• 9
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    9
    Shares

CONTENT | ISSUE 18 | 1st NOV, 2020

KAFEHOUSE

ধারাবাহিক
মিছিলে নাটকে কবিতায় গানে – আরণ্যক বসু

কবিতা / Poetry

যেখানে কেবল বিবর্ণতা – স্বপ্না ইসলাম ছোঁয়া৷ (বাংলাদেশ)
খিচুড়ি ও আমি – তনিমা সাহা
মেয়ের নামে প্রজাপতি – সুমন রুদ্র কর্মকার

গল্প / Short Story

‘শকুনি’ – নাসরিন আক্তার, (বাংলাদেশ)
পুজোতে প্রেম – তনিমা সাহা

অন্যান্য

করোনা কোরোনা – কাঞ্চন কুমার গাঙ্গুলী

আরণ্যক বসু

যেখানে কেবল বিবর্ণতা
স্বপ্না ইসলাম ছোঁয়া৷ (বাংলাদেশ)

আর যদি না ফেরে শৈশব!
যদি হা-হুতাশেই কেটে যায় সারাটা বেলা,
তবে অব্যক্ত কথাগুলো কি সব
বিদায়ী কাশফুলের মতোন ঝরে ঝরেই পড়বে?

ঘুম থেকে জেগেই দেখতাম,
গৃহস্থের উঠোন ভরে গ্যাছে সাদা সাদা কাশফুলে,
নীল আসমান জুড়ে আহ্লাদী মেঘের খুনসুটি;
ঠিক এমনটাই হওয়ার কথা ছিল য্যানো।

অথচ,
যান্ত্রিক এই নগরী উৎসবের ধার ধারে না,
হেমন্তের শরীর জুড়ে ছাতিম ফুলের ঘ্রাণ থাকে না,
নির্লিপ্ত ঘোলা চোখ দুটো’তে কেবল
অভিমানী শিশিরের জল জমায়।

এইখানে নক্ষত্র’রা অন্তহীন বিষণ্ণতায় ভুগে,
নরোম আলোর উষ্ণ শিহরণ পেয়েও
কেঁপে ওঠে না ভোরের কার্নিশ,
কেবল ধানরঙা রোদে পুড়ে যায় এই শহর।

অণুগল্প

‘শকুনি’
নাসরিন আক্তার, (বাংলাদেশ)

হারামির ঘরের হারামি, জাউড়ার ঘরের জাউড়া, গোলামের পুত আয়, কাছে আয় এক কোপে কল্লাডা নামায়ালবাম। ফালানিরে অহনো চিনছোস না!!

– – – বলতে বলতে ফালানি দাঁ উঁচিয়ে ঘরের দাওয়ায় বেরিয়ে আসে।

মধ্য দুপুরের গনগনে রোদে দাঁড়িয়ে ঘেমে নেয়ে একাকার, জলন্ত আগুনের মত ফোঁসফোঁস করে। দাঁ হাতে রোদে পোড়া ডান হাতটা দেখলেই বোঝা যায় এক সময় এই মেয়ের রূপ যৌবনের কমতি ছিলো না। ত্রিশ পার করে এসেও তার এতটুকু কমতি নেই শুধু রোদে পোড়া শরীর ছাড়া। ব্লাউজ ছাড়া আটপৌরে শাড়ির উপর দিয়ে সুঢৌল বুক আর বেখেয়ালে নাভিমূলের কাপড় সরে গেলে এখনে তা স্পষ্ট বোঝা যায়। মুখটা এখনও সেই কৈশোরের মতোই নিষ্পাপ।

লোক মুখে শোনা কথা, ফুটফুটে শিশুকন্যা ফালানির অসুখ বিসুখ লেগেই থাকতো তাই ফালানির মা লোকের বদনজর থেকে বাঁচাতে মেয়ের নাম রাখেন ফালানি’।
ওর একটা ভালো নামও আছে তবে এতো দিনে ফালানি নিজেও সে নামটা মনে রাখতে পারেনি। ফালানিদের মূল নাম মনে থাকেনা…

গত আশ্বিনে সরকারি রাস্তায় মাটি কাটতে যেয়ে রমিজ কোমরে ব্যথা পায়, অনেক জুড়ি-বুটি ও কবিরাজি মালিশ করেও তা পুরোপুরি সারেনি আজও। এখনো প্রায়ই টনটন করে। তখন টানা একমাস বিছানায় পড়ে ছিলো রমিজ।

ঔষধ, পথ্য, চারচারটা মুখ!!!
অভাবের সাথে যুদ্ধ করে ফালানিকেই কাজে নামতে হয়। কাজ নেয় পাশের ধানভাঙা কলে। সারাদিন রোদেপোড়া খাটুনি সয়ে যাচ্ছিলো হাসি মুখেই, গরিবের দুবেলা দু’মুঠো ভাতই স্বর্গসুখ। কিন্তু এই শরীরটাই সকল অনর্থের মূল হলো…
গরীবের বউ সবার ভাবি…
-ফালানি রোদে পুড়ে ধানে ময়ান দেয়, আগুনে তেতে ধান সেদ্ধ করার, চুলোর আগুন উস্কে দেয়- এর ফাঁকে সরে যাওয়া বুকের আঁচল ঠিক করতে যেয়ে চোখে পড়ে কিছু শুকুন চোখ। তবুও নিজেকে যতোটা ঢেকেঢুকে কাজে মন দেয়।
কিন্তু যেদিন ম্যানেজার নিজের রুমে ডেকে চকচকে লোভাতুর টোপ ধরে ফালানির সামনে,
–আল্লায় দিলে গতর খানা ভারি সুন্দর। তোর মতো মাইয়া মাইনষ্যার এতো কাম করুণ লাগে?! আয় আমার একটু সেবা যতন কর, তরে পুশায়া দিমু…
রাজরানী হইয়া বইয়া বইয়া খাইবি, এই চাতালের বেবাকের উপরে মতব্বরি করবি বুঝলি?!
বলতে বলতে লকলকে জিভ দিয়ে ঝোলটানে। চোখের ইশারায় কাছে ডাকে। ঠিক তখনি ফালানির মাথায় রক্ত চেপে যায়। ম্যানেজারের মুখে থুতু ছিটিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসে।
–সেদিন থেকেই ফালানি পাল্টে যায়। এই ফালানিকে ধানকল বা গ্রামের অনেকেই চিনতে পারেনা। হাফাতে হাফাতে ফালানি আরো একদফা ঝাল মিটায়।
–হারামজাদার ঘরের হারামজাদা, আমি সুহে আছি না দুঃখে আছি তরারে কইতাম ক্যারে??? ওরে আমার রসের নাগর আইছে! তোরা আমারে ভাত দেস না কাপড় দেস? আমার সোয়ামি আমারে ভালা পায়, না পায় না, তরা জাইন্যা করবিডা কি?
–বান্দির পুতাইন! ভালা পাইলেও হ্যায় আমার সোয়ামি, না পাইলেও হ্যায়ই আমার সোয়ামি। আমার পোলাপানের বাপ, আইজ বিছনাত পইরা থাকলে হ্যায়ই ঔষধ পথ্যি করবো। তহন কোন চান্দুর মুখ দ্যাহা যাইতো না। তরা অইলি আন্ধারের চিহা, রসের মাছি, রস খাইবার লাইগ্যা ছুকছুক করস, দিনের আলোয় আন্ধারে মুখ লোহাস।
–আমারে তালের রসের হাড়ি ভাবছো, না!?
ফালানির চিল্লাচিল্লির মহরায় থাকতে না পেরে পাশের বাড়ির ষাটোর্ধ রমিছা বেরিয়ে আসে।
–অলো বেডি, অহন চুপ কর, আর কত চিল্লাস? নিজেরে একটু ডাইক্যা ডুইক্যা রাখলেই পারস। ঘরের জালনা কপাট খোলা থাকলে হ্যায়াল শহুন তো চোখ তাতাইবোই। নিজের হেফাজত নিজে কর বেডি।
কথাটা শুনে ফালানি আরো তেতে উঠে- চাচি এইডা তুমি কি কইলা?! মাইয়া অইয়া মাইয়া মাইশ্যারেই কতা হুনাও? আর ঢাকতাম না, আমি স্বাধীন মানুষ, এই শইল আমার, আমার যেমনে মনচায় তেমনে চলুম। দেহি কোন ব্যাডা কাছে আহে? এক কোপে ঘারথন কল্লাডা নামায়ালতাম না?!
দুনিয়াডা হ্যায়াল শহুনে ভইরা গেছে, ম্যাইয়াগো অহন অস্ত্র হাতে লউন লাগবো বুঝছো! নিজে বাঁচুনের লাইগ্যা…
হুনো চাচি, “দুনিয়াই হইলো শক্তের ভক্ত নরমের যম। বিলাই কহনো শক্ত মাডিত হাগেনা, জানো না”?!
ফালানি আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো, তখনি দেখতে পায় রমিজকে- খেতে আসছে। রমিছা চোখ টিপে, এই টিপের অর্থ রমিজকে কিছু বলা যাবে না। রমিজ বাড়িতে ঢুকার মুখে দা হাতে ফালানিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে- কিরে এমুন জল্লাদনীর মত খারাইয়্যা আছোস ক্যা?
–না, এমনি বাড়ির জংলা পরিষ্কার করি। ফালানি নিজেও জানে, সব কথা সোয়ামীদের বলতে নেই, নয়তো একদিন ওকেই বলে বসবে- তুই পশ্রয় দিছোস দ্যাইখ্যাই ওরা সাহস পাইছে, নইলে বারবার তোর কাছে আহে ক্যান!?
এই সমাজে সব জায়গাতেই মেয়েদের দোষ, সহজ-সরল, পল্লীবধু ফালানিরো এই কথাটা অজানা নয়।
রমিজ তাড়া দেয়- আয় ঘরে আয়, বউ খাউন দে, খুউব খিদা লাগছে। হেই বিয়ান বেলা কয়ডা পান্তা খায়া বাইরইছি।

ফালানি ভাত বাড়তে থাকে, হাড়ি বাটির টুংটাং শব্দের সাথে ভেতরে ঘুরপাক খায়- স্বামী, শকুন আর বুক থেকে সরে যাওয়া অবিন্যস্ত আঁচল…

খিচুড়ি ও আমি

তনিমা সাহা

থাকতাম মা আর ভাইটুর সঙ্গে এক ছোট্ট ঝুপড়িতে,
কাটতো দিন হাসি -দুঃখ মেখে বড়ই আনন্দেতে,
বাবা ছিলেন ঠেলা চালক,সারাদিনে খেটে যা পেতেন,
রোজ মাছ না জুটলেও ডালে-চালে মিশিয়ে 
সবজি সঙ্গে সবাইকে নিয়ে খেতেন;
মজা পেত ভাইটু আমার সবচেয়ে বেশী,
আধো কথায় বলতো,”খিতুলি খেতে আমি বদ্দ ভালোবাসি;
কালের চক্রে বাবা গেলেন হারিয়ে,
কোন্ একফাঁকে আকাশের তারা হয়ে,
মায়ের তখন মাথায় হাত,কাজ থাকেন খুঁজতে,
শুধু ভাতে ভাত জোগাড় হয়, হয়না আর খালি 
পেটে থাকতে;
একদিন বলে মা,”জানিস কাজের বাড়িতে পূজো আজ,
পেট ভরে খাওয়াবে খিচুড়ি আর ভাজা মাছ”;
নাম শুনে খিচুড়ির ভাইটু আমার ওঠে, বলে,”মাগো, শুধু একটু খিচুরি এনো লাগবে না কোনো ভাজা মাছ,
সন্ধ্যায় মায়ের আজ যেন ফিরতে হচ্ছে অনেক দেরী,
বাড়লে রাত ভাইটুকে রেখে ঘরে আমি যাই 
মায়ের কাজের বাড়ি,
পৌঁছে দেখি মা শুয়ে মেঝেতে,ঘিরে তাকে কিছু লোক-কড়ি,
বলে একজন,”আরে ফুর্তি করবো কার সাথে,
এ তো একটুতেই গেছে টেঁসে”,
চিৎকার শুনে আমার পেছনে তাকায় লোকগুলো,
যন্ত্রনার নীল হয়ে যেন শেষ হয়ে গেল সকল বুলি,
বিধ্বস্ত ত্রয়োদশী আমি ফিরলাম ঘরে নিয়ে হাতে এক বাটি খিচুড়ি;
কেটে গেল কতো যুগ এরপর,
সেদিনের ত্রয়োদশী আজ এক পরিপক্ক ব্যবসায়ী,
সময়ের গতিতে মালতী থেকে মলী হলাম অগ্রয়ী,
ভাইটু পছন্দ করেনা আর খিচুরি, নয় সেটা আর দামি,
জানে না এখনো ভাইটু আমার কী কাজ করি আমি।

” করোনা কোরোনা “
কাঞ্চন কুমার গাঙ্গুলী
(ডাক্তার বাবুর চেম্বার৷ এক রোগীর সঙ্গে কথা বার্তা চলছে)

ডাক্তারঃ বলুন আপনার কি সমস্যা?

রোগীঃ ডাক্তার বাবু আমি কোরোনা ব্যাধিতে আক্রান্ত৷

ডাক্তারঃ করোনা ব্যাধিতে?
আপনি কি সম্প্রতি চিনে গিয়েছিলে?

রোগীঃ না না ডাক্তার বাবু৷

ডাক্তারঃ তবেকি
কালিম্পং বা দার্জিলিং?

রোগীঃ না না ডাক্তার বাবু৷ আমি কোন দিন Howrah station পার হইনি৷ আর Air port সেতো দূরঅস্ত৷

ডাক্তারঃ আচ্ছা আপনিকি সম্প্রতি সাপ, চামচিকে বা বাদুরের মাংস খেয়েছেন?

রোগীঃ ছিঃছিঃছিঃ… দেখছেন আমি কন্ঠিধারি পরম বৈষ্ণব৷ আমি কেন আমার চোদ্দ গুষ্টি কোনদিন মাছ মাংস বা ডিম খাইনি৷ আর আমি খাব ঐ সাপ, চামচিকে আর বাদুর৷

ডাক্তারঃ রাগছেন কেন? আসলে আমরাতো ডাক্তার তাই সব ধরনের সম্ভাবনার কথা আমাদের মাথায় রাখতে হয়৷

রোগীঃ যা বলেছেন৷ আর আমরাতো রুগী তাই সব ধরনের প্রশ্নের উত্তরও আমাদের মনে রাখতে হয়৷

ডাক্তারঃ ঠিক আছে৷ তা আপনার সমস্যাটা কি? জ্বর, মাথা ব্যাথা বা শ্বাস কষ্ঠ৷

রোগীঃ হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিকই বলেছেন৷ মাথা ব্যাথা৷ আর সাথে সাথে কান ঝালা পালা৷

ডাক্তারঃ কবে থেকে এই সমস্যা?

রোগীঃ আজ্ঞে বিয়ের পর থেকেই৷ তবে ইদানিং তা খুব বেড়ে গেছে৷ এটা কোরোনা, ওটা কোরোনা, সেটা কোরোনা শুনতে শুনতে আমার কানের দফা রফা৷ দয়া করে যাতে কানে কম শুনি তার কিছু মেডিসিন দিন ডাক্তার বাবু৷

ডাক্তারঃ ব্যাধিতার উচ্চারণ কিন্তু করোনা not কোরোনা৷

রোগীঃ আরে মশাই যাহাই করোনা তাহাই কোরোনা৷

ডাক্তারঃ তবে ব্যাধিতা কিন্তু Novel.

রোগীঃ নিকুছি করেছে আপনার noble. আমিযে তা নিতে unable ডাক্তার বাবু!

ডাক্তারঃ কথাটা noble নয়৷ NOVEl (বানান করে পরেন) অর্থাৎ অজ্ঞাত, অভিনব৷

রোগীঃ রাখুন আপনার জ্ঞাত আর অজ্ঞাত৷ আমি মরছি নিজের জ্বালাই৷

ডাক্তারঃ চুপ চাপ বসুন৷ আপনাকে দেখা দরকার(স্টেথো বার কর দেখেন)৷ গায়ে সামান্য জ্বর আছে৷ অবহেলা করা ঠিক হবেনা৷ এই মেডিসিন গুলো লিখে দিলাম৷ এক সপ্তাহ খাবেন৷ যদি দেখেন জ্বর আর মাথা ব্যাথা বেড়ে গেছে আর শ্বাস কষ্ঠ হচ্ছে তাহলে অবশ্যই হাসপাতালে যাবেন৷ Next….
~~~~~~~~

{এই কৌতূক নক্সাটি যখন লিখি তখন COVID 19 ভারতবর্ষে সেভাবে থাবা বসাইনি৷ জনতা কার্ফু বা Lock down ঘোষণা হয়নি}

মেয়ের নামে প্রজাপতি 

সুমন রুদ্র কর্মকার

বিশ বছরের রৌদ্র ছোঁয়া….
ক্ষতের চিহ্ন যায় না গোণা,
চুপ করে যাই সময় বুঝে
অক্ষমতার এই ঠিকানা |

লিখতে গেলে কলম কাঁদে….
হৃদয় জাগে পূর্ণগ্রাসে,
মাটির দেহে কন‍্যে জাগাই
আগমনীর দূর সুবাসে |

কেমন আছিস্ আমার মেয়ে….
মেঘের দেশে মা কী পাশে ?
আরশিনগর পড়শি মরে
নপুংশকের কী যায় আসে |

মিথ্যে তোর চোখ এঁকেছি….
ভোরের আলোয় স্বপ্নজ‍্যোতি,
পারিস যদি দানব-দহন
বিষের নাম প্রজাপতি ||

উৎসর্গ: হাথরাসের গণ-ধর্ষিতা দলিত মেয়েটিকে

পুজোতে প্রেম

তনিমা সাহা

প্রফুল্ল এবার ধনুকভাঙ্গা পণ করেছে যে এই বারের পুজোতে একটা প্রেম সে করেই ছাড়বে। “সাইত্রিশ….সাইত্রিশ টা বসন্ত পেড়িয়ে গেছে….সাইত্রিশ…নাহ্… হিসেবটা একটু গন্ডগোল হচ্ছে। “সতেরো বছর পর্যন্ত তো আর মনে প্রেমরস জাগেনি”,মাথা চুলকাতে চুলকাতে ভাবলো প্রফুল্ল। 

ফুলকিকে লালজামায়, পায়ে নূপুর, রঙিন ফিতে দিয়ে বেনুনী করা চুল দুলিয়ে দুলিয়ে যখন সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে দেখতো তখন প্রফুল্লর মনটাও যেন মুগ্ধতার ভেলায় করে ভাসতে ভাসতে চলতো। কিন্তু ওই দেখাই সার… বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সে পাড়ার পাপলুর সাথে হাত ধরে ঘুরতে শুরু করলো। আর করবে নাইবা কেন..পাপলু হলো ওই যাকে সুন্দর পুরুষ থুরি ছেলে..সুন্দর ছেলে। তার উপর আবার বড়োলোকের ঘরের ছেলে। প্রফুল্লর মতো কি ফাটা পকেট, রোগা প্যাঙাটি ,কৃষ্ণকায় কেউ। মনে মনে যে একটুও দুঃখু সে পায় নি সেকথা বলা ভুল। তাই তো পরপর দুদুটো বছর সে পুজো দেখতেই বেড়োয়নি। তারও পরের তিন বছরে সে নিজের স্বাস্থ্যকে সময় দিয়েছে সাথেসাথে স্কিনটাকে একটু চকচকে করতে দুধের সর থেকে শুরু করে লোশন, মলম, উপটন এমনকি নদীর মাটিও প্রয়োগ করে নিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে প্রফুল্লর প্যাঁচকানো ঝিঙ্গের মতো শরীরটা এখন দেখতে একটু বেগুনের মতো হয়েছে। আর আলগাতরার রঙটা দুটো পোচ কমে একটু ফর্সা হয়েছে। আর একমাস পরেই পুজো। এবার তো আমাদের প্রফুল্লর কন্ফিডেন্স একদম ছাদ ভেদ করে আকাশে উড়ছে।

পুজোর দিন সাজুগুজু করে বাবু সেজে প্রফুল্ল বেড়োলো রাস্তায়। কিন্তু তেমন কাউকে চোখে পড়লো না। ষষ্ঠীর দিনটা পুরোটাই ভেসে গেল। শেষে সপ্তমীর বিকেলে দেখা মিলল তার। হাঁটা যেন গজগামিনী, শরীর যেন কোনো শিল্পীর নিপুণ শিল্পকলা, কোমর ছাপিয়ে পড়ছে মেঘবন্যার কেশরাজি,পটলচেড়া চোখ, মুখে মোহময়ী হাসি…উফফ্!এটাই তো চাইছিল প্রফুল্ল। আনন্দের চোটে আট/দশটা বৈঠকও দিয়ে দিল। শেষে একশোআট বার শ্রীকৃষ্ণের নাম স্মরণ করে বুকের ভেতরে ভীমের মতো সাহস জমিয়ে দু/তিনবার গভীর নিশ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে মেয়েটির সামনে গিয়ে দাঁতের দোকান নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো।

মেয়েটি চোখ-মুখ কুঁচকে বলল,”কী চাই..?”

প্রফুল্ল :- “আজ্ঞে, তোমার মন দিতে চাই”।

মেয়েটি কটমট করে তাকিয়ে বললো,” বটে…তাহলে তো তোমার মনের একটা পরীক্ষা নেওয়া দরকার”।

প্রফুল্ল কোলগেট মার্কা হাসি হেসে বললো,”তা তো অবশ্যই, আসলে প্রেমে তো মনটাই আসল কিনা”।

মেয়েটি:- “জানুউউউউ”।

প্রফুল্ল ভাবলো তাকেই বুঝি বলছে মেয়েটি। সে চোখ বন্ধ করে ঠোঁটদুটো চোঙার মতো করে পরবর্তী পর্যায়ের জন্য মনে মনে তৈরী হয়ে নিল।
হঠাৎ ধপ্ এক শক্ত থাবা প্রফুল্লর কাঁধে পড়লো। তার সদ্য সদ্য স্ফীত আত্মবিশ্বাসী মনটা মুহুর্তেই বেলুনের মতো ‘ফুসসসসসস্’ হয়ে গেল। চোখ খুলে দেখে সামনে এক দশাই চেহারার লোক থুরি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। 

ছেলেটি গর্জে উঠে বললো,” তুই আমার মন্তুসোনাকে কী বললি..”?

প্রফুল্ল :- “আআআআজ্ঞে, কককককে সোনা”।
ছেলেটি:-“কে সোনা নয়, মন্তু সোনা…”, বলে ছেলেটি সেই সুন্দরী মেয়েটিকে দেখিয়ে বললো,”এ আমার মন্তুসোনা”। প্রফুল্লর কানে কেউ যেন গরমজল ঢেলে দিল। মন্তুসোনা থুরি মেয়েটি ওই ঢাউস ছেলেটিকে গাজর খাওয়াতে খাওয়াতে অভিমানী সুরে বলে,”জানো তো জানু,এ বলে কিনা এর নাকি আমাকে মন দিতে ইচ্ছে করছে। তো আমি বললাম ঠিক আছে তাহলে ‘মনের পরীক্ষা’ দিতে হবে। কী! ঠিক বললাম না জানু”।
ছেলেটি তার ছোটোখাটো একটি ফুটবল সাইজের ঘুসি বাগাতে বাগাতে বললো,”তা তো বটেই, ‘মনের পরীক্ষা’ তো আবশ্যক”। প্রফুল্লর মনে হলো তার এই মুহুর্তেই পালানোর প্রয়োজন। সে পেছন ঘুরো যতো জোরে পারে তত জোরে দৌড়ুতে লাগলো। চোখ বন্ধ করে বেশ কিছুক্ষণ দৌঁড়ানোর পর চোখ খুলে দেখে যে সে যেইকার সেই একই জায়গায় আছে, একফোঁটাও এগোয় নি। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখে সেই ধুমসো পালোয়ানটা তার জামাটাকে টেনে ধরে রেখেছে। প্রফুল্ল মনে মনে প্রমাদ গুনলো। 

তারপরের পনেরো মিনিট প্রফুল্লর আর মনে নেই। অজ্ঞান হওয়ার আগে শুধু ছেলেটার এলোপাথাড়ি হাত-পা চালানোটাই যা মনে আছে।
চোখ খোলার পর দেখে তার পরিবারের সবাই তাকে ঘিরে কাঁদছে। প্রফুল্ল তারাতারি উঠে ওদের কান্না থামাতে যায়। কিন্তু  একি! সে তো কাউকেই ছুঁতে পারছে না। তড়িৎ গতিতে পেছনে ঘুরে প্রফুল্ল দেখে তার নিথর দেহটা পরে আছে রাস্তায়। 

সেই থেকে প্রফুল্লর থুরি প্রফুল্লর ভুতের বাস এই নিমগাছটায়। ভুত জীবনে এসেও সে কিন্তু চিত্তহরণকারিনীর খোঁজ করে যাচ্ছে। কিন্তু মনে ধরার মতো কোনো পেত্নীরই খোঁজ পায়নি এখনো। আজ তার সাঁইত্রিশতম ভৌতিক জন্মতিথি এবং আবার আজ দুর্গাসপ্তমীও বটে। সকাল থেকেই তাই সে মন মরা হয়ে গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসেছিল। এখন দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেছে। হঠাৎ মিহিদানার মতো মিষ্টি এক স্বর কানে এলো প্রফুল্লর।হাড্ডিসার ঘাড়টা ঘুরিয়ে দেখে এ তো সেই গজগামিনী যার জানুর ক‍্যালানীর জন্য তাকে ইহলোক ত্যাগ করতে হয়েছিল। প্রফুল্ল রাগতে গিয়েও রাগতে পারলো না। গজগামিনী গুটিগুটি পায়ে প্রফুল্লর পাশে এক্কেবারে ঘেঁষে বসে আদুরে মুখ করে বললো,”সেদিনের জন্য না আমি খুব দুঃখিত। ও যে তোমায় মেরেই ফেলবে তা বুঝতে পারিনি, তারপর তো তার হাজতবাস আর আমার অন্যত্র বিয়ে। তারপরের দূর্বিসহ জীবনের কথা আর না ই বললাম। যাইহোক অচেনা কারোর সাথে ভৌতিক জীবন কাটানোর চেয়ে চেনা লোকের সাথেই কাটানো ভালো। কি বলো..”, বলে কোটরগত একটা চোখ টিপল। প্রফুল্ল ভাবলো,” এ ই বা মন্দ কী”!

  •  
    9
    Shares
  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •