• 12
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    12
    Shares

CONTENT | ISSUE 19 | 8th NOV, 2020

KAFEHOUSE

কবিতা / Poetry

স্বাধীনতা – অতীশ
প্রশ্ন – সোমনাথ দত্ত
I was standing in beauty
In the darkest of the night… – Jhilam Adhikary

গল্প / Short Story

শ্রবনা – কল্যাণ ভট্টাচার্য্য
কর্ম – তনিমা সাহা

স্বাধীনতা

অতীশ

Kafe House Publication

তারপর একদিন –
মহামারী থেমে যাবে
মাঠে প্রান্তরে দৌড়ে বেড়াবে –
শিশুদের দল – কোলাহলে মত্ত হবে
বহুদিনের অদেখা মুখের সারি –
মুখোমুখি হবে – স্পর্শ করবে –
মুখ, হাত, নাক, চিবুক  
নিঃশ্বাসে মিশে যাবে ভালোবাসার কথকথা

তারপর একদিন –
আবার দেখা হবে উন্মুক্ত চরাচরে –
নির্বিষ পৃথিবীর ব্যস্ততম চৌরাস্তার মোড়ে
আমার উন্মুক্ত ওষ্ঠ – চুম্বন করবে তোমার উন্মুক্ত ঠোঁটে
সারি সারি গাড়ি, বাস থমকে দাঁড়াবে –
যদিও ট্রাফিকের সিগন্যাল সবুজ তখন
ভয়হীন, পথে নেমে আসা মুখোশহীন মানুষের দল –
চিৎকার করে বলবে – স্বাধীনতা !

প্রশ্ন

সোমনাথ দত্ত

Flamingo, Valentine, Heart, Valentine'S Day, Love

কতটা কাজল লেপ্টে গেলে চিবুকের তিলে জমে অন্ধকার ?

কতটা পথ একসাথে হাঁটলে সাবালক হয় নীরবতা?

আঙুলে আঙ্গুল ছোয়ানো কতটা গভীর হলে রাখা যায় আরো একটু থেকে যাবার আবদার.?

এসব প্রশ্নের সব উত্তর জানে….
তোমার ঠোঁটের দাগ লেগে থাকা শূন্য চায়ের ভাঁড়।।

Publish Your Book – Hardcover / Paperback
Mail your Manuscript at insightfulsite@gmail.com
SELL YOUR BOOK ON AMAZON

I was standing in beauty

In the darkest of the night…

Jhilam Adhikary

Wallpaper, Texture, Soap Bubbles, Abstract, Background

I was a tree,

Burning in the forest,

At night.

The wind was roaring

Shouting… howling… screaming…

The fire calling my name…

I was burning!

In the moonlight…

I was standing in beauty

In the darkest of the night…

Burning and dying in beauty…

Then you came!

You called my name!

Louder!

And louder than the fires…

I reached out to you!

You took my hand!

And the darkness was gone…

Forever!

The winds were roaring

The fire screaming,

Destruction was calling my name!

I was burning

But you burnt with me…

Even if this world

Is burnt to dust,

Even if the forest

Falls apart;

You said…

I will stay with you!

Forever and ever and ever…

For love is stronger!

And stronger and stronger!

Stronger… than the winds and fires!

I’m the beauty of this night…

And you, my life, my lover.

শ্রবনা
কল্যাণ ভট্টাচার্য্য

Forest, Trees, Man, Adventure, Nature, Natural, Scenery

কে বলেছিল তোমাকে ওই পথে যেতে শ্রবনা?
কেন সেই ফুলওয়ালী মেয়েটি তোমায় নিয়ে গেল ডেকে সুন্দর সুগন্ধ মাখিয়ে ?
কেন তুমি চলে গেলে?
আজকাল মুঠোফোন নেই৷
ইচ্ছে করলেই অন্ধকার৷ তবু, তবু তোমার ফিরে আসার অদ্ভুত এক আকাঙ্খায় বসে আছি৷
রেলগাড়ি আসছে বোধহয়,
তুমি আসবে৷!!

পাহাড়ের অন্দরে এক বিশাল মহীরুহর নীচে শ্রমণ ধ্যান হতে জাগ্রত হলেন৷ কুটির বলা ভুল হবে৷ লতাগুল্মের আচ্ছাদন মাত্র, সেখানেই তাঁর রাত্রিযাপন৷ এই ঘন জঙ্গলে শ্বাপদ- স্বরীসৃপের অবাধ গতায়াত৷ শ্রমনের তা অজানা নয়, তিনি তাতে ভীতও নন৷ ভগবান বুদ্ধের আশীর্বাদ তাঁর ওপরে আছে৷ কমলালেবুর মত ভোর! কাঁচপোকারা বেরিয়েছে ৷ সামনের বৃক্ষশাখায় গর্বিত ধনেশ শ্রমণকে অভিবাদন করলো৷ শ্রমণ গত রাত্রে এক অবাক করা সময়ে উপনীত হয়েছিলেন৷ ধ্যানে মগ্ন থেকে অনুভব করছিলেন অপুর্ব নাদ৷ সেই অনুভূতি থেকে কেউ যেন তাঁর ধ্যানে বিঘ্ন ঘটালো, কিন্তু কে সে? চক্ষু উন্মিলীত করে তিনি কোনো অবয়ব দেখতে পেলেন না, অনুভব করলেন কারুর উপস্থিতি৷ শ্রমণ প্রেতসিদ্ধ যোগী৷ তিনি জানেন, হিমালয় পর্বতের গহন কন্দরে অনেক অশরীরী বাস করেন ৷ আশঙ্কা করলেন এও তাদের মধ্যে কেউ৷ ভগবান বুদ্ধকে শরন করে জিজ্ঞাসা করলেন ” কে তুমি?”
তিনি অনুভব করলেন তার উত্তর এবং উত্তরোত্তর গভীর চিন্তায় মগ্ন হতে থাকলেন৷
শ্রমণ আজ রাতে আবার তার আসার প্রতীক্ষায় বসে আছেন৷ ভগবান বুদ্ধের কাছে আত্মসমর্পন করেছেন শ্রমণ, তাঁর মনে আর কোনো সংশয় নেই, কোনো ভার নেই৷
আজ রাত্রের দ্বিতীয় যামে তার আগমন হলো৷ শ্রমণ আগেথেকেই জঙ্গলের শুকনো কাঠের কাঠকয়লার গুঁড়ো সংগ্রহকরে ছিলেন৷
আগন্তুকের কাছে আরেকবার সম্মতি চাইবেন শ্রমণ৷ তার পর অতি সন্তর্পনে, সেই না দেখা দেহের ওপর কালো রং মাখাতে থাকলেন৷ আস্তে আস্তে ফুটে উঠলো সুন্দর চোখ, টিকালো নাক, নরম ঠোঁট , গলা এবং …সুডৌল স্তনযুগল৷
ধীরে ধীরে ভোর হলো৷ সারা রাত্রিব্যপী এই উৎসবে শ্রমণ উপলব্ধি করেছেন ভগবান বুদ্ধ তাঁকে ত্যাগী ভিক্ষুক হতে দেননি৷ এই মানবী শ্রমণের, আজ থেকে শ্রমণের নিজের পুতুল ৷

গল্প :- 

কর্ম

তনিমা সাহা

Jungle, Pathway, Steps, Way, Sunlight, Walkway, Forest

মকরন্দ আর পারছে না আজকে। কোমরটা যেন ছিড়ে পড়ে যাচ্ছে। একটু বিশ্রাম নিলে ভালো হতো কিন্তু বিশ্রাম নিতে গেলেই দেরী হয়ে যাবে। ওদিকে বাচ্চাগুলো সব অপেক্ষা করে আছে। এই টাকা আর জিনিসগুলো পৌঁছে না দিলে বাচ্চাগুলোর খুব অসুবিধে হয়ে যাবে। এখন যেন আর খাটতে পারে না মকরন্দ। শরীরটাও যেন জবাব দিয়ে দিয়েছে। এবার অভিকুন্তলকে সব বলার সময় হয়েছে।

বাস থেকে নেমে কিছুক্ষণ হাঁটার পর মকরন্দ একটা দুকামরার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো। বাড়ির ভেতর থেকে ছোটোছোটো শিশুদের কলকাকলি ভেসে আসছে। এক দুটো কান্নার রোলও শোনা যাচ্ছে। মকরন্দ মনে মনে ভাবলো,” ওই মিহিক আর বনজা কান্না করছে বোধহয়”। তারাতারি গেট খুলে বাড়িটিতে প্রবেশ করলো মকরন্দ। বাড়িটির বাইরে একটা নাইট বাল্ব টিনের একটা পাতের উপর লাগানো আছে। রঙচটা টিনের পাতটির উপর লেখা আছে, ‘কোলাহল’‌।

মকরন্দ বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই ছোট্ট ঝিনুক দৌঁড়ে এলো। “দাদাই এসেছে, দাদাই এসেছে”, বলে ঝপ করে লাফিয়ে মকরন্দের কোলে উঠে পড়লো। ঝিনুকের কথা বাকিরাও ছুটে আসলো। এমনকি মিহিক আর বনজাও কান্না ভুলে টলমলো পায়ে মকরন্দের দিকে এগিয়ে আসলো। মকরন্দ ঝিনুককে কোল থেকে নামিয়ে পা ভাঁজ করে বসলে মিহিক আর বনজা ধপ্ করে কোলে বসে পড়লো। ওদের কান্না ভেজা চোখ দুটো মুছিয়ে আদুরে গলায় মকরন্দ জিজ্ঞেস করলো,”আমার সোনারা কেন কাঁদছিল, বলো তো। এইতো কতো মিট্টি লাগে হাসলে আমার সোনাদের। তাহলে এতো কান্না কান্না কেন”? বাচ্চা দুটো কী বুঝলো কে জানে..খাণিক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে হঠাৎই মকরন্দকে জড়িয়ে ধরলো। মকরন্দের বুকের ভেতরটা ‘ছ্যাৎ’ করে উঠলো,”তবে কী এরা বুঝতে পেরে গেছে”। এমন সময় পাশের ঘর থেকে অভিকুন্তল বেড়িয়ে এসে বললো,”তুমি এসে গেছো দাদাই। আজ বড্ড দেরী করে ফিরলে”। মকরন্দ বললো,”হ্যাঁ রে আজ একটু দেরীই হয়ে গেলো। ওই লাস্ট বাসটা মিস হয়ে গিয়েই বিপত্তিটা হলো। ভেঙ্গে ভেঙ্গে আসতে দেরী হয়ে গেলো। অভিকুন্তল বললো,”আমি তো ঘনঘন খালি ঘড়ি দেখছি। মিহিক আর বনজার কান্না বন্ধ হওয়াতেই বুঝতে পেরেছিলাম তুমি ফিরেছো”, বলে মকরন্দের কাছে এসে মিহিককে কোলে নিয়ে পেছন দিকে ফিরে বললো,”সোমত্থ, ঋসু একবার এদিকে শুনে যা”‌। মকরন্দ বনজাকে কোলে নিয়েই বসা থেকে উঠতে গিয়ে ‘আহ্’ করে উঠলো। অভিকুন্তল মকরন্দের দিকে তাকিয়ে বললো,”কি হয়েছে দাদাই? অমন করে উঠলে কেন”? সঙ্গে সঙ্গে মকরন্দ বলে উঠলো,”না,না ও কিছু না। ওই আজ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে তো, তাই”। ততক্ষনে ঋসু এসে বললো,” দাদাই রান্না হয়ে গেছে, তুমি হাতমুখ ধুয়ে চলে আসো”। তারপর বললো,”রুমু, তুই ঝিনুক,বনজা আর মিহিককে খাইয়ে দে। বাসু দাদাই যে ব্যাগগুলো নিয়ে এসেছে সেগুলো রান্নাঘরে রেখে দে”। সবাই তখন বাচ্চাদের খাওয়াতে ঘুম পাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। অভিকুন্তলের আজ কেন জানি মনে হচ্ছে দাদাইয়ের শরীরটা বিশেষ ভালো নেই। “চোখের তলায় পুরু হয়ে কালি জমে আছে। শরীরটাও যেন হঠাৎই খুব ভেঙ্গে গেছে। দাদাই বাইরে বাইরে থেকেই চাকরি করে, মাসে কয়েকদিনের জন্যে আসে, সব খরচবারচ দিয়ে আবার চলে যায়। দাদু মারা যাবার পর কিছুদিন আগে থেকেই দাদাই চাকরিতে যোগ দিয়েছে। সব তো ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু আজ দাদাইকে বেশ অসুস্থ লাগছে। নাহ্! দাদাই কে আর কাজ করতে দেবে না সে। তার তো এখানের স্কুলের চাকরিটা হয়েই গেছে। যা মাইনে তাতে পাবে সবারই হয়ে যাবে। তাছাড়া ঋসু আর সোমত্থ তো আছেই। পরের মাস থেকে ওরাও হোটেলের কাজে জয়েন করে নেবে।এখন দাদাই শুধু বিশ্রাম নেবে”, মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় অভিকুন্তল।
এই বাড়িতে তিনটে ঘর। একটা বড়ো ঘরে সব বাচ্চারা ঘুমোয়। আরেকটি ঘরে ডিভাইডার দিয়ে রান্নাঘর করা হয়েছে। সেখানে ঋসু আর সোমত্থ ঘুমোয়। আরেকটি ঘরে মকরন্দ আর অভিকুন্তল ঘুমোয়।


খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেলে বাচ্চারা সবাই ঘুমিয়ে পড়লো। অভিকুন্তলও ঘুমোতে আসছিল। মকরন্দকে জেগে থাকতে দেখে বললো,”দাদাই এখনও ঘুমাওনি”। মকরন্দ হেসে বললো,”না রে ঘুম আসছে না”। মকরন্দ আর অভিকুন্তলের খাট দুটো মুখোমুখি করে রাখা। একধারে লেখাপড়ার জন্য একটি টেবিল-চেয়ার রাখা। এই একটা টেবিল ভাগ করে অভিকুন্তল, সোমত্থ আর ঋসু পড়াশুনা করতো। মকরন্দ বলে,”বোস না অভি। আজ কিছু কথা তোকে বলবো। কথাগুলো জানা তোর জন্য ভীষণ প্রয়োজন। অভিকুন্তল খাটে বসে বললো,”বলো দাদাই, আমি শুনছি”। মকরন্দ ক্লান্ত শরীরটাকে বিছানায় আধশোয়া করে বসে বললো,” আজ তোকে কিছু এমন কথা বলবো যা এর আগে হয়তো কাউকেই বলিনি। আমার আসল নাম মকরন্দ সাধুখাঁ নয়। এই বাড়ীটিও আমার নয়। এই বাড়ির গৃহকর্তা বিলাস সাধুখাঁর সাথে আমার কোনো রক্তের সম্পর্কও নেই। আমার আসল নাম মকরন্দ সালভি। ‘সালভি ইন্ড্রাস্টিয়াল করপোরেশন’ আমার ঠাকুরদাদের সময় থেকেই খুব খ্যাতিমান ছিল। সেই খ্যাতিকে আমার বাবা আরোও সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছান। আমার থেকে বয়সে ছয় বছরের ছোটো ভাই নির্বন্তই এখন কম্পানির কর্নধার”। ভ্রু কুঁচকিয়ে আশ্চর্য্য হয়ে অভিকুন্তল জিজ্ঞাসা করলো,”কিন্তু দাদাই তুমি অতো বড়ো বংশের ছেলে হয়ে এমন অতিসাধারণ জীবনধারন কেন করছো? আর এই আজকেই বা কেন এইকথাগুলো বলছো”?  হঠাৎই কেশে উঠলেন মকরন্দ। কাশতে কাশতে চোখমুখ লাল হয়ে উঠলো। অভিকুন্তল তারাতারি টেবিলের উপর রাখা জলের জগ থেকে গ্লাসে করে খানিকটা জল নিয়ে এসে মকরন্দের সামনে ধরলো। একনাগাড়ে কেশে কেশে মকরন্দের দমটা আটকে আসতে লাগলো। অভিকুন্তল গ্লাসটা নামিয়ে রেখে মকরন্দের বুকে পিঠে হালকা মালিশ করতে করতে বললো,”এমন কাশি কী করে বাঁধালে দাদাই। তোমাকে তো সচরাচর কখনও অসুস্থ হতে দেখিনি। হঠাৎ এতো অসুস্থ কী করে হয়ে পড়লে দাদাই। তুমি বরং এখন একটু বিশ্রাম করো। আমি কাল তোমার সব কথা শুনবো। প্রমিস”। কাশির দমকটা কিছুটা কমেছে এখন মকরন্দের। সে অভিকুন্তলের হাত ধরে পাশে বসিয়ে বললো,”আমার কাছে সময় খুব কম অভি। আমাকে আজ বলতে দে। জানি না আবার এই সাহস বা সময় যোগাতে পারবো কিনা। আমায় আজ আটককাস না অভি…”। অভিকুন্তলের গলাটা যেন একটু কেঁপে উঠলো, তবুও সে যথাসাধ্য স্থির থেকে বললো,”ঠিক আছে, দাদাই বলো কী বলতে চাও তুমি”। মকরন্দ পিঠটা একটু সোজা করে বসে শোনাতে লাগলো তার বিপর্যস্ত জীবনের এক কঠিন কাহিনী‌। 
“সালভি ইন্ডাস্ট্রিয়াল করপোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা আমার ঠাকুরদার ঠাকুরদা শিবাজী সালভি। আমার ঠাকুরদা অবনিশ সালভি এবং পরবর্তীকালে আমার পিতাজী অতূল্য সালভি সেই প্রতিষ্ঠানের উত্থানকে ধীরে ধীরে সাফল্যের চরম শিখরে পৌঁছায়। বলাইবাহুল্য এই পরিবারের বংশগড়িমা কতটা বিস্তৃত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত। বলতে কোনো শঙ্কা নেই, আমাদের বংশের রক্ত খুব উন্নত। আমাদের বংশের প্রত্যেকেই দেখতে অসাধারণ এবং তারা অসামান্য গুনের এবং বুদ্ধির অধিকারী। সবাই নিজের নিজের জায়গায় সুপ্রতিষ্ঠিত। এক ব্যাতিরেক আমি। 
আমি না তো ওই বংশের সৌন্দর্য্য পেলাম নাতো পেলাম অসামান্য বুদ্ধির উপহার। আমার কূরূপ দেখে ঠাকুরদা তো ঘেন্নায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। মা-পিতাজী তাও বুকে জড়িয়ে রেখেছিলেন কয়েকবছর। কিন্তু যখন জানতে পারলেন যে আমি হলাম জেন্ডারক্যুয়্যার বা দ্বৈতলিঙ্গধারী তখন একঝকটায় ছুড়ে ফেলে দিলেন। দাদুর চোখে আমি নিজের জন্যে ঘেন্নাই দেখেছি সবসময়। তখন বুঝতে পারতাম না উনি কেন আমায় অপছন্দ করেন। একদিন লনে খেলতে খেলতে হঠাৎ পরে গিয়ে প্রচন্ড ব্যথা পাই। হাত ছড়ে গিয়েছিল পায়ে অনেকটা কেটে গিয়েছিল। কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। উনি আমার কাটাছেড়াগুলো দেখে বললেন,”যা এবার রাস্তায় রাস্তায় গিয়ে তালি বাজা। কিছু অন্ততঃ জুটবে তোর কপালে। বাপ-ঠাকুরদার না তো রূপ পেলি না তো গুন। আরে যদি মেয়েও হতিস তাহলেও মনকে স্বান্তনা দিতাম, কিন্তু জন্মালি ‘হিজরা’ হয়ে। তুই জন্মাবার আগে মরে গেলি না কেন”? মায়ের ও বলা কথা গুলো আজও আমার কানে বাজে। ‘হিজরা’ কথার মানেটা তখনও জানতাম না, কিন্তু এটা বুঝে গিয়েছিলাম যে ওদের জীবনে আমার কোনো জায়গা নেই। এর কদিন পরই আমার ভাই নির্বন্তর জন্ম হলো। নির্বন্তের জন্মর পর দাদু, বাবা, মা একেবারেই আমার সম্পর্কে বিস্মৃত হয়ে গেলেন। যেন মকরন্দ নামে ওদের জীবনে কেউ নেই। বাড়ির পুরোনো অব্যবহৃত আসবাবপত্রের মতো আমি এককোনে পড়ে থাকতাম। আমার দিকে নজর দেওয়ার জন্যে না তো কারোর কাছে সময় ছিল না তো ছিল ইচ্ছে। শুধু বাড়ির সর্বক্ষণের কেয়ারটেকার বিলাস সাধুখাঁ ছাড়া। সে আমার দিকে সবসময় লক্ষ্য রাখতো। হয়তো তার থেকে স্নেহ- ভালবাসা পেতাম বলেই ‘বাবা’ বলে ডাকতাম তাকে। অবশ্যই যখন কেউ সামনে থাকতো না। দেখতে দেখতে সময় গড়িয়েছে, আমিও অবহেলায় তাচ্ছিল্যের তখন চৌদ্দ পেরিয়েছি এবং আমার ভাই নির্বন্ত আদরে-আহ্লাদে তখন আট পেরিয়েছে। সেদিন নির্বন্তের জন্মদিন ছিল। অনেক অতিথি এসেছিলেন। পিতাজীর এক দূরসম্পর্কের ভাইও এসেছিলেন সেদিন। অস্ট্রিয়ায় থাকতেন, কদিনের জন্য দেশে ফিরেছিলেন। জন্মদিনের পার্টিটা অ্যাটেন্ড করেই  আবার  ফিরে যাবেন। লোকলজ্জার ভয়ে সেদিন আমাকে মা একটা ছেলেদের পোশাক দিয়েছিলেন পরার জন্য। যখন কেক কাটা হচ্ছিল আমি ইচ্ছে করেই পেছনে এককোনে দাঁড়িয়ে রইলাম। সবাই আনন্দে-উচ্ছ্বাসে মত্তো। চুপিচুপি নিজের ঘরেই চলে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ কেউ যেন বললো,”মকরন্দ না তুমি”। পেছনে ঘুরে দেখি পিতাজীর সেই দুরসম্পর্কের ভাই। উনি নিজে থেকেই আমার সাথে নানাজিনিস নিয়ে কথা বলতে লাগলেন। এতোবছরে এক ‘বাবা’ ছাড়া আর কেউ আমার সাথে নিজে থেকে কখনও কথা বলেননি। তাই আমারও বেশ লাগছিল। পার্টিতে তখন লাউড ডি.জে মিউজিক চলছে। উনি বললেন,” চলো তোমার ঘরে গিয়ে গল্প করি। এখানে বড্ডো আওয়াজ হচ্ছে”। আমি উনাকে নিজের ঘরে নিয়ে গেলাম। উনি অস্ট্রিয়ায় থাকার বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন আর আমি হাঁ হয়ে শুনছিলাম। হঠাৎ উনি আমার ঊরুতে হাত বোলাতে বোলাতে আস্তে আস্তে উপরেরে দিকে হাতটা উঠিয়েই জোরে টিপে ধরলেন আমার লিঙ্গাঙ্গে। আমি ব্যথায় ককিয়ে বললাম,”কী করছেন। ছাড়ুন আমায়”। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। উনার আপাদ ভালোমানুষ চেহারায় এক ক্রূরহাসি ফুটে উঠলো। উনি একহাতে আমার মুখ চেপে ধরে আরেক‍হাতে ছিড়ে ফেললেন আমার পোশাক। এরপর উনার সর্বস্য দৈহিক পৌরুষ  নিয়ে আমার উপর তার শক্তি ফলাতে লাগলেন। আমার মনে হচ্ছিল কেউ যেন লোহার ঠান্ডা দিয়ে মেরে আমার কোমর-পিঠ সব ভেঙ্গে দিচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ পর যখন উনার দৈহিক তৃষ্ণার নিবৃত্তি হলো তখন প্রায় অচৈতন্য আমাকে এক ধারে ফেলে রেখে বেড়িয়ে গিয়েছিলেন। সুস্থ হতে সময় লেগেছিল। শরীরের ঘা শুকিয়ে গেলেও মনের ঘা শুকোচ্ছিলো না। মা-পিতাজী সব জেনেও মুখ বুজে ছিলেন। অবসাদে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলাম। ‘বাবা’ই বাঁচিয়েছিলেন। এরপর থেকে ‘বাবা’ আরো বেশী যত্নশীল হয়ে পড়লেন আমার জন্য। একদিন ‘বাবা’কে বললাম, “আমার এখানে ভালো লাগে না। এখান থেকে পালাতে চাই আমি। এখানে থাকলে আমি মরেই যাবো”। একটু হেসে ‘বাবা’ বলেছিলেন, “বাইরের জগৎটা আরো ভয়ঙ্কর। পালিয়ে কোথায় যাবে। তোমার যদি এখানে থাকতে ইচ্ছে না করে তবে তুমি আমার সঙ্গে আমার বাড়িতে থাকতে পারো। আমি তোমার পিতাজীর সাথে কথা বলে নেব”। আমার চলে যাওয়ার কথায় ওরাও যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো। 
 সেইথেকে আমি ‘বাবা’র সাথে এই বাড়িতে চলে এলাম। আমার শারীরিক ত্রুটির জন্য আমাকে কখনও স্কুলে পাঠানো হয় নি। কিন্তু বাবা আমাকে এখানে একটা ছোটোস্কুলে ভর্ত্তি করিয়ে দেন। এরপর কেটে গেল বেশ কিছুবছর। নতুন জীবনে আমি যেন প্রানভরে শ্বাস নিতে পারছিলাম। একদিন বাড়ি ফিরছি, হঠাৎই আস্তাকুঁড়ে থেকে একটা ছোটো বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। সন্ধ্যা হয়ে গেছে অনেক্ষণ। এই অসময়ে বাচ্চার কান্নার আওয়াজটা আমার কাছে কেমন যেন একটা মনে হলো। উঁকি দিয়ে দেখলাম, একটা থলেতে কি যেন জড়ানো আছে আর আওয়াজটাও সেখান থেকেই আসছে। থলেটা খুলে দেখলাম ভেতরে একটা ফুটফুটে বাচ্চা কিন্তু তার দ্বিতলিঙ্গ। সঙ্গে সঙ্গে সব পরিস্কার হয়ে গেল আমার কাছে। বাচ্চাটির লিঙ্গত্রুটির জন্য তাকে পরিত্যাগ করা হয়েছিল। পরনের জামাটা খুলে ভালো করে ঝেড়ে বাচ্চাটিকে তাতে জড়িয়ে নিয়ে তাকে এই বাড়িতে নিয়ে এলাম।  ‘বাবা’র কোনো পরিবার ছিল না। আমাদের বাড়ির কাজটা ছিল কিন্তু ‘বাবা’র শরীর ততদিনে ভেঙ্গে গেছে। আর আগের মতো খাটতে পারতেন না। কোলে বাচ্চা দেখে বাবা অবাক হয়ে বললেন,”কি রে একে কোথা থেকে নিয়ে এলি”? সব বলার পর বাবা বললেন,”ভালো করেছিস। কিন্তু এর তো একটা নাম দিতে হবে। কি নাম হবে এর,কিছু ভেবেছিস”। “অভিকুন্তল”, বললাম আমি। এরপর একে এক ঋসু, সোমত্থকেও আনলাম। একদিন বাবা বললেন,”মকরন্দ, আমার তো পুঁজি বিশেষ নেই। এদের দেখাশোনা কিকরে করবো”। আমি তখন বাবাকে বললাম,”টাকা রোজগারের দায়িত্ব এখন থেকে আমার। তুমি শুধু ওদের খেয়াল রেখো”। এরপর কখনও খাবার হোটেলে টেবিল মুছে, ফাই-ফরমায়েশ খেটে, কখনও কাজের লোক হয়ে, কখনও মাল বয়ে, কখনও দোকানের কর্মচারী হয়ে এমনকি এসকর্ট হয়েও পয়সা অর্জন করেছি। আমার অস্বাভাবিক শারীরিক গঠনের জন্য শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিলাম। তাই জীবনে কিছু করে উঠতে পারিনি। সেকারণে আমি আমার মতো ছিন্নমূলদের এখানে নিয়ে আসি এবং তাদেরকে যথাসম্ভব একটা সুস্থ পরিবেশ দেওয়ার চেষ্টা করি। ‘বাবা’ আমাকে উনার এই বাড়িটা দিয়ে গেছেন। ‘বাবা’র মৃত্যুর পর আমি বাড়িটির নাম রাখি ‘কোলাহল’। কিন্তু অতিরিক্ত পরিশ্রম এবং বিশেষ করে এসকর্টের কাজে নামার জন্যে শরীরে বড়োরোগ বাসা বেঁধেছে,” এটুকু বলে মকরন্দ প্রচন্ড কাশতে লাগলো।
মকরন্দের কথাগুলো শুনতে শুনতে  অভিকুন্তল মাঝেমাঝে শিউরে উঠছিল। মকরন্দের কাশির দমকটা একটু কমলে অভিকুন্তল কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো,”কেন দাদাই, আমরাই কেন”? মুখে হালকা হাসির ছোঁয়া রেখে মকরন্দ বললো,”কারন আমি বিশ্বাস করি প্রতিটি মানুষেরই শিক্ষার অধিকার আছে। শুধু দ্বিতলিঙ্গ বা বিচিত্রলিঙ্গ নিয়ে জন্মগ্রহনের জন্য কেউ যোগ্যতাহীন হয়ে থাকবে সেটা আমি বিশ্বাস করি না। শিখন্ডী যদি রাজা হতে পারেন, শ্রী গৌরী সাভন্ত যদি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়ে সমাজ পরিবর্তন করতে পারেন তবে আমরাই বা কেন পেছনে থাকবো। অভি আমায় কথা দে অভি তুই….তুই আমার অসমাপ্ত কাজটা পূর্ণ করবি। এমন একটা প্রতিষ্ঠান তৈরী করবি যেখানে আমাদের মতো মানুষেরা মাথা উঁচু করে থাকতে পারে । তাদের যাতে রেল লাইনে বা ট্রাফিক সিগন্যালে তালি বাজিয়ে ভিক্ষে করে খেতে না হয়, তাদের যাতে পেটের ভাত যোগাতে শরীর বেচতে না হয়…কথা দে আমায়”। দৃঢ় কন্ঠে অভিকুন্তল বললো,”কথা দিলাম, দাদাই”।

প্রায় চারদিন প্রচন্ড জ্বরে অজ্ঞান ছিল মকরন্দ। পঞ্চম দিন জ্বরের ঘোরেই মকরন্দ মারা গেল। আজ মকরন্দের অষ্টদশতম মৃত্যুবার্ষিকী দিবস। অভিকুন্তল আজ এক স্বনামধন্য প্রফেসর। স্কুলে পড়ানোর সময় থেকেই পি.এইচ.ডি করছিল সে। তিনবছরের মাথায় পি.এইচ.ডি. শেষ করে একটা ভালো কলেজে চাকুরি পায়। ঋসু, সোমত্থ সফল হোটেলিয়্যার। মিহিক এবং বনজা স্কলারশিপের জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। রুমু এখন বিখ্যাত কর্থক নৃত্যশিল্পী। বাসু ন্যাশনাল ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন। এখন ইন্টারন্যাশনাল স্পোর্টস ইভেন্টে পরের মাসে যোগ দেবে। ঝিনুকের একটা ডিজাইনার বুটিক আছে। সেই দিনের আটজনের ছোট্ট পরিবার আজ আটলক্ষে পৌঁছিয়েছে। আজ ‘সবান্ধব ইন্টারসিটি’র শুভ উদ্ভোবন হবে। এখানে পৃথিবীর সমস্ত জেন্ডারক্যুয়্যারদের জন্য বিভিন্ন বিষয়ের উপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি তাদের থাকা এবং হস্তশিল্প শিক্ষার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এই বৃহৎ কর্মযজ্ঞে সবাই একটু একটু করে সাহায্য করেছে।
একটু পরেই রাজ্যপাল এলেন। ফিতে কেটে ইন্টারসিটির উদ্বোধন করলেন। তারপর মকরন্দের মুর্তির উন্মোচন করলেন। সেখানে ধুপ-দীপ জ্বালালেন। তারপর মাইকের সামনে এসে কি করে এই বিশাল প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এবং এইধরনের প্রতিষ্ঠান সমাজের জন্য কতটা প্রয়োজন, সে সম্পর্কে একটা বক্তৃতা রাখলেন। হাততালিতে চতুর্দিক সরগরম। কিন্তু অভিকুন্তলের দৃষ্টি শুধু মকরন্দের মুর্তির দিকে নিবদ্ধ। মনে মনে সে বললো,”দাদাই আমি তোমাকে দেওয়া কথা রেখেছি”।

  •  
    12
    Shares
  • 12
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •