• 7
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    7
    Shares
Facebook
Image Source: OneIndia

 

KAFE HOUSE

(Special Issue on Soumitra Chatterjee)

CONTENT | ISSUE 22 | 30th NOV, 2020

 

কৃষ্ণনাগরিক – আরণ্যক বসু
রাজা লিয়র – শ্যামসুন্দর গোস্বামী
ধ্রুবতারা – স্বরূপ সিংহ রায়
এক আকৈশোর গুণমুগ্ধের নস্টালজিয়া – সৈকত মজুমদার
নদী – চয়ন দত্ত
নির্বাক নায়ক (সৌমিত্র-স্মরণ) – স্নেহাশিস মুখোপাধ‍্যায়
অসমাপ্তির সমাপ্তি – মধুমিতা রায় চৌধুরী মিত্র
সাক্ষাৎকারটি – মানস বসাক। প্রতিলিপিটি লিখেছেন অনুসুয়া মুখার্জী।
অপু ও কাজল – তনিমা সাহা
রঙ্গমঞ্চের ফেলুদা – অতীশ রায়
Brawny – Wribhu Chattopadhyay
শ্রদ্ধার্ঘ্য ‌- মমতা মুন্সী
উদয়ন – প্রদীপ গঙ্গোপাধ্যায়
স্মরণে বরণে তুমি – সুদীপা
এ প্রজন্মের মুখে সৌমিত্র – ঋতায়ান চট্টোপাধ্যায়
বাচিকশিল্পী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: আমার আয়নায় – দেবাংশু মুন্সী
“The Master & I” …… Dr. Samiran Saha
নদীটা যেভাবে নিজের পথ করে নেয় – ডঃ অভিনন্দন সেনগুপ্ত

কৃষ্ণনাগরিক

আরণ্যক বসু

( মানুষের মৃত্যু হলে, তবুও মানব থেকে যায় / রূপসী বাংলার জীবনানন্দ )

অমল আলোর হাসিমুখে
মেধা বহুমাতৃক ;
কিন্তু সবাই জানেন পুলু
কৃষ্ণনাগরিক ।

কেষ্টনগর থেকে আমি
কৃষ্ণ পুতুল আনি,
জলঙ্গির ওই নীরব চলায়
অরূপ তোমার বাণী ।

এতো কিছু পেয়েও যখন
পা’দুটো ছোঁয় মাটি ,
মানিকবাবু জানেন তিনি
রোদের সোনা খাঁটি।

এইতো সেদিন অপুর ঘরে
অপর্ণা নেই ,একা ;
আকাশ ভরা সূর্য তারার
জীবনটাকে দেখা ।

নদীর ধারে বিশ্বপথিক
বাবার কাঁধে ছেলে ,
সেলুলয়েডের মহাকাব্য
তোমার চোখেই মেলে !

কাপুরুষের চাহনি থেকে
তিন ভুবনের পার ,
সোনার কেল্লা ছুঁয়েছে তাঁর
মগজাস্ত্রের ধার।

আকাশ এবার জানতে
পারলো
শ্মশান-চিতার ছাই…
সান্ধ্যতারার ছায়াপথে
এনেছে রোশনাই!

পঁচাশিতেও খুঁজে বেড়ালেন
স্বপ্নের দশদিক,
যুদ্ধক্ষেত্রে হার না মানা
কৃষ্ণনাগরিক ।

কবিতা থেকে মিছিলে গিয়েও
ফেরেন কবিতাতেই ;
ক্যামেরা-রোলিং , অ্যাকশন,
আর , জীবনের মৌতাতে।

অনেক কথা বলার পরেও
হীরক রাজার দেশে,
শিক্ষা, চেতনাকে মেলান
দীন ভিখারির বেশে ।

ভুলবে না কেউ, ভুলতে পারে?
জোরটা যে মানসিক ,
শেষ লোকালে বাড়ি ফিরলেন
কৃষ্ণনাগরিক !

ভুলবে না কেউ… ভুলবে না কেউ… ভুলবে না কেউ… ভুলবে না কেউ…

কমরেড সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়,
মানুষের গানের ও প্রাণের মহামিছিলে আবার দেখা হবে। জয় হোক মানুষের। 

( কৃষ্ণনগরের মানুষদের সারা বাংলার মানুষ “কৃষ্ণনাগরিক”
নামে সম্বোধন করে থাকেন শ্রদ্ধায় ও সম্মানে )

Image: Google.com
The Indian Express

রাজা লিয়র

শ্যামসুন্দর গোস্বামী

Soumitra Chatterjee - Telegraph India
মনে হচ্ছিল তুমি ফিরে আসবে না,
মনে হচ্ছিল
কারণ ফেরার রাস্তা এক দীর্ঘ
থেকে দীর্ঘতর,
অপেক্ষা থেকে অপেক্ষারত….।
মনে রাখব,
একথা বলেছি, তোমায়
বলেছি বলেই কি মনে রাখব!
আমার পায়ে এখন বেড়ি,
কোভিড ধনাত্মকে দুনিয়া আড়ি।
তবু বুকের ভেতর তোলপাড়,
তোলপাড় তুমি!
তোমার অপু, তোমার অমূল্য
তোমার শ্যাম, তোমার ফেলুদা
তোমার অসীম, তোমার “হে বন্ধু বিদায়”
আমার কাছে এখনও তুমি
রাজা লিয়র….
রাত পার করতে পারলে,
যমের দুয়ারে কাঁটা দিত
তোমার বোনেরা।
তুমি রাজা, মঞ্চের দুদিকে
দাপিয়ে বেড়াচ্ছ তুমি,
ফিরবে বলে প্রস্তুত হচ্ছো!
অনিন্দ্যদা আরও একবার
“বৈতরণী”র চিত্রনাট্য শোনাবে তোমায়,
তুমি রাজা লিয়র!
তুমি নিজের কবিতা পড়ে চলেছ,
বৈতরণী পার হচ্ছো তুমি
নিজের কবিতা পড়ার
এই তো অনন্ত সময়, পড়ো
কবিতা পড়ো, রাজা লিয়র।

Image: The Telegraph 

 

ধ্রুবতারা
স্বরূপ সিংহ রায়

I am still eager to portray characters from Shakespeare's stories: Soumitra  Chatterjee | Bengali Movie News - Times of India

ধ্রুবতারা তুমি। আকাশ যদিও কালো।
আঁধার-সন্ধ্যা। তবুও দেখাও আলো।

তুমি তো থামো নি। মৃত্যু মেনেছে হার।
কাটিয়ে ছুটি। ফিরে এসো বারবার।

প্রতি সন্ধ্যায়। অবসাদ যদি দহনে।
নেশা করে নেবো। সেঁকে নেবো প্রেম মননে।

সেখানে তোমার। হাসিমুখ চালচিত্র।
দেখাবেই পথ। প্রতি সন্ধ্যায়, সৌমিত্র॥

Image: TOI

এক আকৈশোর গুণমুগ্ধের নস্টালজিয়া

সৈকত মজুমদার

So long, Soumitra Chattopadhyay: The Apu who travelled far on the road -  Utkal Today

ছেলেটার বয়স তখন দশের কোঠাতেও পৌঁছয় নি। বাবা-মায়ের হাত ধরে উত্তর কলকাতার এক হলে দেখতে গেল জয় বাবা ফেলুনাথ। মগজাস্ত্র, মগনলাল আর মছলিবাবায় মশগুল হয়ে গেল ছেলেটা। আর সেই সঙ্গে খোঁজ পেল জীবনের প্রথম নায়ককে। ফেলুদা তার আগেই সোনার কেল্লা ঘুরে এসেছে মুকুলের হাত ধরে। ছেলেটার তখনও তা দেখা হয় নি। কারণ তখনও শয়ে শয়ে চ্যানেল আসে নি, একই সিনেমা অজস্র বার দেখিয়ে বিরক্তি উৎপাদনের মহামারী শুরু হয় নি। সোনার কেল্লার সন্ধান সে পেল আরও কয়েক বছর পর। ততদিনে সে ফেলুদার ভক্ত হয়ে উঠেছে। বইমেলা থেকে বাবা-মায়ের কিনে দেওয়া ফেলুদা কাহিনিগুলো গোগ্রাসে গিলছে আর চোখের সামনে পর্দায় দেখা মানুষটিকে ভিস্যুয়ালাইজ করছে।
এর মধ্যে হল আরেক অনন্য অভিজ্ঞতা। মা-বাবা ছেলেটাকে নিয়ে গেলেন রবীন্দ্র সদনে এক অনুষ্ঠান দেখতে। তখন শিক্ষিত, সংস্কৃত বাঙালি পরিবারে ছোটদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা গ্রুপ থিয়েটার দেখার সুঅভ্যাস  ছিল।  বাঙালি তখনও উনকোটি চ্যানেলে  সিরিয়াল নামক মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে নি। সোশ্যাল মিডিয়া কথাটা অভিধানে যোগ হয় নি। সে যাই হোক, এই অনুষ্ঠানে ছেলেটা মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখল, থুড়ি শুনল, পর্দার  ফেলুদার মন্দ্রিত কন্ঠে রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা। গোয়েন্দা ফেলুদার ভক্ত কিশোরের সৌমিত্র-ভক্ত হয়ে ওঠার সেই শুরু। শেষের কবিতা আত্মস্থ করা কিশোর মননে অসম্ভব। কিন্তু ছেলেটার হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হতে  থাকল, হতেই থাকল, “কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও…’
ছেলেটার আবৃত্তিতে হাতে খড়ি ছোটবেলাতেই, মায়ের কাছে । স্কুলের অনুষ্ঠানে বা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের অভ্যেস তাই ছিলই। এবার স্বপ্নের নায়কের কন্ঠে কবিতা শুনে আবৃত্তির ওপর ভালবাসা আরও গভীর হল। কতবার যে সে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বাচনশৈলী অনুকরণ করে তোতাকাহিনি পাঠ করার চেষ্টা করেছে !
তারপর ছেলেটা দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেল। স্বপ্নের নায়কের তালিকায় একটা দুটো নাম যোগও  হয়েছে। কিন্তু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আসন অনড়। ততদিনে ছেলেটা সত্যজিত রায়ের সব সিনেমা দেখে ফেলেছে। অপু থেকে ডাক্তার অশোক গুপ্ত – বিভিন্নরূপে তার  প্রিয় অভিনেতাকে পর্দায় দেখে মুগ্ধ হয়েছে। রায় ঘরানার বাইরেও দেখেছে কোনির ক্ষিদ্দা বা মিনিস্টার ফাটাকেষ্টর মাস্টারমশাই কাম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে। আর শুধু পর্দা কেন? মঞ্চেও সুদর্শন মানুষটির দাপট কতটা তাও দেখে নিয়েছে বেশ ক-বার। রাজকুমার বা টিকটিকি দেখে আর পাশাপাশি প্রেমিকার উপহার দেওয়া সৌমিত্রর কবিতার বই পড়ে অবাক হয়ে ভেবেছে অলরাউন্ডার কথাটার সার্থক উদাহরণ কি এই মানুষটি !
ছেলেটার বয়স আরও বাড়ল। তার পরিণত চোখে ধরা পড়ল আরও এক মজার তথ্য। টেলিভিশনের পর্দায় তিন ভুবনের পারে বা বসন্ত বিলাপ দেখে তার মায়ের চোখেও যে রকম মুগ্ধতা, তার প্রেমিকা থেকে স্ত্রী হয়ে আসা তরুণীটিরও তাই । সৌমিত্র-মুগ্ধতা তো এক প্রজন্মে শেষ হওয়ার নয় !
ছেলেটা এখন প্রৌঢ়ত্বের সীমায়। তাকে আর ছেলে বলা যায় না। কিন্তু তার প্রিয় অভিনেতা বৃদ্ধ হলেন কই ! ‘বেলাশেষে’ এসেও ‘পোস্ত’র স্বাদ এখনও আগের মতই। ‘সাঁঝবাতি’র ঔজ্জ্বল্য এতটুকু কমে নি। মৃত্যুকে তিনি এখনও তাঁর সঙ্গে তিনপাত্তি খেলার চ্যালেঞ্জ জানান।
ছেলেটা, থুড়ি লোকটা আরও অনেকের মতই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে এই ভাবেই দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি যখন লড়ে হারলেন শেষ লড়াইটা, তখন কেমন যেন বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল ! মনে হচ্ছিল এই বুঝি তিনি উঠে বসে জলদগম্ভীর কন্ঠে বলে উঠবেন, ‘মৃত্যু, আয় তিন পাত্তি খেলি আয়…’
চটক ভাঙতে সে দেখল, না, উদয়ন পণ্ডিতের পাঠশালা এবার সত্যিই বন্ধ হয়ে গেছে।অপু চলে গেছেন তিন ভুবনের পারে।
পাঠক, চিনতে পেরেছেন এই আকৈশোর গুণমুগ্ধকে ? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখুন। নিশ্চয়ই চিনবেন।

(Photo: UtkalToday) 

নদী

চয়ন দত্ত

Outlook India Photo Gallery - Soumitra Chatterjee

রুক্ষ ধারিত্রীর বুক চিরে,
একখানা নদী বইতো,
গভীর নীলাভ একখানা নদী,
ভীষণ শান্ত অথচ অসম্ভব স্রোতস্বিনী,
চিত্তের মতো চঞ্চল স্রোতে ছিল বিদ্যুৎের ঝলকানি,
যেন সাক্ষাত নীলকন্ঠ!
আর সেই রুদ্র রূপের ওপিঠে ছিল–
বসন্তের উষ্ণতা,
পরম মমতায় সেই নদীটি
নিজের দু-পারে ছড়াতো
সংস্কৃতির পলি,
সমৃদ্ধ করতো শতো নগরী,  প্রাচীন জনপদ ।
কাতারে কাতারে বহু মানুষ আসতো ,
নদীটিকে শুধু স্পর্শ করবে বলে ।
যেমন এসেছে আজও,
অশ্রুচক্ষে,নতমস্তকে ।

কিন্তু নদীর যে নেই কোন মৃত্যু,
আছে শুধু বুকে নিয়ে বয়ে চলা ইতিহাস,সুবর্ণ গৌরব,
আর প্রবহমান বর্তমান!
এমন একটি নদীর চরণে জানাই সশ্রদ্ধ শতকোটি প্রণাম ।।

[ সৌমিত্র চট্টপাধ্যায়ের স্মৃতির উদ্দেশ্যে]

Image: India Today
The Telegraph

নির্বাক নায়ক (সৌমিত্র-স্মরণ)

স্নেহাশিস  মুখোপাধ‍্যায়

Soumitra Chatterjee: Bengal's man in the world - Movies News

(১)

তবে কি স্মৃতিতে কোনো ঋণ লেখা নেই?

নিঃশ্বাস, বিচ্ছেদ, অবলোকনের ইতিহাস?

নেই? কোনো ঋণ কোথাও রাখে না স্মৃতি?

সব ঠিকঠাক চলে আগের মতো এগিয়ে এগিয়ে!

শিরার ভেতরে কি থাকে তবে?

শুধু আয়ু…আর বুঝি কিছুই থাকতে নেই?

রক্ত-চলাচল কি করে দেখতে পায় মুখ?

নাকি মুখ দেখতে পায় রক্ত-চলাচল!

আমি কেন সেই মুখ নই? রক্ত-চলাচল!  

আমার কতো স্পর্ধা, গাছের হাঁটা-চলা দেখতে গিয়েছি।

গাছ কি সবার সামনে হাঁটে?

তবে কে হাঁটে – সাধারণ মানুষ?

তাহলে ক্যামেরা ঝলসে ওঠে কেন?
ক্যামেরা কি গাছের রাতের খবর রাখে?

রাখে তো! তাও কি গভীর রাতটুকু?
যখন মর্মর গাছ প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়ে?

সেসব গাছের সাক্ষাৎকার!

গাছও কি প্রত্যেক সেকেন্ড মনে রাখে?

তাহলে সেকেন্ডগুলো কোথায় যায়?

তিনটে পৃথিবীর পারে…উপনক্ষত্রের মতো হয়ে থাকে?

আর গাছ – ইচ্ছায় ইচ্ছায় বাঁধা পরদাসত্ব কিছুটা তো মেনে নিতে হয়ই।

রাতের সেকেন্ডে ঘুম হয়ে যেসব চিন্তারা হানা দেয়,

ঠিক সেই সেকেন্ডগুলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে একটা পাখির মুখ এঁকেছেন কেউ।

হাওয়ার বাঁধাগুলো হারিয়ে ইচ্ছেডানা তৈরি হয়েছে।  

গাছের সুতোয় একটা লাট্টু দোলে ঘুমহীন পৃথিবীর মতো। 

Image: India Today
অসমাপ্তির সমাপ্তি
 
মধুমিতা রায় চৌধুরী মিত্র
 
Mamata Banerjee wishes Soumitra Chatterjee on 83rd birthday
ক্ষিদদা! তুমি কি হেরে গেলে শেষে?
নাকি গেলে, সত্যি সেই না-ফেরার দেশে?
নাকি হারিয়ে গেলে, কোনো ভাঙা কেল্লার গলিতে?
তুমি গেলে কি কারোর ডাক পেয়ে– 
নাকি গেলে, পরিযায়ী রূপে?
কেন এভাবে ভাঙলে অপুর সংসার?
জানি মৃত্যুর সাথে, লড়তে লড়তে, ছিলনা, তোমার কোনো বিকার!
তাও মনের মধ্যে বাঁধছে যে অনেক জট–
এতো কাজ ফেলে, কেউ যেতে পারে হুট-পাট?
মানিক-বাবু, কি দিলো তোমায় ডাক?
বোধহয়, মগনলাল, করছে সেখানেও উৎপাত!!
ঘায়েল কোরো তাঁকে, তোমার মগজ-অস্ত্র দিয়ে!
বুঝেছি!! 
সেখানে যে আছে সঞ্জয়, শেখর, হরি!
হবে চারমূর্তি আবার এক– 
সে আমরা, বেশ বুঝতে পারি।
এবার বলতো, কে লিখবে তোমার অসমাপ্ত কবিতা?
কে আঁকবে, আবার রঙ দিয়ে ছবি-ছবি খেলা?
কে কন্ঠ দেবে, সব আবেগের কবিতায়?
কে বোঝাবে, সহজ করে সব চরিত্রের অভিনয়?
সহস্র প্রশ্ন আজ, মনে ভিড় করে–
মনে হয়—
যেন বাঙালি ফেঁসেছে, নতুন কোনো, এক, জটিল কেসে!
যেখানেই থাকো, তুমি লড়াইটা, চালু রেখো ক্ষিদদা!!
সমস্যায় পড়লে, বাড়িয়ে দেবে হাত–
আমাদের ফেলুদা॥॥
Image: The Statesmen 

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিশিষ্ট বিনোদন সাংবাদিক মানস বসাক। বাংলায় প্রতিলিপিটি লিখেছেন অনুসুয়া মুখার্জী।

 

একটা মৃত্যু যাকে ঘিরে হয়তো অনেক আবেগ ভালো লাগা স্মৃতি ,হ্যাঁ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কেই বলা.কারণ তাঁর মৃত্যু সত্যি তারা খসা। এবং তাঁর মৃত্যুর পরই যেমন দেখতে পাচ্ছি তাঁর নামধরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় অপু ,ফেলুদা তাঁর বিভিন্ন বিখ্যাত চরিত্রের নাম ধরে লেখা লেখি। তাঁকে হারানোর যে বিশাল শূন্যতাএবং সেইসঙ্গে শোক জ্ঞাপন চলছে চলবে ,চলার কথাও তার ব্যক্তিত্বই এমন। তিনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর কেউ নন।
আমার মতন যারা সাংবাদিকতা করতে গিয়ে বার বার মানুষটার কাছে এসেছে তারা হয়তো জানে সিনেমায় বা বিভিন্য অনুষ্ঠানে বা পাবলিক ফোরামে তাকে যেভাবে দেখেছি ,ব্যক্তি মানুষটা কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা।একজন অত্যন্ত গুণী সমস্কৃতিবান , রাজনৈতিক চেতনা সম্পন্ন্য, এক ব্যক্তিত্ব। যিনি শুধু অসাধারণ অভিনয়ে সেলুলয়েড কে সমৃদ্ধ করেন নি, তার বিভিন্ন্য সংস্কৃতির চর্চার মধ্যে দিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন ,যার ছায়াতে আমরা সমৃদ্ধ হয়েছি।

তিনি শুধু অভিনেতা নন। একজন নাট্যকার ,সম্পাদক ,লেখক ,কবি ,বাচিক শিল্পী। ভালো গান গাইতেন, ছবিও আঁকতেন। খেলাধুলা সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান।ক্রিকেট সম্পর্কে একজন ক্রিকেটার থেকে কম জানতেন না। টেনিসও খেলতে পারতেন। এমনি একটি মানুষ যাকে ঘিরে অনেকগুলো অরা যেমন থাকে ,তেমন রয়েছে। সেই মানুষটাকে খুব কাছ থেকে জানার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। প্রথম যখন পরিচয় হয়েছিল ,মানুষটা পর্দার ব্যক্তিত্ব নিয়েই উপস্থিত হয়েছিলেন ,কিন্তু পরবর্তীকালে যত জেনেছি ততো নতুন হয়ে ধরা দিয়েছেন। কথা প্রসঙ্গে মৃত্যুর কথাও এসেছে। তাঁর মৃত্যু হয়তো এইভাবে কাম্য ছিলোনা। তার দর্শকদের দেবার এখনো অনেক কিছু বাকি ছিল। কিন্তু উনি কখনোই পরনির্ভরশীলতা চান নি। কাজ করতে করতে চলে যাওয়াটাই তার কাম্য ছিল।তিনি অকপটে আমার কাছে বলেছেন মৃত্যুকে তিনি ভয় পান। আগে শুধু ভয় পেতেন ,পরে ভাবতেন কেমন করে এই মৃত্যু ভয়র সঙ্গে লড়াই করা যায়। এই পৃথিবীতে সবই অনিশ্চিত, নিশ্চিত শুধু মৃত্যু।র কথা তিনি মানে প্রাণে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু অসুস্থ হয়ে পরনির্ভরশীল হয়ে বিছানায় শুয়ে থাকতে চাননি। তাই হয়তো হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরতে হলোনা।

তাঁর মতন মানুষের আত্মজীবনীর প্রতি সব মানুষেরই কৌতূহল ছিল। আমিও তাকে বলেছি ,আপনি আত্মজীবনী লেখেন না কেন ?উনি বলছিলেন চাইলেই আমি লিখতে পারি আমার কলমে এখনো ধার রয়েছে কিন্তু ,আমাদের মতন দেশে আত্মজীবনী লেখাটা খুবই কঠিন। সব সত্যি লেখা সম্ভব নয়। আর সব সত্যি ছাড়া আত্মজীবনী অসম্পূর্ণ। সে সঙ্গে তিনি বলতেন আমার জীবনের সঙ্গে অনেক জীবন জড়িয়ে ,লিখতে গেলে তাদের কথাও উঠে আসবে। আমিতা লিখতে চাইনা। তাই কোনোদিন চাননি তার আত্মজীবনী লেখা হোক। তবে তার জীবনের শেষ লগ্নে এসে পরমব্রত চক্রবর্তীর নির্দেশনায় তার বায়োপিক ‘অভিযান ‘এ কাজ করেছেন। আশ্চর্য তার না চাওয়াটাই সত্যি রয়ে গেল।তিনি অভিনয় করে গেলেন কিন্তু বায়োপিক অভিযান দেখে যেতে পারলেন না।

যতদিন গড়িয়েছে ততো নতুন করে তাঁকে আবিষ্কার করেছি,কঠিন কঠোর অন্তর্মুখী মানুষটা কখন খুব কাছের হয়ে উঠেছিলেন। কয়েক বছর আগে ফ্রান্সের লিজোডিয়ার অনার সম্মানে যখন তাঁকে ভূষিত করা হল ,অফিসের চাপে সব সংবাদ মাধ্যম কে হারিয়ে প্রথম ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্য অফিসের থেকে কিনে দেওয়া বুকে নিয়ে সকাল সাতটায় তাঁর গল্ফগ্রিনের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলম্ । সে সময় তাঁর যোগব্যায়াম ,মর্নিং ওয়াক সারা হয়ে গেছে। তার কাছে ব্যায়াম ছিল জীবনের মূল মন্ত্র। এর মাধ্যমেই উনি বেঁচে আছেন শরীরে মননে চিন্তনে। সেই দিন কিন্তু অন্যান্য প্রসঙ্গ ও উঠে এসেছিলো । উনি বলেছিলেন ,উনিও একসময় ডিপ্রেশনের রুগী ছিলেন। সৃষ্টিশীল মানুষের ডিপ্রেশন হওয়া উচিত। ডিপ্রেশন কাটিয়ে ওঠার জন্যই নতুন সৃষ্টির উন্মাদনার সৃষ্টি হয়। তাঁর বহুমুখী প্রতিভার প্রকাশ ঘটেছে এই ডিপ্রেশন এর জন্য। নতুন ভাবে তিনি মঞ্চের মাধ্যমে নিজেকে তুলে ধরেছেন। মঞ্চ ই ছিল তাঁর ভালোবাসার ভালোলাগার আশ্রয়স্থল।তিনি বলেছিলেন সিনেমা আমাকে সৌমিত্র করে তুললেও নাটকের মঞ্চেই আমার মুক্তি ঘটে।


জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে মিথ্যাচার করা যায় কিন্তু কবিতায় কোনো মিথ্যাচার হয়না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় তিনি বলতেন কবিতা তাঁর বহুকালের প্রেয়সী। রবীন্দ্রনাথ ,সুকুমার রায় তাঁর প্রিয় কবি। কবিতার মাধ্যমেই আমি মনের সত্যিটাকে নির্দ্বিধায় তুলে ধরতে পারি।

লেখালেখির জগতের বাইরে তাঁর প্রিয় মঞ্চের জন্য তাঁর সময় নির্দিষ্ট ছিল.।এই সময়ের সঙ্গে তিনি কোনো সংঘাত পছন্দ করতেন না। ডায়েরি তে সিনেমার সিডিউল এর পাশাপাশি মঞ্চের সিডিউল ও দুমাস আগে লিখে রাখতেন। সবসময় চেষ্টা করতেন নাটকের রিহার্সালের ডেট যেন কোনও শুটিংয়ের ডেটের সঙ্গে এক না হয়ে যায়। এমন হলে উনি খুব বিরক্ত হতেন।

আমৃত্যু উনি অভিনয় করে গেছেন। মঞ্চের অভিনয় ওনার বেঁচে থাকার রসদ। ভাল স্ক্রিপ্ট ছাড়া বিভিন্য
সিনেমায় বা বিজ্ঞাপনে ও উনি অভিনয় করে গেছেন ,শুধুমাত্র জীবিকার প্রয়জনে ,স্ত্রী ,পুত্র দুজনেই অসুস্থ ,মে নাতি নাতনি বেশ বড় পরিবার ,সে পরিবারের জন্য অনিচ্ছায় ও তাকে লাইট ক্যামেরা সাউন্ডের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

এই অভিনয় প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন বিখ্যাত সব নায়িকাদের সঙ্গে অভিনয়ের জন্য কফি হাউসের অল্পবয়সে বন্ধুদের কাছে তিনি ছিলেন ঈর্ষার পাত্র।অভিযানে তিনি ওয়াহিদা রহমানের সঙ্গে অভিনয় করেন। বন্ধুরা কিন্তু ঈর্ষান্বিত হননি ,তারা নিজেদের পুলুর পরিবর্তে ওই জায়গায় নিজেকে মনে করেছেন।

ওনার প্রিয় অভিনেত্রী কিন্তু সুচিত্রা সেন নয় সাবিত্রী ,উনি মনে করতেন এমন অভিনয় ক্ষমতা আর সেন্স অফ হিউমার কোনও অন্য অভিনেত্রী র ছিলোনা। সুচিত্রা সেন ভাল অভিনেত্রী তবে খুব আন প্রেডিক্টবল ছিলেন।অপর্ণা সেন অত্যন্ত শিক্ষিত পরিচালক।শর্মিলা আর পাতৌদি র সঙ্গে ঘন্টার পার ঘন্টা আড্ডা মেরেছেন সময় কোথা দিয়ে চলে গেছে টেরি পাননি।

শেষের দিকে খুব এনসাইটিতে ভুগতেন।আঁকা কে নিরানন্দ অন্ধকারাগার থেকে বের হবার হাতিয়ার করে নিয়েছিলেন।ভালোবেসেছিলেন আঁকাকে।কথা প্রসঙ্গে একবার বলেছিলেন জীবনে প্রাপ্তির ভান্ডার হয়তো পূর্ণ হয়না,আমার প্রাপ্তির ভান্ডার কিন্তু পূর্ণ।নতুন করে পাওয়ার কিছু নেই।যেগুলো পেয়েছি সে গুলোই ঘষে মেজে ঝালাই করে চলেছি।

ওনার মতন এমন মানুষ এর নশ্বর দেহের বিলুপ্তি ঘটলেও এমন এক মানুষের চলে যাওয়া মন থেকে মেনে নেওয়া যায়না।পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তার সৃষ্টির এক আর্কাইভ গড়ে তোলা দরকার।

ওনাকে এত কাছ থেকে দেখেছি,মিশেছি, অনুভব করেছি ওনার এই যাওয়ার মধ্যে দিয়েই উনি অমরত্ব পেলেন। এই শোক পেরোতে সময় লাগবে। সেই দূরাগত আলোর জন্য একদিন আমরা কি বিস্মিত হবোনা।তিনি নেই। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে,সমস্কৃতির অস্তিত্ব থাকবে কোথাও না কোথাও তার আলো এসে পৌঁছাতে থাকবে আমাদের প্রত্যেকের জীবনে। যতবার তার অভিনীত ছবি সেলুলয়েড এ ফুটে উঠবে ততবার তিনি আমাদের মনের মনিকোঠায় জায়গা করে নেবেন। এবং তার কবিতার মধ্যে দিয়ে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন আমাদের মধ্যে । তাঁর লেখা ভালোবাসার কবিতা দিয়েই শেষ করছি। এই ভালোবাসার মধ্যে দিয়েই তিনি আমাদের মধ্যে রোএ যাবেন মননে চিন্তনে স্মৃতিতে।

মানস বসাক

বিনোদন সাংবাদিক

গল্প :-

অপু ও কাজল

 তনিমা সাহা

Soumitra Chatterjee in 'Apur Sansar' | Film world, Satyajit ray, Soumitra  chatterjee

আজ নিশ্চিন্দিপুরের সাথে সমস্ত সম্পর্ক নিশ্চিন্তে মিটিয়ে অপু মানে অপূর্ব মিত্র একটা ছোটো সুটকেস নিয়ে কোলকাতাগামী ট্রেনে চাপলো। কিছুপরেই স্টেশন মাস্টারের সবুজ বাতি দেখানোর সঙ্গে সঙ্গেই ট্রেনের চাকা গতি নিল। চোখ বন্ধ করে নিজের ফেলে আসা দিনগুলোকে রোমন্থন করছিল। এই ট্রেন দেখার জন্য সে দুর্গা দিদির সাথে প্রবল বৃষ্টির দাপটকেও উপেক্ষা করে বাড়ি থেকে রেল লাইন দেখতে গিয়েছিল। সেই বৃষ্টিতে অপুকে আড়াল করতে গিয়েই তো দিদিটা অমন করে ভিজেছিল যার ফলশ্রুতিতে দিদির নিমোনিয়া হয়ে গিয়েছিল। অপুরা সেসময় খুব গরীব। ডাক্তার দেখানোরও পয়সা ছিল না। প্রায় বিনা চিকিৎসায় অপুর দুর্গাদিদি মারা যায়। 

“ভাই, খেয়ে নাও..এই যে এই গ্রাসটা খেয়ে নিলেই আমি তোমাকে একটা সুন্দর পরীর গল্প শোনাবো”।

“সত্যি দিদি…”।

“সত্যি, সত্যি, সত্যি.. এই তিনসত্যি বললাম। এবার লক্ষীভাইয়ের মতো খেয়ে নাও”।

ট্রেনের কামরায় অন্য একটি পরিবারও আছে। ভাই, দিদি, বাবা আর মা। সেই পরিবারটির মেয়েটার এবং ছেলেটার কপোথকথনের শুনে অপূর্ব স্মৃতির রাজ্য থেকে ফিরে এলো। ওদেরকে দেখে নিজের ছোটোবেলার কথা মনে পরলো অপূর্বর। পরদিন সকালে হাওড়া স্টেশনে ট্রেন থামলে অপূর্ব নিজের বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে নেমে পরলো। নিশ্চিন্দিপুরের নিরালা নিরিবিলি পরিবেশ থেকে কোলকাতার কোলাহল সদাই সরগরম পরিবেশ যেন অপূর্বর মধ্যেও এক নতুন সত্ত্বার সৃষ্টি করলো। 

অপূর্বর আপাত ঠিকানা এখন বিরিঞ্চিবাবুর ভাড়াবাড়ি। কলেজের পড়াশোনা শেষে এখন অপূর্ব দু-একটা টিউশনি করে। চাকরি খুঁজছে কিন্তু পাচ্ছে না। টিউশনি করে যা আমদানি হয় তাতে যে অপূর্বর চলে যায় তা নয়। মাঝেমাঝে মাসিক বাড়িভাড়ার টাকাও জোগাড় হয় না। বাড়িওলা তা নিয়ে খুব অশান্তিও করে। এই তো একদিন বাড়িওলা বিরিঞ্চিবাবু অপূর্বর অনুপস্তিতিতে ঘরে তালা ঝুলিয়ে দেন। অপূর্ব ফিরে এসে প্রশ্ন করলে বলেন,”আগে গত তিনমাসের ভাড়া মেটাও, তারপরেই ঘরের তালা খুলবো”। অপূর্বও কম যায় না। সেও কোমরে হাত দিয়ে পাক্কা শহুরেদের মতোই ভাড়া নেওয়া ঘরটিতে কতো ত্রুটি আছে তা নিয়ে বেশ অনেক্ষণ ঝগড়া করলো। শেষে বাড়িওয়ালাই চুপ করে গেলেন। এই দুবছরে বাড়িওয়ালার সাথে এইধরনের বচসা তো কম হয় নি। তবে তা নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা নেই অপূর্বর। সে দিব্বি সিগারেট খেয়ে, শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে, উপন্যাস লিখে বেশ দিন কাটছে অপুর। একদিন ভিক্টোরিয়ার সামনে ময়দানে বসে বৈকালিক প্রসন্ন আবহাওয়ার আমেজ নিচ্ছিল। হঠাৎ চেনা গলায় নিজের নাম শুনতে পেয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখতে পেল তার কলেজের প্রানের বন্ধু পলু মানে পল্লবকে, তার দিকে তাকিয়েই হাত নাড়াচ্ছে। দুই বন্ধুতে মিলে অনেকদিন পর অনেক আড্ডা হলো। কথায় কথায় অপু জানালো যে সে চাকরির খোঁজ করছে। পলু বললো যে তার এক পিশেমশাইয়ের একটা মেশিনের ফ্যাক্টরি আছে, সেখানে অনেক লোক কাজ করে। অপুর কাজ হবে তাদের কাজের তদারকি করা অর্থাৎ সুপারভাইজার। মাইনেও মন্দ না। কিন্তু অপু একটা দোটানায় পরে যায়। কারণ অপু জানে চাকরিতে যোগ দেওয়া মানেই তার এই নিশ্চিন্ত নিরুপদ্রপ বোহেমিয়ান জীবনকে বিদায় জানিয়ে এক নির্দিষ্ট নিয়মের ঘেরাটোপের জীবনকে স্বাগত জানাতে হবে। অপু দোনামনা করতে দেখে পলু বললো,”ঠিক আছে, এখনই জবাব দিতে হবে না। তুই দু/তিনদিন ভেবে নে, তারপর জানাস নাহয়। এখন চল এক জায়গায়। একটা দারুন রেস্তোরাঁ  খুলেছে। চল দুজনে মিলে একটু কবজি ডুবিয়ে খেয়ে আসি”। 

কিছুদিন পর পলু অপুর ভাড়াবাড়িতে দেখা করতে এলো। কিছুক্ষণ আড্ডার পর পলু জানালো যে বাংলাদেশের খুলনা শহরে তার কাকাতো বোন অপর্ণার বিয়ের নেমন্তন্ন করতেই তার অপুর কাছে আসা। অপু জানে বাংলাদেশের লোকেদের রান্নার হাত হয় অসাধারণ। পুকুরের জ্যান্ত মাছ, নানাবিধ গাছের ফল, ক্ষেতের তাজা সবজি…তার উপরে ঘরের পাতা দই-মিষ্টি তো আছেই… এ সবই অবশ্য পলুর বলা কথা। অপুও ভেবে দেখলো রোজই তো হাত পুড়িয়ে রান্না করে খেতে হয়। কদিন নাহয় একটু আরামেই খাওয়া দাওয়া হলো।

বিয়ের আসর জমজমাট। পলু পৌঁছেই বিয়ের কাজে লেগে পড়েছে। তাতে অবশ্য অপুর যত্ন-আত্তি মোটেই কম হচ্ছে না। বরযাত্রী এসেছে। অপু একটা সিগারেট ধরিয়ে বিয়ে আসর থেকে বেরিয়ে আসে।

কিছুপরে বাড়ির ভেতর থেকে তুমুল ঝগড়ার আওয়াজ আসে। হাতের সিগারেটটা ফেলে তাড়াতাড়ি বাড়ির ভেতরে ঢুকলো। ভেতরে ঢুকে দেখে বিয়ের আসরে এক দক্ষযজ্ঞ কান্ড। পল্লব হাত উঠিয়ে কাউকে শাশাচ্ছে আর পল্লবের আশেপাশে কিছু লোক জড়ো হয় আছে। একদিকে পল্লবের কাকিমা বুক চাপড়ে চাপড়ে কেঁদে যাচ্ছে। পল্লবের কাকু ‘আমার মেয়েটার সর্বনাশ হয়ে গেল’,’আমার মেয়েটার সর্বনাশ হয়ে গেল’,বলে হাহাকার করছেন। অন্যদিকে মন্ডপের ভেতরে বিয়ের কনের পাশে বর বেশে যে বসে আছে তাকে কোনোভাবেই একটা সুস্থ্য স্বাভাবিক মানুষ বলা যায়। সে সম্পূর্ণভাবে মানসিক বিকারগ্রস্থ। আসরের ভেতরে যেতেই অপু কানে এলো,”হা ঠাকুর, এ কী সর্বনাশ হলো মেয়েটার। এমন লক্ষীমন্ত মেয়ে। এখন এই লগ্নভ্রষ্টা মেয়েকে কে বিয়ে করবে। গ্রামের লোক তো এখন তাকে একঘরে করে দেবে”। অপুকে দেখতে পেয়েই পলু দৌঁড়ে এলো,”অপু,অপু…দেখ না আমার বোনটার কী সর্বনাশ হয়ে গেল। ছেলেরবাড়ি অন্য একটি ছেলের ছবি দেখিয়ে আমাদের ঠকিয়েছে। এই পাগলের সঙ্গে বিয়ে হলে বোন আমার মরে যাবে রে অপু, বোনটা আমার মরে যাবে”,বরে পলু কাঁদতে লাগলো। অপু চোয়ালটা শক্ত করে বললো,”আমি বিয়ে করবো তোর বোন অপর্ণাকে। তুই নিশ্চন্ত থাক বন্ধু। অপর্ণার কোনো ক্ষতি হবে না। আমি বিয়ে করবো তাকে”। 

শুরু হয়ে গেল অপূর্ব এবং অপর্ণার বৈবাহিক জীবন। সেই সুপারভাইজারের চাকরিটাই নিয়ে নিল অপু। ভাড়াবাড়িটা ছেড়ে দিয়েছে সে। অফিস থেকে একটা কোয়ার্টারের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। সেখানেই আপাতত অপু আর অপর্ণা নিজেদের ছোট্ট সংসার করে। সেই টিউশনি গুলো এখনো করে অপু। অপর্ণার সাথে এখন বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। সেই বন্ধুত্ব থেকে সম্পর্কটা ভালোবাসা পর্যন্ত গড়াতে সময় নেয় নি। ক্লান্ত শরীরে অফিস থেকে ফেরার পর অপর্ণার পেছন থেকে চুপিসারে এসে কানের কাছে কাগজের ঠোঙা ফাটিয়ে চমকিয়ে দেওয়া বা সিগারেটের প্যাকেটে ‘সিগারেট খেও না, খাবার খাও’ কিংবা টেবিলের উপর চিরকূটে ‘কাজের লোকের প্রয়োজন নেই, তুমি বরং টিউশনগুলো ছেড়ে দাও’ ইত্যাদি অনুরোধের অনুচিঠিগুলো সদাগম্ভীর অপূর্বর মুখেও হাসি ফুঁটিয়ে দেয়। সময়ের নিয়ম মেনে অপর্ণা অন্তঃসত্ত্বা হলো। কিন্তু সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে অপর্ণাকে প্রাণ হারাতে হলো। সন্তানের নাম রাখা হলো কাজল। 

কাজলকে অপুর মোটেও পছন্দের ছিল না। কারণ অপূর্বর সবসময় এটাই মনে হতো যে আজ কাজল আছে বলেই অপর্ণা তার জীবনে। ওই একরত্তি দুধের শিশুটার বুক ফাটানো কান্ন ও অপুর পাষাণ হৃদয়কে গলাতে পারে নি। অপু চূড়ান্তভাবে অবসাদে ভুগতে শুরু করলো। নিজের উপন্যাসের খাতা ছিড়ে ফেলে দিল অপূর্ব। তারপর হঠাৎই একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। 

পল্লব কাজলকে নিয়ে তাদের দেশের বাড়িতে চলে এলো। আদরে যত্নে কাজল বড়ো হতে লাগলো ঠিকই তার সাথে হয়ে উঠলো একরোখা ও জেদি। দেখতে দেখতে দশটা বছর পেরিয়ে গেল। কাজলের কাছে ‘কলকাতা আর বাবা’র সংজ্ঞা একইরকম…. অদেখা,অজানা এক অজ্ঞাত পরিচয়। একদিন আচমকাই অপু আবার ফিরে  আসলো ঠিক যেমনি যছমন একদিন হঠাৎ হারিয়ে গিয়েছিল তেমনি ফিরে এলো। কাজল তার বাবার সাথে কথা বলা তো দুর তার বাবাকে দেখতে পর্যন্ত রাজি হলো না। একদিন বিকেলে কাজল গৌরীনদীর চরে খেলা করছিল। সেখানে অপু উপস্থিত হয়ে নিজেকে কাজলের ‘বাবা’ হিসেবে পরিচয় দেয়। কাজল তখন নুড়ি পাথর নিয়ে খেলা করছিল। কাজল হাতের পাথরটা নিয়ে ছুড়ে মেরে অপুর মাথা ফাটিয়ে দেয়। অপু তখন নিজের ভুলটা বুঝতে পারে। দুদিন পর আবার গৌরীনদীর চরে কাজলের সাথে দেখা করলো। কাজল তখন নদীর জলে নুড়িপাথর ছুড়ে ছুড়ে ফেলছিল। অপু তার পাশে বসে বললো,”কাজল… জানি আমি অনেক অন্যায় করেছি। তুমি রাগ করে আছো আমার উপর। সেটাই স্বাভাবিক.. তোমার রাগ করে থাকাটা স্বাভাবিক। আমাকে কী একবার ক্ষমা করা যায় না…”। কাজল চুপ করে মাথা নিচু করে আছে। আসলে সেদিন অপুর মাথা ফাটিয়ে সেও যথেষ্ঠ অনুতপ্ত। অপু আরেকটু কাজলের কাছ ঘেঁষে বললো,”আচ্ছা কাজল..আআআমি যদি…আমি যদি তোমার বন্ধু হতে চাই তবে…তবে তুমি কী আমার বন্ধু হবে। আমার সাথে কোলকাতাতে ঘোরাতে নিয়ে যাই…তবে তুমি কী যাবে আমার সাথে কোলকাতা ঘুরতে। বন্ধুর সাথে কলকাতায় বেড়াতে যাবে…”। মিইয়ে যাওয়া কাজলের দৃষ্টি যেন হঠাৎই উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। বললো,”কলকাতা… তুমি আমায় কলকাতা নিয়ে যাবে…সেই যেখানে ট্রেন চলে…ট্রাম চলে সেই কলকাতা নিয়ে যাবে…সত্যি নিয়ে যাবে বলো”। কাজলের খুশিতে উপচে পরা মুখখানি দেখে অপু বললো,”সত্যি… সত্যি….সত্যি, এই তিন সত্যি বললাম”। ধীরে ধীরে দুই অসমবয়সীর মধ্যে গড়ে উঠতে লাগলো এক নিবিড় শর্তহীন বন্ধুত্ব।

(‘অপুর সংসার’ নিজের ভাষায় সাজালাম। ভুল-ত্রুটি মার্জনীয়) Image: Google

রঙ্গমঞ্চের ফেলুদা

অতীশ রায়

SPEAKING ALONE - Telegraph India

আজ যখন বাঙালী তথা সমগ্র পৃথিবীতেই মধ্য মেধার জয় জয়াকার, তখন আমার মতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় – একজন বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির প্রতিনিধি, মেধা, শ্রম, সাধনা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সেই অদ্ভুত মিশেল যা দিন দিন বিরল হয়ে যাচ্ছে |

যেকোনো প্রতিভাবান মানুষের মৃত্যুই জগতের ক্ষতি, সে যেই বয়সেই হোকনা কেন | কিন্তু স্রষ্টার মৃত্যু হলেও, সৃষ্টির মাঝে তিনি অমরত্ব লাভ করেন, কারণ সৃষ্টির মৃত্যু নেই, সে মৃত্যুহীন প্রাণ | তবে আসন্ন কঠিন সময়, এরম মানুষদের সমাজের অনেক বেশি বেশি করে দরকার| তাই অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এর থেকেই এইসময় সমাজের অভিভাবক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বেশি বেশি দরকার ছিল | তার অভিনয়, কবিতা, লেখার আশ্রয় দরকার ছিল | এই লেখা তৈরির সময় খবর পাচ্ছি মহারাষ্ট্রে নোয়াম চমস্কি নিষিদ্ধ হচ্ছেন | বিভিন্ন কৃষ্টি নিয়ামক সংস্থার আধিকারিক পদে দলদাসদের অধিষ্ঠান হচ্ছে, যদিও নতুন কিছু নয় | চারিদিকে মাধ্যমেধার ডঙ্কানিনাদ | এইসময় এই মানুষদের বারো প্রয়োজন | শিল্প, নাটক, কবিতা ও চলচ্চিত্র বিরাট শক্তিশালী গণমাধ্যম, আর তার শ্রেষ্ঠ কুশীলবদের অন্যতম একজন মানুষ – তার অভাববোধ তো হবেই | 

চলচ্চিত্র অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কে নিয়ে তো সারা দেশের গণমাধ্যম, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রচুর তথ্য, প্রচুর সংবাদ, প্রচুর কাহিনী, তাই এই লেখার অনুরোধে ভাবলাম একটু অন্য আঙ্গিকে তাকে ভেবে দেখি খানিক | সেই ভাবনাতেই একটা অক্ষম প্রচেষ্টা – কম জানা দিকটা একটু খুঁজে দেখার |

১৪ টির ওপর কাব্যগ্রন্থের লেখক, অসংখ্য নাটকের নাট্যকার, আবৃত্তিকার, লেখক ও রবীন্দ্রপ্রেমী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে লেখার মতো পান্ডিত্য ও মেধা কোনোটাই আমার নেই, শুধু দু চারকথা বলি – তাঁর একটিমাত্র বই এর কয়েকটি পৃষ্ঠা আমার কাছে কি এক অজানা জগৎ খুলে দিয়েছিলো.

অগ্রপথিকেরা – সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা এক অসামান্য বই, তাঁর অগ্রজ অভিনেতাদের নিয়ে স্মৃতি, তথ্য, গল্প আর বিশ্লেষণের | আর সেই বইয়ের কয়েকটা পৃষ্ঠা আমার কাছে খুলে দিয়েছিলো আমার এক অজানা ইতিহাসের কথা | এই বঙ্গদেশের থিয়েটার ও মঞ্চ অভিনয়ের অসামান্য সমৃদ্ধ এক যুগ, আর তার কারিগরদের পরিচয় | সেই সূত্রে জেনে ফেললাম – সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথে নাট্যচার্য্য শিশির ভাদুড়ির পরিচয় ও পারস্পরিক সম্পর্ক, হৃদ্যতা, চিন্তা ভাবনার আদানপ্রদান ও সমকালীন বা তার পূর্বের মঞ্চের দিক্পালদের নিয়ে নাট্যচার্যের অভিমত, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিশ্লেষণ এবং সেই সূত্রে সেই যুগ বা তার পূর্ববর্তী মঞ্চের রাথি মহারথীদের যুগে পৌঁছে যাওয়া, তাদের সম্পর্কে জানা |  উৎসাহ বাড়লো আদি কলকাতার রঙ্গমঞ্চ নিয়ে – আর তারসাথে উৎসাহ বাড়লো শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত ও সৌমিত্র বাবুর নাটক নিয়ে | আজ সেই দিকটাই একটু আলোচনা করি | নাটক না বোঝা মানুষের কথা – এক দিকপাল অভিনেতা কে নিয়ে | ধৃষ্টতা নয়, সরল অনুভবের কথা |

গিরিশ ঘোষ কে জানতাম, শ্রী শ্রী  রামকৃষ্ণ পারমহংস দেবের কাহিনী সূত্রে | যার কিছুটা মিথ, কিছুটা সত্যি আর জানতাম তার চরিত্রের রসালো দিকের অতিরঞ্জিত চুটকি ঘটনা | আমাদের মতো মাধ্যমেধার মানুষের যা জানার কথা | অগ্রপথিক পরে জানলাম তার অবদান, রঙ্গালয়ে তার অভিনয়ের বিশেষত্ত্ব, অভিনয় সুরেলা হয় – এটাও জানলাম সেই সূত্রেই | আর তার সাথে জানতে পারলাম অহীন্দ্র চৌধুরী, অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি, দানী বাবু ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসামান্য নাট্য প্রতিভা আর বঙ্গ দেশের রঙ্গ মঞ্চের স্বর্ণযুগে তাদের অসামান্য অবদানের গল্প, অজানা কথা | আর সেই তথ্যের ভান্ডার যিনি উপুড় করে দিলেন তিনি – সৌমিত্র | আরেক অসামান্য প্রতিভাবান মানুষ, যিনি প্রকৃত অর্থেই এনাদের অগ্রপথিক বলেছেন – নিজ যোগ্যতাতেই |

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিবারের আদিবাড়ি ছিল বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় শিলাইদহের কাছে কয়া নামে একটি গ্রামে। তার পিতামহের সময় থেকে তারা কৃষ্ণনগরে বসবাস শুরু করেন। কৃষ্ণনগরেই ছিল তার স্কুলের প্রাথমিক লেখাপড়া। পরে কাজের সুবাদে তার বাবা কলকাতায় চলে এলে পরবর্তীতে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা নেন কলকাতাতেই।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যে পরিবারে জন্মেছিলেন, সেই পরিবার ঘিরে ছিল অভিনয়ের বাতাবরণ। অভিনয় ছিল তাঁদের রক্তে। তাঁর বাবা আর ঠাকুরদা— দু’জনেরই ছিল মঞ্চে অভিনয় করার দুর্নিবার আগ্রহ। সৌমিত্রদেরও নাটক করতে উৎসাহিত করা হত। সৌমিত্র লিখেছেন, ‘আমরা ছোট ছিলাম, তাই পরিবারের ঘনিষ্ঠ লোকজনরাই আমাদের শ্রোতা ছিলেন। একটা বেশ বড় মাপের নিচু খাটকে আমরা মঞ্চ হিসাবে ব্যবহার করতাম, আর বিছানার চাদর দিয়ে পর্দা তৈরি করতাম’। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারেই এটা একটা পরিচিত দৃশ্য ছিল সেই সময়ে। রবীন্দ্রনাথের ‘মুকুট’-এর মতো শিশুদের অভিনয়যোগ্য নাটকও তখন পাওয়া যেত।

এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন কৃষ্ণনগরে বেশ উন্নতমানের নাট্যচর্চ্চা হতো তার ছেলেবেলায়। তার বাবা সেখানে শৌখীন নাট্য দলে নাটক করতেন, বাড়িতেও কবিতা আবৃত্তি এবং নাটকের একটা আবহ ছিল।

“শৈশবকালে আমরাও বাড়িতে তক্তাপোষ দিয়ে মঞ্চ তৈরি করে, বিছানার চাদর দিয়ে পর্দা খাটিয়ে ভাইবোন ও বন্ধুবান্ধবরা মিলে ছোট ছোট নাটিকার অভিনয় করতাম। বাড়ির বড়রাও প্রচুর উৎসাহ দিতেন। ক্লাস ফোর ফাইভে পড়ার সময় থেকেই আমার নাটকের নেশা প্রচুর বেড়ে গেল,” বলেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

স্কুলের মঞ্চে প্রথম অভিনয় করেছিলেন ইংরেজি একটি নাটক- ‘স্লিপিং প্রিন্সেস’। যার জন্য পদক ও মেডেলও পেয়েছিলেন তিনি।

কলেজে বাংলা অনার্স নিয়ে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় নাট্যব্যক্তিত্ব শিশির কুমার ভাদুড়ীর সাথে যোগাযোগ হয়েছিল তার। তখন থেকেই অভিনয়কে জীবনের মূল লক্ষ্য করে নেবার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তার ন্যাটাভিনয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।

সিটি কলেজে পড়ার সময় সান্নিধ্যে আসেন সাহিত্যিক এবং অধ্যাপক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের। টেনিদার স্রষ্টা সৌমিত্রবাবুকে পরামর্শ দেন নাটকে অভিনয় করার। পরে সাক্ষাৎকারে সৌমিত্রবাবু বলেছিলেন, তাঁর অভিনয় জীবনের পিছনে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের বড় ভূমিকার কথা।

মঞ্চে তাঁর এক বিশাল অবদান। মঞ্চে একের পর এক নাট্য প্রযোজনায় পরিচালক হিসাবে কাজ করেছেন। মঞ্চ থেকই অভিনয় জীবনের হাতেখড়ি। গুরু শিশির কুমার ভাদুড়ি। সৌমিত্র বলতেন, ‘শিশির কুমার ভাদুড়ি আমার গুরু ছিলেন বটে, কিন্তু এক অসম বয়সী সখ্যতা ছিল তাঁর সঙ্গে। নানা বিষয়ে আলোচনা হত শিশির কুমারের সঙ্গে । শিশির কুমারের সঙ্গে মঞ্চে মাত্র একটি নাটকেই অভিনয়, তাও মাত্র একটি শো-তে। ‘প্রফুল্ল’ নাটকে সুরেশের ভূমিকায়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নাট্য জীবন বাংলা মঞ্চ অভিনয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ‘দ্য মঙ্কিস প’ আবলম্বনে ‘মুখোশ’ থেকে, ‘বিদেহী’, ‘নামজীবন’, ‘নীলকণ্ঠ’ দেখার জন্য বারবার পূর্ণ হয়েছে প্রেক্ষাগৃহ। ‘স্বপ্নসন্ধানী’ দলে অনুজপ্রতিম কৌশিক সেনের সঙ্গে ‘টিকটিকি’ বাংলা নাটকে এক ফেনোমেনন।

বিখ্যাত নাট্যকার বিভাস চক্রবর্তীর আনন্দবাজারের হয়ে লেখা কলমে জানিয়েছেন,’ মঞ্চের সৌমিত্র আমাকে বরাবরই বিস্মিত করেছেন। যে সময় আমরা থিয়েটার করতে আসি, তখন সাধারণ রঙ্গালয় বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে বর্তমান। সেই সময়ে একটা ধারণা চালু ছিল। সেটা এই যে, সাধারণ রঙ্গালয়ের নাটক যেহেতু আম-দর্শকের জন্য, সেহেতু তার অভিনয় থেকে মঞ্চসজ্জা— সব কিছুতেই একটা চড়া ব্যাপার থাকবে। সৌমিত্রদা সেই ব্যাপারটা জানতেন’। বহু বিখ্যাত পাশ্চাত্য নাটক বাংলার প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছেন সৌমিত্র।  ‘দ্য মঙ্কিস প’ অবলম্বনে ‘মুখোশ’ সৌমিত্র এক কালজয়ী কাজ। শৈল্পিক সত্ত্বার সঙ্গে আম-জনতাকে তৃপ্ত করার এক জাদু দণ্ড ছিল নাট্যকার সৌমিত্র হাতে। অভিনয়ের স্বাভাবিকত্ব আর মঞ্চ কম্পোজিশনের আধুনিকতা আজীবন বিদ্যমান থেকেছে সৌমিত্রর নাটকে। তাই তো ‘নামজীবন’,‘বিদেহী’, ‘নীলকণ্ঠ’ দেখার জন্য প্রেক্ষাগৃহে উপচে পড়ত ভিড়। পরবর্তী সময়ে কৌশিক সেনের সঙ্গে জোট বেঁধে ‘স্বপ্নসন্ধানী’ দলের সঙ্গে ‘টিকটিকি’ নাটকে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র। যা বাংলা রঙ্গমঞ্চের জন্য একটা না-ভোলা কর্মযজ্ঞ। 

মঞ্চ শিল্পের চরম আকালেও তুড়ি মেরে সুপারহিট হয় ‘ফেরা’। ৮৫ বছর বয়সেও মঞ্চে অভিনয় নিয়ে তাঁর উত্সাহে কোনও খামতি ছিল না।  বিভাস চক্রবর্তীর কথায়, ‘অভিনয়ের চাতুরি তথা মুখোশ ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে চরিত্রের প্রচণ্ড অভিজ্ঞতার মুখকে প্রকট করতে নাটকের যে নির্মম মিতকথন নাট্যকার সৌমিত্র তাঁর নাটকের ভাষায় নিয়ে এসেছেন, তা পুরনো বাংলা নাটকের উচ্চারণ-কথনবহুল নাটকীয়তা থেকে এত দূরই সরে এসেছে যে তার মৌলিকতা নাটকের সূত্র বা উৎসের ‘অমৌলিকতা’কে অবান্তর করে দেয়’। ‘আত্মকথা’, ‘ছাড়িগঙ্গা’, ‘তৃতীয় অঙ্ক-এর মতো নাটকে এই বিষয়টি সুচারুভাবে উপস্থিত করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। মঞ্চে শেক্সপিয়রের কাজকে উপস্থাপন করতে বরাবর উত্সসাহী ছিলেন সৌমিত্র।নাট্য দুনিয়ার মানুষদের কাছে তিনি কোনওদিন ‘স্টার’ সৌমিত্র ছিলেন না। তিনি ছিলেন পাশের বাড়ির বড়দাদার মতো। তাদের আপনজন।

অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বাইরে তিনি একজন কবি, নাট্যকার। বাংলার রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে বারংবার গর্জে উঠেছে তাঁর কলম। অথচ আজ তাঁর শেষযাত্রায় রাজনীতির কোনও রঙ নেই। সব ভুলে এদিন তাঁর শেষযাত্রায় হাঁটলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিমান বসুরা। আর মাইকে বাজল- ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’। এটাই তো শিল্পী সৌমিত্র সাফল্য, তাঁর প্রাপ্তি, আজ গোটা তিলোত্তমা শুধুই সৌমিত্রর। সৌমিত্র নিজেই বলেছেন, ‘মানুষ হিসাবে আমি র‍্যাডিক্যাল। এই অনুসন্ধানী মন বারবার প্রশ্ন করে, এতদিন যাঁদের সবকিছু ভালো দেখেছি, তাঁদের সবটাই কি ভালো? যাঁদের খারাপ ভাবতাম, তাঁরা সত্যিই কি এতটা খারাপ? তার উপর দাঁড়িয়েই বারবার বিশ্বাস ভেঙেছে, আবার তার থেকেই জন্ম নিয়েছে এক নতুন বিশ্বাস’।

উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’-এর ভূমিকায় অভিনয় করতে না পারার জন্য কষ্ট পান সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। অথচ ওই চরিত্রটিই তাঁকে আকর্ষণ করে সবথেকে বেশি। ৮২ বছরের সৌমিত্র এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছিলেন, যদি তাঁর বয়স আরও ৫০ বছর কম হত, তা হলে হ্যামলেটের ভূমিকায় অভিনয়ের চেষ্টা করতেন তিনি। শেক্সপিয়রের ‘কিং লিয়র’ তিনি করেছেন কিন্তু তাতে আশ মেটেনি। ইচ্ছে করে, শেক্সপিয়রের আরও নাটকে অভিনয় করার। তবে হ্যামলেটের পর কিং লিয়র তাঁর দ্বিতীয় পছন্দের চরিত্র। ২০১১-য় ‘কিং লিয়র’ অবলম্বনে ‘রাজা লিয়র’ মঞ্চস্থ করেন তিনি। তাঁর কথায়, ব্রিটিশ নাট্যকার ও তাঁর যাবতীয় সৃষ্টি তাঁর ওপর অসামান্য প্রভাব রেখেছে। তাদের আবেদন আন্তর্জাতিক। বাড়ির ছাদে বসে হাজারবার ‘টু বি অর নট টু বি’ আবৃত্তি করলেও আশ মিটবে না তাঁর। শেক্সপিয়রের নাটকের ভিত অক্ষুণ্ণ রেখে সেগুলির যদি আধুনিকীকরণ হয়, তবে তাতে সৌমিত্রের আপত্তি নেই। মহাভারত আধুনিক কিনা যেমন প্রশ্নাতীত, তেমনই সত্যিকারের ক্লাসিক বরাবর বেঁচে থাকে সময়ের বেড়া টপকে। রবীন্দ্রনাথও শেক্সপিয়রের সাহিত্যে বিরাট প্রভাবিত হন বলে মন্তব্য করেছেন সৌমিত্র। নিয়মিত শেক্সপিয়রের সৃষ্টি ট্রাজেডি ও কমেডি পড়তেন তিনি।

বাংলা ছবিতে টানা ২০ বছর কাজ করার পর ১৯৭৮ সালে নিজের প্রযোজিত ‘নাম জীবন’-এর মধ্য দিয়ে থিয়েটারে ফিরেছিলেন সৌমিত্র। ২০১০ সাল থেকে উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘কিং লিয়ার’ অবলম্বনে জনপ্রিয় নাটক ‘রাজা লিয়ার’-এ মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। নাটকটির জন্য সমালোচক ও দর্শকদের ভূয়সী প্রশংসা পান গুণী এই শিল্পী। শুধু অভিনয়ই নয়, তিনি বেশ কয়েকটি নাটক রচনা ও পরিচালনা করেছেন এবং কয়েকটি অনুবাদ করেছেন।

রবীন্দ্রোত্তর বাংলা নাট্যসাহিত্যে আধুনিকতার যে চার পুরোধা নাট্যকার, সেই বিজন ভট্টাচার্য, বাদল সরকার, মোহিত চট্টোপাধ্যায় ও মনোজ মিত্র, তাঁদের থেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যেখানে অনেকটাই ভিন্ন, সে হল তাঁর ‘মৌলিকতা’র অভাব! তিনি নিজেও সে বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। তাঁর নাট্যসমগ্র-এর তিন খণ্ডেরই ‘কথামুখ’-এ তিনি তাঁর ‘রচিত নাটকগুলির একটা বড় অংশই’ যে ‘যাকে বলে অ্যাডাপটেশন— অর্থাৎ যা অন্যান্য নাটক বা কথাসাহিত্যকে অবলম্বন করেই নির্মিত’, এ বিষয়ে তাঁর ‘বক্তব্য’— ‘কৈফিয়ত নয়’— ‘জানাবার একটু তাগিদ অনুভব’ করেছেন। অথচ নব্বইয়ের দশক থেকেই লক্ষ করছি, বিদেশেও নতুন তথাকথিত ‘মৌলিক’ নাটকের একই আকাল। টম স্টপার্ড, ডেভিড হেয়ার-এর মতো অগ্রগণ্য ইংরেজ নাট্যকাররাও চেখভ, লোরকা, ইবসেন, স্ট্রিন্ডবার্গ-এর মতো নাট্যকারদের নাটকের নতুন অনুবাদ বা রূপান্তরণ করছেন। ইয়োরোপীয় থিয়েটারে ফিরে আসছেন সেরভান্তেস, বালজ়াক, মান, এউরিপেদেস। যুগ পরিবর্তন না কি যুগ সঙ্কটের ক্ষণেই কি ক্ল্যাসিক্‌স বা চিরায়ত সাহিত্যে ইতিহাস-সন্ধানের এই তাড়না?

সিনেমার বাইরে থিয়েটারের এক স্বাধীন ভূমিতে থিয়েটারকে খুঁজতেই বিদেশি নাটক-নাট্যের সঙ্গে তাঁর এই আলাপচারিতা। অভিনেতা বা নাট্যনির্দেশক যখন নাট্যকার হন, তখন নিজের গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের তাৎক্ষণিক চাহিদা— যার মধ্যে প্রায় অবধারিত ভাবেই চটজলদি জমিয়ে দেওয়ার একটা দায়-পূরণের যে টানাপড়েন থাকে, তা কিন্তু সৌমিত্রবাবুকে কখনওই তার ফাঁদে ফেলেনি। বা সে ভাবে তিনি তাঁর এই নাটকমালাকে নিজেকে আরও বড় করে প্রমাণ বা প্রতিষ্ঠা করার নাট্যপীঠ বিবেচনা করেননি। ‘টিকটিকি’, ‘নামজীবন’, ‘রাজকুমার’, ‘নীলকণ্ঠ’ এই বিচারেই স্মরণীয়। কিন্তু এই দাবিপূরণের তাৎক্ষণিকতার বাইরেই সৌমিত্রবাবু যে ভাবে থিয়েটারে আধুনিকতার ক্ল্যাসিক্‌সগুলির মধ্যে নতুন নাট্যভাষার ধাতকে ধরেছেন ব্রেখ্‌ট, ড্যুরেনমাট, কাম্যু বা পিন্টার-এর নাট্যরূপান্তরে, তাতে ওই নাট্যভাষাকে ধরতে পারার প্রবল নিষ্ঠার গুণেই মানবসম্পর্কের অন্তঃসলিলা দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ, ঘাতপ্রতিঘাতের সূক্ষ্ম, গোপন অভিঘাত থিয়েটারের বিষয় হয়ে ওঠে।

পড়তে পড়তে বোঝা যায়, সাবেকি প্লটের স্বতঃসিদ্ধতাকে ভাঙার যে সিদ্ধতা তিনি এই রকম এক একটি নাটকে (যা অনেক সময় অপ্রযোজিত থেকে গিয়েছে) আয়ত্ত করেছেন, তাতেই সেই শক্তি তিনি পেয়ে গিয়েছেন যাতে অভিনেতার মুখোশ বিদীর্ণ করে তিনি যেন অন্তর্দীর্ণ মানুষের মুখকে থিয়েটারে উপস্থিত করতে পারেন ‘আত্মকথা’, ‘ছাড়িগঙ্গা’, ‘তৃতীয় অঙ্ক, অতএব’-এর মতো নাটকে। অভিনয়ের চাতুরি তথা মুখোশ ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে চরিত্রের প্রচণ্ড অভিজ্ঞতার মুখকে প্রকট করতে নাটকের যে নির্মম মিতকথন নাট্যকার সৌমিত্র তাঁর নাটকের ভাষায় নিয়ে এসেছেন, তা পুরনো বাংলা নাটকের উচ্চারণ-কথনবহুল নাটকীয়তা থেকে এত দূরই সরে এসেছে যে তার মৌলিকতা নাটকের সূত্র বা উৎসের ‘অমৌলিকতা’কে অবান্তর করে দেয়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মৌলিকতা নাটকে ওই আত্মবীক্ষণেই।

কবিতা, পত্রিকা সম্পাদনা, মানুষের বৃহত্তর সংস্কৃতির মধ্যে নিরভিমানে বিচরণ করা ইত্যাদি ছাড়া যেটা সৌমিত্রকে অন্য সফল তারকা থেকে আলাদা করে আনে তা হল তার নাটকের প্রতি অভাবিত ও অবৈষয়িক ভালোবাসা। আমাদের জীবৎকালে দেখেছি, অনেক সফল চিত্রাভিনেতা তখনও জীবিত স্টার, রঙমহল বা বিশ্বরূপায় অভিনয় করতে এসেছেন পেশার কারণে, কেউ কেউ যাত্রাতেও যোগ দিয়েছেন। হয়তো শুধু পেশার কারণে নয়, অন্য অভিজ্ঞতা দিয়ে তাদের অভিনয়ের শক্তি বৃদ্ধির জন্যও। কিন্তু সৌমিত্রের থিয়েটারের প্রতি ভালোবাসা সেই রকম ‘সিজনাল’ বা পেশাভিত্তিক ছিল না। নাটকের জন্য ভালোবাসা ছিল তার অস্থিতে-মজ্জায়। যাদের রক্তে নাটকের নেশা থাকে তারা সামনে জীবন্ত মানুষের উপস্থিতি আর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে চায়। এবং আমার মতে, নাটকেই সৌমিত্র তার অভিনয়ের বিপুল সামর্থ্য ও সম্ভাবনা অবলীলাক্রমে প্রকাশ করতে পারতেন। আমি তার প্রথম অভিনয় দেখি কৌশিক সেনের ‘টিকটিকি’তে, নাটকটি অ্যান্টনি শ্যাফারের ‘স্লুথ্’-এর দেশীকরণ। সেই অভিনয় দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। সৌমিত্র যে কতভাবে, কত মেজাজে নিজেকে ব্যক্ত করলেন তা দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। আর এই সেদিন, ২০১০-এ ‘রাজা লিয়ারে’ তার অভিনয় বলে দেয় তার অভিনয় কী উচ্চতায় পৌঁছোতে পারত।

নাটকের ক্ষেত্রে তিনি আরও যে কাজটা করার চেষ্টা করেছিলেন, তা হল গ্রুপ থিয়েটারের একটা পেশাদার ভিত্তি তৈরি করা, যাতে সাফল্য পাওয়া সহজ ছিল না, পানওনি। কিন্তু তার ভালোবাসাটা অস্পষ্ট থাকে না। তিনি জানতেন এতে তাকে স্বোপার্জিত অর্থ ঢালতে হবে, যা কখনও ফেরত আসবে না এবং সবাই জানেন যে ফেরত আসেনি। কিন্তু তার চেষ্টায় ক্ষান্তি ছিল না। এ এক ধরনের মিশনারির কাজ, শুধু নিজের শখ মেটানো নয়। আমরা তার যথার্থ মূল্য দিতে পারিনি।

এসব নিয়ে কথাবার্তা বলার অধিকার আছে, এমন কোনো ভুল আত্মবিশ্বাস আমার নেই বলেই তো ধারণা ছিল। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কিছু লেখা পড়ে এমন আত্মবিশ্বাস ঘটল। আমাদের অভিনয় জগতে, আমাদের মানে ভারতের অভিনয় জগতে, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একেবারে আলাদা। তিনি তো সারাজীবন অভিনয়ই করেছেন – নাটকে ও সিনেমায়। কিন্তু সৌমিত্র এই একটা বিষয়ে আর সবার থেকে আলাদা যে, তিনি নাটক নিয়ে, সিনেমা নিয়ে, অভিনয় নিয়ে সারাজীবনই লিখে গেছেন, এই কথা প্রমাণ করতে অভিনয় তাঁর স্বনির্বাচিত বৃত্তি, তাই সেই বৃত্তির ভিতরকার সমস্যা ও উত্তরণ চেনা ও বলার দায় তাঁরই। তিনি ছাড়া আর-কেউই তো এমন লেখা কোনো কালেই লেখেন নি। পুরনো ও সমকালীন অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে তাঁর ছোট-বড় নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আমাদের নতুন করে সিনেমা-থিয়েটার দেখতে উৎসাহিত করে ও নাটক-ফিল্ম নিয়ে ভাবতেও। এমন কেন আরো সবাই লেখেন না? যদি লিখতেন, তা হলে বাংলা নাট্যাভিনয় ও সিনেমার ইতিহাস ভাবার ও লেখার কাজটা অনেকটাই সাধ্যের মধ্যে আসত। তাঁর এই লেখাগুলিতে আমাদের মতো আনাড়িদের জন্যও বেশ দরজা খোলা থাকে। তাঁর কথাগুলি থেকে নতুন কথা জাগে। আমরাও তো সিনেমা-থিয়েটার দেখেছি। তা হলে আমরাও তো এ নিয়ে দু-এক কথা বলতে পারি।

২০১০ এর রাজা লিয়র দেখার স্মৃতি আজ অমলিন, সন্তান স্নেহে অন্ধ পিতা, আবার সেই বলছেন – ভগবান আপনাদের কি বার্ধক্য আসেনা? আপনারা বৃদ্ধা লোকদের কষ্ট দেখতে পান না? সত্যি এই মাঝ বয়েসে বৃদ্ধ পিতা রাজা লিয়র এর ভূমিকাতে সেই অনবদ্য বাচনভঙ্গিতে, জলদগম্ভীর কন্ঠের দূরান্ত মডুলেশন – নির্ভুল উচ্চারণে ছুড়ে দেওয়া কথা – আজ ভাবায় | সত্যি জীবনের চরম সত্য হয়তো এটাও | তবে জীবন বোধের পাঠের থেকে বেশি দাগ রেখে গ্যাছে ওনার দূরান্ত সেই অভিনয় | কানে বাজে – ভুল করোনা পিতাগণ – কেউ তোমাকে চিনবেনা | কিন্তু ভুল আপনি করেন নি – বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের চিরতরুণ পিতামহ – নাটক আপনাকে মনে রাখবে | যদিও শেষ করতে মন চাইছে তার কবিতা দিয়ে – ‘‘হয়তো ওই শারদ আকাশের অন্ধকার সরণিতে কালপুরুষ আর তারার তরবারি নিয়ে প্রহরায় বিশ্বস্ত হয়ে আছে এসবই ভাবতে ভাবতে আমি সপ্তর্ষির চিরজিজ্ঞাসার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সীমার অতীতকে বোঝার চেষ্টা করতে থাকব’’

যা দিয়ে গেলেন তা আমাদের পরম পাওয়া – সিনেমার সৌমিত্র, পাঠের সৌমিত্র, কবিতার সৌমিত্র, মঞ্চের সৌমিত্র, রবীন্দ্র প্রেমের সৌমিত্র, বামপন্থার সৌমিত্র, কর্মযোগের সৌমিত্র – ধারাতে তা ভিন্ন ভিন্ন – অন্তিমেতে একাঙ্গী – বাঙালির ভালোবাসার সৌমিত্র | ভালো থাকুন – নিজ সৃষ্টিতে অমর হয়ে |

তথ্যসূত্র  – এইসময়, আনন্দবাজার পত্রিকা, উইকিপেডিয়া ও বিভিন্ন ইন্টারনেট এ উপলব্ধ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কে নিয়ে প্রকাশিত রচনা এবং প্রতিবেদন |  Image: Telegraph India 

Brawny

Wribhu Chattopadhyay

The Big Interview! Soumitra Chatterjee: Education system now teaching history in distorted form, what can be more horrifying? | Bengali Movie News - Times of India

A silent procession is behind a
pseudo moving hearse where lies
a shadow of a banyan tree.
He talked like the enchanted
flower petals. He worked like
the trance of the utopian earth.
Till the shoulder does not know
how does the pain look like?
What is pandemic portion?
Only inside the four walls that gasping
was waiting with prayer for a miracle.
But only a full stop knows a stone
is now wheezing.
Is everything remaining
the same as you have left?
Our eyes still search for a real candle light.

Image: TOI 

শ্রদ্ধার্ঘ্য ‌

মমতা মুন্সী

Soumitra Chatterjee's Condition Remains Same, Doctors Struggling with Secondary Infections

মাটির পৃথিবী থেকে খুব কাছের আকাশে।
যে নক্ষত্রকে জ্বলতে দেখেছি;সে ঝরে গেল।
রেখে গেল অফুরান স্মৃতি গুলো-
অগ্রদানী ব্রাহ্মণ, তুমি শুধু দিয়ে গেলে।
বিনিময়ের স্মৃতিটা বড় হৃদয় বিদারক।
কিন্তু চারুলতার সঙ্গে বন্ধুত্ব টা বড় মধুরতম।
যৌবনের উচ্ছাসটা ও কম ছিল না।
সেই তিন ভূবনের পার ছেড়ে,
আজ তুমি কোন ভূবনে!
অপু, তোমার সঙসার বেদনা ভূলে যাও।
সেই যে তোমার খেলার সাথী, তোমার দিদি দুর্গা।
যার পেছনে ছায়া হয়ে ঘুরতে,
এত বছর পার করে ও তার কথা ভোলনি!
সে তোমায় ডেকে নিল,আর তুমি সাড়া দিলে; চলে গেলে।
মাস্টার মশায়,হীরক রাজার দেশের,
বিদঘুটে নিয়মগুলো পাল্টাতে হবে যে।
নেতৃত্বের বড় অভাব।
এই বাংলার আকাশ-বাতাস বড়ো বিষাক্ত-
হয়ে উঠেছে যে ফেলুদা;
নি:শ্বাস নিতে বড়ো কষ্ট হয়।
কত জটিল সব সমস্যা, সমাধান করবে কে??

Image: News18
the Quint

উদয়ন

প্রদীপ গঙ্গোপাধ্যায়

Soumitra Chatterjee's health shows marginal improvement, but still critical - entertainment

ওইখানেতে আছেন তিনি জলের ঢেউ – এ ভেতর ভেতর
সাঁতরে ওপার যাচ্ছে ক্ষিতিশ ঠেলতে ঠেলতে বুকের পাথর
এখন তুমি মোৎর্জাটে আর বিটোফেনের সুরের নেশায়
নিকষ কালো গ্রন্থিগুলো খুলে দিচ্ছ আলোর শাখায়
খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার তিন ভুবনের ওপার থেকে
বেঁচে থাকাই সার্থকতা তিনপাত্তির বেলাশেষে
আতঙ্কিত একাকিত্বে গণশত্রুর আপন দেশে
তোমার মগজাস্ত্রে মানুষ রাজার প্রতি বদলা নেবে…

Image: Google

 স্মরণে বরণে তুমি
সুদীপা

I am still eager to portray characters from Shakespeare's stories: Soumitra Chatterjee | Bengali Movie News - Times of India

 
‘ঘরে-বাইরে’ থাকবে জীবন জুড়ে,
অতীতের সেই ‘বসন্ত বিলাপ’ এর সুরে,
‘হীরক রাজার দেশে’ র তুমিই মুশকিল আসান,
‘সোনার কেল্লা’য় ঢুকেছিলে হাতে নিয়ে প্রাণ।
‘চারুলতা’য় করেছো বিদ্রোহ,
‘সাত পাঁকে বাঁধা’পড়েও দ্বন্ধ অহরহ।
বাঁধতে চেয়েছিলে ‘অপুর সংসার’,
কখনো ‘ফেলুদা’ তুমি করেছো অন্যায়ের সংহার।
নক্ষত্রের পতন হয় মাঝে মাঝে,
বুকের ভিতর ঠিক তখনি ব্যাথা বাজে,
চলে গেলে, দূরে-বহুদূরে,
বলবে না কেউ আর, “ফাইট কোনি ফাইট” চেনা সেই সুরে।।
Image: TOI

এ প্রজন্মের মুখে সৌমিত্র

ঋতায়ান চট্টোপাধ্যায়

Soumitra Chatterjee Is On Several Life Support Systems, Need A Miracle,"  Says Doctor

আমাদের সবার প্রিয় পুলু বাবু শুধু আমাদের আগের প্রজন্ম নয় বর্তমান প্রজন্মের কাছেও একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি।
আমি আগামী বছর উচ্চমাধ্যমিক দেব। শুধু আমার মতন বর্তমান প্রজন্মই নয় তার আগের, আগের প্রজন্ম তাঁকে একজন রোমান্টিক হিরো হিসেবে দেখেছেন। তখনকার তরুণ প্রজন্ম তাকে অনুসরণ করেছে। তখনকার চলচ্চিত্রগুলোকে দেখে আমি এখনো বুঝতে পারি যে তিনি শুধু তখনকার যুগের নয় এযুগের তরুণদের কাছেও সমান আকর্ষণীয়।

শুধু অভিনয়ই না সাহিত্য, সম্পাদনা, নাটক লেখা, গায়ক, লেখক, নাট্য নির্দেশক সবকিছুতেই তার দখল ছিল।

তার অভিনীত অমর চরিত্র অপু সবার প্রিয়। সেই ছোটবেলায় দেখেছিলাম ‘অপুর সংসার’।
এই উপর থেকে আমরা বর্তমান প্রজন্ম অনেক কিছু শিখতে পারি। জীবনে লড়াই করা, প্রকৃতিকে ভালোবাসা, অজানার খোঁজে ডুবে থাকা।

আবার ‘ফেলুদা’ কে দেখে অবাক হয়ে যাই। কোথায় অপু আর কোথায় ফেলুদা দুটো চরিত্রের মাঝে আকাশ পাতাল পার্থক্য, কি দক্ষ অভিনেতা!। আমার প্রিয় চরিত্র ফেলুদা। শুধু আমার বা আমাদের না প্রতিটা প্রজন্মেরই প্রিয় চরিত্র হলো ফেলুদা। আমার মনে হয়, সত্যজিৎ রায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কে দেখেই সৃষ্টি করেছেন এই ফেলুদা চরিত্র। ঠিক একই রকম লম্বা, সুঠাম, সুগঠিত ব্যায়াম করা শরীর, বুদ্ধিদীপ্ত, ব্যক্তিত্ব।
এমনকি তার নিজের আঁকা ফেলুদা ও যেন সৌমিত্রকে ভেবেই আঁকা।
এরপরেও আমি অনেক অভিনেতাকে ফেলুদার চরিত্রে অভিনয় করতে দেখেছি।
কিন্তু আমার বারবার মনে হয়েছে যে ফেলুদা চরিত্র সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ওকে ছাড়া বেমানান।

এবার চলে আসি আমাদের ছোট, বড়, বয়স্ক সকলের প্রিয় সিনেমা “হীরক রাজার দেশে”র ‘উদয়ন পন্ডিত’ চরিত্রটিতে।
একজন আদর্শ শিক্ষক যিনি কখনো হার মানতে শেখান না, অন্যায়কে মেনে নিতে সেখানে না, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখান।এবং বিদ্রোহ ও বিপ্লবের সূত্রপাত এবং তার নিয়ন্ত্রণ এই শিক্ষকসমাজই করেন।
যদিও সেখানে শাসক শ্রমিক, কৃষকদের প্রায় নিজের কব্জায় এনে ফেলেছিলেন, কিন্তু শিক্ষকই ছাত্রদের নিয়ে বিপ্লব ঘটালেন।
ছাত্রসমাজই হচ্ছে জাতি বা দেশের ভবিষ্যৎ।
তারা যাতে এই অন্যায়কে মেনে না নিয়ে তার প্রতিবাদ করে এই শিক্ষায় তিনি দিলেন ছাত্রসমাজকে। পুলু বাবু অভিনীত ‘উদয়ন পন্ডিত’ এক অমর চরিত্র।

আবার ‘সত্যজিৎ রায়’ পরিচালিত “গণশত্রু” সিনেমায় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক ডাক্তারের লড়াই, তা সত্যিই দেখার মতো।
দুই প্রজন্ম আগের প্রজন্মের হলেও এই প্রজন্মের কাছেও তিনি অনুকরণীয়। এবং আমি নিজেই যেহেতু অভিনয় এর সাথে যুক্ত, ওনার অভিনীত ফেলুদা চরিত্রটি আমি যদি অভিনয় করতে পারতাম তাহলে আমার জীবনের একটা স্বপ্ন পূরণ হতে পারত। কারণ ওনার অভিনীত চরিত্র আমার মনে দৃঢ় ভাবে দাগ কেটে গেছে।
যতবারই দেখি পুরনো হয় না। এবং এটি যেন আমার কাছে স্বপ্নের একটি চরিত্র।
ফেলুদার বই পড়ে যেমন আনন্দ হয়, সিনেমা দেখলে মনে হয় যেন ফেলুদা চরিত্র জীবন্ত হয়ে আছে ওনার অভিনয় দিয়ে।

বাচিকশিল্পী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: আমার আয়নায়

 দেবাংশু মুন্সী

Soumitra Chatterjee | The tree's gone, the shade remains - The Hindu

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে লেখা মানে আমার কাছে অনেকটা যেন, বামুনের হাতে টেলিস্কোপ ধরিয়ে দেওয়া। বামুন হয়ে চাঁদ ধরার মতন বিষয়আর কি।
যাই হোক আমি আবৃত্তি করি এবং আবৃত্তির মধ্যেই ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, এটা আমার কাছে অত্যন্ত গৌরবের বিষয়।
বেশ মনে পড়ছে বিশিষ্ট আবৃত্তিকার অমিতাভ বাগচী একদিন আমায় ডেকে বললেন “দেবাংশু তুমি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি যাও। তাঁর জন্মদিনের এই গিফটটি তাঁকে দিয়ে এস এবং তাঁকে জানিও যে তুমি আমার ছাত্র। আমি অসুস্থ অসুস্থ বলে তোমার মাধ্যমে এই উপহারটি তাঁকে আমি পাঠিয়েছি।” যাইহোক সকাল আটটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে আমি পৌঁছে গিয়েছিলাম তাঁর গল্ফগ্রীনের বাসভবনে। কলিং বেল টিপতেই আমার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন সে কিংবদন্তি মানুষটি। বিশিষ্ট আবৃত্তিকার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর দিকে তাকিয়েছিলাম।
আজকের আলোচনায় অবশ্যই প্রথমে বলব যে, আবৃত্তিকার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় – মৌলিকত্ব তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে বারবার দেখিয়েছেন। অভিনেতার কাজ তাঁর নিজস্ব চরিত্রকে সরিয়ে রেখে তাঁর নাট্যব্যক্তিত্বকে, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কে অভিব্যক্ত করা। অর্থাৎ আঙ্গিক বাচিক ও সাত্বিক অভিনয়ের মাধ্যমে চরিত্রটির সঙ্গে একাত্ম হওয়া। আমার মনে হয় আবৃত্তিকার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সেই কাজটি নিপুণভাবে করেছেন। পাশাপাশি তাঁর নিজস্ব অভিনয় সত্তা থেকে আলাদা রেখে বিরল ভাবেই নিজেকে প্রকাশিত করেছেন আবৃত্তিকার হিসেবে। তাঁর অভিনয়ের ছাপ আবৃত্তির মধ্যে বিশেষ করে প্রাধান্য পায় না। সেখানে তিনি কার্যতই স্বতন্ত্র। কারন তিনি যখন কোন কবিতা বা ভাষ্য পাঠ করেছেন, তখন কবিতা বা ভাষ্যটি থেকে নিজেকে উপ্ত করে, উচ্চারন শব্দপ্রয়োগ ইত্যাদির মারফৎ নিজের অভিব্যক্তির প্রকাশ করেছেন। এই নিজস্বতার প্রকাশভঙ্গি অবশ্যই লক্ষণীয় বিষয়। শব্দের উপরে নিয়ন্ত্রণ রেখে তাকে কিভাবে সঠিক তাৎপর্য দিয়ে প্রকাশ করা যায় এবং সেটা আবৃত্তি শিল্পের মাধ্যমেই সম্ভব , তা দেখিয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ভাষার প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি এক অনন্য উপহার দিয়েছেন আবৃত্তি শিল্পকে। আমার মনে হয় নিখুঁত বাঙালিয়ানা তাকেই বলে যখন বাংলা শব্দের সাবলীলতা তার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়।
কেন জানিনা আজ ও আমার মনে হয় জীবনানন্দ দাশকে তাঁর কবিতাগুলি কি লিখেছিলেন আবৃত্তিকার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা মাথায় রেখেই? আমার মনে হয় জীবনানন্দের কবিতাগুলি সবচেয়ে বেশি খাপ খাইয়ে যায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠেই। জীবনানন্দের কবিতায় আমরা যে মাদকতা পাই, বাংলা রূপমাধুর্য প্রকাশ পাই তা সঠিক শব্দ প্রক্ষেপনের মাধ্যমে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠেই বড্ড বেশি যেন মানানসই। জীবনানন্দের কবিতায় মাদকতার প্রকাশ,
পরিপূর্ণতা আবৃত্তিকার সৌমিত্রের কন্ঠেই। আমি নিজেও যখন জীবনানন্দের কবিতা পাঠ করতে যাই তখন সেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় শব্দ প্রক্ষেপণে কানে বাজে।
সেই ভাবে যদি উচ্চারণ করতে না পারি তাহলে মনে হয় জীবনানন্দ দাশের কবিতা যেন পূর্ণমাত্রা পেল না। আবার আসিব ফিরে, লাশকাটা ঘরের মত কবিতা নিশ্চয়ই তাঁর একটা আলাদা মৌলিকত্ব আছে।
আমরা যারা আবৃত্তি শিল্পে এখন এসেছি তাদের কাছে প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকবেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আমার মনে হয় আবৃত্তি শিল্প তার পূর্ণতা পেয়েছে এদের হাত ধরে। এদের মাধ্যমে আবৃত্তি শিল্প আলাদা করে নিজের জায়গা করে নিতে পেরেছে বলে আমার মনে হয়।

Image: The Hindu

“The Master & I” ……

Dr. Samiran Saha

For 35 years, Bengal’s most accomplished actor Soumitra Chatterjee was a constant presence in the artistic and personal life of India’s foremost film director Satyajit Ray. Not only did he act in 14 of the maestro’s films, he was also the filmmaker’s most faithful student and one of his closest friends. Soumitra Chatterjee tells the stories of his life with Satyajit Ray, in the book “The Master & I”, which he wrote shortly after Ray’s death.

Soumitra’s retelling of the day when Ray decides to catch him unawares by a sudden announcement is remarkable. It was at the set of “Jalsaghar” that ‘Apu’ came knocking at Soumitra’s door. The ecstasy on bagging his first film offer with Satyajit Ray is recounted with childlike innocence:

“One day I was there to watch a scene from “Jalsaghar” being shot…. As I was about to leave, he said, “Let me introduce you to Chhabi Biswas, you haven’t met him, have you?” He said in his customary baritone, “Chhabida! This is Soumitra Chattopadhyay; he’s playing Apu in my next film “Apur Sansar”. The penny had dropped! The chandelier on the sets of “Jalsaghar” began to sway in front of my eyes; my feet left the ground”.

In that debut, Soumitra Chatterjee showed a range of emotions that could only come from an actor of exceptional maturity and sensibility. Ray knew how to make his expressive face reveal emotions that words couldn’t depict.
Over the years, Soumitra Chatterjee personified the nuanced angst of the modern educated Indian, bound by traditions and accepting them while being sceptical. When tragedy strikes, he is overwhelmed, but he finds the reserves within him to rise again and faces the future with equanimity.

Apu is a hard act to follow, but many of Soumitra Chatterjee’s roles stand out: the grim truck driver Narsingh in Abhijan (The Expedition, 1962); the boundless enthusiasm of Amal in Charulata (The Lonely Wife, 1964), who stirs creativity and much else, unleashing an emotional whirlwind in his gifted sister-in-law, played by another Ray regular, Madhabi Mukherjee; his sobering presence among friends on a picnic in Aranyer Din Ratri (Days and Nights in the Forest, 1969); the anguish of the teacher unable to feed his family during the Bengal famine in Ashani Sanket (Distant Thunder, 1973); the Charminar-smoking detective Feluda in Sonar Kella (The Fortress, 1974) and Joi Baba Felunath (The Elephant God, 1978); the self-righteous hypocrisy of a freedom fighter in Ghare-Baire (The Home and The World, 1984); all the way up to the frustrated rationalist fighting superstition in Ganashatru (Enemy of the People, 1989, based on Henrik Ibsen’s play).

  •  
    7
    Shares
  • 7
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •