• 10
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    10
    Shares
Voice behind silence by Mreettika Chattopadhay

CONTENT | ISSUE 23 | 06th Dec, 2020

KAFE HOUSE

Behind the Veil of Birth – Scott Thomas Outlar

শুকতারা – নীতুল জান্নাত নীতি

আমি ও নিঃসঙ্গ বারান্দা – স্বপ্না ইসলাম ছোঁয়া

কবিতা – কল্যাণ ভট্টাচার্য্য

নদীটা যেভাবে নিজের পথ করে নেয় – ডঃ অভিনন্দন সেনগুপ্ত

দাস বিদ্রোহ – দাস প্রথার ইতিকথা – নাসরিন আক্তার

গল্প – কল্যাণ ভট্টাচার্য্য

লাল পিঁপড়ে – অনসুয়া মুখোপাধ্যায়

ভাবের ঘরে – কাঞ্চন কুমার গাঙ্গুলী

বার্ষিক – বদরুদ্দোজা শেখু

মৃত্যুই শেষ নয় – তনিমা সাহা

Featured Poet

Behind the Veil of Birth

Scott Thomas Outlar

but these bones were born for the moors
destined for crystal and silicon visions

but these relics sit pretty
enshrined
on the mantelpiece of dreams

femurs wrapped in single threads
of black silken hair

and in the wildlands of America
there were generations
garnering wisdom from the earth

and I have seen elephants
gather around their fallen
to weep
to dance
to mourn
to bury the dead

clavicles hidden away
in a heathen’s cloak
and on the trail of tears
scars are bled out in the sand
beneath a war-torn sun
that never dares to sleep

but I have seen your brother
and my father
and all the lovers of ages past
who now reside in realms beyond
the grasp of those still bound to flesh

as are we

but even ghosts have living souls
and each of them smiles wide for you
because it’s your Birthday
so it’s only natural to cry
before entering the party
to blow out the candles
in grand fashion

rib cage holding white doves
freedom tattooed on their wings

and novels extracted
from the marrow

শুকতারা

নীতুল জান্নাত নীতি  (ঢাকা, বাংলাদেশ)

Universe, Sky, Star, Space, Cosmos, Galaxy

একটি শুকতারার উদ্দেশ্যে ছুটতে থাকি রোজ,
অন্ধকারাচ্ছন্ন পথে তখন আমাদের অন্তিম ছায়া,
ছুটতে থাকি তবুও রোজ,
পথে পথে অনিন্দ্য অনন্তে।

একটি শুকতারার চোখে আমরা ভিন্ন আকাশ,
যে আকাশ মিশে গেছে জলে-
যে আকাশ মিলে গেছে অনন্তের পথে
ভয়ংকর সৌদামিনীর বুকে।

একটি শুকতারা জানে-
রোজ সন্ধ্যায় এ দ্বীপে কত প্রদীপ জ্বলে,
তারা শিশিরজলে নিভুনিভু-
নিশুতি মধ্যরাতে।

জোনাকি নারী এবং…

শ্যামসুন্দর গোস্বামী

Published by Kafe House Publication 

Coming Soon…

আমি ও নিঃসঙ্গ বারান্দা

স্বপ্না ইসলাম ছোঁয়া (ঢাকা, বাংলাদেশ)

Balcony, Flowers, Vase, Art, Watercolor, Nature

বিকেলের বেলকনি’তে
একাকীত্ব ঘোচাতে ঘোচাতে ক্লান্ত আমি
সে-ই কবে থেকে ভাবছি,
কতদিন কথা হয়নি আমাদের মাঝে,
বহুদিন সেলফোন কেঁপে ওঠেনি
প্রিয় বার্তার টুংটাং শব্দে।
একলা শালিকের বিষণ্ণতায় অভ্যস্ত আমি,
ভুলে গেছি জমকালো জোনাকির কথা।
দুঃখকে পোষা পাখির মতো হৃদয়ে পুষতে পুষতে
বোহেমিয় মনটা’কে অনুনয় করে বলি,
থামাও তোমার রথ, নিয়ে চলো কাশফুলদের
দেশে, কিংবা নরম ঘাসের বুকে যেখানে
শিশির পেতেছিল আদুরে শয্যা।
নিঠুর সময় দাঁত কেলিয়ে হাসে-
অজস্র মানুষের পদধ্বনিতে মুখরিত এই শহর
কিছুই দেয়নি কি তোমায় একাকীত্ব ছাড়া?
শূন্যতায় আচ্ছন্ন ধূসর সন্ধ্যা অবশেষে,
স্তিমিত হতে হতেই ফিসফিসিয়ে বলে যায়,
‘প্রিয় কষ্টগুলো বুক পকেটে গুঁজে
দু’জনেই তো হেঁটে চলেছ বিপরীত প্রান্তে।’

Face, Soul, Head, Smoke, Light, Sad, Thoughts

ছোটবেলা বলল,
কিরে বেশ তো বড় হতে চাইছিলি,
এবার দেখ বড় হবার কেমন মজা!!
খুব অপ্রস্তুত লাগলো,
নিজেকে বোকা বোকা মনে হল,
লজ্জা পেলাম খুব।
ছোটবেলা বলে চলল,
রঙ পেনসিলটা আজ সিগারেটে,
হোমওয়ার্কটা মান্থলি টার্গেটে,
আর হাত খরচটা স্যালারিতে পরিনত হয়েছে তো?
তখন পয়লা বৈশাখে হাতে 30 টাকা পেলে সেটা উল্টো রথ অব্দি খরচ করেও কিছু বাঁচত।

আর এখন তোর 3 তারিখের মাইনে 23 তারিখ পার
হতে গিয়ে 300 টাকা ধার করে বসে!
এখন তো আর বাড়িতে থাকতেই পারিসনা,
মুখে নাকে একটু দিয়েই ছোটা।
আগে কি দারুন ব্যলকানিতে বসে পা দোলাতিস,
গাছ গুলোর দিকে চেয়ে থাকতিস!
জানিস তোর শরীরটা আরও রুগ্ন হয়ে গেছে,
চোখের কোনে কালি।
আজকাল তো তোর ঘুম ভাল হয়না,
আমি বললাম,
বন্ধ করো, আমি আর শুনে কষ্ট পেতে চাইনা।
ছোটবেলা আরও বলল,
জানিস কাল অনেকদিন বাদে বেশ লোডশেডিং হলো,
আর আমরা জমিয়ে গল্প করলাম
হ্যারিকেন, আমি, তোর পুরানো জ্যামিতি বক্স,
সেই ডায়রি আর বই এর পাতা গুলো মিলে।
তোর স্কুল ব্যাগ তো বলছিল-
আমি আগেই বুঝেছিলাম।
কলেজে যাবার পরই সব কেমন হয়ে যাচ্ছিল।

আমি ছলছল চোখে ছোটবেলার দিকে তাকালাম।
ও বলল,
তোর হ্যারিকেন, পড়ার টেবিল, জ্যামিতি বক্স, রঙ পেনসিল রাও
তোকে খুব মিস করে রে৷

কল্যাণ ভট্টাচার্য্য

নদীটা যেভাবে নিজের পথ করে নেয়


ডঃ অভিনন্দন সেনগুপ্ত

Vintage, Birds, Line Art, Peacock, Parrot, Duck, Crane
নদী যেভাবে নিজের পথ করে নেয় যে প্রকৃতিতে সে শায়িত থাকে তাকে সয়ে বুঝে নিয়ে তেমনি এক শিল্পী
তার শিল্পী হয়ে ওঠার পথ তৈরি করে নেয় যে সমাজে সে অবস্থান করে তাকে সয়ে বুঝে নিয়ে। এক কথায়
বলতে গেলে মানুষের মধ্যেকার শিল্পী সত্তা কোন ও দৈবিগুনের প্রকাশ নয় ,তা অত্যন্ত সামাজিক। অর্থাৎ
শিল্পী মানসের উৎপত্তি হল আসলে একটি সামাজিক উৎপত্তি। এ এক দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল ।তিলে তিলে
নিজেকে গড়ে তুলবার এক কঠিন আত্ম অনুশীলন – তাতে বারবার নিরাশা আসে বারবার প্রত্যাখ্যান জোটে
তার মধ্যে দিয়ে নিজেকে ভেঙে চুড়ে গড়ে তুলবার প্রয়াস ও চলে । চলে গেলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক প্রবাদ
প্রতিম ব্যক্তিত্ব – অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় । এমন মানুষের মৃত্যুর পর স্বভাবতঃই সমাজে নানান
আলােচনার সূত্রপাত ঘটবে এটাই স্বাভাবিক। তিনি কিভাবে অপু হয়ে উঠলেন ,আবার অপু থেকে ফেলুদা
,ক্ষিদদা , উদয়ন পন্ডিত হয়ে সাঁযবাতি ,পােস্তর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় হয়ে ওঠার কাহিনী এমন ই কষ্টকর আত্ম
অনুশীলনের পথ। অবশ্যই তার সমস্ত উপাদান রয়েছে সমকালিন সমাজের গর্ভে। সূচনায় যে কথা বলেছি তাঁ
হল এমন একটা বহতা নদীর বয়ে চলার কথা যার নাম শ্রী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।
পলু থেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় হয়ে ওঠার আখ্যান ভারি চিত্তাকর্যক । জন্ম ১৯৩৫ সালে নদীয়ার কৃষ্ণনগরে
এক যৌথ পরিবারে। শিল্পী হয়েওঠার প্রাথমিক উপাদান পরিবার থেকে ই পেয়েছেন। পারিবারিক সাংস্কৃতিক
পরিমন্ডলে এক প্রগতিশিল পরিমন্ডল তাঁর কিশাের মনকে পরিপুষ্ট করেছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বিশিষ্ট
রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী সুচিত্রা মিত্র ছিলেন তাঁর মাসি। প্রথম থেকেই তার অভিনয়ের প্রতি একটা প্রীতি ছিল এবং
সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশে যৌবনকাল কাটানাে অন্যান্য পাঁচটা যুবকের মত তিনি ও ছিলেন দেশ ও সমাজের
ভবিষ্যৎ নিয়ে অনুসন্ধিৎসু এবং চিন্তাশীল । সদ্য স্তিমিত হয়ে আসা স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাবে তার মনেও অনেক ন্যায়পরায়ন সমাজের কল্পনা ছিল । দরদী মন দিয়ে খুঁটিয়ে মানুষকে দেখেছেন ও বুঝবার চেষ্টা
করেছেন ।কবিতা ও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ ,সমকালিন সমাজ ও রাজনীতিকে বুঝবার চেষ্টা, সবকিছুকে ভেঙেচুড়ে তার ভিতরকার অন্তর্নিহিত কারন অনুসন্ধান করা তার সেইসময়কার প্রবনতা ছিল । এর থেকেই
এসেছিল বামপন্থী দর্শনের প্রতি প্রত্যয়। তিনি তাঁর ভাবনার অভিব্যক্তির প্রকাশের হিসাবে বেঁছে নিয়েছিলেন অভিনয়কে। তাঁর এই সৎ প্রয়াসই তাঁকে সার্থক অভিনেতা হিসাবে গড়ে তুলেছিল । প্রথম যৌবনে তিনি যেমন
জীবিকার অনুসন্ধা করেছেন ,তেমনি বিভিন্ন নাটকে চুটিয়ে অভিনয় করেছেন। প্রথম ষেজীবনে তিনি ছিলেন আকাশবানীর ঘােষক ।তার সাথে ছিলেন প্রবাদ প্রতিম নট শিশির ভাদুরীর সুযােগ্য শিষ্য। এমন প্রবাদ প্রতিম গুরু পাওয়া নিশ্চয় সৌমিত্রের কাছে এক পরম সুযােগ জানবার ,শিখবার তীব্র ক্ষুধা গুরু শিশির ভাদুরিকে অবশ্যই মুদ্ধ করেছিল । এরসাথে অবশ্যই তার ঋজু ব্যক্তিত্বপূর্ণ চিন্তাশীল চেহারা তাকে একটা আলাদা মাত্রা দিয়েছিল। জীবনে ছাত্রাবস্থায় তিনি স্থির করে নিয়েছিলেন যে তিনি অভিনয়ই করবেন। এই যে সদ্কল্প তাঁর মধ্যে অভিনয় করে কিন্তু প্রচুর অর্থ রােজগার করবেন এমন কোনাে আকাঙখ্যা ছিল গা। অবশ্যই অভিনয়কে কেরিয়ার হিসাবে নিলেও তা কে বেঁচে বাণিজ্য
করবার খােনও আকাঙ্খ্যা ছিল না। অর্থাৎ পেশাদারিত্ব মানে কোনও বনিকত্ব নয়। তাই তিনি কখন ই জীবনে নিজের চেতনা শিল্পবােধ সৃজনশীলতাকে বেৈচে দেন নি।এখানেই তাঁর অমর শিল্পী হয়ে ওঠার মূল চাবিকাঠি তাঁর স্বপ্নের প্রকৃত সূচনা কফি হাউস থেকে ; সেখানেই তিনি প্রথম শুনলেন পথের পাচালিকে নিয়ে চলচ্চিত্র
বানাচ্ছেন সুকুমার রায়ের পুত্র সত্যজিত রায়। তখন থেকেই মনের কোনে অপুর চরিত্রে অভিনয় করবার আকাঙ্খা তৈরি হয়। গুরু সত্যজিত রায় ও তাঁর প্রিয় শিষ্য সৌমিত্রের প্রথম সাক্ষাত সেনেট হলে। সেখানে প্রখ্যাত সাহিত্যিকরা সত্যজিত রায়ের একটা সংবর্ধনা সভার আয়ােজন করেন ; সেই সভায় সৌমিত্র উপস্থিত ছিলেন ।সেই থেকে মুগ্ধতার সূচনা হয়। সেখানে সত্যজিত রায় বলেন সব পরিচালকের মত তিনি ও অবস্যই
শুধু সুযােগ ই নয় , সৌমিত্রের একনিষ্ঠ অনুশীলন চান দর্শক তাঁর সিনেমা দেখুক ; না হলে তাঁকে কয়েকজন মুষ্ঠিমেয় গুনগ্রাহীর কাছেই তাঁর সৃষ্টিকে পরিবেশন
করে তাঁকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। বেশি দর্শকের কাছে অবশ্যই পৌঁছাতে হবে , কিন্তু তাঁর জন্যে কখনই আপােষ
না করে দর্শকের রুচি ভাবনাকে বাড়াতে হবে। সেই থেকেই সত্যজিত সৌমিত্রের মনে একটা দর্শনকে প্রােথিত
করে।
সৌমিত্র মনে মনে সত্যজিতের অপুর ভুমিকায় কাজ করবার বাসনা পােষণ করতে লাগলেন। একদিন তার এক
বন্ধু অরুন সৌমিত্রের সাথে সত্যজিত রায়ের সহকারি নিতাইবাবুর আলাপ করিয়ে দেন। সেই নিতাইবাবু তাঁকে
জানালেন সত্যজিতবাবু তাঁর পথেরপাচালির পরের সিনেমা অপরাজিত নিয়ে চিন্তা করছেন।
নিতাইবাবু সত্যজিত রায়ের সাথে সৌমিত্রের আলাপ করিয়ে দেন । সেই প্রথম আলাপের স্মৃতি তরুন সৌমিত্রের
মনে অমলিন ছিল ।যদিও সত্যজিতবাবু তাঁর অপরাজিতের অপু হিসাবে সৌমিত্রকে মনােনীত করেন নি ,তবুও তাকে তিনি ভুলে যান নি।পরবর্তি সময়ে সৌমিত্র তখন কফি হাউসে আড্ডা মারছিলেন ,সেইখানে আসেন ওনার আরেক বন্ধু সুবীর হাজরা তিনি আবার ছিলেন সত্যজিত রায়ের সহকারি ও বটে ; তিনিই জানালেন যে
সত্যজিত রায় অপরাজিতর পরবর্তি অংশ নিয়ে সত্যজিত রায় সিনেমা করতে চান । পরে সুবীরবাবু সৌমিত্রর
বাড়িতে এসে বলেন সত্যজিত রায় তাকে ডাকছেন কথা বলবার জন্যে। স্বভাবতঃই এতে তিন যথেষ্ট পুলকিত হন ,এবং দেখা করেন। সেখানে সত্যজিত রায় তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন ;এখন ও তিনি কি অভিনয় করতে আগের মতন ভালবাসেন কি না? তাঁর আগ্রহের গভিরতা পরখ করে তিনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে জানান ,যে তিনি অপরাজিতের পরবর্তি অংশ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মান করবেন ,সেখানে অপু চরিত্রের জন্য তাঁকে ভাবছেন। তবে কতগুলি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। সত্যজিতবাবু প্রতিটি নতুন।
শিল্পী নির্বাচনের মতই বিভিন্ন কথা বার্তা বলে ,আলাপ পরিহাসের মাধ্যমে তাঁর কথা বলার ধরন ,ব্যক্তিত্ব ,
শরীরি ভাষা প্রয়ােগের পদ্ধতি লক্ষ্য করে নেন। সেই সময়ে জলসাঘর ও পরশপাথরের স্যুটিং চলছিল ,তিনি
সেখানে সৌমিত্রকে স্যুটিং দেখবার জন্যে আমন্ত্রণ জানান। সেই স্যুটিং চলাকালিন নানান কথাবার্তার মাদ্যমে
জেনে নেন শিশির ভাদুরীর সাথে কি কি অভিনয় করেছেন ? শিশিরবাবু কি কি বই পড়েন ? এছাড়া সৌমিত্র
সাহিত্যের ছাত্র জেনে তার সাহিত্য জ্ঞানের গভিরতা ও জেনে নেন। সাহিত্যের জ্ঞান ও সাহিত্যের উপর
আগ্রহকে মাপকাঠি করে নতুন শিল্পীকে নির্বাচন করবার এই প্রবনতা সৌমিত্র চট্টোপাদ্যায়কে বিস্মিত করেছেন।
সাধারনভাবে কথা বলতে বলতে ই সত্যজিত বাবু সহিত্যের কোন চরিত্রটির বৈশিষ্ট্য কি সে সম্পর্কে আলােচনা করতেন। ক্রমে এই দুইটি চলচ্চিত্রের স্যুটিঙের ফাকে ফাকে সত্যজিত রায় তাঁর কল্পনায় থাকা নায়ককে গড়ে তুলতে থাকেন ।সেই সময়ে তিনি কতগুলি বই সৌমিত্রকে পড়তে দেন। তিনি তাঁকে স্ট্যানিসলাভস্কির “মাই লাইফ ইন আর্ট : “বিন্ডি আ ক্যারেক্টার এবং অ্যান আক্টর প্রিপেয়ার্স বই তিনটি পড়তে দেন । তাঁর
স্যুটিঙের সমস্ত খুটি নাটি দেখিয়ে , সেটে উপস্থিত করে ও তার টিমের সকল কুশীলব ও অন্যন্য অভিনেতাদের
সাথে মেলা মেশা করতে দিয়ে নতুন শিল্পির আড়ষ্ঠতা ভাঙান সত্যজিত রায়। সেই খানে ই ছবি বিশ্বাসের
সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে ঘােষনা করেন যে সৌমিত্রই হচ্ছেন তাঁর অপরাজিতের পরবর্তি অংশের অপু।
এইভাবেই সুচনা হল অপুর সংসারের প্রস্তুতি ।
এই অপুর সংসার হল বাংলার তিনি চিন্তাবিদ সৃজনশীল মানুষ ; বিভুতিভূষণ বন্ধোপাধ্যায় সত্যজিত রায় ও
সৌমিত্র চট্টোপাধায়ের সৃষ্টির সমাপতন । সৌমিত্র চট্টোপাদ্যায় সত্যজিত রায়ের কাছে সিখেছেন প্রতিটা চরিত্রকে মানস পর্যবেক্ষণ করতে ,তাঁকে নিয়ে গভির ভাবে ভাবতে। এর জন্য তাঁর সহজাত সমাজ চেতনা বিশেষ
সহায়তা করেছিল । সার্থক শিল্পী তাঁর সহজাত সমাজের বাইরে নন। তাই প্রথমেই বলেছি মানুষের মধ্যেকার
শিল্পী সত্তা কোন ও দৈবিগুনের প্রকাশ নয় ,তা অত্যন্ত সামাজিক । অর্থাৎ শিল্পী মানসের উৎপত্তি হল আসলে একটি সামাজিক উৎপত্তি। দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্ম অনুশীলনের মাধ্যমে বিকশিত হয়।

দাস বিদ্রোহ – দাস প্রথার ইতিকথা

নাসরিন আক্তার (ঢাকা, বাংলাদেশ)

দাসত্ব - উইকিপিডিয়া

সভ্যতা বিকাশের ধারায় মানবসমাজে উদ্ভব ঘটে দাসপ্রথার। কালের টানে একসময় বিলোপও হয়ে যায়। কিন্তু সভ্যতার গায়ে ক্ষতচিহ্নের মতো রয়ে গেছে এই অমানবিক প্রথার দাগ। দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট বৈশ্বিক তারিখ নেই। একেক দেশে একেক দিন দাসপ্রথাকে বিলোপ করা হয়। প্রাপ্ত তথ্য মতে, প্রাচীন দক্ষিণ এশীয় প-িত কৌটিল্য দাসপ্রথা তুলে দিতে তার সম্রাটকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। সম্ভবত এটাই দাসপ্রথা বিলোপের প্রথম উদ্যোগ। আর সর্বশেষ দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয় ১৯৬৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী ২ ডিসেম্বরকে পালন করা হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে ফর দ্য এবলিউশন অব স্লেভারি’ হিসাবে। এদিন মূলত স্মরণ করা হয় সভ্যতা বিকাশে দাসদের অবদানের কথা, স্মরণ করা হয় গ্লানিময় এক প্রথার কথা।

দাসত্বের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা প্রথম সমাজ হলো গ্রিক সভ্যতার সমাজব্যবস্থা। গ্রিক সভ্যতার সূচনা যিশুর জন্মের আনুমানিক দুহাজার বছর আগে মাইনোয়ান যুগে। হোমারের দুই মহাকাব্য ইলিয়াড এবং ওডিসির রচনাকাল আনুমানিক ৭৫০-৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। এই দুই মহাকাব্যে দাসত্ব এবং দাসপ্রথার টুকরো কিছু ছবি পাওয়া যায়। হোমার বা হেসিয়ডের রচনা থেকে জানা যায় গ্রিকরা দাসপ্রথাকে জীবনের একটি স্বাভাবিক ঘটনা বলেই ধরে নিত। হোমারের যুগে গ্রিকরা ক্রীতদাস বা ঝষধাব বোঝানোর জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করত ‘অ্যানড্রোপোডন’ শব্দটি, ইংরেজিতে যার অর্থ পযধঃঃবষ ংষধাব. অ্যানড্রোপোডন কথাটির মানে মনুষ্যপদবিশিষ্ট জীব বা গধহ ভড়ড়ঃবফ পৎবধঃঁৎব অর্থাৎ মানুষের মতো জীব। শব্দটি এসেছিল টেট্রাপোডা শব্দের উপমা হিসাবে। টেট্রাপোডার অর্থ চতুষ্পদী গবাদি প্রাণী। গ্রিসের দাসপ্রথা ছিল প্রকৃতপক্ষে পযধঃঃবষ ংষধাবৎু. ক্রীতদাস হলো সেই মানুষ যে আইন ও সমাজের চোখে অন্য একজন মানুষের একটি পযধঃঃবষ বা অধিকার। পলিবিয়াস বলেছেন, জীবনের অত্যাবশ্যক প্রয়োজন হলো গবাদিপশু আর ক্রীতদাস। গ্রিসের অন্যতম প্রধান দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতে, দাসব্যবস্থা প্রকৃতিরই নিয়ম। গ্রিসের অভিজাতদের ৩০-৪০ জন দাস থাকত। কৃষি এবং শিল্প খাতে শ্রমের চাহিদা মেটানো হতো দাসদের দ্বারা। গ্রিকদের শিল্প যখন সমুদ্র পার হয়ে রফতানি শুরু হয় তখন দাসদের প্রয়োজনীয়তাও বৃদ্ধি পায়। দাস বেচাকেনার জন্য ব্যবসা শুরু হয়। এথেন্সের দাস ব্যবসায়ীরা এশিয়া মাইনর, সিরিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে দাস আমদানি করত। ফিনিসীয় দাস ব্যবসায়ীরা নিজেরাই এথেন্সের বাজারে দাস নিয়ে আসত। সিরিয়া, মিসর, আরব প্রভৃতি দেশের সঙ্গেও এথেন্স এবং অন্য গ্রিক রাষ্ট্রের দাস ব্যবসা শুরু হয়। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে এথেন্সের অর্থনীতি পুরোপুরিই দাসশ্রমনির্ভর হয়ে পড়ে। মনীষী এঙ্গেলসের মতে, এথেন্সের যখন চরম সমৃদ্ধি তখন স্ত্রী ও পুরুষসহ সমগ্র নাগরিকের সংখ্যা সেখানে ৯০ হাজার। এরা ছাড়াও ছিল ৩ লাখ ৬৬ হাজার স্ত্রী ও পুরুষ দাস এবং ৪৫ হাজার বিদেশি ও স্বাধীনতাপ্রাপ্ত আশ্রিত। অতএব, প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ নাগরিকের অনুপাতে ছিল অন্তত ১৮ জন দাস এবং ২ জনের বেশি আশ্রিত। প্রাচ্যে গ্রিকদের তিনটি সাম্রাজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিলÑ নীলনদের মুখে আলেকজান্দ্রিয়া, টাইগ্রিসের তীরে সেলিউসিয়া এবং সিরিয়ায় আরোন্টাসের তীরে এন্টিওক। গ্রিক ভূস্বামীরা প্রাচ্যে বিলাস ও আলস্যের জীবনযাপন করত। গ্রিকদের প্রাসাদ, সুরম্য অট্টালিকা দাসদের শ্রমেই তৈরি হয়েছিল।

প্রাচীন রোম সভ্যতাতেও ছিল দাসপ্রথার প্রচলন। রোমান সাম্রাজ্যের বিজিত প্রদেশগুলোকে রোমে দাস সরবরাহ করতে হতো। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের মধ্যভাগে গ্রিস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল ১ লাখ ৫০ হাজার দাস। খ্রিস্টপূর্ব ২য় এবং ১ম শতকে রোমসহ সারা ইতালিতেই দাস শ্রমের ব্যবহার চরম আকার ধারণ করে। দাসদের প্রধানত খাটানো হতো জমি এবং খনিতে। কৃষির চেয়ে খনির কাজে দাসদের শোষণ করা হতো বেশি। গৃহকার্য এবং কৃষির দাসদের শাস্তি দেওয়ার জন্য খনিতে পাঠানো হতো। রোমান দাস-মালিকরা গ্রিকদের মতোই দাসকে মানুষ মনে করত না। দাসদের বিবাহিত পারিবারিক জীবনযাপন করতে দেওয়া হতো না। রোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন আইন এবং রাষ্ট্রীয় সনদ থেকে জানা যায়, ক্রীতদাস তার প্রভুর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে তা আদৌ বিবেচনা করা হতো না বরং তাকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো। নাট্যকার অ্যারিস্টোফানিস ঠাট্টা করে বলেছিলেন, পাইস (চধরং) শব্দটি এসেছে পেইন (চধরবরহ) থেকে। পাইস অর্থ ক্রীতদাস বা শিশু। আর পেইন মানে প্রহার।

সিন্ধু সভ্যতার যুগ

পুরাতাত্ত্বিকদের মতে, সিন্ধু সভ্যতা ২৫০০ থেকে ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে অস্তিত্বমান ছিল। পাঞ্জাবের রোপার, কোয়েট্টার কাছে ডাবরকোট, ওমান সাগরের কাছে সুৎকাজেনদোর এবং কাথিয়াবাড়ের লোথালে ধ্বংসস্তূপগুলোর অস্তিত্ব থেকে এর প্রভাবের ব্যাপ্তি চোখে পড়ে। পরস্পর থেকে ৭০০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো শহর দুটি ছিল সেই সমাজের কেন্দ্র। বিভিন্ন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিকরা ধারণা করেছেন গ্রামীণ জনসমষ্টির মধ্যেই দাসদের অস্তিত্ব ছিল। শহরে যে এরা ছিলেন তা আরো নিশ্চিত। শহরে কমপক্ষে তিন ধরনের সামাজিক অস্তিত্ব স্বীকৃত শাসকবর্গ (পুরোহিত ও নগরশাসকরা দুটি পৃথক গোষ্ঠী ছিল কিনা তা জানা যায় না), বণিক এবং কারিগর। এই তিনটি সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব থেকে বোঝা যায় ভৃত্যশ্রেণী নিয়ে গঠিত একটি চতুর্থ শ্রেণীর অস্তিত্বের কথা। এই ভৃত্যেরা বেতনভোগী শ্রমিক অথবা দাসও হতে পারতেন (যুদ্ধ বন্দি, ঋণ-দাস ইত্যাদি) গৃহদাস ও ভৃত্যদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ দাস আর বেতনভোগী শ্রমিকও নিয়োগ করতেন বলেই ইতিহাসবিদদের বিশ্বাস। মহেঞ্জোদারোয় ব্যারাকের মতো দুসারির বাসগৃহের আবিষ্কার এ তথ্যের প্রমাণ দেয়। সব মিলিয়ে এটা বলা যায়, সিন্ধু সভ্যতার গ্রাম ও শহর দুজায়গাতেই দাস শ্রমিকদের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব। সিন্ধু সভ্যতার কোনো লিখিত তথ্য পাওয়া যায় না (সিলমোহরগুলোর পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি)। তাই সিন্ধু সভ্যতার দাসপ্রথা বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা সম্ভব হয়নি।

বৌদ্ধযুগে দাসপ্রথা

বৌদ্ধযুগের সূচনার কিছুদিন আগে (খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে) কোনো মানুষ বিভিন্ন কারণে অপর একজনের সম্পূর্ণ ক্ষমতাধীন হয়ে পড়লে তাকে দাস বলা হতো। তবে দেশের আকৃতিগত বিশালতার কারণে কিছু সঙ্কীর্ণ গোষ্ঠী দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিলÑ গোষ্ঠীর বাইরে যাদের বিবাহ ছিল নিষিদ্ধ। পরবর্তী যুগের রচনায় অভিজাত গোষ্ঠী শাসনতন্ত্রের ধাঁচের এই গোষ্ঠীগুলোর অস্তিত্বের সাক্ষ্য মেলে। এই সম্প্রদায়গুলোতে একটা সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীই দাস বলে গণ্য হতো, ফলে এক্ষেত্রে ‘দাস’ শব্দটির শুধু বৈধ ধারণাই নয়, একটি ছদ্ম জাতিগত তাৎপর্যও ছিল। প্রভুরা অনেক সময় দাসীদের উপপতœী হিসাবে গ্রহণ করতেন।

বৌদ্ধ যুগের সূচনায় দুধরনের রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠান দেখা যায়। প্রথম ধরনটিতে ছিল বজ্জী (৮টি রাজ্যের সংযুক্তি), মল্ল, সক্য, কোলীয় ও ভগ্গদের রাজ্যÑ এগুলো ছিল গোষ্ঠীশাসনতন্ত্র ঘাতক ধরনের জনশাসন। অন্যগুলোতে ছিল রাজতন্ত্র।

রাজতন্ত্রে সেনাবাহিনীতে দাসদের অংশগ্রহণ ছিল। এদের বলা হতো ‘দাসকপুত্ত’ অর্থাৎ ‘দাসের ছেলে’। রাজ অশ্বশালায়ও দাসদের নিয়োগ করা হতো। অন্যদিকে গোষ্ঠীশাসনতন্ত্রে সেনাবাহিনীতে দাসদের নিয়োগ দেওয়া হতো না।

রাজতন্ত্রে মধ্যম কৃষকরা কৃষি কাজে অল্প কয়েকজন দাস-দাসী নিয়োগ করতেন। ধনী ভূস্বামীদের জমি চাষ করতেন দাসরা। রাজ-অধিকৃত অঞ্চলে অবিরতই নতুন জমি উদ্ধার করা হচ্ছিল। গাঙ্গেয় উপত্যকার বিশাল অংশ অনেকটাই অরণ্যময়। লোহার কুঠার ব্যবহার করে প্রচুর গাছ কেটে ফেলা সম্ভব হয়েছিল। এভাবে পরিষ্কার করা ভূমি লোহার তৈরি লাঙলের ফালের সাহায্যে কৃষিযোগ্য করে তোলা হতো। এই কাজকর্ম চালাতেন দাস ও ভৃত্যরা। বিপরীতপক্ষে, তথ্যের অভাব সত্ত্বেও ধারণা করা হয় গোষ্ঠীশাসনতন্ত্রে দাসপ্রথা ছিল জন্মগত। গোষ্ঠীশাসকদের দাসেরা প্রভুদের জন্য কাজ করতে বাধ্য ছিল। সর্বোপরি কৃষির পুরো কাজই চালাতেন দাস ও ভৃত্যরা।

দাস ও ভৃত্যরা অন্য যে কাজটি করতেন তা হলো অনুচরবৃত্তি। রাজাসহ পরিবারের সব সদস্যেরই অনুচর থাকত। ধনী ব্যক্তিদের নিজস্ব অনুচর থাকত। ধনী ব্যক্তির অনুচর প্রভুর ভ্রমণ বা পদচারণার সঙ্গী হতে।

ধাত্রী বা ধাতীরা শিশুপালনের কাজ করত। তারা দাসী ছিল, নাকি বেতনভোগী স্বাধীন ভৃত্যা ছিলÑ এই আইনগত পদমর্যাদা সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত, রাজকন্যার স্তন্যদায়িনী ধাত্রী ছিলেন তার সারাজীবনের সঙ্গিনী এবং কর্ত্রীর পতিগৃহেও ধাত্রী তাকে অনুসরণ করতেন। এখানে দাসত্বের বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। ‘ধাত্রী-দাসী’, ‘দাসী-ধাত্রী’ শব্দগুলো তাদের দাসত্বসূচক অবস্থানকে নির্দেশ করে কিনা তা নিশ্চিত প্রমাণিত হয়নি। দাস-দাসীদের পক্ষে সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন এবং অস্বাস্থ্যকর কাজ ছিল রন্ধনশালায়। তদের খুব ভোর থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত, কখনোবা গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হতো। দ্বাররক্ষক বা দোবারিকের কাজেও দাসদের নিয়োগ করা হতো। এরা অতিথিকে স্বাগত জানাত এবং গৃহস্বামীর কাছে অতিথির আগমনের কথা ঘোষণা করত। গৃহদ্বারের তত্ত্বাবধানে যে দাস থাকত সে অতিথির পা ধুইয়ে দিত ও তাকে বাড়ির মধ্যে নিয়ে যেত। যেমন মগধরাজকে তার কোষাধ্যক্ষের গৃহে এভাবেই স্বাগত জানান হয়েছিল। আদেশ পেলে দোবারিক অবাঞ্ছিত ব্যক্তিকে গৃহে প্রবেশ করতে বাধা দিত। নারীদের বাইরে যাওয়ার ব্যাপারটিও দেখাশোনা করত দ্বাররক্ষক, যাতে কোনো স্ত্রী ইচ্ছামতো বাড়ি থেকে বেরুতে না পারে। রাজকীয় বাগিচার রক্ষক দাস ছিলেন, না ভৃত্য ছিলেন তা জানা যায় না। তবে এ দুইয়ের মধ্যে কোনো একটি তাকে হতেই হতো, কেননা রাজার সাজভৃত্য তাকে দাস বা ভৃত্যরূপে ‘ভনে’ বলে সম্বোধন করত। দাস ও ভৃত্যদের এই সমস্ত কাজ তত্ত্বাবধায়নের ভার ছিল রাজার আস্থাভাজন ব্যক্তি বা গৃহপ্রধানের ওপর (প্রধানত ভূস্বামী কৃষক, সাধারণ বণিক)। মধ্যশ্রেণীর পরিবারে গৃহের নারীদের গৃহকর্মে সহযোগিতার জন্য দু-একজন দাস থাকত। গ্রামীণ পরিবারে স্ত্রী খাদ্য প্রস্তুত করতেন আর দাসরা তা ক্ষেতে পৌঁছে দিত। গৃহশ্রমের ক্ষেত্রে গোষ্ঠী শাসনতন্ত্র ও রাজতন্ত্রের মধ্যে কোনো মৌলিক ভেদ ছিল না। মৌর্য চন্দ্রগুপ্তের সময় দাসপ্রথার অবসানে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন ব্রাহ্মণমন্ত্রী কৌটিল্য। তিনি দাসপ্রথা উঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। সম্রাট অশোকের সময় প্রথম সামাজিক বৈষম্য দূর করার চেষ্টা করা হয়। অশোকের রাজত্বকালে বিচার ও দ-ের ব্যবস্থা সবার পক্ষে একই করা হয়।

বৌদ্ধ সঙ্ঘারামে দাসদের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। চীনা পরিব্রাজক ই-ৎসিং এক সঙ্ঘারামে দাসদের দেখেছিলেন। তিনি এক ভিক্ষুর ত্যাগ করা ভূমি, গৃহ, দাস ইত্যাদির কথা বলেছেন। ফা-হিয়েনও মধ্যদেশে রাজা ও গৃহস্থদের দ্বারা সঙ্ঘকে দান করা ভূমি, গৃহ, বাগান, মানুষের পরিবার, গবাদিপশু থাকার কথা বলেছেন। সঙ্ঘারামের যে দাস গ্রহণের অধিকার ছিল সে তথ্যের প্রমাণ মেলে এক কোরীয় পরিব্রাজক হুই-চি আও-এর রচনায়। তিনি অষ্টম শতকের প্রথমার্ধে ভারতে আসেন। গান্ধারের রাজার কথা বলতে গিয়ে তিনি বর্ণনা করেছেন, কেমন করে এই ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধটি ভিক্ষুদের হাতে তার সম্পদ ও স্ত্রীদের দান করতেন এবং আবার তাদের কিনে নিতেন। চীনে বৌদ্ধ সঙ্ঘারামে দাসের অস্তিত্ব প্রমাণের বহু উল্লেখসূত্র আছে। রাজবংশের একসূত্রে সেই শাসনতন্ত্র নিয়ে দুঃখ করা হয়েছে, যেখানে ‘ত্রিরতœ’ অধিকৃত দাসসমেত সংঘের সমস্ত জিনিস প্রশাসন ব্যবহার করে। অন্যত্র জানা যায় সঙ্ঘারাম অধিকৃত অহল্যা ভূমি এবং পার্বত্য ভূখ- চাষ করতেন দাসরা। ভিক্ষুনীদের ক্ষেত্রে পালিগ্রন্থে মহিলা সঙ্ঘারামে দাসগ্রহণের কোনো দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না।

কম্বোডিয়ায় হিন্দু মন্দিরগুলোর মতো বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতেও দাস ছিল। খমের মন্দিরের অর্থনীতিতে প্রাধান্য ছিল দাস শ্রমের। মন্দিরে যাদের দান করা হতো তাতে স্ত্রী-পুরুষ উভয় শ্রেণীর দাসের মধ্যে শিশুরাও ছিল। দাসদের সঙ্গে ব্যবহারে সব সময় যথেষ্ট দয়া দেখানো হতো না। ভিক্ষু রাহুল তার সিংহলে বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস বইটিতে সিংহলি সঙ্ঘারামগুলোতে দাসপ্রথার কথা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘… যে প্রাচীনকাল থেকেই স্ত্রী-পুরুষ উভয়শ্রেণীর দাসরা সঙ্ঘারামের নিযুক্ত হতেন এবং তাদের প্রতিপালনের জন্য প্রচুর পরিমাণে অর্থ গচ্ছিত রাখা হতো। সিংহলি রাজাদের হাতে ধৃত যুদ্ধবন্দিরাও এই দাসদের মধ্যে ছিলেন।

প্রাচীনকালের অধিকাংশ বড়মাপের দাস বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৪০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৭০ অব্দের মধ্যে। অর্থাৎ রোমান সাম্রাজ্যের একটি বিশেষ পর্বে। খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ক্রমাগত বিদ্রোহের ঘটনা ঘটতে থাকে। যেমন : খ্রিস্টপূর্ব ১৩৬-১৩২ সময়কালে সিসিলির প্রথম যুদ্ধ, ১৩৩-১২৯ সময়কালে এশিয়াতে অ্যারিস্টোনিকাসের অভ্যুত্থান, ১০৪ থেকে ১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত সিসিলির দ্বিতীয় যুদ্ধ এবং খ্রিস্টপূর্ব ৭৩-৭১ সময়কালে বিখ্যাত স্পার্টাকাসের বিদ্রোহ। এসব বিরাট দাসযুদ্ধ উসকে দিয়েছিল অনেক ছোট সংঘর্ষকে। যেমন : ইতালির বিভিন্ন শহর, অ্যাটিকার খনি অঞ্চল এবং ডেলস দ্বীপে ঘটে যাওয়া নানা অভ্যুত্থান। তবে স্পার্টাকাসের পরাজয়ের পর এ মাপের দাস বিদ্রোহ তার ঘটেনি।

স্পার্টাকাস, ইতিহাসের অনন্য নায়ক। প্রাচীন রোমের এই দাস বিদ্রোহী সম্পর্কে ফরাসি চিন্তাবিদ ভলতেয়ার বলেছেন ‘তার যুদ্ধ ইতিহাসের সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধÑ হয়তো ইতিহাসের একমাত্র ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ।’ ইতিহাসে তার প্রিয় চরিত্র কে? কন্যার এই প্রশ্নের জবাবে মহামতি কার্ল মার্কস উত্তর দিয়েছিলেন ‘স্পার্টাকাস’।

লাতিন স্পার্টাকাস মানে স্পার্টা নগরী থেকে আগত। স্পার্টাকাস ছিলেন একজন গ্লাডিয়েটর। গ্লাডিয়েটরদের একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে পালিয়ে বিদ্রোহ করেছিলেন স্পার্টাকাস। স্পার্টাকাসের দেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঐতিহাসিকরা মনে করেন, স্পার্টাকাস তার অনুগামীদের সঙ্গেই যুদ্ধে মারা গেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে বেশিরভাগ ক্রীতদাস মারা গেলেও প্রায় ছ হাজার বিদ্রোহী প্রাণে বেঁচে যায়। এদের রোম এবং কাপুয়ার সংযোগ সড়কে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। স্পার্টাকাসকে নিয়ে অসাধারণ একটি উপন্যাস লিখেছেন মার্কিন লেখক হাওয়ার্ড ফার্স্ট। স্পার্টাকাসকে নিয়ে হলিউডে চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। আধুনিককালে দাসপ্রথাবিরোধী বিদ্রোহের তাৎপর্যময় দৃষ্টান্ত হাইতির দাস বিদ্রোহ।

হাইতির দাস বিদ্রোহ (১৭৯১-১৮০৩) পৃথিবীব্যাপী দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলনকে শক্তি জুগিয়েছিল। ইতিহাসবিদ সিএলআর জেমস হাইতির দাস বিদ্রোহ সম্পর্কে বলেছেন, ‘ইতিহাসের একমাত্র সফল দাস বিদ্রোহ।’ হাইতির দাস বিদ্রোহ ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের ফরাসি বিপ্লব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল।

হাইতির আদি নাম সেন্ট ডোমিঙ্গো। হাইতি নামের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৮০৪ সালের ১ জানুয়ারি। হাইতি ছিল ফ্রান্সের সবচেয়ে সমৃদ্ধ উপনিবেশ। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের সময় হাইতিতে চারটি সম্প্রদায় ছিলÑ ১. শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়, ২. অশ্বেতাঙ্গ স্বাধীন সম্প্রদায়, ৩. কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস শ্রেণী এবং ৪. পলাতক ক্রীতদাসদের সম্প্রদায় বা গধৎড়ড়হ. বিদ্রোহের প্রাক্কালে হাইতিতে প্রায় ২০ হাজার শ্বেতাঙ্গ ছিল। এদের অধিকাংশই ফরাসি। সে সময় হাইতিতে ছিল প্রায় ৩০ হাজার অশ্বেতাঙ্গ স্বাধীন মানুষ। ১৭৭০-এর দশকের গোড়ায় হাইতিতে ক্রীতদাসের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ। স্বাধীন মানুষের সঙ্গে দাসদের সংখ্যার অনুপাত ছিল ১ঃ১০। হাইতির দাসব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত অমানবিক এবং নিষ্ঠুর। অবস্থা এতই ভয়ানক ছিল যে, আমেরিকায় অবাধ্য দাসদের এই বলে ভয় দেখানো হতো যে কথা না শুনলে তাদের সেন্ট ডোমিঙ্গোতে বিক্রি করে দেওয়া হবে। ঘরগৃহস্থালির রাঁধুনির কাজ, খাস ভৃত্য এবং নানা ধরনের কারিগরের কাজ করত প্রায় লাখখানেক দাস। এরা প্রভুদের কাছ থেকে কিছুটা সদয় আচরণ পেত। বাকি প্রায় চার লাখ দাস কাজ করত মাঠে-ময়দানে। হাইতির কঠিন আবহাওয়ায় এদের পশুর মতো খাটানো হতো। গধৎড়ড়হ বা পলাতক দাসরা প্রভুদের কাছ থেকে পালিয়ে জঙ্গলে এবং পাহাড়-পর্বতে আশ্রয় নিত। বিদ্রোহের প্রথম দিকের দুজন গুরুত্বপূর্ণ দাস সেনাপতি ছিলেন এই পলাতক দাসদের মধ্য থেকে আগত।

হাইতির দাস বিদ্রোহ শুরু হয় ১৭৯১ সালের ২২ আগস্ট। দাসদের বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো। বিদ্রোহীরা বাগিচা মালিকদের হত্যা করে। প্রায় ১ হাজার ফরাসি নিহত হয়। উত্তরাঞ্চলের বিদ্রোহী দাসরা কেপ ফ্রাঁসোয়া ঘিরে ফেলে। এই বিদ্রোহে এক লাখের বেশি ক্রীতদাস যোগ দিয়েছিল। দাসত্বের শৃঙ্খলে আজীবন নির্যাতিত দাসরা মুক্তির আশায় উন্মত্ত আবেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের প্রভুদের বিরুদ্ধে। টানা তিন সপ্তাহ ধরে দাসরা দ্বীপের অগণিত খামার আর বাগিচা পুড়িয়ে দিয়েছিল। শ্বেতাঙ্গরা পালিয়ে আশ্রয় নেয় উপকূলবর্তী শহরগুলোতে। বিদ্রোহের দুই মহানায়ক ছিলেন ফ্রাঁসোয়া ডোমিনিক তুসাঁ এবং দেসালিনে। তুসাঁর বিদ্রোহের শুরুতে দাসদের উজ্জীবিত করেছিলেন। নেপোলিয়ন তুসাঁকে পরাজিত করতে হাইতিতে ২০ হাজার সেনা পাঠান। তুসাঁর নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। ১৮০২ সালে ফরাসিদের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করে তুসাঁ নিজের খামারে ফিরে যান। ১৮০৩ সালে ফরাসিরা আলোচনা করার জন্য ডেকে এনে তুসাঁকে গ্রেফতার করে এবং ১৮০৩ সালের এপ্রিলে তুসাঁ ফরাসিদের কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। তুসাঁর বিদ্রোহের হাল ধরেন জ্যাঁ জ্যাক দেসালিনে। ফরাসি সেনাপতি লেকলার্ক এবং জ্যাঁ ব্যাপটিস্ট রোশাম্বোর সঙ্গে দেসালিনের ভয়ঙ্কর রক্তাক্ত যুদ্ধ হয়। যুদ্ধের এক পর্যায়ে ১৮০৩ সালের নভেম্বরে রোশাম্বো জ্যামাইকায় পালিয়ে যান। ১৮০৪ সালের ১ জানুয়ারি দেসালিনের নেতৃত্বে জন্ম হয় স্বাধীন হাইতির।

ফ্রাঙ্কলিন নাইটসের মতে, আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সবচেয়ে নিñিদ্র বা সর্বাত্মক একটি দৃষ্টান্ত হলো হাইতির বিপ্লব। পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে হাইতির এই বিপ্লব দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলনকে নতুন গতি এনে দেয়। হাইতি বিপ্লবের প্রভাব পড়ে ব্রিটেনেও। ১৮০৮ সালে ব্রিটিশ সরকার তাদের আটলান্টিক জোড়া দাস ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। আর ব্রিটেনে দাস ব্যবস্থার অবসান ঘটে ১৮৩৪ থেকে ১৮৩৮ সালের মধ্যে। ফ্রান্সে দাস প্রথার বিলোপ হয় ১৮৪৮ সালে।

আমেরিকার দক্ষিণাংশের ১১টি রাজ্যের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল দাসশ্রম। ১৮৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দাসের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ মিলিয়ন। আমেরিকার উত্তরাংশে দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে সমাজ সংস্কারক উইলিয়াম গ্যারিসন, লেখক হ্যারিয়েট বিচার স্টো প্রমুখের নেতৃত্বে। ১৮৬০ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হন আব্রাহাম লিংকন। লিংকন আমেরিকার পশ্চিমাংশে দাসপ্রথা প্রসারের বিরোধিতা করেন। ১৮৬১ সালের ১২ এপ্রিল শুরু হয় আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ। ১৮৬৩ সালে প্রেসিডেন্ট লিংকন ‘দাসপ্রথাবিরোধী ঘোষণা’ জারির মাধ্যমে আমেরিকার দক্ষিণাংশের কনফেডারেট রাজ্যগুলোর দাসদের দাসত্ব মোচন করেন। ১৮৬৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে দেশ থেকে দাসপ্রথা বিলোপ করা হয়।

পৃথিবীর কয়েকটি দেশে দাসপ্রথা বিলোপের সময়কাল

সুইডেন : ১৮৪৬

আর্জেন্টিনা : ১৮৫৩

মেক্সিকো : ১৮২৯

ডেনমার্ক : ১৮৪৮

কিউবা : ১৮৮৬

ব্রাজিল : ১৮৮৮

মাদাগাস্কার : ১৮৯৬

চীন : ১৯১০

আফগানিস্তান : ১৯২৩

ইরাক : ১৯২৪

ইরান : ১৯২৮

মিয়ানমার : ১৯২৯

সৌদি আরব : ১৯৬২

সংযুক্ত আরব আমিরাত : ১৯৬৩

নেপাল : ১৯২৬ ( সংগৃহীত)

Image: Wikipedia

Father And Son, Walking, Love, Child, Joy, Childhood

উঠোনের তুলসীতলায় সাঁঝবাতি দিয়ে এসে মা ঠাকুরঘরে৷ আমি ফুটবলের কাদামাটি ছেড়ে বিছানায়! বাবা সবে দোনলা বন্দুকটা বার করে পরিস্কার করবেন ঠিক করেছেন, আমি মহা উৎসাহে তার সামগ্রী গুছোনোর তাল করছি৷ ইস্কুলে গরমের ছুটি, তাই পড়ার অত চাপ নেই৷
মা ঠাকুরঘর থেকে এসে যখন বসতেন, আমি কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়তাম, আর মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে গান করতেন ” আকাশ প্রদীপ জ্বলে, দূরের তারার পানে চেয়ে.” ওই গানটা৷ সবটা শোনা আমার কোনোদিনই হয়নি কারন আমি তার আগেই ঘুমিয়ে পড়তাম৷
তখন আমাদের গ্রামে এত ইলেকট্রিকের আলো ছিলনা৷
গাড়ি ঘোড়ার আওয়াজও ছিলনা৷ আধো অন্ধকারে গল্পবলা অনেক চরিত্র জ্যান্ত হতে বেশী দেরী লাগতনা৷ ব্যাঙ্গমা ব্যঙ্গমীরাও সংসার পাততে আসতো ঘুমের ঘোরে৷ কল্পনায় আমরা ঝকঝকে ছবি আঁকতে পারতাম৷
তখন আমসত্ব পাততো বাড়িতে, পাতলা সাদা কাপড়ের ওপর আমের রস শুকিয়ে নিয়ে৷ বাবা একবার গল্প বলেছিলেন, কলকাতার এক বাড়িতে নাকি তাঁকে কাঁচের প্লেটে করে আমের টুকরো খেতে দেওয়া হয়েছিল, যা বাবার কাছে আশ্চর্য ঠেকেছিল কেননা আমরা প্রথমপুরুষ থেকেই আস্ত আম গোটা পাঁচেক ছালছাড়িয়ে খেতে শিখেছি৷ আম গাছ থেকে পাড়ার পর রান্নাঘর অবধি পৌঁছোতোনা৷
আজ এই অসম সময়ে, হতাশা গ্রাস করবে বলে হাঁ করে আছে বিছানায়, ভুল কথা বললাম বলে সরকার বেঁধে নিয়ে যায়, চুপ করে থাকলেও আয়না চড় মারে৷ এখন মনে হয়, কী দরকার ছিল বড় হওয়ার?

কল্যাণ ভট্টাচার্য্য

লাল পিঁপড়ে

অনসুয়া মুখোপাধ্যায়

Flower, Texture, Pattern, Fabric, Detail, Nobody

চড়চড়ে রোদ, বিনীটা ছাদের মধ্যে কী করছে? দেবু ওর চিলে কোঠার ঘরের জানলা দিয়ে বিনীকে দেখছে। হ্যাঁ পড়ার ফাঁকে ফাঁকে পাগলী বিনীকে দেখাও দেবুর কাজ।

বাবা অফিসে চলে যায় ,উচ্চ অভিজাত বংশের বিশাল পাচঁমাহলা বাড়ির ছাদে বিনী বড়ো একলা। মা নিজের কাজে ব্যস্ত,দিদিরা কলেজে। ছেলে চাইতে চাইতে পাঁচ বোনের সবশেষে বিনী। বৃদ্ধ বয়েসের অবদান ,বিনীর জড়তা। জড়ো বুদ্ধিসম্পন্না বিনী। বড়ো বড়ো কুঁচি দেওয়া ঘটি হাতা জামা ,চোদ্দো বছরকে যতটা লুকিয়ে রাখা যায়। বিনীর চেহারায় কোনো অসামঞ্জস্য নেই। যেখানে যা দরকার ঈশ্বর সব কিছু বেশি বেশি দিয়েছেন।গায়ের রং একসময় বেশ ফর্সা ছিল.,অযত্ন আর এই দুপুরের রোদ সেটাকে গম রঙে পরিণত করেছে। শক্ত করে ফিতে দিয়ে দুটো বিনুনি বাঁধা। খুচরো চুল মুখে এসে পড়ছে।

বীনি মাঝে মাঝে বড় বড় নিষ্পাপ চোখ তুলে দেবুদার ঘরের দিকে তাকায়। দেবুদার সাথে চোখাচোখি হলে দেবুদা হাসে,কি মিষ্টি হাসিটা। ওদের বাড়িতে অমন কালো কেউ নেই। সবাই সাদা ফ্যাট ফ্যাটে। চশমা ঠিক করতে করতে দেবুদা যখন গম্ভীর গলায় বলে ওঠে , “এই বিনী কী করছিস?” অসম্ভব ভালো লাগে। বিনীর সঙ্গেতো কেউ কথাই বলেনা। ও যে স্পষ্ট করে কথাই বলতে পারেনা।কেউ জানেনা ও এই দুপুরে ছাদে কেন আসে ,দেবুদাও না , দেবুদাকে দেখতে আর ওই ডাক শুনতে।

—-না অন্য কাজও আছে। জাম গাছের ওই পিঁপড়ে গুলো কেমন লাইন করে চলে ,আস্তে আস্তে ছাদ থেকে জাম গাছে গিয়ে ওঠে। আবার মিনি বেড়ালটা গম্ভীরভাবে সারা ছাদে একটা চক্কর দেয় ,যেন ওকে পাহারা দিতে এসেছে। একটা কাক এসে বসলো। হু উ স স ,জড়িয়ে জড়িয়ে চিৎকার করলো বীনি । কাকটা কোনো পাত্তাই দিলোনা। বিনীও আর কোনো চেষ্টা করলোনা।কাকটাও তো ওর সঙ্গী।

বড্ডো খিদে পেয়েছে। মা ডাকছেনা কেন !

দেবুদাও আজ তাকাচ্ছেনা। কি একটা টিভির মতন,ঝুঁকে কিসব লিখছে।দিদিরাও লেখে। ওকে দেখতে দেয়না। মা ডাকছেনা ,না ডাকলে নীচে যাবে কেমন করে !মা বলেছে না ডাকলে নীচে না যেতে। সিধু জেঠু এসেছে ।রোজ এ সময় আসে। চা খায় ,গল্প করে তারপর যায়। জেঠু যাবার পর মা স্নান করে,ঠাকুর দেয় ,তারপর ওর খাওয়ার ডাক।

উফ বড্ডো খিদে পেয়েছে ,খিদের চোটে মরেই যাবো।ছাদটা ডিঙালেই দেবুদার ঘর ,মাঝখানে শুধু পিছল ধরা মোটা পাঁচিল। একবার যাবে ,উঁকি দেবে দেবুদার ঘরে ,জিজ্ঞেস করবে ,কেন আজ একবার ও তাকায়নি, যাবে ? দেখবে ওই লাল পিঁপড়ে গুলো দেবুদার ঘরেও যায় কিনা! মা বারণ করেছে। বলেছে এই ছাদ থেকে অন্য কোথাও না যেতে।

একবার যাই ,দেবুদাকে বলি গিয়ে ,খুব খিদে পেয়েছে। শুধু ওই চওড়া পাঁচিল পেরোনো । ইস কি পিছল। ভয় করছে। পড়ে যাই যদি। ঈশান কাকা বলেছে ,চোখ বুজে রাম রাম করলেই ভয় করেনা। যাই ——

ধপ করে একটা আওয়াজে চমকে উঠলো দেবু !কী পড়লো !কিসের আওয়াজ !না অন্য দিকে মন দেবেনা ।সুলগ্নার সাথে আজ ঝগড়াটা মিটিয়ে নিতেই হবে ।একটা মিষ্টি হাসি খেলেগেলো দেবুর মুখে।পিছনের বাদাড়ে জাম- গাছ, আম – গাছের নিচে অনেক লাল পিঁপড়ে ,আর মিনিটাও কেমন মরা কান্না জুড়ে ম্যাও ম্যাও করছে।কিসের যেন চারপাশে গোল হয়ে ঘুরছে।

ভাবের ঘরে

কাঞ্চন কুমার গাঙ্গুলী

ভাবের ঘরে চুরি করে
চোখ বুঝে তুমি যতই রও
উপটৌকনে ঝুলি ভরে
তোষামদ তুমি করে যাও ৷

লুটের মালে পকেট ভরো
কাজ না করে ঘোরো ফের
জনগনকে বোকা ভেবে
নিজের আখের গুছিয়ে নাও ৷

দেওয়াল লিখন পড়তে শেখ
ইতিহাসটা জেনে নাও
পাশার দান উল্টে গেলে
কাঁদবে তখন হাউ হাউ ৷

ভাবের ঘরে চুরি করে
ভাবছ হবে পগার পার
অলক্ষ্যে সব দেখছে জেনো
পুতুল নাচের কারিগর ৷

Publish Your Book with Kafe House 

Sell on Amazon and Offline-Stores 

Earn 100% ROYALTY

Hardbound with Jacket | Paperback 

Free E-book | Free-Distribution | Interview | Book Review | Advertising and Promotion

Mail us: insightfulsite@gmail.com

বার্ষিক

বদরুদ্দোজা শেখু

Castle, Palace, Building, Mountain, Old, Architecture
ফি-বছর জড়ো হই,
এক মঞ্চে, গত এক বছর সালতামামির 
মনােজ্ঞ মহড়া হয়, দাবী দাওয়া চাঁদা আন্দোলন সাফল্য ব্যর্থতা
বিশ্লেষিত হয় বিদায়ী কার্যকরী কমিটির, 
সাধারণ সভ্যদের বক্তব্য সমস্যা ক্ষোভ ইত্যাদি ইত্যাদি 
শোনা হয়, চুল-চেরা আলোচনা সমালোচনার
বরাদ্দ সময় সার্থক করার আদর্শ ফোরাম বটে 
অকপটে নিজস্ব প্রস্তাব দাবী কৈফিয়ৎ রাখা যায়
সভ্যদের কাছে। পাশাপাশি নতুন সালের জন্য
 কার্যকরী কমিটি গড়ার  অনুপূর্ব
ভােটাভুটি শুরু হয়, অধিকাংশ সদস্যই স্রেফ 
ভােট দিয়ে কেটে পড়ে, ফলাফল শুनবার
অপেক্ষা করে না, তাদের ব্যক্তিগত তাড়াহুড়ো 
অধিকতর মূল্যবান হবে হয়ত-বা, কিংবা 
কে বা কারা ক্ষমতায় এলো তাতে তাদের যায় আসে না কিছু। 
আর অধিবেশনের  শেষ অঙ্ক সমাপ্ত না হওয়া অব্দি সমিতির শতরঞ্জি আগলায় গুটিকয় নিষ্ঠাবান নীরব মেম্বার।
ফলাফল ঘোষণার প্রায় শূন্য সম্মেলনের এলাহি দরবার 
অবশেষে বেজে উঠে হাততালির 
কাড়া -নাকাড়ায় নতুন সভ্যদের অভিষেকে ; ফিরে এসে দূর থেকে
ফেলে আসা মঞ্চটাকে মনে হয় সমিতির শক্তিস্থল
পােড়াে রাজবাড়ি।

 মৃত্যুই শেষ নয়

তনিমা সাহা

Leaf, Autumn, Wood, Contrast, Dark, Abstract, Fall

সাবিত্রীর হাত-পা গুলো শুষ্কতার জন্য ফেটে গেছে। সেখান থেকে এখন রক্ত বেরোচ্ছে। সাবিত্রীর দুচোখ বেয়ে ঝরে পরছে গরম নোনা জল। সাবিত্রী যতটা না শারীরিক কষ্টের জন্য কাঁদছে সে তার চেয়েও বেশী কাঁদছে মনের যাতনার জন্য। আজ দুমাস হয়ে গেল মকবুল নেই। পুরোনো অভ্যেসে বালিশের তলায় হাত দিয়েই জোর চমকে উঠলো সাবিত্রী।

ভালোবাসার বিয়ে মকবুল আর সাবিত্রীর। গরীব বলেই হয়তো বিধর্মে বিয়ে করতে বেগ পেতে হয় নি তাদের বিশেষ। পয়সাওয়ালাদের তো দেখে কিছু একটা হলেই ইয়া বড়ো বড়ো করে খবর ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। রিক্সা চালাতো মকবুল আর সাবিত্রী পাঁচবাড়ির ঠিকে কাজ করে। কোনোরকমে টেনেটুনে ঠিক চলে যেত ওদের। খুব সুন্দর হাতের কাজ জানতো মকবুল। কিন্তু অভাবের তাড়নায় তার পড়াশোনা করে হওয়া ওঠেনি। তবে মকবুলের তাতে কোনো আফসোস ছিল না। বলতো, “জানো তো সাবিত্রী আল্লাহ কখনোই সবদিক থেকে আমাদের মারে না। বই পড়া হয়তোবা হয়নি কিন্তু শিল্পকে আমি ছাড়িনি”। বিবাহবার্ষিকীতে মকবুল বিভিন্ন সাজের জিনিস দিয়ে কখনো ফুলের মতো বা কখনো অন্য কিছুর আকার বানিয়ে উপহার দিত সাবিত্রীকে। সারাবছর সাবিত্রীর তাতে চলে যেত। মকবুল কিকরে যেন আগে থেকেই সাবিত্রীর সব প্রয়োজনের কথা বুঝে যেত। সাতটা বছর ধরে যেন আলোর বন্যায় ভাসছিল তারা। প্রথম প্রথম তারা বাচ্চা নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কিছুতেই গর্ভধারণ করতে পারছিল না। ডাক্তারের কাছে যেতে তিনি কি যেন বড়োসরো একটা রোগের নাম বললো, আর তার নামের থেকেও বড়ো ছিল চিকিৎসায় খরচের অঙ্ক। স্পষ্টতঃই সাবিত্রী বুঝতে পেরেছিল যে তাদের কখনো বাচ্চা হবে না। খুব কেঁদেছিল তখন সে। মকবুল তাকে দুবাহুতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, “আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। একদিকে ভালোই হয়েছে। আমাদের এই টানাটানির সংসারে যদি সে আসতো তাহলে সত্যিই কি আমরা তার জন্য কিছু করতে পারতাম। তারচেয়ে একটা কাজ করলে হয়। আমরা যদি এক/দুজন পথশিশুর খাওয়াপরার দায়িত্ব নেই তাহলে কেমন হয়। হয়তো খুব বেশী কিছু করতে পারবো না। কিন্তু ওদের একবেলার খাবার, বছরে একবার জামা-কাপড় দিতে পারবো। তাতে তুমি একজনের নয় অনেকজন বাচ্চার মা হতে পারবে”। সাবিত্রী বললো, “কিন্তু মকবুল তাহলে তো আমরা কখনও টাকা-পয়সা কিছুই জমাতে পারবো না। যখন আমাদের বয়েস হবে বা ভগবান না করুক যদি আমরা অসুস্থ হয়ে যাই তখন তো আমাদের কাছে চিকিৎসার জন্যও পয়সা থাকবে না। তখন আমাদের কী করে চলবে মকবুল”। হেসে মকবুল বলেছিল, “ওসব চিন্তা আল্লাহর উপরই ছেড়ে দাও। যখন উনি আমাদের উপায় বলেছেন তখন দেখবে ওই উপায়কে পাওয়ার পথটাও উনিই বলে দেবেন”। মকবুল কখনোই সাবিত্রীকে ধর্মবিশ্বাস নিয়ে কিছু বলেনি। মকবুল বলতো সবই এক শক্তি সাবিত্রী। আমরা আমাদের মনের মতো তাকে সাজিয়ে নেই। তাই তাদের ভিন্ন ভিন্ন নাম ভিন্ন ভিন্ন আকার। সাবিত্রী মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল মানুষটির মানসিকতায়। নিজেকে মনে মনে গরীব হওয়ায় ভাগ্যবতী ভাবলো সাবিত্রী। ভাগ্যিস মকবুলকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছিল। আর্থিক ভাবে নির্ধন হলেও মানুষটি মনের দিক থেকে ছিল চরম ধনী। এরজন্য কতবার যে সাবিত্রী নিজের ঠাকুরকে ধন্যবাদ জানিয়েছে তার হিসেব নেই। 

একদিন এমনই পথশিশুদের খাওয়ানোর সময় কোথা থেকে এক বেপরোয়া লড়ি এসে চোখের সামনে রাস্তায় পিষে দিল মকবুলকে। সাবিত্রীর গোটা জীবনটা যেন সেখানেই শেষ হয়ে গেল। কতবার ভেবেছিল নিজেকে শেষ করে মকবুলের কাছে চলে যাবে। কিন্তু তখনই পথশিশুগুলোর মুখ ভেসে উঠতো তার চোখের সামনে। আজকাল তো তার মনে হয় মকবুল যেন তার আশেপাশেই কোথাও আছে। মকবুলের মনটা খুব শৈল্পিক ছিল। যখন কথা বলতো তখন যেমন গুছিয়ে বলতো তেমনই সব জিনিসকে জায়গামতো গুছিয়ে রাখতো যাতে হাত দিলেই পাওয়া যায়। যেমন গরমের সময় পাঁচবাড়ির কাজ করতে করতে বেশী জলঘাঁটার জন্যে সাবিত্রীর সারা পায়ে হাজা হতো। তখন মকবুল একটা হাজার মলম নিয়ম করে সাবিত্রীর মাথার বালিশের নিচে রাখতো যাতে সাবিত্রী হাত দিলেই পেয়ে যায়। শীতকালে তার জায়গায় স্থান নিত বোরোলিন। বিয়ে হওয়া ইস্তক এই নিয়মই চলে আসছে।

আজ ফিরতে বড্ড রাত হয়ে গেছে সাবিত্রীর। যে পথশিশুগুলোকে সাবিত্রীরা দেখাশোনা করতো তারমধ্যে বুলবুলি হলো সবচেয়ে ছোটো। বুলবুলিটা আজ হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পরেছিল। ঠিকে কাজগুলো শেষ করেই বুলবুলিকে নিয়ে ছুটেছিল ডাক্তারের কাছে। সব সেরে ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেছে তাই। রাত বেড়ে যাওয়ায় রাস্তায় মাতালদের আনাগোনাও বেড়ে গেছে। জোরে পা চালিয়ে হাঁটছে সাবিত্রী। এই তো এই মোড়টা পেরোলেই ওর বাড়ির রাস্তা পরবে। মোড়টা একটু অন্ধকার-অন্ধকার মতো। একটু ভয়ও করছে সাবিত্রীর। মোড়ের সামনে আসতেই হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে তিনটে লোক বেরিয়ে এলো। আপাদমস্তক টলছে তাদের। গা থেকে ভুরভুরিয়ে মদের গন্ধ বেরোচ্ছে। সাবিত্রীর বমি পেয়ে গেল ওই দুর্গন্ধ শুঁকে। সেটা দেখে তিনজনের একজন খ্যানখ্যানে গলায় বললো, “আরেব্বাস! ফুলটুসি…. এতো রাতে কোথায় যাচ্ছো। শরীরটা তো খারাপ মনে হচ্ছে। একটু এগিয়ে দেব নাকি বাড়ি পর্যন্ত‌”। সাবিত্রী গলায় জোর এনে বললো, “পথ ছাড়ো। নইলে…ভালো হবে না বলে দিচ্ছি”। আরেরজন বললো, “এই, এই ছেড়ে দে…ছেড়ে দে…নইলে এক্ষুনি ‘হালুম’ করে উঠবে রে”, বলে তিনজনই বিচ্ছিরি ভাবে হাসতে লাগলো। তৃতীয়জন ধমকের স্বরে বললো, “আমরা যাকে ধরি তাকে যে অত সহজে ছাড়িনা ফুলটুসি। ভালোয় ভালোয় মেনে যাও…নইলে তোমারই কষ্ট বেশী হবে”, বলে আরেক চোট তারা হেসে উঠলো। হাতের খালি মদের বোতলগুলো ফেলে দিয়ে এবার ওরা তিনজন সাবিত্রীর দিকে পায়ে পায়ে এগোলো। সাবিত্রী আবার ধমকে উঠলো, “ভালো হবে না বলছি। পেছনে যা। যেতে দে আমায়”। প্রথমজন সাবিত্রীর শাড়িতে ধরে টান দিলে দ্বিতীয় জন সাবিত্রীর পরনের ব্লাউজটাতে টান মারতে যেতেই হঠাৎই চোখমুখ বিকৃত করে কাটা কলাগাছের মতো ধপ্ করে রাস্তায় পরে গেল। লোকটি চিৎকার করে এলোপাথাড়ি হাত-পা ছুড়তে লাগলো। কিছুপরেই তার চোখ মুখ ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো। প্রথম জন এই দৃশ্য দেখে মারাত্মক চমকে সাবিত্রীর শাড়ি ছেড়ে কেমন একটা স্থবিরের মতো দাঁড়িয়ে পরলো। তৃতীয়জন এইসব দেখে ক্রমাগত চিৎকার করতে লাগলো, “এই পল্টু, এই টনি..কি হলো রে তোদের। কথা বলছিস না কেন”? বলতে বলতে সে তার স্থবির হয়ে যাওয়া সাথীর কাঁধে হাত দিতেই সঙ্গে সঙ্গে স্থবির লোকটি ভষ্মে পরিনত হয়ে গেল। তৃতীয়জন এইবার প্রচন্ড আক্রোশে সাবিত্রীর দিকে তেড়ে আসতেই কোথা থেকে এক ঘূর্ণি বাতাস এসে তৃতীয় লোকটিকে উড়িয়ে নিয়ে চলে গেল। সাবিত্রী এই সমস্তকিছু দেখে বেশ আতঙ্কিত হয়ে পরলো। হঠাৎই অন্ধকার মোড়টা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং রাস্তার ধুলোরাশি সরে গিয়ে সেখানে কিছু শব্দ ফুটে উঠলো, “ভয় পেয়ো সাবিত্রী। আমি মকবুল। আমি থাকতে তোমার কেউ কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। জীবিত থাকা অবস্থায় যেমন করে তোমায় আগলে রাখতাম মৃত্যুর পরেও তেমনি তোমায় আগলে রাখবো। তারপর যখন সময় হবে তখন দুজনের দেখা হবে মৃত্যুর ওপারে। মৃত্যুই শেষ নয় সবকিছুর.. সাবিত্রী আমি অপেক্ষা করবো তোমার জন্যে …..কিন্তু ততদিন পর্যন্ত তোমার পাশে থাকবো আমি…..এভাবেই”।  এবার সাবিত্রীর কাছে সবকিছু স্পষ্ট হলো। কিকরে বালিশের তলায় বোরোলিন আসলো বা কেনই তার চারপাশে মকবুলের উপস্থিতি মনে হতো। সেসবকিছুর উত্তর তার ক্রন্দনরত ঠোঁটে হাসি হয়ে ফুটে উঠলো।

  •  
    10
    Shares
  • 10
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •