিড় গাঁটছড়া। সে মাধবের হাত ধরে স্কুলে যায়, খেলার মাঠে তুমুল দৌড়ায়, খোলা মাঠে গিয়ে গবাদী চড়ায়, গাঁয়ের গা ঘেঁষা নদীটিতে উদ্দাম সাঁতরায় অার শৈশবের গন্ধডোবা স্মৃতির পুকুরটাতে অাপাদমস্তক ডুবে যায়, হাবুডুবু খায়। তারপর সে ভেসে ওঠে। ভেসে ওঠে যৌবনে। যেখানে অম্লান ফুটে থাকে ‘৭১, অার তার পাশেই ভীষণ বিসদৃশভাবে জেগে থাকে অমোচনীয় কালির দাগ, তার নিজের হাতে জড়ো করা, একজীবন বয়ে বেড়ানো শোচনার দূর্বহ বোঝা। সে দেখে মাধবের ছোটবোন মহুয়ার ব্যাকুল, ভয়ার্ত চোখ, সেই চোখে ফুটে থাকা সীমাহীন ঘৃণা। পাকিস্তানী মিলিটারির পুরোভাগে পথনির্দেশক হয়ে সে পৌঁছে যায় মাধবদের বাড়ির উঠোনে, সেখানে ভর সন্ধ্যায় তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালাতে থাকা মহুয়া তাকে, তাদেরকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে চিৎকার ক’রে ওঠে, মুহূর্তেই শান্ত, স্নিগ্ধ সেই সন্ধ্যাটা নরক হয়ে ওঠে, মহুয়াকে হিড়হিড় ক’রে টানতে টানতে দুজন পাকিস্তানী সেনা তাদের জীপে নিয়ে তোলে, অার দাওয়ায় পড়ে থাকে মাধবের সাদা শাড়ি পরা বিধবা মায়ের লাশ, রাইফেলের রক্তে রঙীন হয়ে ওঠে যা নিমেষেই। মাধব তখন মুক্তিসেনা, দেশের জন্য সে তখন ঘর ছাড়া, নিরুদ্দেশ। তন্ন তন্ন ক’রে তাকে খোঁজা হয় সারাবাড়ি, নেই সে। কোত্থাও নেই। অালতাফ হোসেন তাকে মিলিটারিদের হাতে তুলে দেওয়ার ওয়াদা ক’রে ফিরে যায় সে-যাত্রা। সাথে নিয়ে যায় মহুয়ার মায়ের অাহাজারি, অভিশাপ, অার মহুয়ার দুচোখভরা ঘৃণা। মাধব ফেরে না অার। যুদ্ধ শেষে সে নাকি ফিরেছিল শোনা যায়। বিধবা মা অার একমাত্র বোনের করুণ পরিণতি শুনে, বাল্যবন্ধুর চরমতম বিশ্বাসঘাতকতার অবিশ্বাস্য কিন্তু রূঢ় বাস্তবতার কথা শুনে, সে ফিরে গেছিল অাবার সীমান্তের ওপারে। হারিয়ে গেছিল চিরতরে।
অালতাফ হোসেন নিজেকে ফিরে পায় মাধবদের শূন্য বাড়িতে, যেখানকার দখল নিয়ে সে কাটিয়েছে, কাটাচ্ছে একজীবন। বাধাহীন, প্রতিবন্ধকতাহীন। তবু, শোচনা এসে ভর করে বুকে হঠাৎ হঠাৎ। মাধবের সাথে কাটানো শৈশব ভারি হয়ে চেপে ধরে বুক। মাধবের মা অার তার বোন মহুয়া চোখভরা ঘৃণা নিয়ে তাকে ফিরিয়ে দেয় কেঁচো অার কেন্নোর জীবন। এমন অসংখ্য মাধব অার তাদের মা ও বোনেরা সময়ে, অসময়ে, কণ্ঠ চেপে ধরে তার, বুকের ভেতর চাপিয়ে দেয় পাহাড়ের ভার। ফলত এই অভিশপ্ত জীবন তাকে বয়ে বেড়াতে হয় নিতান্ত অনিচ্ছায়, মাসান্তে চিকিৎসার্থে ছুটতে হয় ঢাকা টু কলকাতা। এই ট্রেন তার কষ্ট কিছুটা লাঘব করেছে, সহজ করেছে অসুস্থ শরীর ও মন নিয়ে বাধ্য হয়ে করা এইসব ক্লান্তিকর ভ্রমণ। কিন্তু এই ভ্রমণে অাজ কী যে হয় সহসা, কে একজন মাধব অাজ জলজ্যান্ত এসে ঠিক তার মুখোমুখি বসে, ধূসর মাফলারে অাড়াল ক’রে রাখে মুখের দুই তৃতীয়াংশ অার অালতাফ হোসেনকে উড়িয়ে নিয়ে যায় তার শৈশবের অাঙিনায়, যৌবনের উঠোনে। তাতে প্রথমটায় অামোদে চনমন ক’রে ওঠে তার মন অার পরক্ষণেই প্রবল অপরাধবোধে ছেয়ে যায় শরীর-মন। যেন স্বর্গ থেকে তাকে নিদারুণ রোষে কেউ অাছড়ে ফেলে নরকে। সেই বেমক্কা অাছাড়ে নাজেহাল হ’তে হ’তে ঠিক তখন সম্বিত ফেরে অালতাফ হোসেনের, যখন বিষম সুরে হুইসেল তুলে হঠাৎ থেমে যায় ট্রেন, অার সে, অালতাফ হোসেন, দেখে, ট্রেন থেকে ঝোলা কাঁধে দরজার দিকে এগিয়ে যায় লোকটি। ভ্যাবাচেকা খেয়ে সে নিজের কুঁতকুঁতে, ক্ষীণদৃষ্টির চোখে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। লোকটির হাঁটার ভঙ্গী অবিকল মাধবের। অালতাফ হোসেন যখন পুরোপুরি নিশ্চিত হয়, লোকটি অার কেউ নয়, মাধব, ততক্ষণে লোকটি ট্রেন থেকে নেমে স্টেশনের জনারণ্যে মিশে গেছে।
অালতাফ হোসেন জানে না, মাটির টানে মাধব প্রায়ই অনাহুত যাত্রী হয় এ ট্রেনে, নামে কমলাপুর স্টেশনে, মিশে যায় জনারণ্যে অার তারপর, জন্মভূমির মাটির সোঁদা গন্ধ নাকে নিয়ে অাবার পাড়ি জমায় ওপারে। শেকড়হীন বাঁচে, বাঁচে প্রাণহীন। অালতাফ হোসেন জনারণ্যে চোখ রেখে হারিয়ে যাওয়া মাধবকে খোঁজে। মাটি নয়, রক্তের কটু গন্ধে শরীর গুলিয়ে ওঠে তার। ট্রেনের সিটে সে বসে থাকে শাপগ্রস্তের মতো অনড়, অটল।

  •  
    25
    Shares
  • 25
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •