• 49
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    49
    Shares

Kafe House Special Issue – 26

ফিরে দেখা ২০২০

Looking back: 2020

03.01.2021

 

A Special Gift for all our readers

2021 Calendar

Paintings by Subrata Gangopadhyay

Designed by TMS (Tomorrow’s Marketing Solutions). 

You can download this calendar here

মানুষ ডাকলে

আরণ‍্যক বসু

Abstract, Aged, Aluminum, Backdrop, Dirty, Grunge

( হৃদয় আমার প্রকাশ হল অনন্ত আকাশে… গীতবিতান/ পূজা-২০৮)

সকলের বুকে বৃন্দগানেই থেকো–
ও একুশ ,তুমি মহাকাশ হয়ে ডেকো !

দেখতে চাই না, মানুষের মাথা হেঁট ;
আর দেখবো না, অভাবের খালি পেট।

ভালোবাসা যেন ভালো থাকা হয়ে বাঁচে ,
সবার উঠোনে কিশোর বাউল নাচে ।
চাষির দুয়োরে রাখা মঙ্গলঘটে ,
শিশু ফুল দেবে–যেন এমনটা ঘটে।

সবার ফসল,কলকারখানা,
আমাদের সম্প্রীতি ;
পাহারায় থাকি,কাড়তে না পারে,
মুখোশের ভয়-ভীতি ।

একজনও যদি সুবিচারহীন ফেরে,
মা-প্রকৃতি যাবে দিগন্তরেখা ছেড়ে।

হারমোনিয়ামে ,বৃন্দগানেই ডেকো ;
ভালোবাসা তুমি সত্যি হয়েই থেকো।

মানুষ ডাকলে যেন রাস্তায় নামি ,
শুধু নতজানু প্রার্থনা হবো আমি ।

আমরা নতুন করে শ্যামলিমা
এঁকে দিই নিজের বুকের গভীরে… নয়তো, মরণের শীতলতা পেরিয়ে, শিমূল পলাশ কৃষ্ণচূড়া ফুটবে কেমন করে ? 

Head, Human Head, Half Profile, Portrait, Side View

সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং: মানসিক বিচ্ছিন্নতা, আমরা আর নির্বাসনের দণ্ডাদেশ

শমীক সেন

Depression, Loneliness, Man, Mood, People, Sickness

নতুন করে বিচ্ছিন্ন হবার কিছু নেই, বিচ্ছিন্ন আমরা হয়েই গেছি অনেকদিন, টের পাইনি শুধু। আর আজ আমরা যে পরিস্থিতির মুখোমুখি সেই পরিস্থিতি আমাদেরই মানসিক বিচ্ছিন্নতার ফল। ভেবে দেখুন তো কবে আমরা শেষবারের জন্য আমাদের চারপাশটাকে নিয়ে ভেবেছি? অন্তহীন লোভ, উগ্র স্বার্থপরতা, আগ্রাসী ভোগবাদ, বিবিধ লোলুপতার বশবর্তী হয়ে আমরা তো কবে থেকেই দ্বীপের মত ভেসে চলেছি জীবন নামে একটা বিরাট আদিঅন্তহীন জলের উপর দিয়ে। আমাদের পাশ থেকে পাখি সরে গেছে, গাছ গুটিয়ে নিয়েছে ছায়া, আমাদের অতীত নেই, নেই ভবিষ্যত, স্মৃতি নেই, সত্তাও নেই, আমরা শুধু ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ার ভয়, আমরা শুধুই সিংহাসন থেকে নবতর সিংহাসনে যাওয়ার বিবেকহীন ব্যগ্র আয়োজন। আমাদের ধমনীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চলেছে এই শিশ্নোদরপরায়ণ ইতর সভ্যতার বদরক্ত। তাই সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিংকে বিপুল ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে দেয় মেন্টাল ডিস্ট্যাংসিং। আমরা অনেক অনেক দিন ধরেই আমার আমিকে দুধেভাতে রাখবো বলে অপরের মুখ ম্লান করে দেবার প্রিয় অভ্যেস রপ্ত করেছি, আমরা এক ইমোজিসর্বস্ব পাগলাগারদের বাসিন্দা, আমাদের অশ্রুপাত একটা অর্থহীন সামাজিকতা, আমাদের প্রেম আমাদের মূল্যবোধহীন ইগোর পুষ্টি যোগানোর উপায়, আমাদের বিষাদ আমাদের আত্মসর্বস্বতার জমকালো ভাণ।

সব্জি কিনতে গিয়ে দেখি সমস্ত বাজার যেন একটা অশ্লীল মোচ্ছব। লাউশাকের দামটুকু জিগ্যেস করার ফুরসত পেলাম না, ঘাড়ের উপর থেকে আওয়াজ এলো সবগুলো দিয়ে দাও। পাশে মুর্গির দোকান। একজন ভদ্রলোক আটটা মুরগি কিনলেন তারপর একটা অপার্থিব এমনকি অলৌকিক লজ্জায় মুখচোখে প্রথম প্রেমে পড়ার অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে বললেন, মেয়েটা আবার চিকেন ছাড়া… যে লোকটিকে বললেন সেও একজন সম্ভাব্য ক্রেতা এবং ঐ আটটি মুর্গি বিক্রি হয়ে যাবার পর আর কিছু পড়ে ছিলো না। কিন্তু তাতে কী বা এসে যায় আমাদের উত্তমকুমারের, তিনি তো রেস জিতে গেছেন, সাফল্যের দড়ি ছুঁয়ে ফেলে পিছনে তাকাচ্ছেন সকৌতুকে। মজা, বীভৎস এক মজায় আমরা আকন্ঠ ডুবে আছি।

আসলে ঐ ডারউইনীয় প্রতিপাদ্যটিই বড় গোলমেলে, ঐ যে অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম আর যোগ্যতমের উদ্বর্তন। ঐ তত্ত্বের মধ্যেই নিহিত ছিলো বাজার অর্থনীতির নির্যাস, আমাদের সময়ের অন্ধকার আর ছায়াহীনতার উৎস। অথচ যে নিসর্গ থেকে অনেক অনেক দূরে সরে এসেছি আমরা, সেই রাজ্যে mutual coexistence বলেও একটা বস্তু আছে, যা বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষা করে এসেছে সৃষ্টির সেই ঊষাকাল থেকে।

আজ আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাভ নেই কমরেড, করোনা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখুন, কারন করোনায় মরে গেলে আপনার লাশের সৎকারের জন্য লোক পাবেন না আপনার নিকটজনেরা । হ্যাঁ এই নির্বাসনের দণ্ডাদেশ আপনি নিজের হাতেই লিখেছেন।

( বাবা বলতেন সবার হলে আমারও হবে। বাবা মারা গেছেন, মারা গেছেন বহুকাল)

Empty Moments

Gopal Lahiri

Daisy, Bellis, Multiannual Daisy, Tausendschön, Meadow

glass windows face the sunbeams,
pale fingers are over there
scratching the months and years,

screaming winds are sending their tails
and there is another dream building
in unopened letters, in blue envelopes,

hidden cries litter the empty chairs
phone calls are full of goodbyes
days and nights fill blank pages.

poison in the blood consumes the new rain,
shadows lick the wall like flames
in the silence of the morning.

in me no love, no dream, no desire
and everywhere ghost promises,
talk some sense perhaps in dead memories.

an earthly suffering that engulfs
the borders of the lane, the street,
the city and, finally distils even the time period.

ফিরে দেখা ২০২০

মুকুট রায়

Flower, Daisy, Meadow, White Flower, Bloom, Blossom

চলো না ফিরে দেখি একবার সেই ২০২০ বছর,
আমরা কি পেরিয়ে আসতে সত্যিই পেরেছি করোনার খপ্পর?
মনে এখনো জাগে কেন তবে সেই বিভীষিকা,
মন কাঁদে কেন আজও ভেবে স্বর্গগতের স্মৃতির লিপিকা?

পরিযায়ী শ্রমিকের দল যারা গেছিল পরবাসে,
ফিরতে পেরেছে কি তারা তাদের শান্তির নিজবাসে?
আকাশে ভাসে কেন আজও তাদেরি দীর্ঘশ্বাস,
অনাথ শিশুর কান্না মথিত বাতাস জানায় নেতাদের প্রতি অবিশ্বাস ।

কত তরুন হারিয়েছে তাদের চাকরি করোনার যাঁতাকলে,
ম্লানমুখে তারা ফেরে আজি,স্বপ্নভ্রষ্ট হয়ে দলেদলে।
দেশে উৎপাদন নেই, টাকার দর আজ নিম্নগতি,
দেশ চালানো মুস্কিল আজ তাই,দেশ কিনে নিয়ে যাকনা ঐ শিল্পপতি।

কত প্রবাদপ্রতিমরা এ বছর চলে গেল চোখের সামনে চোখের জলে,
আর কি কেউ পূর্ন করতে পারবে তাদের স্থান, জাগে প্রশ্ন মনে কুতুহলে।
যারা ভরেছিল আমাদের জীবন বিচিত্র সব নতুন ফুলে- ফলে
আজ তাঁদের অভাব বোঝা যায় জীবনের প্রতি পলে।

২০২০ বছর তো আমরা ফেলে এলাম পিছনে,
সত্যিই কি বদভ্যাস ভুলে মিলতে পারব মোরা, নতুন বর্ষের নতুন ভুবনে?

পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে একটা ছোট গল্প


হঠাৎ হোয়াটস আপে

ডঃ অভিনন্দন সেনগুপ্ত

Children Of Uganda, Uganda, Village, Vanity, Load

সেইদিন হোয়াটস আপে তার একটা পোস্ট।আমার কাছ থেকে সে আমার নম্বর নিয়েছিল তিনমাস আগে চেন্নাই থেকে ফেরার সময়ে; কিন্তু কোন ও দিন বিরক্ত করতে চায় নি বলে সে একটাও পোস্ট করে নি।মনোহর অর্থাৎ মনোহর বেহরা আমায় লিখছে ,”স্যার আমার ছেলেটা ভীষণ অসুস্থ এখন ই চিকিৎসা না করলে মারা যাবে।আমাদের গ্রাম থেকে কটকে নিয়ে যেতে হবে ।তাই যদি পাঁচ হাজার টাকা ধার দেন ,তা হলে উপকার হয়। আমার ভাইয়ের ব্যাংক আকাউন্ট টা পাঠালাম।”
আমাকে আমার ছেলের চিকিৎসার জন্য সপরিবারে চেন্নাইয়ের একটি প্রসিদ্ধ বেসরকারি হাসপাতালে সম্প্রতি যেতে হয়েছিল। প্রথমবার যাই গত নভেম্বর মাসে। তখন রাস্তা থেকে ধরে মনোহর ই নিয়ে গিয়েছিল বিশ্রাম লজে।কাস্টমার ধরে নিয়ে গেলে মনোহরদের কমিশন বাঁধা । সেই থেকে ওর সাথে আলাপ।মনোহর একজন মধ্য তিরিশের সুঠাম দীর্ঘদেহী একজন উৎকলবাসী যুবক।উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে দেশে কোনো কাজ না জোটায় কোন ও এক পাড়াতুতো কাকার হাত ধরে চলে এসেছে এই চেন্নাই শহরে। এখানে পূর্ব ভারত থেকে প্রচুর মানুষ রোগ উপশমে আসে বলে সেই সব রাজ্যগুলি থেকে অনেক যুবক এই লজ গুলিতে কাজ করতে আসে।অল্প কিছু মাস মাইনে তার সাথে পেশেন্ট পার্টি ধরে আনলে কিছু কমিশন ,এছাড়া থাকা খাওয়া পুরোদস্তুর ফ্রি ।বোর্ডার দের সুবিধা অসুবিধা দেখা ও ফাই ফরমায়েশ খাটা ই হল এদের মূল কাজ।মনোহর আর তার সঙ্গী আমাদের মেদিনীপুর জেলার বাসিন্দা দিলীপ এই দুইজনে মিলে বিশ্রাম লজের সমস্ত বোর্ডার দের ঝক্কি ঝামেলা সামলে আসছে হাসিমুখে।মনোহরের হাসিখুশি দিলখোলা স্বভাবের জন্যে একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল প্রথম থেকেই । একদিন মনোহর স্বাভাবিক কৌতুক বশতঃ বলেছিল ;-”স্যার আমাদের উৎকলবাসীদের জগন্নাথ ই শিখিয়েছিল মানুষের সেবা করতে ।”
দ্বিতীয়বার জানুয়ারী মাসে যখন ছেলের অপারেশন করাতে চেন্নাই যাই ,তখন সেই বিশ্রাম লজে ই থাকি।লজে যাওয়ার পর মনোহরের সাক্ষাৎ মেলেনি। দিলীপ একা ই সব কিছু সামলাচ্ছিল ,দিলীপ কে জিজ্ঞাসা করতেই সহাস্য উত্তর;-”স্যার মনোহরের ছেলে হয়েছে তাই দেশে গেছে।” শুনে মনটা যৎপরোনাস্তি পুলকিত হয়ে উঠল।সেবার প্রায় কুড়ি পঁচিশ দিন চেন্নাইতে ছিলাম। দশদিনের মাথায় মনোহর কাজে ফিরে এল।মনোহরকে দেখে জড়িয়ে ধরে বললাম ,”অনেক অভিনন্দন তোমায় ,বাপ হয়েছো মনোহর ।”’মনোহর সলজ্জ হাসি হেসে বলল ,”স্যার বউ বাচ্চাকে খেতে দিতে হবে তো ,তাই তাদের জগন্নাথের কৃপায় রেখে চলে এলাম।” সত্যিই এ এক অমোঘ বাধ্য বাঁধকতা ।
এর মধ্যে আমার ছেলের অপারেশন হল নির্বিঘ্নে ।জীবনের উপর দিয়ে একটা ঝড়ঝাপ্টা চলে গেল ।হাসপাতাল থেকে প্রতিদিন লজে ফিরতে অনেক রাত হত । কিন্তু রাতের খাবার মনোহর ঠিক জুটিয়ে রাখতো প্রতিদিন ।যেদিন হাসপাতাল থেকে ছেলেকে ছাড়বে ;তার আগের দিন মনোহরকে একটা এ সি ঘরের ব্যবস্থা করতে বলে দিলাম ।মনোহর দোতলায় একটা এসি ঘরের ব্যবস্থা করে রেখেছিল।ছেলেকে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করে দেবার পর তাকে লজে নিয়ে আসার পর কিভাবে লজের সরু সিড়ি দিয়ে দোতলায় নিয়ে যাব ভেবে পাচ্ছিলাম না । এমন সময়ে মুশকিল আসানের মত সম্মুখে হাজির হল মনোহর।পাঁজাকোলা করে অতি সন্তর্পনে ছেলেকে দোতালার ঘরে তুলে শুয়ে দিল সে। তারপর খুশি হয়ে দুই শত টাকা ।মনোহরকে বকশিস দিতে গিয়েছিলাম,মনোহর সেই টাকা ফেরত দিয়ে বলল ,”কাকা হিসাবে ভাইপো কে তুলে দিয়ে এই টাকা নিতে পারব না।বরং আপনি দাদা এই টাকাটা রেখে দিন ,যখন প্রয়োজন পড়বে তখন নিশ্চয় ই চেয়ে নেব ।”
তারপর আমরা বাড়ি ফিরে আসি।মনোহরের সাথে ফোনে যোগাযোগ ছিল। করোনা নামে এক ভাইরাস গোটা বিশ্বকে কারাগারে পরিণত করল ।মনোহরের আর ঘরে ফেরা হল না।সন্তানের মুখ স্বপ্নেই দেখে উদ্বিঘ্ন পিতা। এই হাসপাতালে রুগী আসা বন্ধ হয়ে যায়।মনোহরদের রোজগারে টান পড়ল ,শুধু থাকা খাওয়াটা কোনমতে পাচ্ছিল সে।এমন সময়ে পেলাম মেসেজটা।মনোহরের বাচ্চাটা গুরুতর অসুস্থ, তাই তাকে ভদ্রকের কাছে তাদের গ্রাম থেকে এই লক ডাউনের মধ্যে নিয়ে যেতে হবে কটকের হাসপাতালে ।আমি ও তাই মনোহরের কথামত টাকাটা তার ভাইয়ের ব্যাংকের একাউন্টে পাঠিয়ে দিলাম ।
না বাচ্চাটাকে বাঁচানো যায় নি।বাড়িতে অনেকদিন ধরে টাকা পাঠাতে পারছিল না মনোহর । অপুষ্টিতে স্তনদায়িনী মায়ের স্তন শুকিয়ে গেলে মৃত্যূ হয় শিশুটার । সে ভেবেছিল ছেলের ছয়মাস হলে আনন্দ করে অন্নপ্রাশন দেবে ,তা আর হল না।মূহুর্তে সমস্ত চরাচর শূন্য গর্ভ মনে হয় সেই পরোপকারি ছেলেটার। আমাকে ও যেন বিষাদ সিন্ধুর সুনামি গ্রাস করে নিল।

অচেনা আবর্তে

সন্দীপ গাঙ্গুলী

Amaryllis, Flower, Christmas, Blossom, Bloom, Flora
সমদূরত্বে একলা চলা মানুষ
স্মৃতির উজানে ছেড়ে যাওয়া নৌকার মত,
বৃক্ষবিহীন দীর্ঘ পথ ভ্রমনে
ছায়া সম্পর্কের বাঁধন আজ অতীত।
এক সময়ের সুতীব্র চাওয়ার ঠিকানায়
এখন সুখের পরবাসে অন্য বসতি,
জলের গভীরে হারিয়ে যাওয়া তটে
চেনা পদচিহ্নের আকর্ষণ।
ডুবে যাওয়া ধানক্ষেতে 
বয়ে চলে একলা বাতাস,
স্পর্শহীন ব্যাকুলতায়
চেয়ে থাকে নুয়ে পরা ফসলের দিকে।
ফিরে দেখার নিষ্ফল চেষ্টায়
গভীর থেকে অতলে নেমে যাওয়া,
জীবনের এই জটিল অংকে
নতুন আমি কে খোঁজার চেষ্টা।

নতুন দিল্লি ষ্টেশনে নেমে

বদরুদ্দোজা শেখু

Train, Railway, Old, Abandoned, Outdated, Railroad
 
দু’ঘন্টা দেরী ক’রে দুপুর নাগাদ
পৌঁছলাম নতুন দিল্লি ষ্টেশনে, আড়ষ্ট অবসাদ 
ঝেড়েঝুড়ে নামলাম ব্যাগ স্যুটকেস
নিয়ে, ধীরে সুস্থে পিছু যাওয়া পুরনো অভ্যেস ।
 
একনজরে দেখছি যে দিল্লি নগর—
রাজ পথে নেমে গেছে রেল -চত্বর
ব্যস্ত স্রোতের মতো মানুষের ভিড়ে
নানা যানবাহনের নকশী নিবিড়ে 
যাত্রী ধরছে লাল কুর্তার কুলি
আশপাশ থেকে এলো ভিক্ষার ঝুলি ,
ছুটে এলো অটো ভ্যান ট্যাক্সি দালাল
ঠিকা দরে দিলো কতো বিপরীত চাল
এমন-কি ব্যাগ ধ’রে টেনে নিতে চায়
নবাগত যাত্রীরা বড়ো অসহায়
বোঁচকাবুঁচকি সহ কোনোক্রমে দ্রুত
অদূরের রাজপথে হন  দ্রবীভূত।
বোঝা দায় কা’র কী যে কমিশন আছে–
হোটেলের নামধাম আওড়ায় কাছে
এসে কিছু লোক , দূর থেকে কিছু লোক
জনতার প্রতি হানে ঈগলের চোখ ,
পাঞ্জাবি-পাজামায় পাগড়ি ও দাড়ি-
ওয়ালা শিখ লোক দু’টো পার্ক করা গাড়ি
ঠেস দিয়ে হাতে খৈনি ছিলিম ডলে
একমনে, ডাকাতের মতো চোখ জ্বলে ;
ড্রাইভার বুঝি কিবা সন্ত্রাসবাদী
ইমতাম দৃষ্টিতে অর্থ বিবাদী।
একটি মারুতি লাল অতি আধুনিক
এসে ছেড়ে দিয়ে গেল রূপের বণিক
মহিলাকে, ফ্যাসানের দুরন্ত তাল 
তুলে হেঁটে গেল পাশ দিয়ে উত্তাল
ঢেউ-তোলা ঊর্বশী-আগুনের আঁচ
চোখ দু’টো ব’নে গেল শো-কেসের কাঁচ,
ঝলসানো দুপুরের নির্মম ধার
হীরের ছোঁয়ায় যেন হলো চুরমার
পিছু ধায় অসংখ্য পুরুষের চোখ
ক’লজে নিঙড়ে নেয় রূপের আরক
  বাতাসে বাজছে তার গমনের সুর,
এ ক্ষেত্রে কে-বা নয় পথের কুকুর ?
 
বিস্তৃত সীমানার বামপাশে বাস
ডান পাশে ছোট যান ছুটে হুসহাস
মাঝখানে ইটের রেলিং- ঘেরা লন
তাতে কিছু ফুলগাছ রচে আবেদন,
যানে ধায় জনস্রোত নগরীর বুকে
রৌদ্রে ধুঁকছি পোড়া পেট্রোল শুঁকে।
শব্দের ফুলঝুরি শুনি চৌদিকে
প্রধানতঃ অগম্য ভাষার নিরীখে
 বুঝলাম বাঙালীর শতাংশ কম।
বন্ধুরা এগোবার নিলো উদ্যম।
আমার আকুল চোখে চলমান রীল
 অগণিত দৃশ্যের ছবির মিছিল
কতোকিছু অভিনব দেখবার আছে,
দূরের পৃথিবী এলো দুয়ারের কাছে, 
সাগরে অবগাহন হবে  নিশ্চয়
মনের বিকাশ হবে , খুলবে হৃদয়।
পাবো কি সাক্ষাৎ তার ? যে আমার হবে
উদার হৃদয়-রানী মনে অনুভবে ?
কর্মযোগের সাথে এই ভাগ্যযোগ
জুটবে কি আদৌ আশু নিয়তি-অমোঘ ??

Publish Your Book with Kafe House 

Sell on Amazon and Offline-Stores 

Earn 100% ROYALTY

Hardbound with Jacket | Paperback 

Free E-book | Free-Distribution | Interview | Book Review | Advertising and Promotion

Mail us: insightfulsite@gmail.com

আন্দোলন এক নতুন যুগের সূচনা করে 

 রতন বসাক  (প্রাক্তন সৈনিক, ভারতীয় বিমান বাহিনী)

Ships, War, Line Art, Boats, Battle, Fight, Conflict
আমাদের সমাজে যার যত বেশি আছে, সে আরো ততো বেশি চায় নিজের আয়ত্তে সব কিছু করে নিতে । সে নিজেও জানে না কতটা পেলে সে স্যাটিসফাই হবে । সেইটাকে পেতে তার জন্য যদি কোন অন্যায় করতে হয় তাও সে করবে । যেন তেন প্রকারেণ নিজের কায়েমী স্বার্থটাকে সে বজায় রাখার চেষ্টা করে । অন্যান্য মানুষের তাদের স্বার্থটাকে সে বঞ্চিত করতে থাকে । 
 
সাধারণ মানুষ খুবই দুর্বল শ্রেণীর হয়ে থাকে । তারা সব সময় ভয়ে ভয়ে জীবন অতিবাহিত করতে থাকে । যদিও তারা নিরুপায় হয়েই এমন করে । আসলে তাদের করার কিছুই থাকে না কিংবা কোনো ক্ষমতাই নেই কিছু করার । অন্যায় সহ্য করতে করতে তাদের শক্তি স্তিমিত হয়ে যায় । তাই তারা সব অন্যায় চুপচাপ সহ্য করতে থাকে দিনের পর দিন । যদিও সব সহ্যের একটা সীমা আছে। 
 
এরপর দিনের পর দিন তাদের অধিকার খর্ব হতে থাকতে দেখে, তাদেরই মধ্যে থেকে কেউ না কেউ একদিন গর্জে ওঠে । নিজের অধিকারকে আওয়াজ করে বলতে থাকে । আর সেই গর্জে ওঠার আগুন ধীরে ধীরে এক এক করে ছড়িয়ে পড়তে থাকে সমাজে । আর শুরু হয়ে যায় এক আন্দোলন নিজের অধিকারকে পাওয়ার জন্য । আসলে অধিকার কেউ কাউকে দেয় না । অধিকারকে ছিনিয়ে নিতে হয় আন্দোলনের মাধ্যমে।
 
আন্দোলন হলো সাধারণ মানুষের এক অহম শক্তি । যার ফলে সমাজের সমস্ত মানুষ একসাথে হয়ে প্রতিবাদ করা শুরু করে । আর সেই আন্দোলনের ফলে আসে এক নতুন যুগান্তকারী দিনের পরিবর্তন সমাজে প্রত্যেকের জন্য । আন্দোলন সাধারণ মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে । আন্দোলন কোন অনৈতিক কিছু নয় । এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ তার প্রতিবাদ করে কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে আওয়াজ ওঠায় ।
 
আমাদের সমাজে এখনো দেখা যায় বিভিন্ন কর্ম ক্ষেত্রে, শ্রমিকদের বিভিন্ন অধিকার ও সুযোগ সুবিধার থেকে বঞ্চিত করছে মালিক শ্রেণীর লোকেরা । তাদের সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে আন্দোলনের প্রয়োজন হয়, নিজেদের সুযোগ সুবিধাগুলো ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য । বিভিন্ন রকম আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজে এক নতুন যুগের সূচনা হয় । তাই আন্দোলন করা অন্যায় বিরুদ্ধে এক নৈতিক অধিকার মানুষের ।

চাদর

সৌরভ মুখার্জি

Anna'S Hummingbird, Bird, Perched, Hummingbird, Animal

প্ল্যাটফর্মের এক্কেবারে শেষপ্রান্তে বুড়োটাকে একটা রংচটা বিছানার চাদর টানটান করে পেতে শুয়ে থাকতে দেখতাম রোজ। ঠিক রাধাচূড়া গাছটার নিচে। দিনের দিকে চাদরের ওপর উবু হয়ে বসে বিড়বিড় করত আর সন্ধ্যে থেকে ওই চাদরেই ঘুমোত। মাথা ভর্তি চুল, নোংরা দাড়ি। শতচ্ছিন্ন পাঞ্জাবি, তবে পাজামা নেই। বয়স ষাটও হতে পারে, নব্বইও হতে পারে। আর পাঁচটা পাগল বুড়ো ভিখিরির থেকে আলাদা কিছু না। আর ভিখিরি কবেই বা স্পেশাল হয়! কেউ দু-একটা পয়সা ছুঁড়ে দিত, কিংবা কেক-বিস্কুটের প্যাকেট একটা। কোনোদিন কেউই পাত্তা দিত না, বুড়োও কাউকে পাত্তা দিত না। নিজের চাদরে নিজের মত করে সংসার গুছিয়ে নিয়েছিল।

ওকে খেয়াল করেছিলাম ওর চাদরটার জন্যই। কোণটা একটু মুড়ে গেলে লাফিয়ে উঠে টানটান করে দিত। ব্যস্ত সময়ে অসতর্ক কোনো ডেইলি প্যাসেঞ্জারের বুটজুতো তার চাদর মাড়িয়ে দিলে রে রে করে গাল দিত। এমনকি ছুঁড়ে দেওয়া পয়সা চাদরের বাইরে পড়লে সেখানেই পড়ে থাকত, কখনো নিত না। তবে রাধাচূড়ার ফুল বা পাতা পড়লে সরাত না। চড়াই কি শালিক এসে বসলে তাড়াতো না, শুধু খ্যাক খ্যাক করে হাসত। আবার পাখিতে তার চাদরে এতটুকু নোংরা করলে বাপ-বাপান্ত করতেও ছাড়ত না। চাদরটুকুর বাইরের পৃথিবীর প্রতি যদিও কোনো ভ্রূক্ষেপ ছিল না, কিন্তু চাদরের মধ্যের সংসারে এতটুকু বেনিয়ম সহ্য করত না।

শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, ওই একই চাদর। গরমকালে চাদর বিছিয়ে উবু হয়ে বসে থাকত। কেউ একটা কেক কি বিস্কুট দিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে খেত। তারপর হাত ঝেড়ে ঝেড়ে চাদরটাকে পরিষ্কার করত। ট্রেন ঢুকলেই কড়া নজর রাখত, কেউ তার চাদর মাড়িয়ে না দেয়। শীতকালে দেখতাম সেটাকেই পা থেকে মাথা অবধি মুড়ে ঘুমোচ্ছে। দেখে মনে হত দুধপুলি। মাথা আর পায়ের দিকটা সরু, মাঝখানটা মোটা। ওই একটাই আসবাব তার জীবনে। কিংবা অলংকার। বর্ষায় চাদরটাকে টানতে টানতে রেলপুলিশের ঘরের সামনের ছাউনির নীচে টানটান করে পাতত। পুলিশকেও ভয় পেত না।

কিন্তু বুড়ো ভিখিরি, বেওয়ারিশ, পাগল। মাঝে মাঝে ওর চাদরপ্রেম দেখে বন্ধুদের সঙ্গে ইয়ার্কি করেছি এই পর্যন্তই। ট্রেনে ওঠার পর বা বাড়িতে ফিরে কোনদিন ওর কথা মনেও হয়নি।

কলেজ হোস্টেল থেকে বাড়ি ফিরছি বেশ রাতে। মফঃস্বলের শীত। স্টেশনের মিটমিটে হলুদ আলো আর কুয়াশা। বেশিরভাগেরই ঘরে ফেরার তাড়া। ট্রেন থেকে নেমে সামনেই দেখি রেলপুলিশের ঘরের সামনে চাদর মুড়ি দিয়ে বুড়ো শুয়ে আছে। মাথা থেকে পা অবধি মুড়ে পিঠে-পুলি হয়ে ঘুমোচ্ছে! সামনে কয়েকটা লোক। গুজগুজ করে বুড়োকে দেখছে। বুড়ো কিন্তু নিজেকে আপাদমস্তক চাদরে মুড়ে বেশ নিশ্চিন্তে চুপচাপ শুয়ে আছে।

সদ্য শেষ করা সিগারেটের গন্ধ লুকোনোর জন্যে স্টেশনে মিনিট পনেরো কাটাতে হবে। ভালোই হল, আমিও জুড়ে গেলাম ব্যাপারটা দেখতে।

ভেতর থেকে এক ভোজপুরী হাবিলদার আমাদের তাড়াতে দৌড়ে এল। “আরে ইঁহা ক্যা মেহফিল বৈঠা হ্যায়? যাও সব জাগাহ খালি করো।” লোকজন খানিক সরে গেল বটে, কিন্তু চলে গেল না। মফঃস্বল শহরে তেমন আ্যাডভেঞ্চার ঘটে কই! ভিড় একটু ফাঁকা হলে হাবিলদার কাকে যেন চিৎকার করে করে বলতে লাগল, “উসকা চাদর হাওয়া মে উড় গয়া থা। সেটা নিতে লাইনে নেমেছিল। তারপর মালগাড়ির ধাক্কায় ছিটকে পোস্টে লেগে সঙ্গে সঙ্গে মরে গেছে। ঘিলু নিকলকে উধার গিরা। লেকিন সবসে বড়া বাত, ছিটকে যাবার আগেই লাইন থেকে চাদরটাকে ঠিক বুকে তুলে নিয়েছিল।”

দিন তিনেক পরে কলেজ যাবার সময় দেখি বুড়ো ভিখিরির বসার জায়গায় আট-দশটা রাধাচূড়া ফুল। ওপরের গাছ থেকেই পড়েছে। তিন চারটে চড়াই ঠিক ওই জায়গাটায় পিড়িং পিড়িং করে লাফাচ্ছে।

ওরা কি বুড়োর শ্রাদ্ধ করছে? তাই হবে, ওরা ছাড়া আর কেই বা করবে!

শখ

গোপেশ দে


Glass, Structure, Abstract, Modern, Art, Background
ছ’ মাস হল চাকরি থেকে রিটায়ার্ড করেছেন অবিনাশ।এই ছ’ মাস যেন তার কাছে অনন্তকাল বলে মনে হয়।সারাদিন ঘরে বসে থাকেন একপ্রকার।স্ত্রীর সাথে একটু আধটু গল্পও করেন।তবুও যেন সময় কমে না।বড় ছেলেটা দু’মাস হল বিয়ে করেছে।কাজকম্ম বলতে কিছুই করে না সন্তু।চাকরি খুঁজে বেড়াচ্ছে দু’ বছর ধরে।কিন্তু একদিন দুম করে বিয়ে করে ফেলল।বউ নিয়ে চলে এল বাড়িতে।প্রেম করে বিয়ে।মেয়ের পরিবারের অমতেই বিয়েটা করে।তাইতো নিজেরাই মন্দিরে বিয়েটা সেরে আসে।বাবা মাকেও বলে না সন্তু।এক সকালে বউ নিয়ে সোজা চলে আসে সন্তু।বাবা মা দেখেই থ।তারপরে ব্যাপারটাকে স্বাভাবিক ভাবেই নেন বাবা মা।বউটি এমনিতে লক্ষ্মী।দেখতেও বেশ।শ্যামলা গড়ন গোলগাল মুখশ্রী।শাশুড়িকে রান্নায় সাহায্য করে।শ্বশুরকেও চা দেয় সকাল বিকেল।মুখটা হাসিখুশিই থাকে।

ছেলেটা সারাদিন টইটই করে ঘুরে হয়ত চাকরির সন্ধানে।বউটা এমনিতে খুব একটা কথা বলে না।রান্নাঘরের রান্নার কাজ হয়ে গেলে নিজের ঘরে গিয়ে টিভি দেখে।মাঝেমধ্যে গুনগুন করে গানও গায়।অবিনাশ আর গার্গীর কানে আসে।অবিনাশের শুনতে বেশ লাগে।বউমাটি বেশ হয়েছে।গান ভালোবাসে কিনা।এটাও ভাবে।

প্রায় রাতেই ছোটখাট চাপানউতোর আসে সন্তুর ঘর থেকে।অবিনাশ আর গার্গীর কানে আসে অস্পষ্ট কিছু বাক্য।দুজনের মুখই মলিন হয়ে যায় তখন।ঝগড়ার বিষয়টি তাদের কাছে কিছুটা স্পষ্ট।সন্তুর চাকরি নেই।কাঠ-বেকার।ফুসলিয়ে বিয়ে করেছে।হয়ত মেয়েটা শ্বশুরের পেনসনের টাকায় সংসার চালানোটা পছন্দ করে না।ঠিকই তো।কোন মেয়েই বা করে সেটা।নিজের বর কিছু না করলে হয় নাকি? আর মেয়েটাই বা কোন আক্কেলে এমন অপদার্থ ছেলেকে বিয়ে করল কে জানে? ছেলেটা নিশ্চয়ই অনেক বুজরুকি কথা বলে মেয়েটাকে এনেছে।নিজের ছেলেকে তো তিনি চেনেন।বাড়িটাও খুব একটা পছন্দসই না বোধহয় মেয়েটার।
সেদিন গার্গী বলেছিল অবিনাশকে , ‘বউমা ছাদে উঠতে ভয় পায়।’
তিনি বলেছিলেন, ‘রেলিং নেই বলে ? 
‘হ্যাঁ।’
আসলে রেলিং করবেন করবেন করে আর করা হয়ে উঠেনি তাঁর।সারাজীবন কেরানীগিরি করে গেছেন।তাই এই বাড়ি।তাতেই তার জেরবার।এখনো কিছু ধারদেনা আছে দোকানে।মাসে মাসে অল্প অল্প করে শোধ করেন।পেনসনের টাকায় পুরো সংসার।এদিকে বড় ছেলেটা আবার বিয়ে করে এনেছে।ছেলেটা কিছু আয় রোজগার করলে হয়ত রেলিং টা দিয়ে দিতেন।

ছোট ছেলেটা থাকে মহারাষ্ট্রে। হোটেলে কাজ করে।বছরে একবার দু’বার আসে।তাও অনেক বলে বলে আনতে হয়।সে তার মত থাকে।ফোন করলে দু মিনিট কথা বলেই বলে ব্যস্ত।নিজে থেকে ফোন করে না ঝন্টু।সংসারে কোনো টাকাও দেয় না।
আজ বিছানায় শুতে শুতে গার্গী বউয়ের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ টানে, ‘বউমা বোধহয় মদ খায় !’
‘কিভাবে বুঝলে ?’
‘আজ সকালে কথা বলার সময় মুখ দিয়ে বিশ্রী মদ মদ গন্ধ বেরুচ্ছিল।’
অবিনাশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেন, ‘চেপে যাও।বউমাকে কিছু বলতে যেও না।যা ভালো লাগে করুক।তুমি কিছুই জানো না এই ভাব নিয়ে থেকো।’
অবিনাশ চায় না সংসারে কোনো অশান্তি আসুক।বউমা মদ খাক, সিগারেট খাক সেতো আর তাদের দেখিয়ে খায় না।আর তাদের সাথে খারাপ আচরণও করে না।তাহলে শুধু শুধু ঝামেলা বাড়ানো কেন ? 
তিনি নিজেও টের পেয়েছেন বউমা মদ খায়।দু’তিন দিন মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে যাওয়ার সময় তিনি টের পেয়েছেন বউমাকে ‘চিয়ার্স’ বলতে।বাথরুমের পাশেই সন্তুদের বেডরুম।
তিনি খুশিই হয়েছেন।প্রতিদিন ওদের ঝগড়ার পর হয়ত এখানেই ওরা আনন্দ খুঁজে পায়।
অবিনাশ গার্গীর একটা হাত বুকের ওপর আনে।গার্গীকে তিনি বেশ ভালো ভাবেই চেনেন।ত্রিশ বছর হয়ে গেল একসাথে।তাঁর চেয়ে আর কে ভালো চিনবে ? গার্গী বউমাকে কোনদিন কটু কথা বলবে না।কোনো সংসারের কাজ না করলেও বলবে না।বউমা যদি কোনো অন্যায়ও করে তবেও বলবে না।শুধু রাতে ঘুমানোর সময় দু একটা অভিযোগ হয়ত আনবে তাঁর কাছে।
গার্গীর চেহায়ায় বয়েসী ছাপ যেন প্রবল হয়ে গেছে।চুলগুলো পেকে গেছে সব।তার বউ যে কতকাল সাজগোছ করে না সেটা সে প্রায়ই ভাবে।তার সাজার কোনো স্মৃতি মনে করতে পারে না অবিনাশ।
গার্গীর একটা হাত বুকে রেখে গল্প করতে চান অবিনাশ।কিন্তু গার্গী কিছু সময় পর ঘুমিয়ে পড়ে।

সারাদিন বাড়ি বসে থেকে থেকে অবিনাশের মনে হয় জীবনটা যেন শুকিয়ে যাচ্ছে।আজও তার মনে হচ্ছে।তার বড্ড ইচ্ছে করে গার্গীকে বলবেন, ‘চলো কাছে পিঠে কোথাও ঘুরে আসি।দূরে তো আর কোথাও ঘোরা হল না।’

গার্গীকে যখন বউ করে তিনি এনেছিলেন তখন গার্গী প্রায়ই বলত উত্তরবঙ্গ দেখার খুব শখ।বিশেষ করে ডুয়ার্স।শুধু হবে হবে বলেই কাটিয়ে দিলেন অবিনাশ ত্রিশটা বছর।কিভাবে ত্রিশটা বছর চলে গেল সেটাই এক বিস্ময় তাঁর কাছে।মনে হল এই সেদিন তিনি গার্গীকে ঘরে আনলেন বউ করে।ঘটা করে দুশ লোক বউভাতে খাইয়ে দিলেন।

গার্গী কপালের ঘাম মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে তার কাছে এল।অবিনাশ গার্গীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমার শখ আহলাদ পূরণ কিরতে পারলাম নাগো ?’
গার্গী খুব কোমল সুরে বলল, ‘কোন শখ আহলাদ গো ?’
‘ওই যে ডুয়ার্স দেখতে চেয়েছিলে।’
গার্গী গোপনে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ল, ‘ছাড়োতো এসব।সেই ছোটবেলার কি না কি পাগলামী।বাদ দাও।চা খাবে ? বিকেল হয়ে এল।’
এই জন্যই তিনি গার্গীকে এত ভালোবাসেন।এত মায়া তার প্রতি ইদানীং হয় অবিনাশের।তাঁর যে টাকার জোর নেই সেটা গার্গী জানে।তাই তাকে সান্ত্বনা দেয়।যাতে তিনি কষ্ট বুকে চেপে না রাখেন।তাঁকে হালকা করার চেষ্টা করে।গার্গী যেন এ সংসারের বটগাছ।

অবিনাশ ঘুরতে যাওয়ার জন্য কিছু টাকা অনেক আগেই একটা ব্যাঙ্কে ফিক্সড ডিপোজিট করে রেখেছেন।ফিক্সড-এ যা টাকা আছে তাতে সপ্তাহ খানেকের জন্য ডুয়ার্স ঘোরা হয়ে যাবে।গার্গী সে কথা জানে না।আজ বলবেন কি ? সন্তুতো আর এখন একা নয়।দুজন মনের মত ঘুরবেন।গার্গীর শখটাও পুরণ হল।
গার্গী চা দিতে দিতে বলল, ‘বউমার মুখটা কেমন যেন ভার ভার।তুমি তো দু’চারটে কথা বলতে পারো।হয়ত ওর বাবা মার কথা মনে পড়ছে।বেচারী !’
‘ঠিক আছে বলব না হয়।একটা কথা বলার ছিল।’
‘বলো।’
‘যাবে নাকি ডুয়ার্স ?’ অবিনাশ রহস্যময় ভঙ্গিতে তাকায়।
গার্গী তেমন বিস্মিত হয় না, ‘টাকা পাবে কোথায় ?’
‘কিছু টাকা একটা ডিপোজিট করে রেখেছিলাম ঘোরার জন্য।তোমাকে বলিনি।ভাঙলে যা পাব তাতে দুজনের ঘোরা হয়ে যাবে।’
‘কোথাও যেতে হবে না।টাকাটা রেখে দাও।এখন গেলে বউমা ভাববে রেলিং করতে পারে না ঘুরতে যায়।’
‘আরে যা আছে তাতে রেলিংও হয়ে যাবে আবার ঘোরাটাও।আমরা তো আর ফার্স্ট ক্লাস ট্রেনে যাচ্ছি না।সেকেন্ড ক্লাস।আর থাকব গিয়ে একেবারে লো জায়গায়।তাতে হয়ে যাবে।কেনাকাটাও করব না।দামী হোটেলে খাব না।শুধু একটু ঘুরব।’
গার্গী একটু হাসে, ‘তোমার যা খুশি।’
অবিনাশের মনটা আনন্দে ভরে যায়।ঘুরতে গেলে গার্গী কী যে খুশি হবে।গার্গীর শখটা পূরণ হবে যে।

‘বউমা।’
অবিনাশ বউমার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একটু কড়া নাড়ে।দরজাটা ভেজানো।
বউমা দরজা খুলে বলে, ‘আসুন বাবা।’
মেয়েটার মুখে হাসি ঝিলিক দিচ্ছে এখন।
‘সন্তু এখনো আসেনি বউমা ?’ অবিনাশ চেয়ার টেনে বসেন।
‘না বাবা।ও তো তিনটে সাড়ে তিনটেয় আসে।তারপর আবার চারটে পাঁচটেয় বেরিয়ে যায়।’
‘কোথায় যায় হতচ্ছাড়া ?’
‘ওর কোন এক বন্ধুর বাড়ি যায়।চাকরির ব্যাপারে।’
‘তোমার বাবা মা ভালো আছেন ?’
বউমা মুখটা নিচু করে বলে, ‘বাবা মার সাথে যোগাযোগ নেই।’
‘কেন ? বাবা মার সাথে ফোনে কথা হয় না ?’
‘ফোন করি।কিন্তু আমার বাবা খুব স্ট্রিক্ট মানুষ।বিয়েটা মেনে নিচ্ছ না।তাই কথা বলে না।’
এই কথার প্রতুত্তরে কি উত্তর দেয়া যায় ভেবে পান না অবিনাশ।কথা ঘোরায়, ‘এখানে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো মা ?’
‘না বাবা।ঠিক আছে।’
‘তোমার শাশুড়ি মা বলল তোমার নাকি মনটা খারাপ।’
‘ও কিছু নয় বাবা।আসলে কোথাও ঘুরতে যেতে পারি না তো তাই…’
অবিনাশ বললেন, ‘কোথাও ঘুরতে যেতে চাও ?’
‘হ্যাঁ।’
অবিনাশ কী করে এখন গার্গীকে নিয়ে ডুয়ার্স যাবেন ? বউমা কী ভাববে এতে ? আজকালকার যুগের মেয়ে ঘুরতে যাওয়ার বায়না থাকবেই। তার ছেলেটা যে অপদার্থ।কোনো কাজকম্মের বন্দোবস্ত না করেই বিয়েটা সারল।মেয়েটার দোষ দিয়ে হবেটা কী ? তিনি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, ‘কবে যেতে চাও ?’
বাবা ঠিক বুঝলাম না।
‘আমি টাকা দেব।যাও ঘুরে আসো ডুয়ার্স সন্তুকে নিয়ে।তবে মা সেকেন্ড ক্লাস ট্রেনে যেতে হবে কিন্তু।আমার দেয়ার মত যা  আছে তাতে একটু কষ্টে সৃষ্টে বেড়াতে হবে মা।’ অবিনাশ একটু হাসলেন।চোখের কোণায় একটু জলও এল।
‘কী যে বলেন না বাবা।আপনি টাকা দিচ্ছেন এটাই তো অনেক।টাকা তো আমার বরের দেওয়া উচিত।বাবা চা খাবেন ?’
মেয়েটার ‘চা খাবেন’ কথাটা শুনে বুকটা জুড়িয়ে গেল, ‘দাও মা এক কাপ।’

বিকেলে রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা মাঠের কাছে গেলেন তিনি।বাচ্চা ছেলেরা ফুটবল খেলছে।অনেকদিন গভীর মনোযোগে বাচ্চাদের খেলা দেখেন না তিনি।আজ দেখতে লাগলেন, এই দিনটা তাঁরও গেছে।তাঁর মনে হচ্ছে বাচ্চাদের দলে তিনি ভিড়ে যাবেন।হৈ-হুল্লোড় করে খেলবেন তিনি।ঠিক বাচ্চা হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে তাঁর।পৃথিবীর বুকে একটা হারানো জীবন খুঁজে নিতে ইচ্ছে করছে।মনে হচ্ছে তাঁর আপন বলতে এই ছেলেগুলি।যাদের সাথে সারাদিন খেলবেন, গল্প করবেন।এতদিন তিনি কিসের মধ্যে ছিলেন ? এত সুন্দর বাচ্চাদের খেলা কেন তার চোখে পড়েনি এতদিন? কোথায় ছিলেন তিনি ? শুধু কাজ আর কাজ ? তিনি হাঁটতে হাঁটতে গেলেন বাচ্চাদের মাঝে।বাচ্চা ছেলেগুলো খেলায় নিয়েও নিল তাঁকে।তিনি ঝুঁকে ঝুঁকে বলের কাছে দৌড়াতে থাকেন।ছেলেগুলো মজা করে পা দিয়ে তার গায়ে বল ছুঁড়ে মারে আর হাসে।আহ! কী মজা ! তার গায়ে বল মেরে কী মজাই না পাচ্ছে বাচ্চাগুলো ! পাক না মজা।ওদের মজাই তো তাঁর মজা।তাঁর গায়ে বল মেরে মজা পেলে আরো মারুক।তিনি নিজেই বললেন, ‘এই যে আমার দিকে মার তো বাছারা।’

বাচ্চাদের কেউ কেউ বলল, ‘তুমি তো দৌড়াতেই পারো না দাদু।’
‘তাতে কি আমার গায়ে বল মার।’
আকাশ ভেঙে কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি এল। ছেলেগুলো বৃষ্টিতে যেন আরো আনন্দ পেয়ে গেল।তিনিও বৃষ্টিতে ভিজে সন্ধ্যা অবধি খেলে বাসায় ফিরলেন সন্ধ্যাটা পার করে।রাতেই বেশ জ্বর ঝেঁকে এল।শরীর কাঁপতে লাগল।কিছুই খেতে পারলেন না।
গার্গী বিছানায় শুয়ে কপালে জলপট্টি দিতে থাকে একমনে।
তিনি গার্গীর একটা হাত বুকে রেখে বলেন, ‘তোমাকে বোধহয় ডুয়ার্স নিয়ে যেতে পারব না।’
‘সে আমি কি বলেছি নিয়ে যাও।বুড়ো হয়েছি।এখন আর ওসব দেখে কি হবে বলো।’
অবিনাশের চোখের কোণায় জল এসে যায়, ‘না আসলে আমার বউমাকে ঘুরতে যাওয়ার জন্য টাকা দেব।ওর খুব ঘোরার শখ।তাই তুমি মনে কিছু কোরো না।’
‘না।মনে কিছু করছি না।’
তিনি জানেন, গার্গী মনে কিছুই করবে না।সারাজীবন সংসারটাই করে গেছে।বিশেষ কিছুর জন্য কোনদিন চাপ দেয়নি তাঁকে।
আজ অনেক গল্প করতে ইচ্ছে করছে তাঁর।প্রতিদিনই করেন।গার্গী তাঁর কোনো গল্পই পুরোটা শুনবে না।শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে সে।সারাদিন খাটা-খাটনি করে কিনা।অথচ বিয়ের পরপর কত গল্প শুনতে চাইত গার্গী।আর তখন অবিনাশের চোখ জুড়ে ঘুম আসত।হয়ত গার্গী রাত জেগে থাকত তখন আর তিনি ঘুমাতেন।আর এখন গার্গী ঘুমায় তিনি রাত জেগে থাকেন।আজ অনেক গল্প করবেন তিনি।তাঁর মনে হচ্ছে আয়ু ফুরিয়ে আসছে।পৃথিবী যেন বিদায় জানাচ্ছে তাঁকে।গার্গী বিধবা হলে কেমন লাগবে দেখতে ? ছোট ছেলেটা একেবারে স্বার্থপর হয়ে গেল।একটা টাকাও পাঠালো না আজ অব্ধি।যোগাযোগও খুব রাখে না।সেখানে বিয়ে কিরেছে কিনা কে জানে ? খুবই চাপা স্বভাবের।বিয়ে করাটা অবিশ্বাস্য নয়।গার্গী একা সামাল দিতে পারবে তো? বড় ছেলেটা একেবারে ভ্যাগাবন্ড।চাকরি খোঁজার অজুহাতে বাইরে বাইরে থাকে।বউমা হয়ত নিজের ভুলের জন্য কাঁদে।
বড় ছেলেটার একটা চাকরি হলে কিছুটা নিশ্চিন্ত হতেন তিনি।বউমার মুখে হাসি ফুটত।রাতে দম বন্ধ হয়ে মরে যাবেন নাতো আবার ? মাথাটা প্রচন্ড ব্যথা করছে।এ যাত্রায় বাঁচবেন কি ?  জীবনীশক্তি বোধহয় ফুরিয়ে আসছে।

সারারাত এলোপাথাড়ি স্বপ্ন দেখে রাতটা পার হল অবিনাশের।সকালে ঘুম ভাঙলে বুঝতে পারেন না সময়টা কত ? এক ফালি রোদ জানলা দিয়ে বিছানায় এসে পড়েছে।রোদের তেজটাও ঝাঁঝালো।তারমানে সকাল গড়িয়ে দুপুর কি ? তিনি উঠে বসলেন।একটু ভালো লাগছে এখন।
গার্গী হাসি হাসি মুখ করে রুমে এল।গার্গীর মুখে হাসি দেখলে বুকটা জুড়িয়ে যায় আজকাল তাঁর।
‘ওগো খুশির খবর !’
‘কী ?’
‘তুমি দাদু হচ্ছ।আর আমি ঠাম্মা।’
‘বাহ ! খুব ভালো খুব ভালো।সন্তুকে একটু মিষ্টি আনতে পাঠাও না ? আমার পকেট থেকে একশ টাকা দাও ওকে।’বুকটা যেন জুড়িয়ে গেল কথাটা শুনে।তিনি দাদু হবেন এ যে বড়ই খুশির খবর।পৃথিবীটাকে একটু রঙিন লাগতে শুরু করছে।
‘আর বউমা এখন ডুয়ার্স যাবে না।বলেছে আমাদের ঘুরে আসতে।’
‘বউমা কিভাবে বুঝল আমরা ডুয়ার্স যাওয়ার প্ল্যান করেছি।’
এমনিই হয়ত বলেছে।গার্গীর হাসে সরে না মুখ থেকে।
অবিনাশ পা নাচালেন, ‘তা যাবে নাকি ?’
‘পাগল ! ওই টাকা দিয়ে আমার দাদু ভাইয়ের জন্য সোনার কিছু একটা গড়াব।’
‘কিন্তু তোমার শখ ?’
‘আমার শখ এখন দাদু বা দিদিভাই যেই আসুক ওকে সোনার একটা কিছু দেয়া।’
অবিনাশের বুকটা সত্যি ভরে ওঠে গার্গীর কথা শুনে।শখ আহলাদ নিয়েই তো মানুষ বেঁচে থাকে।তিনি ভাবেন, গার্গী ঘুমোবে রাতে ঘুমাক।তিনি নাতী নাতনী যেই হোক তাকেই রাতে নিজের কাছে রেখে গল্প বলবেন।এই তো আর ক’টা বছর।দেখতে দেখতেই যাবে।তাঁর যে অনেক গল্প জমে আছে।জীবনীশক্তি যেন বেড়ে যাচ্ছে তাঁঁর।

ফিরে দেখা

মধুমিতা রায় চৌধুরী মিত্র

Clock, Alarm Clock, Watch, Time, Old, Numbers, Hours
ঘড়ির কাঁটা বলছে এবার, নিতে হবে বিদায়–
লেখা থাকবো কোন এক অবহেলার ইতিহাসের পাতায়!
সহ্য খানিক করে নাও, আমার শেষ এই কয়েক মুহূর্ত।
জানি, আমি জানি, হবে না কেউ কোথাও, আমার জন্যে বেদনার্ত।
 
ভেবেছ তোমরা আমাকে এক দুঃস্বপ্নের সময়!
“বিশের-বিষ” নাম দিলে তোমরা আমায়।
পাওনি তোমরা আমার থেকে কোনো শুভাশীষ!
প্রতিটি বিশ্ববাসীর কাছে হলাম আমি শুধুমাত্র একটি “বিষ”।
 
সত্য করে বলতো তোমরা, কখনো কি পেয়েছ এমন শান্ত ধরা?
পেয়েছ কি এমন নীল আকাশ যেখানে নেই দূষণের কণা?
কখনো কি পেয়েছ এমন স্বচ্ছ নীল পবিত্র গঙ্গা? 
ভেবেছ কি সেই জল দিয়ে তোমরা মেটাতে পারবে তৃষ্ণা?
 
পেয়েছ কি কখনো এমন অবকাশ?
করেছ কি দীর্ঘদিন সকল পরিবার সমেত একত্রে বাস?
দেখেছ কি কখনো রাজনীতির রঙগুলি কাজে নেমেছে এক সাথে?
পেয়েছ কি এমন সমাজ যেখানে লুঠপাট কমেছে কিছু হারে?
 
 
দেখছ কি এমন শুনশান পরিছন্ন পথঘাট?
পেয়েছ কি কখনো এমন পৃথিবী, যেখানে শব্দ দুষণও হয়েছে লোপাট?
দেখেছ কি কখনো, পশুরা নির্ভয়ে ঘুরছে রাস্তায়?
দেখেছ কি, মন্দির মসজিদ ছেড়ে মানুষ বিশ্বাস রেখেছে নিজ হৃদয়ে?
 
তোমরা দেখেছ আমার সময় এক মারণরোগের নৃত্য!
এ’কথা কি ভেবেছ, তোমরা হয়েছ স্বাস্থ্য সচেতন নিত্য?
দেখছ কি তোমরা কমেছে খানিক হলেও অন্য রোগের রুগী?
শুধুই তোমরা মেপে গেলে, দেখে গেলে করোনার দাপাদাপি?
 
হয়তো আমার দোষে কর্মহীন পরিযায়ী শ্রমিকের পথচলা,
আমার দোষেই, লাখো মানুষ আজ কর্মহীন, সমাজ হল বেকারে ভরা?
আমার সময় খসে গেল কত উজ্জ্বল নক্ষত্র– 
প্রাকৃতিক নিয়মের মৃত্যু,এও কি লাগে তোমাদের বিচিত্র?
 
যাইহোক, আর কিছু মুহূর্ত কেবল বাকি–
তোমাদের থেকে বিদায় নিলে আমিও খানিক বাঁচি!
আমার জন্য, তোমাদের বিপরীত পরিবেশে বাঁচার যুদ্ধ!
আশা রাখি, শেষ হবে এই লড়াই, উঠবে “একুশের” নতুন সূর্য!!

বন্দীজীবনের ইতিবৃত্ত

সুদীপা মন্ডল

Pocket Watch, Watch, Timepiece, Clock, Accessory

জীবন এক বয়ে চলা নদী
আছে ভাঙা, আছে গড়া
সুখ-দুঃখ মিঠেকড়া নিরবধি।
অবিরত চলা, আসুক যতই বাঁধা
থাকে উজ্বল,সদা উন্মুখ ভালোবাসার প্রতি।
তবু মাঝে মাঝে জীবন জুড়ে ওঠে ঝড়,
এলোমেলো করে সাজানো,গোছানো ঘর

বন্দী মন,বদ্ধ ঘরেই চলায় তার আবর্তন।
ঝড়ের দাপটে ভেঙে যায় কিছু সজীব স্বপ্ন
অসহায় জীবন বয়ে নিয়ে চলে এক অন্য গল্প।
বন্দী জীবন কেড়ে নেয় রুজি, অদৃশ্য হয় রুটি
পরিয়ায়ী জীবন নামে পথে, নতুন সংগ্রামে।

জঠরে ক্ষুধার জ্বালা,মনে হতাশা
বাড়ায় পা এক অজানা পথে।
আসে মৃত্যু, হয় জন্ম পথকে ঘিরে
লেখা হয় নতুন জীবনের ইতিবৃত্ত।
আর, আছে যারা ঘরে বন্দী,

নিজেকে বাঁচাতে রচে নানান ফন্দী
জেগে ওঠে কিছু পুরোনো স্মৃতি,
তোমার -আমার মাঝের কিছু প্রেম-প্রীতি।
কিছু সম্পর্ক পায় নতুন বুনন,
কিছুর হয় আত্মহনন,
চলছে রংবদলের অভিনব খেলা
বদ্ধ ঘরে সারাদিন, সারাবেলা।

তবু বাঁধি হাজারো আশা
বন্দী জীবনকে ঘিরে নতুন ভরসা
আগামীতে কাটবেই এই অমানিশা।
জীবন দেখাবেই তোমাকে,আমাকে
এক নতুন পথের দিশা।

 দেবতা নই- আমি অসুর

দেবদত্ত চট্টরাজ

Abstract, Art, Background, Paint, Texture, Colorful

(গল্পটি আমার স্বরচিত। বাস্তবের সাথে এর কোন মিল নেই। পাঠক/পাঠিকাদের কাছে অনুরোধ এই গল্পে বর্ণিত চরিত্র এবং তাদের মানসিক অবস্থাকে নিছক একটি কাল্পনিক গল্প পড়ার মত করে নেবেন। আপনাদের ভাবাবেগ আঘাত করার কোন অভিপ্রায় আমার নেই।  )
 

পর্ব ১

– হে নন্দদুলাল, এ আপনার কেমন লীলা ? যেথা আপন ভ্রাতাকে গোপন করিতে হয়। আপনার……হটাৎ একটা বিষম খেয়ে জোরে কেশে ওঠে প্রভাত। 

– কাট্ কাট্।

আচ্ছা মুশকিলে পড়া গেল তো মশাই। বলি এই যে  ছোকরা। বলছি থিয়েটার কি এই প্রথম না কি ?

– আজ্ঞে স্যার। আরো কিছু বলতে যাওয়ার আগেই আবার সে বিষম খেয়ে প্রায় নাকের জলে চোখের জলে হয়ে যায়। 
 
সোনালী রঙের ফ্রেমের চশমার ভেতর থেকে ডিরেক্টর ত্রিনাথবাবু তখন সুচারুদৃষ্টিতে প্রভাতকে জরিপ করছেন। ছেলেটা দলে নতুন, তারপর সে এসেছে কোন এক নাম না জানা গাঁ থেকে। তাই প্রথম যেদিন সে আসে, সেদিনই মুখ খানা পানসে হয়ে  গিয়েছিল ত্রিনাথ বাবুর। অবশ্য তিনি প্রথম থেকেই বেশ বাধা দেন,কিন্তু তাতে সেরকম তিনি বিশেষ কিছু সুবিধে করতে পারেন নি। এই থিয়েটার গ্রুপের গত বছর একটা ওয়ার্ক শপে নাকি ছেলেটা বিভীষণের রোলে পুরো ফাটিয়ে দিয়েছিল। থিয়েটার গ্রুপের ম্যানেজিং বডিতেও নাকি সে কথা পৌঁছে যায়। তারপর আর কি; সোজা বল্লভপুর থেকে মহানগরের সেরা থিয়েটার গ্রুপ  শাম্বতে এন্ট্রি। ভাবা যায়……

তবে ছেলেটা যে মোটের ওপর খারাপ না সেকথা তিনি ও ভালোই বোঝেন। কিন্তু………এমন সম্ভব কি করে? 

এই  থিয়েটার গ্রুপে আজ অব্দি কোন অভিনেতা তার কাছে অভিনয় না শিখে চান্স পাইনি। লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে নামি দামি সব একাডেমিতে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকলে তবে গিয়ে পাওয়া যায় শাম্ব থিয়েটারে একটা ছোট রোল। আর এই ছোকরা কি না………..  
কিন্তু কিছু বলাও  যাবেনা। থিয়েটারের যা অবস্থা, তাতে করে শ্রীকান্ত আগারওয়ালের টাকা ছাড়া আজ শাম্ব হয়তো হেরিটেজ হয়ে যেত এতদিনে। লোকটা অসম্ভব থিয়েটার ভালোবাসে। তাই আজও ত্রিনাথ বাবু তার সৃষ্টিকে বাঁচাতে পেরেছেন। তবে এই আগরওয়াল একদিন ওয়ার্কশপে গিয়ে  কি যে  এমন দেখলো ছেলেটার অভিনয়। তা তিনি ভেবে পান না। ফিরে এসেই নাকি বলে দিয়েছেন,

– ত্রিনাথ বাবু একঠো লাড়কা আছে। আহা কি অভিনয় করে। একদম ন্যাচারাল। আমি এমন একটাও দেখিনি। 
ত্রিনাথবাবু সেদিন মুচকি হেসে মনে মনে ভেবেছিলেন ক’টাই বা থিয়েটার দেখেছেন।
কিন্তু তারপরেই সেই কথাটা পেড়েছিলেন ভদ্রলোক

– আচ্ছা ত্রিনাথ বাবু আপনি তো একঠো থিয়েটার করবেন বোলছিলেন না। কি যেন ছিল…. উঁ উঁ..হাঁ মনে পড়ে গেছে কৃষ্ণা সোহাদার।

– না না। সোহাদার নয় ওটা সহদর। মানে হল গিয়ে ভাই। কৃষ্ণের ভাই।

একগাল হেসে শ্রীকান্ত আগারওয়াল বলেছিলেন হাঁ হাঁ বহি। তো সহদোর বানান না

চক্ষু চড়কগাছ করে ত্রিনাথ বাবু জিজ্ঞেস করেছিলেন কাকে ?

– বহি হামার পছন্দের ছেলেটাকে। তারপর হাতদুটো পরম ভক্তিতে জোড় করে বলেছিলেন আহা। কৃষ্ণার ভাই বলরাম। দারুণ মানাবে।

উনার মুখের প্রশস্ত হাসিটার মধ্যে এতটাই জোর ছিল যে ত্রিনাথ বাবু আর কিছু বলে উঠতে পারেন নি। কিন্তু তিনি নিজের ভাষা হারিয়েছিলেন। তাঁর সারা জীবনের স্বপ্ন হল কৃষ্ণ সহদর। এই থিয়েটারটা তিনি মঞ্চস্থ করে দু হাত দিয়ে কুড়োতে চান আপামর মানুষের ভালোবাসা। তাঁর নাম যে অমর হয়ে রয়ে যাবে এই যাত্রার হাত ধরে। এর নাট্যরূপ, সংলাপ , শব্দ চয়ন থেকে শুরু করে……..এর কাস্টিং যে তার আগেই ভাবা হয়ে গেছে। এই রোল যে করবে সে যে রাতারাতি হয়ে উঠবে বাংলার সেরা স্টার। তিনি সেটা ভালো ভাবেই জানেন। সেজন্যেই এই থিয়েটারের আসল চরিত্র যে তিনি বহু আগেই বিকিয়ে দিয়েছেন পুরো পঞ্চাশ লক্ষ টাকায়। আর দেবেন নাই বা কেন। কি আছে এই থিয়েটারে। কত টুকুই আর পারিশ্রমিক পান তিনি। এর থেকে তো ওই ম্যাড়ম্যাড়ে সিরিয়ালের পরিচালকরা অনেক বেশি কামায়। কিন্তু তিনি পারেন নি। এত বছর  অভিনয়কে যে তিনি সাধনা ভেবেছেন । তাই পারেন নি। কিন্তু এই প্রৌঢ়াবস্থায় এসে যেন তার ধ্যানভঙ্গ হয়েছে। তার মনেও এসেছে লোভ। এই লোভ দুর্দমনীয়। এই লোভ যশের, এই লোভ অর্থের। তাই বলরামের রোলটা টাকার বিনিময়ে বিকিয়ে দিয়েছেন  বিখ্যাত ডায়মন্ড জুয়েলারি দোকান ভৌমিক ব্রাদার্সের কর্ণধারের একমাত্র পুত্র অল্পেশ ভৌমিককে। ছেলেকে যে সুপারস্টার হতে দেখাটা বাবার অবসেশানে দাঁড়িয়ে গেছে সেটা তিনি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু এখন তিনি কি করে এর থেকে পরিত্রাণ পাবেন ? এই সব লোক যে খুব সুবিধের নন তা তিনি হাড়ে হাড়ে বোঝেন। তাই সেদিন শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে থেকেও  ভয়ে ওঁনার প্রাণ শুকিয়ে গিয়েছিল। মাথায় জমেছিল বিন্দু বিন্দু ঘাম।

প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে থিয়েটারের হর্তাকর্তার এই অবস্থা শুনে অলোকরঞ্জন ভৌমিক তো হেসেই আধমরা। অনেক কষ্টে তারপর নিজের হাসিতে খানিক নিয়ন্ত্রণ এনে তিনি একটা সিগারে বার কয়েক জোরে টান মেরে কেটে কেটে বলেছিলেন, 

-আপনাকে অনেক সম্মান করি ত্রিনাথবাবু। তাই আজ প্রথমবার বলে সেরকম কিছু বলছিনা। তবে জেনে রাখুন অল্পেশ যদি রোলটা না পায় না। তাহলে আপনি যে আর থিয়েটার করবার মত অবস্থায় থাকবেন না । সে বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত থাকুন।

একটা বদ্ধ ঘরে বসে ত্রিনাথবাবু সেদিন যেরকমের অপমানিত বোধ করেছিয়েন হয়তো তার পুরো জীবনেও করেন নি। কিন্তু কেন জানি না সেই অপমান তার মজ্জায় আঘাত করতে পারেনি। আকস্মিক এই বিপুল অর্থলাভে তার বিলাসবহুল ফ্ল্যাট আর দামি গাড়িটা তার মধ্যে লজ্জা নামক বস্তুটির ছিটেফোঁটাও আস্ত রাখেনি। উল্টে তার মনে সঞ্চার করেছিল রোষ। এক এমন ঈর্ষা যা তাকে এই গ্রামের ছেলেটির আপ্রাণ চেষ্টা বা  পরিশ্রমকে তার চোখেই পড়তে দেয়নি। এ যেন অর্থলোভের চালসে তার একদা বিচক্ষণ দৃষ্টিকে পুরোদস্তুর ঢেকে ফেলেছে।

ত্রিনাথবাবু একটা হুৎকার ছাড়লেন।

বাইরের একটা ছেলে এসে কিনা একটা মেন রোলে। এই ব্যাপারটা অনেকেরই দৃষ্টিকটু লাগছিলো। তবে ত্রিনাথ বাবুর এই হুৎকার যেন সেই ঈর্ষাতে ঘৃতাহুতি দিল।

থিয়েটার টিমের মধ্যে থেকে গুজগুজ ফুসফুস শব্দ যেন সুর চড়ালো। খানিক গলা ঝেড়ে নিয়ে সাত্যকী বলে উঠলো, স্যার বাইরের ছেলে নিলে এটাই হয়।এরা তো আর কোন কিছুই শিখেনি। সবটাই ওই শখের বসে। আপনার কাছ থেকে যেমন আমি এতদিন…….. 

সুযোগ বুঝেই যেন সে তেল দিতে শুরু করেছে দেখে ত্রিনাথবাবু খানিক স্বমহিমায় ফিরে এলেন। খানিক জোর গলায় তার উদ্দেশ্যে বলেন, হ্যাঁ তা বৈকি। আমার কাছে নেই নেই করে বছর সাতেক কাটালে। কিন্তু কৈ। শিখলে কি কিছু। আজও তো একটা মনোলগ মুখস্থ হয়না। আবার বড় বড় কথা। 

সাত্যকীর মুখখানা নিমেষে নিষ্প্রভ হয়ে গেল। সে মাথা নিচু করে নিজের জায়গায় ফিরে গেল। 

ত্রিনাথবাবু এবার চোখদুটো ছোট ও তীক্ষ্ণ করে এগিয়ে গেলেন প্রভাতের দিকে। একবার আপাদ মস্তক জরিপ করে তিনি দেখলেন অপমানটা হয়তো একটু বেশিই করা হয়ে গিয়েছে। মাথা নিচু করে ছেলেটি জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর ওর ডান হাতের কড়ি আঙুলটি থেমে থেমে কাঁপছে। 

ত্রিনাথবাবুর যেন বুকটা কেঁপে উঠলো। আজ থেকে সেই সাতাশ বছর আগের কথা তার নিমেষে মনে পড়লো যখন নিদারুণ থিয়েটার থেকে তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিল সেখানের গেট কিপার। কি অপমানটাই না হতে হয়েছিল তাকে । কিন্তু সেবার তার অপমানটা হৃদয়ে আঘাত করেনি। কারণ তখন তিনি থিয়েটারকে ভালোবাসতেন। নাটক যে একটা শিল্প,এ যে সাধনা। নবীনের ভুল হওয়া তো স্বাভাবিক। তাই না ?

তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন ও নিজেকে আজ থিয়েটারের সেরা পরিচালক করতে পেরেছেন। কিন্তু আজ ? আজ কি তিনি এটা ঠিক করছেন? কোথায় তার সাধনা,কোথায় সেই শিল্পের প্রতি প্রেম ? সব কি তাহলে কর্পূরের মত টাকার নেশায় উবে গেল। নিজের অন্তরাত্মা তার কেঁপে উঠলো একবার। মনে মনে ভাবলেন …….এ ছেলে একলব্যের জাত। এদের গুরু লাগেনা।

মানসিক টানাপোড়ন চলছিল তার মনে। ইতিমধ্যে ঘরে প্রবেশ করল এক নতুন স্বর।

– মে আই কাম ইন। 

ইংরেজিতে সম্ভাষণ ত্রিনাথবাবু মোটেও পছন্দ করেন না। আর বাংলাতে বেশি করে কথোপকথনে রয়েছে বেশ কড়াকড়ি। তাই এই নতুন গলাটি শুনে স্বভাবগত ভাবেই বাকিরা ভেবেছিল এই বুঝি গর্জন হলো বলে।

কিন্তু না।

নিমেষে আঁখি লাল করে গর্জন করার আগেই যেন তার তেজ নিমেষে নিষ্প্রভ হয়ে গেল। ঘরের ভেতর তখন একটি যুবকের প্রবেশ ঘটেছে। বেশ সুপুরুষ ও আধুনিক তার পোশাক পরিচ্ছদ। একখানা স্কিন ফিট টিশার্ট সাথে মাউস কাট জিন্স পরে সেই যুবকের মুখখানা বেশ উজ্জ্বল। 

সবার প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করে ত্রিনাথবাবু সেই যুবককে কোনরূপ ধমক ধামক না দিয়েই এগিয়ে গেলেন বেশ আনন্দে। তারপর সবার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন সবাই শোন এই হল আমাদের থিয়েটারের শেষ সদস্য অল্পেশ ভৌমিক।

কানাঘুষো তো আর লুকোনো থাকেনা। তাই দিন কয়েকের মধ্যেই একথা চাউর হয়ে গেল যে অল্পেশ ভৌমিক হল গিয়ে আসল নায়ক। এই ছেলে এসেছে বলরামের পাঠ করতে। তাই সবাই যে যার নিজের পাঠে মনোনিবেশ করতে লাগলো। সাথে একটা অকৃত্তিম চাপ ঘন হতে লাগলো প্রভাতের ওপর। সুযোগ পেলেই সবাই যেন তাকে উত্যক্ত করতে লাগলো এই নিয়ে। কেও কেও ওকে দেখে আড়ালে বলতে লাগলো আহা আমাদের প্রভাতের আলো যে অল্পতেই নিভে গেল। কিন্তু সে কষ্ট পেলেও দমলো না।
আর সে দমবেই বা কেন? এই সুযোগ যে তার কাছে সব কিছু। তার বাড়ির অবস্থা ভালো নয় তা সত্ত্বেও সে যেন স্বপ্ন দেখছে খুব বড় হওয়ার। পাড়া পড়শীদের মুখের সেই বিকৃত উক্তি , কটূক্তি উপেক্ষা করে সে যে ঝাঁপ দিয়েছে এই দুর্দমনীয় আলোকিত দুনিয়ায়। তবে সে অর্থলোলুপ নয়। সে ভালোবাসে অভিনয়। যেমনটা বছর তেইশের ত্রিনাথবাবু একদা ভালোবাসতেন।

থিয়েটারের  রিহার্সাল বেশ জোর কদমেই চলতে লাগল এরপর বেশ কয়দিন। সাথে সাথে একথা স্পষ্ট হতে লাগল যে প্রভাত কোন আনাড়ি নয়। হতে পারে তার কাছে এই বিষয়ে কোনও পড়াশোনা নেই। কিন্তু তার আবেগ যেন অভিনয়ে এক অন্য মাত্রা এনে দিচ্ছিল। প্রভাত শুধু একটা জিনিষ জেনে এসেছে আর তা হল অভিনয় হল অভিব্যাক্তির বহিঃপ্রকাশ। এ জিনিষ সাধনার ফল আর চাই নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার ক্ষমতা। অভিনয়ের জন্য সর্বস্বান্ত হওয়া সবার কাজ নয়। এ জিনিস কোটিতে কারোর কারোর থাকে।

হাল্কা নীল আলোয় রিহার্সালের মহড়া চলছে। তবে গরীব মথুরাবাসির রোলে অল্পেশের সামান্য একটা ডাইলগ বলতে যেন গলদঘর্ম অবস্থা। সেই দেখে ইতিউতি ফিকফিক হাসির রোল উঠেছে দলে। ব্যাঙ্গ করে কেউ একজন অন্ধকার থেকে বলেও উঠল, আহারে ভৌমিক নন্দনের মুখে তো রা সরে না। সাথে সাথে মঞ্চজুড়ে দমফাটা এক হাসির ঝড়। রেগে, অপমানে মুখখানা তখন লাল হয়ে উঠেছে অল্পেশের। আর তার পরেই সেই আবেগের বিস্ফোরণ। বাবার কাছে সে আগেই জেনে ছিল এই থিয়েটারের নায়ক হবে সে, আর কিনা…… সেখান থেকে এক্কেবারে সাইড রোল। তাও কিনা মোটমাট কুড়ি মিনিটের। বেশির ভাগ ডাইলগ তার মধ্যে  কৃষ্ণ-বলরামের কাছে আর্তির। না এটা হতে পারেনা। সে নায়ক হতে চায়। এমন সুপুরুষ ছেলে কিনা সাইড রোলে। তবে কিসের জন্য এই পঞ্চাশ লক্ষ টাকা। রাগে দাঁত কড়মড় করে সে খেঁকিয়ে উঠল ত্রিনাথবাবুর ওপর একদম অপ্রত্যাশিত ভাবে।

এটা কোন রোল হল। এই রোল আমি করবোনা। জানেন আমি কে ? ভৌমিক ব্রাদার্সের একমাত্র উত্তরসূরী। কথাটা মাথায় থাকে যেন।

রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে সেই ছেলে তখন তর্জনী তুলে রীতিমত হুঁশিয়ারি দিচ্ছে ত্রিনাথবাবুকে। সবাই মুহূর্তের মধ্যে চুপ। ত্রিনাথবাবু বদমেজাজি লোক। লোকজন বাইরে নাকি বলে বেড়ায়, অনেক বড় বড় স্টারকেও নাকি তাদের থিয়েটারে জীবনের প্রাথমিক দিনে খুব বেইজ্জত করেছেন তিনি। এমন কি……… এখন কার সুপারস্টার রাজন সেনও নাকি কম অপদস্ত হননি তার কাছে। এটাই হয়ত আসল কারণ যে, অনেকেই প্রাক্তন ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও পরে আর এই বদমেজাজি লোকটার সাথে খোঁজ রাখেনা। সেই উড়ো কথাগুলো যেন লোকেদের মনে ভয়ের সঞ্চার করেছে ধীরে ধীরে। তাই ত্রিনাথবাবুর বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঠাণ্ডা হলেও এই দুর্নাম তার পিছু ছাড়েনি। স্বভাবতই রিহার্সালের বাকিরা ভেবেছিল এই বুঝি ভৌমিককে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তিনি বের করে দিলেন বলে। কেউ কেউ তো চোখ বুঝেও নিয়েছিল এটা ভেবে যে গর্জন করে উঠলেন এই বুঝি।

কিন্তু না। সকলকে তাজ্জব করে দিয়ে তিনি হতবাক চিত্তে বসে রইলেন তার পুরনো কাঠের হাতলওয়ালা চেয়ারটায়। যেটার পেছনে একসময়ে তার প্রিয় ছাত্র রাজন সেন সাদা রঙ দিয়ে লিখে দিয়েছিল ওয়ার্ল্ড বেস্ট ডিরেক্টর।

দিন সাতেকের মধ্যেই টিমের সবাই মোটামুটি নিজের রোল বুঝে গেছে শুধু সেই দিন থেকে অল্পেশ আর আসেনি। তাই গরীব মথুরাবাসির রোল পেয়েছে সাত্যকী। তবে থিয়েটারের মধ্যে শুধু একটি রোল আজও ফাঁকা। আর সেটা হল থিয়েটারের  খলনায়কের। নাম তার বকাসুর।

গরীব মথুরাবাসির রোলটার থেকেও কিন্তু এই রোলে অভিনয়ের স্কোপ ছিল অনেক বেশী। কিন্তু তাও টিমের কেউ এই রোল করতে চায় না। কারণটা খুবই সাধারণ। এই রোল যে করবে সে যত ভালই অভিনয় করুক ,কেউ তার মুখ দেখতে পাবেনা। পুরো রোল জুড়ে তাকে যে পরতে হবে সাদা একখানা বকের মুখোশ। তাই দর্শক মুখ দেখতে না পেলে নাম হবে কীভাবে ? তাছাড়া কৃষ্ণ বলরামের আখ্যানে ভাবে গদ গদ হয়ে তখন বকাসুরের উপস্থিতির চেয়ে তার নিধন দেখতেই সবাই মুখিয়ে  থাকবে, তাই না ? তারপর বেশ খবর ছড়িয়েছে যে তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রি থেকে শুরু  করে সেদিন উপস্থিত থাকবেন নামকরা সব পরিচালক ও অভিনেতা- অভিনেত্রীরা। হয়তো এই থিয়েটারের পর আর পিছন ফিরে তাকাতে হবেনা কাউকে। তাই ঐ অপয়া রোল করে কে নিজেকে বোকা বানাবে ? এমনিতেই তো ত্রিনাথবাবু রোল কেটে কেটে মাত্র বারো মিনিটের পাঠে দাঁড় করিয়েছেন সেটাকে।  

(পর্ব ২)

সময় সত্যিই দ্রুতগামী । দেখতে দেখতে কেমন করে যে চোদ্দটা দিন কেটে গেছে তা বোঝাই যায়নি। তেরো দিনের টানা রিহার্সালের পর, আজ একটা দিন ত্রিনাথবাবু ছুটি দিয়েছেন। একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠেও অলসভাবে বিছানায় শুয়ে আড়মোড়া ভাঙছিলো প্রভাত। নিজের মনেই সে একবার হেসে উঠল। একবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠল ওর গ্রামের লোকেদের সেই বিদ্রুপ গুলো। কানে যেন ফের শুনতে পেল সে, দু বেলা ভাতের ঠিক নেই ছেলে হবে সিনেমা স্টার। তারপর তার কথার সাথে সাথে হাসির রোল। সেই বিদ্রুপ যেন আজ বড্ড হাস্যপ্রদ লাগছে তার কাছে। সে চোখ বুজে একবার মনে মনে ভাবলো বলরামের রোলটা তার মোটামুটি পাকা। এবার ঠিকভাবে ষ্টেজে নামাতে পারলেই এই এত কষ্ট-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে সে। মুক্তি পাবে ওর বিধবা মা। হয়তো বোনটাকে সে আরও পড়াতে পারবে। মনের মধ্যে তখন এক এক করে মাকড়সার জালবোনার মত করে প্রভাত বুনছিল তার আগামী সুখের দিনের স্বপ্নগুলোকে। কিন্তু তারপরেই একটা ব্যাথা অনুভব করলো সে, ঠিক ডান চোখের উপরে। খানিক ঘষতেই যেন জ্বালা করে উঠলো আরও। খানিক এদিক ওদিক তাকিয়ে ডান চোখটা চেপে ধরেই সে উঠে দাঁড়াল আর এগিয়ে গেল দেওয়ালে টাঙ্গানো ছোট আয়নাটার দিকে। তারপর ভালো করে পরখ করতে লাগলো চোখের ঊপরটা। প্রথম দৃষ্টিতে সেরকম কিছুই চোখে পড়েনি তার। তারপরেই সেটা ধরা দিল। দাগ…………এক মিশমিশে কালো  দাগ হয়েছে ঠিক ডান ভ্রু’টার উপরে। সাথে সেই তীব্র জ্বালাতে ডান কপালের একটা শিরা ফুলে উঠেছে বিশ্রীভাবে। কি করবে সে বুঝে উঠতে পারছিলনা ?  একবার ভাবলো মেসের বাকিদের গিয়ে কি বলবে ? তারপর আবার সেই সেই ক্ষীণ কণ্ঠের বিদ্রূপটা কানে ভেসে এলো ওর। “ হাভাতে ঘরের হিরো………হি হি হি”। সেই গলার স্বর যেন ওর গ্রামের লোকেদের নয় বরঞ্চ এই পৃথিবীর বাকি সকলের। সবাই যেন চায় প্রভাত যেন এই যাত্রা হেরে যায় । হ্যাঁ ঠিক এটাই চায় তারা। প্রভাত তার হাত দুটো শক্ত করে বাথরুমে গিয়ে বারকয়েক জল নিলো। নিজের দুর্বলতা, অসুবিধে কাউকে বলার নয়। এই যুগে সবাই যেন তাকে উপহাস করতে চায়। জলে ভেজা মুখে উত্তেজনায় হাঁফ ছাড়ছে সে। ধীরে ধীরে ওর ব্যাথাটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পুনরায় নিজের শরীরটাকে এলিয়ে দিল সে বিছানায়। চোখ বন্ধ করে আবার ফিরে যেতে চাইল ওর স্বপ্নের দুনিয়ায়।

 অশেষ কষ্টের ফলস্বরূপ যেখানে প্রভাত বুনে চলেছে তার স্বপ্নের জাল। সেখানেই তার থেকে ঘণ্টা খানেকের রাস্তার দূরত্বে ত্রিনাথবাবুর অবস্থা ছিল বেশ শোচনীয়। নিজের পৈত্রিক চোকলা ওঠা বাড়িটায় সদ্য বেশ কিছু আসবাব কিনেছিলেন তিনি। সব কটাই বড্ড বেমানান। তবে পড়ন্ত বয়সে খানিক আমোদ কি খুব অন্যায় ? নিজের হুইস্কির গ্লাসে বার কয়েক চুমুক দিয়েও উনার শরীর তখনও  থর থর করে কাঁপছে। লজ্জায় অস্তমিত সূর্যের ন্যায় মুখ লাল হয়ে উঠেছে।

কানে ভেসে আসছে ভৌমিক নন্দনের সেই বলিষ্ঠ চিৎকার।

ড্যাড । গেট আউট দ্যাট ব্লাডি রাস্কেল। জানো তুমি এই লোকটা কি করেছে?

কানটা ভোঁ ভোঁ করে উঠেছিল ত্রিনাথবাবুর। মুহূর্তের জন্য নিজের সম্বিৎ হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। এক নিমেশে যেন বেশ কয়েক বছর আগে নিজের প্রিয় ছাত্রকে করা সেই অপমানটা বিদ্যুতের চমকের মত মনে পড়ে গেল। যেন এ এক নিয়তির পুনরাবৃত্তি। তবে আজ তার সেই দর্প আর নেই। নিজের থিয়েটারের বাসনাকে যেন অর্থের রসনা ধীরে ধীরে আজ গ্রাস করেছে। তিনি খানিক কেঁপে উঠেছিলেন। চোখ দুটো ছলছল করে উঠেছিল। একটা নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তখন তিনি চেয়েছিলেন ভৌমিক ব্রাদার্সের পার্সোনাল কেবিনে। উল্টোদিকে হিংস্র হায়েনার মত একদৃষ্টে তখন চেয়ে আছেন অলোকরঞ্জন ভৌমিক, সাথে উনার সেক্রেটারির মুখে একটা বিকৃত হাসি ও ছেলের বয়সী অল্পেশের মুখে গালমন্দ। সুদীর্ঘ জীবনের সমস্ত সঞ্চিত সম্মান তখন সেই বছর বাইশের অল্পেশ সম্পূর্ণ ভূলুণ্ঠিত করেছে।

ছেলেকে যেন তার মনের রাগ মেটাতে খানিক সময় দিয়েছিলেন অলোকরঞ্জন ভৌমিক। তারপর যখন দেখলেন ত্রিনাথবাবু একদম নিশ্চুপ, তখন ফিরে এলেন স্বমহিমায়। নিজের ছেলেকে একটা উচ্চ স্বরে আওয়াজ তুলে থামতে বলে সামনের টেবিলের দিকে কিঞ্চিৎ ঝুঁকে মুখখানা এগিয়ে নিয়ে গেলেন ত্রিনাথবাবুর দিকে।

কি করছেন ত্রিনাথবাবু। আপনার হাতে আমার ছেলের ভবিষ্যৎ তুলে দিলাম, আর আপনি কি না। ওর কি দোষ বলুন ও তো বাচ্চা ছেলে। কিন্তু আপনি তো সমঝদার আছেন নাকি।

শেষের কথাগুলো বলার সময় ত্রিনাথবাবু লক্ষ্য করলেন ভৌমিকের মুখখানা যেন বজ্রকঠিন। এ যেন আবদারের ভাষা নয়। তিনি অতিকষ্টে বললেন আমি দেখছি কি করতে পারি। এই বলে চেয়ার ছেড়ে উঠা মাত্রই তার হাত চেপে ধরেছিল অলোকরঞ্জন ভৌমিক। সে যেন লৌহ কঠিন মুষ্টি। কাটা কাটা স্বরে বলেছিলেন,

নাম কামানো সারা জীবনের সঞ্চয়, আর খোয়ানো ক্ষণিকের। ভুলে যাবেন না পঞ্চাশ লক্ষ টাকা দিয়েছি। শুধু রোল না,ওকে মেন লিডটাই দিতে হবে। ক্যামন ? 

কথাগুলো যেন ত্রিনাথবাবুর মাথায় হাতুড়ির ঘা মারছিল। ড্রিঙ্কসের বাকিটুকু এক চুমুকে শেষ করে তিনি আরামকেদারায় এলিয়ে দিলেন নিজের শরীরটাকে। শুধু চোখ দুটো বুজে আসার সময় তার মুখ থেকে একটা অশ্লীল ভাষা বেরোল প্রভাতের উদ্দেশ্যে।

পর্ব ৩

দিনের বাকি সময় প্রভাত আর সেদিন কিছুই করতে পারেনি। এমনকি রাতে ওর এলো ধুম জ্বর। একা একটা রুমে থাকে বলে সে আর কাউকে বলতেও পারলোনা। সারাদিন সেই সকাল থেকে শুয়েই রইল বিছানাতে। মনে তখন সর্বক্ষণ এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি, হোক না একদিন না খেলে কিছুই এসে যায়না। কিন্তু এখন শরীর খারাপ রাখা যাবেনা। সকালে যখন সে উঠলো দেখল মাথাটা বেশ ভার হয়ে আছে। সাথে মাথার ডান দিকে একটা তীব্র ব্যাথা। টলমল করতে করতে সে এগিয়ে গেল বাথরুমের দিকে। মুখে একটা জলের ঝাপটা মেরে যেই না আয়নাতে তাকিয়েছে ওমনি ওর সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। একটা শীতল হিম স্রোত নেমে গেল ওর মেরুদণ্ড দিয়ে। এ কি………… এ কি দেখছে ও। জলের ঝাপটা দেওয়ার সময় আয়নাতে বিন্দু বিন্দু জলকণা জমেছে কিন্তু তারই মাঝে সে নিজের মুখ দেখতে পাচ্ছে। প্রথমে আয়নাতে নিজের মুখ দেখে ও বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে এটা ওর চেহারা। খানিক আরও কাছে এগিয়ে গেল সে আয়নাটার দিকে। বিস্ফারিত চোখ মেলে দেখল গতকালের ওর ডান গালে থাকা কালো বিন্দুটা আজ যেন কয়েকশো গুন বেড়ে গিয়েছে। আর সেটা আজ প্রায় অর্ধেক ডান গাল  অব্দি নিজের প্রসার বিস্তার করেছে। সাথে সেই তীব্র জ্বলন। বুকটা ওর দুরুদুরু করে উঠলো। কি করবে সে যেন ভাবতেই পারছেনা। এক মুহূর্তে মনে হল তাকে ছাড়া পৃথিবীর সমস্ত লোকেরা আজ যেন জয়ধ্বনি দিচ্ছে। এই মাথার ব্যাথাটা   আসলে তাদের বিদ্রুপের শঙ্খ নিনাদ। আজ তারা জয়ী…… পূর্ণ রূপে জয়ী। কিছু ভাবতে পারছেনা আর সে, ধীরে ধীরে তার শরীরটা অবশ হয়ে আসছিল। সে লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে।

 একটা বিপ্ বিপ্ শব্দ কানে ধীরে ধীরে শোনা দিতেই সম্বিৎ ফিরে পেল প্রভাত।  খুব  দুর্বল লাগছিল ওর শরীরটা, যেন কেউ শক্ত করে বাহুবন্দি করেছে।  সাথে মাথায়  একটা চিন চিন করে ব্যাথা অনুভব করলো সে। অতি কষ্টে চোখ খুলতেই প্রথমেই চমকে উঠলো, দেখল ডান চোখের জ্যোতি খুব ক্ষীণ। তবুও সেই অস্পষ্ট দৃষ্টিতে  বুঝতে পারল, সে কোন হাসপাতালে ভর্তি। মুখের সামনে একজন ডাক্তারবাবু কাষ্ঠ হাসি হেসে বলছেন শরীর ঠিক লাগছে তো ?  

প্রভাত নিরুত্তর। সে যেন বুঝতেই পারছেনা বাস্তব আর কল্পনার কোন দোদুল্যমান অবস্থায় সে আছে। ওর হৃদস্পন্দন যেন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ জোরে কাঁপছে। মাথা ভার হয়ে আছে খুব, সাথে ডান চোখে সে কি ভীষণ জ্বালা। চোখ বুঝতেই সে অনুভব করলো ঘরে ডাক্তার বাদেও আরও কিছুজন উপস্থিত। তাদের মধ্যে একজন বয়স্ক লোকের গলা বেশ উদ্বিগ্ন। কণ্ঠস্বর শুনেই সে বুঝল, এ গলা তার অতি পরিচিত।কিন্তু শরীর যেন আর সেই জ্বালা সহ্য করতে অক্ষম। ধীরে ধীরে সে আত্মসমর্পণ করলো অচেতনতার কাছে।

কি বুঝছেন ডাক্তারবাবু ?

একটা হাঁফ ছেড়ে ডাক্তার নিরস দৃষ্টিতে চাইলেন। তারপর কয়েক সেকেন্ডের একটা নিস্তব্দতা। উল্টোদিকে প্রশ্নকর্তার উদ্বিগ্নতা যেন ক্রমশ বেড়েই চলেছে । তারপর নিস্তব্দতা ভেঙে ডাক্তারবাবু বললেন,
আমি আজ প্রায় পঁচিশ বছর ডাক্তারি করছি। কিন্তু এমন অদ্ভুত কেস আজ অব্দি দেখিনি। এটা কমপ্লিটলি একটা রেয়ার ডিজিস। হটাৎ করে রোগীর শরীরে অত্যধিক দ্রুত ভাবে মেলানিন তৈরি হচ্ছে বলার নয়। কিন্তু আমার চিন্তা অন্যকিছু……………

ত্রিনাথবাবু আরও বেশী কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। সাথে সাথেই বললেন, আরও কি?

ডাক্তারবাবু খানিক এদিক সেদিক তাকিয়ে একটু অন্যমনস্ক ভাবে বললেন, প্রথমত এভাবে মেলানিনের মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি আমাকে অবাক করেছে। তবে তার চেয়ে বেশী অবাক হচ্ছি এটা ভেবে যে এই বৃদ্ধি শুধুমাত্র রোগীর ডানদিকেই সীমাবদ্ধ।

ত্রিনাথ বাবুর চোখ যেন কপালে উঠে গিয়েছিল। তিনি অবাক হয়ে বললেন মানে ?

আমিও সেটাই চিন্তা করছি। এরকম এত সুচারুভাবে মেলানিনের বৃদ্ধি আমি কেন, হয়তো ডার্মাটোলজি বিভাগেও কেও কোনদিন দেখেনি।


ডাক্তারবাবু কথাগুলো বলে একবার ত্রিনাথবাবুকে তার পার্সোনাল কেবিনে আসতে বললেন। ত্রিনাথবাবু তার কথামতো এগিয়ে যাবার আগে তার সাথে থিয়েটারের কিছু ছেলেকে সেখানেই তার জন্য অপেক্ষা করতে ইশারা করলেন।

  পার্সোনাল কেবিনে ঢুকে তিনি নিজের চেয়ারে টানটান হয়ে বসলেন। তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে তিনি অতিশয় চিন্তিত। নিজের হাতের তালু দুটো বারবার ঘষছেন। তারপর সোজাভাবে ত্রিনাথবাবুকে বললেন,

ছেলেটার অবস্থা ভালো নয় ত্রিনাথবাবু। ওর শরীরে যে কি অসুবিধে হচ্ছে সেটা কিন্তু আমরা ধরতে পারিনি। এই অদ্ভুত ভাবে মেলানিন বৃদ্ধিটা আসলে ওর শরীরে কি প্রভাব ফেলতে পারে তাও আমরা বুঝতে পারছিনা। আর সবচেয়ে অবাক হচ্ছি আপনি যখন একে ভর্তি করতে এলেন আপনি বলেছিলেন এর মুখে কোনরূপ দাগ ছিলোনা। তারপর সেখান থেকে আজ এইভাবে মাত্র তিন দিনে এই পরিবর্তন সত্যি আমাকে অবাক করছে।

ত্রিনাথবাবু প্রত্যুত্তরে শুধু মাথা নাড়ালেন।

আমরা ওর তিনটে টেস্ট করেছি এমন কি ওর ডান গাল থেকে অল্প স্কিন নিয়েছি টেস্টের জন্য। কিন্তু । কিছু বলতে গিয়েও তিনি থেমে গেলেন। আচ্ছা এই জিনিস ওর আগে ছিলোনা তাই বললেন তো ?

ত্রিনাথবাবু এবারেও শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। তারপর খানিক নিচুগলায় জিজ্ঞেস করলেন, এর থেকে ঠিক হওয়ার কোন আশা নেই। মানে ওর শরীর কি আর ঠিক হবেনা ?

না, না। শরীরে এমনি কোন অসুবিধে নেই। শুধু এই কালো দাগটা যেভাবে ছড়াচ্ছে সেটাই চিন্তার। কথাটি বলে ডাক্তারবাবু আবার খানিক বিমর্ষ হয়ে পড়লেন।
তারপর ধীরে ধীরে অন্যমনস্ক ভাবে বললেন আসলে কি জানেন তো মানুষের মস্তিষ্ক খুব জটিল। আর আমাদের মেডিক্যাল সায়েন্স বলে মানুষের মস্তিষ্কের ডান দিক ক্রিয়েটিভিটি মানে  শিল্পসত্ত্বাকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এই দাগটা আসলে কি,সেটা ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা। একটা সন্দেহ রয়ে যাচ্ছে জানেন তো ? ছেলেটার ব্রেনে কোন চেঞ্জ আসে কিনা সেটাই দেখার।

সময়। সময় বড়ই বিচিত্র জিনিষ। ডাক্তারবাবুর বিমর্ষ ভাব থেকে ত্রিনাথবাবুর মুখে যেন এক চিলতে হাসি খেলে গেল।  তার স্বপ্নের থিয়েটার যেন নিজের রূপ ফিরে পেল। থাক না একটা ভালো অভিনেতা। এবার তার পছন্দের ছেলেকে তিনি বানাবেন  কৃষ্ণ সহোদরের নায়ক। হয়ত আনন্দে তিনি জাপটে ধরে ফেলতেন ডাক্তারকে কিন্তু অতি কষ্টে নিজেকে সামলালেন। মনে মনে ভাবলেন মেলানিন এনহ্যান্সার থেকে ব্রেন প্রবলেম। অদ্ভুত । তবে, সে যা খুশি হোক না কেন। এটার তার ভাগ্য সুপ্রসন্ন করেছে তা এক কথায় নিশ্চিত।

নমস্কার করে উঠে পড়লেন তিনি।  নিজের মনের মধ্যে আগামী সব কাজ গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। তার সামনে এখন বিস্তর কাজ বাকি। মাত্র সাতদিনের মধ্যে আয়োজন হবে থিয়েটারের গ্র্যান্ড ওপেনিং। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। একরাশ আনন্দ নিয়ে কেবিনের চৌকাঠ পেরিয়ে বাইরে সাত্যকিকে দেখেই মেলানিন এনহান্সসারের  কথাটা মনে আসতেই একটা নিস্প্রভ কিন্তু প্রচ্ছন্ন হাসির রেস খেলে গেল তার মুখে । মনের মধ্যে তখন ওঁনার আনন্দের ফুলঝুরি ছুটছে। ডাক্তারবাবুর অসহায়তা দেখে বেশ হাসি পেল। মনে মনে ভাবলেন শুধু ডান দিকে ছড়ায়। তাই না ।




( পর্ব ৪ )

স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার বেদনা বুঝতে প্রভাতের আরও দিন দুই সময় লেগেছিল। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে যেদিন সে আবার থিয়েটারে গেল দেখল সব কেমন জানি চেঞ্জ।  মনের ভেতর একটা কু ডাকছিল এন্ট্রি থেকেই। কারণ সেখানে যে একখানা ব্যানার লাগানো হয়েছে। প্রকাণ্ড সেই ব্যানারে জ্বলজ্বল করছে অল্পেশ ভৌমিক। সাথে রয়েছে বাকি সকলের ছবি। নিজেকে সেই ভিড়ে অনেকক্ষণ ধরে খুঁজেছিল সে। একবার তো ইচ্ছে করছিল ডান চোখে বাঁধা ব্যান্ডেজখানি সে ছুঁড়ে ফেলে। কিন্তু সে অনেক চেষ্টা করেও নিজের ছবি সেই ভিড়ে খুঁজে পায়নি।

এদিকে থিয়েটারের ভেতরে তখন সাজো সাজো রব। দিন পাঁচেকের মধ্যেই শহরের অতি প্রতীক্ষিত থিয়েটার শুরু হতে চলেছে, তারই প্রস্তুতি জোর কদমে চলছে।  বুকে একরাশ আতঙ্ক নিয়ে প্রভাত শুকনো মুখে এগিয়ে চলল স্টেজের দিকে। তারপর ধীর পায়ে স্টেজের একদম সামনে এসে দাঁড়াতে কিছুক্ষণ পর ব্যাক ষ্টেজ থেকে বেরিয়ে এলেন ত্রিনাথবাবু। প্রভাতকে দেখেই একটা কাষ্ঠ হাসি হেসে বললেন,

শরীর কেমন প্রভাত। এখন ঠিক লাগছে তো ?

প্রভাতের যেন মুখ দিয়ে রা সরে না। ডান চোখটা হাসপাতালে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে তবু একটা চোখ তো ঠিক আছে তার। সেটা যেন নিথর দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে স্টেজের দিকে। যেন ত্রিনাথবাবুর কোন কথাই সে শুনতে পাচ্ছেনা। চোখ ঠেলে জল বেরিয়ে আসছিল ওর। কারণ ষ্টেজে বলরামের বেশে দাঁড়িয়ে আছে অল্পেশ। কি বলতে হয়, সেটা যেন মুহূর্তের জন্য ভুলে গিয়েছিল সে।

ত্রিনাথবাবুর কথায় চমক ভাঙল ওর।

কি করবো বলো ? আমিও তো নিরুপায়। থিয়েটারের মূল অভিনেতা যদি অসুস্থ হয় তাহলে কি আর থিয়েটারটা করা সম্ভব ?

হয়ত আরও বেশ কিছু কথা তিনি বলছিলেন। কিন্তু প্রভাতের কানে সেসব কথা আর ঢুকল না। নিজের তিলতিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নটা নিমেষে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে । চারিপাশের কোলাহল নিমেষে শান্ত বলে মনে হচ্ছিল। আর যেদিকেই তাকায় না কেন শুধু চোখে ভেসে উঠছিল ওর গ্রামের লোকগুলোর মুখ। তারা যেন খিলখিলিয়ে হাসছে। পুরো শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল প্রভাতের। স্টেজের ওপরের লোহা লক্কড়ের স্ক্যাফোলডিং কাজ চলছে দ্রুততার সাথে। তবে সেই লোহা ঠোকাঠুকির শব্দটা বুকে ফলার মত আঘাত করছিল। চারিপাশে শুধু এক ধ্বনি, “ হাভাতে ঘরের হিরো। খিক্ খিক্ খিক্”

ত্রিনাথবাবু খানিক ঠাণ্ডা গলায় বললেন, “ দেখো। আমি জানি তুমি এই রোলটার জন্য কতটা পরিশ্রম করেছ, কিন্তু আমাকেও তো সব বিচার বিবেচনা করতে হয়। এখানে তো শুধু তোমার কথা ভাবলে আমার চলবে না। বাকিদের কথাও ভাবতে হবে। তাই আমি বলি কি…………

ত্রিনাথবাবুর কথা আর শেষ হল না, তার আগেই হাউ হাউ করে কেঁদে প্রভাত ওঁর পায়ে লুটিয়ে পড়ল।

এ কি। এ কি

স্যার আমার সাথে এমন করবেন না। আমার এই থিয়েটার ছাড়া আর কিছুই নেই। এর সব পাঠ আমার কণ্ঠস্থ। এমন অবস্থায় আমাকে বাদ দিলে আমি মরে যাব স্যার। অনেক পরিশ্রম করেছি এই রোলটার জন্য………তখন সে একই কথা বারবার আউড়ে চলেছে ।

প্রভাতের কান্না দেখে নিমেষে সবাই যেন সেই দিকেই চোখ ফেরাল। প্রায় জনা পঞ্চাশেক লোক থাকা সত্ত্বেও কেমন জানি একটা থমথমে ভাব পুরো ষ্টেজ জুড়ে।

-আঃ প্রভাত। ওঠো ওঠো। এমন করোনা। এসব করে কি লাভ বলত ? আর তাছাড়া আমি কে সব ঠিক করার। তোমার শরীর এখনও দুর্বল এই অবস্থায় মেন লিডের পাঠ তোমায় দিই কি করে।  

 কিন্তু প্রভাতকে তখন যেন কোন জেদ পেয়ে বসেছে। সে নানান যুক্তি দেখাতে থাকলো কোনক্রমে ওর রোলটা ফিরে পাওয়ার জন্য। কিন্তু না, বৃথা চেষ্টা।

এদিকে ষ্টেজে তখন রিহার্সালে ছেদ পড়েছে। সকলে তাদের কথোপকথন শুনতে নিজেদের কাজ ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে কিছুটা দূরত্ব রেখে।

-আঃ, প্রভাত। কেন বুঝতে পারছোনা যে- আমার পক্ষে তোমাকে আর এই রোলটা দেওয়া সম্ভব নয়। তোমার শরীর এখন এই জটিল রোল পারমিট করবে না। শোন নি ডাক্তারবাবু কি বলেছেন। এখন তোমার কমপ্লিট রেস্ট।

প্রভাত যেন শান্ত হওয়ার নয়। নিজের শেষ আশাটুকু বাঁচানোর তাগিদে সে তখন অনর্গল তার পাঠ বলতে শুরু করেছে। তিনি এক ধন্দের মধ্যে পড়লেন। এক এক বার তো তার অন্তর আত্মা তাকে বারণও করছিল। মনে মনে ভাবলেন সত্যি কি তাহলে আমি এমন পাপ কাজটা করবো ? একবার চোখ সরিয়ে  স্টেজের দিকে মুখ ফেরাতেই দেখলেন অল্পেশের মুখখানা রাগে অগ্নিশর্মা। নিজেকে খানিক সামলে কিছু বলতে যাবেন ওমনি একজন ষ্টেজ থেকে বলে উঠলো,
শোন প্রভাত। ফর্সা নয় কালো যে কোন একটা রঙের মানুষ বোঝা যায়। কিন্তু তুই তো এখন পুরোই ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট। তো কি করে মেন লিড হবি বলত। এই বলে একটা বিশ্রি সুরে খিক্ খিক্ করে হেসে উঠে সে।

এদিকে প্রভাত যেন স্তম্ভিত। এই কথাটার জন্য অবশ্য সে তৈরি ছিলোনা। কিছু কথা থাকে যা স্পষ্ট করে না বোঝালেই বোধ হয় ভালো হয়। নিজের সকল আবেদনের এবার যেন প্রভাত একটা উত্তর পেল। চোখ দিয়ে দু ধারে জল গড়িয়ে পড়ল ওর। সাথে শরীর জুড়ে নিজের কালো দাগটার জন্য জন্মালো একটা তীব্র অসহ্য ঘেন্না। হাতটা ওর আবার যেন লজ্জায় কাঁপতে থাকে । মাথা নিচু করে প্রভাত থিয়েটার ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তখনও যে লজ্জার করাঘাত সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। সেই কণ্ঠস্বর আবার ভেসে এলো। এবার আরেকটু দৃপ্ত কণ্ঠে। সে ত্রিনাথবাবুর উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
স্যার । আমি বলি কি প্রভাত অনেক খেটেছে। ওকে না হয় ঐ রোলটাই দিননা।

ত্রিনাথবাবু এতক্ষণ মাথা নিচু করেছিলেন, তিনি এবার মুখ তুলে বললেন কোন রোল।

ঐ যে বকাসুরের। মুখ নিয়েই তো প্রবলেম। তো মুখোশ পরলে আর অসুবিধে কোথায় ?

এই বলে আবার একটা বিদ্রুপের হাসি হেসে সে বলল, অন্তত দু রঙের মুখ দেখতে হবেনা। কি বল অল্পেশ ? হি হি হি

প্রভাতের রাগে গা জ্বলে উঠলো । এতক্ষনের অপমান কি পর্যাপ্ত ছিলোনা যে এবার……। চোখে যেন রোষাগ্নি ছুটছিল। এক লহমায় মুখ ফিরিয়ে প্রভাত দেখল মুখ টিপে স্টেজের বেশ কিছু জন হাসছে। তবে সেই বিদ্রুপের কণ্ঠ এখনও নিজের হাসির আস্ফালন থামায়নি। আর তাকে প্রভাত খুব ভালভাবেই চেনে।

( পর্ব ৫)

  প্রভাতের মেসের ঘরটা এমনিতেই স্যাঁতস্যাঁতে। তবে আজ যেন দরজা বন্ধ থাকায় একটা হিমঘরের মত লাগছে। যেখানে প্রভাতের স্বপ্নগুলো মর্গের চেম্বারে শায়িত। নিজের এত প্রতিশ্রুতি, এত লড়াই কি তাহলে সবই মিথ্যে। মাঝে মাঝে সে ভাগ্যটাকেই দোষরোপ করতে লাগলো।

এমন সময় দরজার বাইরে একটা আওয়াজ। ঠক্ ঠক্। চমক ভাঙল প্রভাতের। একটানা চোখের জল ফেলে গলাটাও কেমন জানি ধরে গিয়েছিল । ধরা গলায় জিজ্ঞেস করলো কে ?

বাইরে থেকে মেসের কেয়ারটেকার’টা বলে উঠল, বৃষ্টি আসবে। তোমার দরজার থেকে এই প্যাকেটটা ওঠাও।

প্রভাত চমকে উঠলো। প্যাকেট। প্যাকেট কিসের ?

খাট থেকে নেমে প্যাকেটটা তুলতে গিয়ে দেখল আকাশ ঘন ধূসর বর্ণের হয়ে গিয়েছে। সাথে বেশ হাওয়ার জোর বেড়েছে। এদিক সেদিক ঘরের বাসিন্দাদের কথা শোনা যাচ্ছে। “এই জানলা কপাট লাগাও ঝড় আসছে”। প্রভাত সেদিকে আর না তাকিয়ে প্যাকেটটা নিয়ে ঘরে ঢুকল,  

ভেতরে এসে কপাটের মধ্যে দিয়ে সন্ধ্যে নামার আগের ক্ষীণ আলোয় দেখল লেখা আছে, ফর ইউ প্রভাত সাথে একটা হাসির ইমোজি। প্রভাত আর দেরি না করে এক ঝটকায় সেই প্যাকেটটা ছিঁড়ে ফেললো। আর খুলতেই তার সারা শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল সেই অপমানের লেলিহান শিখাটা । সেটাকে খাটেই ছুঁড়ে ফেলে ও দাঁড়িয়ে হাফাতে লাগলো। কিন্তু জিনিসটা ততক্ষণে প্যাকেটের আবরণ থেকে বেরিয়ে এসেছে। প্রভাত লজ্জায় অপমানে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল কারণ সে দেখছে প্যাকেটে এসেছে একটা মুখোশ। থিয়েটারের  খলনায়কের মুখোশ। সাথে প্রেরকের একটা মেসেজ, “ আশা করি তোমার ভালো লাগবে মিস্টার. ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট”

এই ভাবে আরও তিন দিন কেটে গেছে। প্রভাত আর যেতে পারেনি থিয়েটারে।  ত্রিনাথবাবু ওকে ফোনেই বলেছেন ও যেন ঘরেই প্র্যাকটিস করে, থিয়েটারে ওকে আর প্র্যাকটিসে আসতে হবেনা। কারণ রোলটা গৌণ্য। মাত্র বারো মিনিটের। আছে বলতে একটা ছোট মনোলগ, একজন গ্রামবাসীকে হত্যা সাথে কৃষ্ণের হাতে নিহত। ব্যাস।   

একবার হাফ ছাড়ল প্রভাত। নিজের মনেই একবার ভাবল সত্যি যদি দাগটা না থাকতো তাহলে হয়তো আমার কত নাম হত ? আমার তো পুরো রোলটা আজও মুখস্থ। একবার এটাও ভাবল অল্পেশ কি সত্যি ওর মত পারবে ? আর যদি পারে, তাহলে রিহার্সালে তার করা সেই সব প্র্যাকটিস আর কি কেউ মনে রাখবে ?  নাকি……………… সে সত্যি ব্রাত্য হয়ে গেছে, ঠিক এই বকাসুরের মত ?

  একটা কথা ঠিক যে সময় কারোর জন্য অপেক্ষা করেনা। দেখতে দেখতে আরও দুটো দিন কেমন জানি চোখের পলকে কেটে গেল। আর উপস্থিত হল সেই চির অপেক্ষিত দিন “ দ্যা গ্র্যান্ড ওপেনিং অফ কৃষ্ণ সহোদর”। সকালে থেকে না করে হোক ত্রিনাথবাবু প্রভাতকে দশবার ফোন করেছেন আর প্রতিবার সে শুধু একটা নিরস হুম বলে তার কথার উত্তর দিয়েছে। নিজে হাতে আজ আরেক একলব্যের বুড়ো আঙুল কেটেছিলেন ত্রিনাথবাবু। হয়তো নিজেও খানিক সেটা বুঝেছিলেন। শুধু বলেছিলেন “ তোমার শট ঠিক সন্ধ্যে সাতটা বেজে পাঁচে প্রভাত। ভুলেও দেরি করোনা। আর হ্যাঁ তোমার জন্য একটা রিহার্সাল কেবিনের ব্যাবস্থা করেছি । ড্রেসিং রুমের পাশের ঘরটায় কেমন ? একটু আগে এসে রিহার্স করে নিও।”

প্রভাত মনে মনে একবার মুচকি হাসল। ড্রেসিং রুমের পাশের কেবিন, সে তো জঞ্জাল রাখার ঘর। মান্যি গন্যি লোকেরা সব আসবে বলে হয়ত এই অভাগার কুরূপ দেখাতে চান না তিনি। সে ত্রিনাথবাবুকে আর কোন উত্তর না দিয়েই ফোনটা কেটে দিল । মনটা অতিশয় ভার হয়ে আছে ওর। এই ক’দিন ধরে মনের মধ্যে টানাপোড়নের এক অসম সংঘর্ষে জর্জরিত সে । এখন আর আগের মত  কোনকিছুই ভাল লাগেনা। না খিদে পায়, না ঘুম। এমন কি নিজের আত্মবিশ্বাসটাও   কেমন জানি আজকাল মাটিতে মিশে গিয়েছে। নিজের ঘরেই বেশির ভাগ সময়  নিজেকে আবদ্ধ রাখে সে । আসল সত্যিটা হল, মন যে এ কথা মানতেই চায় না। যে সে আর বলরামের রোল করতে পারবেনা। ওর মনে হল সত্যিই কি সুদর্শন চেহারাই সবকিছু। তবে যে বলে অভিনয়ে দর্শন ধারে না গুন বিচারে নির্ধারণ হয় ? কথাটা ভেবেই চোখের কোণটা আর্দ্র হয়ে এল । একবার খাটের পাশে টেবিলটায় রাখা বকাসুরের মুখোশটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সে। এই প্রথমবার ভাল করে তাকাতেই বুঝল কি ঘন বকাসুরের চোখগুলো ? যেন পৃথিবীর সকল কদর্যতাকে নিজের মধ্যে বিলীন করেছে সেই মুখোশটা।  

আজকাল সারাদিন শুধু রোল হারানোর চিন্তার বুঁদ হয়ে থেকে একটা নতুন ধরণের রোগ যেন বাসা বেঁধেছে ওর মনে। কেউ বেশ কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থাকলেই কেন জানিনা ওর মনে হয় সে ওকে বিদ্রুপ করছে। মনে মনে উৎফুল্ল হচ্ছে। ভাবছে কেমন দেখতে না ছেলেটাকে ? ইস কি বিশ্রী চেহারা।    

তবে সত্যি তো। প্রভাত নিজেও তাই মনে করে। পুরো ডান দিকটায় সেই কালো দাগটা এখন যেন দগদগে ঘা হয়ে উঠেছে। হাত দিলে বা ছুলেই বিদ্যুতের মত ঝটকা দেয়। নিজেও তাই এই কয়দিন আর আয়নায় মুখ দেখেনি সে। বড্ড ঘেন্না লাগে ওর। একবার ঘড়িটার দিকে নজর ফেরাতেই দেখে বিকেল পাঁচটা বাজতে আর মিনিট দশ দেরি। মনে মনে ভাবল এতক্ষনে দুটো পাঠ হয়ে গেছে বলরামের। মুখে একটা ম্লান হাসি হেসে একপলকের জন্য সে যেন দেখল দর্শকেরা চিৎকার জুড়েছে বলরামের জন্য। তখনই ফোনটা বেজে উঠতেই দেখে ত্রিনাথবাবুর কল করছেন। তাই আর দেরি না করে সে উঠে পড়ল নিজের কষ্টিউমটা নিয়ে। বহুদিন পর সে আজ ঘরের চৌকাঠ ডিঙিয়ে বাইরে পা রাখতে চলেছিল। কিন্তু ডিঙাতে গিয়েও, এক মুহূর্তের জন্য ওর মুখের কালো দাগটার কথা স্মরণে আসতেই কুণ্ঠাবোধ হল খুব। কিছু উপায় ঠাউর করতে যাবে তখনই মনে পড়ল বকাসুরের  মুখোশটার কথা। আর সেটাকে মুখে গলিয়ে নিতেই কেন জানিনা একটা মিশ্র অনুভূতি  হল ওর ভেতরে। মনে হল যেন একটা অপার্থিব শক্তি বিদ্যুতের ন্যায় ওর মেরুদণ্ড বেয়ে মস্তিকের প্রতিটা স্নায়ুতে ছড়িয়ে পড়ল। একটা গভীর নিঃশ্বাসের সাথে সে যেন ফিরে পেল নিজের হারানো আত্মবিশ্বাসটাকে। হতাশায় বেঁকে যাওয়া ওর মেরুদণ্ডটা কেমন জানি টানটান হয়ে উঠল। নিজেই নিজের মধ্যে এই  আকস্মিক পরিবর্তনে রীতিমত তাজ্জব বনে গেল সে। ঘরের মধ্যে ছোট আয়নাটায়  গত তিনদিন ধরে সে নিজের মুখ দেখার সাহস পায়নি, কিন্তু আজ পেল। বকাসুরের কালো চোখের ফাঁকে ওর চোখের মণিটা যেন জ্বলজ্বল করে উঠেছে। এ যেন এক প্রবল আসুরিক শক্তির সঞ্চার হয়েছে ওর পুরো শরীর জুড়ে। সাথে শরীরের উত্তাপ যেন বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েক’শ গুণ । গ্লানির শেষে এ যেন এক প্রতিহিংসার রোষানল । আয়নাতে চোখ যেতেই সে দেখল বাঁকা লাল চঞ্চুটা বিকেলের পড়ন্ত আলোতেও তীক্ষ্ণ তলোয়ারের ন্যায় ঝিলিক দিয়ে উঠেছে । মনে হল যেন বকাসুরেরা শুধু কালে কালে জন্ম নিয়েছে অপমানের প্রতিশোধ নিতে।

বাড়ি থেকে শুরু করে থিয়েটারে এসে কেবিনে ঢোকা অব্দি, রাস্তায় সবাই ওকে আজ বিস্ফারিত দৃষ্টিতে চেয়ে-চেয়ে দেখেছে। কেউ হেসেছে, কেউ অবাক হয়েছে, আবার কেউ কেউ  রীতিমত সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে  আপাদমস্তক জরিপ করেছে ওকে। ও শুনেছে  সবাই যেন বলছে শাম্ব থিয়েটারের বকাসুর। কিন্তু তাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়াটা কেন জানিনা আজ খুব উপভোগ করছে সে । এ যেন এক অদ্ভুত আনন্দ। মনে হচ্ছিল ওর যেন পুনর্জন্ম হয়েছে । এবার কেউ যেন ওর থেকে মুখ সরিয়ে নিচ্ছেনা। কেউ বলছেনা ও বিশ্রী। হয়ত ভয় সত্যি তাচ্ছিল্যকে গ্রাস করে সমাজে সম্মান ফিরিয়ে এনে দেয়। কেবিনে আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে এই কথাটা ভেবে  খুব হাসি পেল ওর। বদ্ধ কেবিনের সারা ঘরময় শুধুই জঞ্জালে ভর্তি। সাথে থিয়েটারের লাউডস্পিকারে শোনা যাচ্ছে অল্পেশ পাঠ করছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রভাত বলে উঠল, ধ্যাৎ । এটাও কোন পাঠ হচ্ছে । মনে মনে ভাবল আজ থিয়েটারে বলরামের রোলে যে ওকে বাদ দিয়ে ত্রিনাথবাবু সবথেকে ভুল করেছেন সেটা পুরো সত্যি হয়ে যাবে। কথাটা মনে করেই  খুব হাসি পেল ওর । বকাসুরের মুখোশে সে আজ তার মধ্যে ছিলোনা। এই অসুর যেন তার মনে ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছিল। ওর কানে কানে কে যেন ফিসফিসিয়ে বলে গেল, নায়ক নয় এই শাম্ব থিয়েটারের জুবিলি শো’য়ের স্টার হবে খলনায়ক। আর আজ ও সেটাই করে দেখাবে। একবার ত্রিনাথবাবুর পাঠানো স্ক্রিপ্টটা হাতে তুলে নিয়ে সে ধীরে ধীরে সেটাই পড়তে শুরু করলো প্রভাত,

              “হে নন্দদুলাল শোন এই ত্রাহি ত্রাহি রব,  

          আপনার শান্তির নীড়ে আজ এই কেন কলরব।

              পরিত্রান হেতু এথা নগরবাসী চঞ্চল।

              স্বয়ং ঈশ্বরের উপস্থিতি সত্ত্বেও, 
                    আজ আমি  উজ্জ্বল।।

              কালান্তক কীট আমি…………………”

পড়তে পড়তে  মুখে একটা হাসির ঝিলিক খেলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সব অপমান, ওর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, সব কিছু যেন মাথায় তালগোল পাকিয়ে যেতে লাগল। আর সেদিন সাত্যকির সেই হাসিটা; মনে পড়তেই ওর শরীর রাগে রি রি করে উঠল। বকাসুরের কষ্টিউমে মধ্যে ওর  মনে হল যেন  হাতের নাগালে পেলে সাত্যকিকে আজ কাঁচা চিবিয়ে খাবে । এমন সময় গেটে একটা টোকা পড়ল,

“প্রভাত গেট রেডি। তোর শট আসছে।”  

প্রভাত শুধু হাসল। বকাসুরের ডানাটা হাতের মধ্যে গলাতে গলাতে নিজের মনলোগটা আবার আউড়ে নিলো সে। এ যেন সত্যি ওর জন্যই লেখা। এ যেন সব ব্রাত্যদের প্রতিহিংসার আস্ফালন। হাতের আঙুলে তীক্ষ্ণ স্টিলের নখগুলো পরে সে এগিয়ে গেল স্টেজের দিকে। একবার প্রম্পটিং ডিপার্টমেন্টের দিকে তাকাতেই বুঝল থিয়েটার আশানুরূপ হচ্ছেনা এবং ত্রিনাথবাবু বেশ হতাশ দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রভাতকে দেখে একবার হাসলেন শুধু। কিন্তু প্রভাত উত্তর দিলনা। মনে মনে শুধু একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে ওর। ত্রাহি ত্রাহি রব না……… আমি দেখাবো কাকে বলে ত্রাহি ত্রাহি রব। সে উঠতেই স্টেজের আলো খানিক অন্ধকার করে একটা লাল আলো ফোকাস করা হল ওর ওপর । প্রভাত নিজের চোখ দুটো বন্ধ করল আর মুহূর্তের মধ্যে স্মরণ করল মর্ত্যলোকের নরাধম বকাসুরকে। কারণ আজ তার যোগ্যতা প্রমানের দিন। দর্শকেরা এতক্ষণ অল্পেশের নিম্নমানের অভিনয়ে বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। তারা শোরগোল করছিল আগে থেকেই। প্রভাতের কানে এল কে যেন দর্শকদের মধ্যে থেকে বলে উঠেছে “এই কাকতাড়ুয়াটাকে হাটাও”। সাথে সাথে হাসির রোল খেলে গেল দর্শকদের মধ্যে। ঠিক যেমন সেদিন তাকে দেখে সাত্যকি করেছিল। তবে আজ ওর রাগ হলনা বরঞ্চ ও একবার পৈশাচিক ভাবে হেসে উঠল। এমন হাসি ইতিপূর্বে কেউ কোথাও শোনেনি। এ যেন নরকের কাল কুহকের ধ্বনি। সাথে সাথে দর্শকদের মধ্যে একটা হিম শীতল নিঃস্তব্দতা। প্রভাত নিজের ঘাড় বেঁকিয়ে বলতে শুরু করল,  

“হে নন্দদুলাল, শোন এই ত্রাহি ত্রাহি রব, 

আপনার শান্তির নীড়ে আজ কেন এই কলরব ?

        পরিত্রান হেতু এথা নগরবাসী চঞ্চল।

  স্বয়ং ঈশ্বরের উপস্থিতি সত্ত্বেও, আজ আমি উজ্জ্বল।।

  কালান্তক কীট আমি, আমি নরাধম

 অধর্মের বীজ আমি, আমি সত্যের শমন।

 দেবতা নই আমি- আমি নরকের অসুর

 আমি মর্ত্যের নরাধম,অসুরশ্রেষ্ঠ বকাসুর”

তারপর একটা বিকট চিৎকার করে সে হাসতে লাগল। দর্শকদের মধ্যে যেন খেলে গেল একটা ভয়ের স্রোত। যারা মিনিট কয়েক পূর্বেও ভেবেছিলেন সিট ছেড়ে চলে যাবেন তারাও কেমন জানি ভয়ে সিটিয়ে বসে পড়লেন। সাথে ব্যাক ষ্টেজে সবাই বিহ্বল দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে প্রভাতের দিকে। এ যেন সত্যি বকাসুরের আবির্ভাব হয়েছে। প্রভাতের যেন মাথার ঠিক নেই। ওর হাসির জোরে পুরো থিয়েটারের প্রতিটা কোণ যেন কাঁপতে শুরু করেছে। খানিক পরেই মথুরাবাসির নিহত করার সিন। তাই সাত্যকি উঠে গিয়ে নিজের পাঠ শুরু করল।

 আর সাত্যিকির গলার স্বর পেতেই প্রভাতের মস্তিকের প্রতিটা স্নায়ুতে ছড়িয়ে পড়ল সহস্র উল্কার তেজ। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা দুঃসাধ্য হয়ে উঠল ওর পক্ষে। মনে হল এই বকাসুরের শরীর যেন চিরে ফেলতে চায় ওকে। ওর শোণিত পান করে তবেই তৃপ্ত হবে সে। রাগে সে থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। আর সেই মুহূর্তেই সে অনুভব করল একটা শিহরণ। যেটা আজ বকাসুরের মুখোশ পড়ার মুহূর্তে ওর হয়েছিল। সে স্পষ্ট বুঝতে পারল গালের কালো দাগটার থেকে একটা অনুভুতি হচ্ছে। সেটা প্রতিশোধ চাইছে তার কাছে। সেটা যেন বলতে চাইছে অনেক হল এই নীতিবাক্য, এবার থাক। আর সেটা অনুরোধের স্বর মোটেও ছিলনা। এ যেন বকাসুরের নির্দেশ। এক লহমায় স্টেজের এত লোকের শব্দ, মিউজিক এমনকি সাত্যকির গলার আওয়াজ অব্দি সে আর যেন শুনতে পেল না। বরং সে দেখল একটা ভ্রম। সুদূর কলকাতার থিয়েটারের গণ্ডি ছাড়িয়ে সে যেন কয়েক মুহূর্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে তার গ্রামে। সেখানে তার মায়ের চোখের জল, তার বোনের হতাশায় শুকনো মুখ আর মোড়লের লোকেদের বিদ্রুপের আওয়াজ ওর কানের পর্দা যেন ফাটিয়ে দিচ্ছে। তারা যেন সমবেত ভাবে হাসছে বা কাঁদছে ওর দিকে তাকিয়ে। সে অনুভব করল নিজের বুকের মধ্যে একটা চাপা হতাশা যেন অজগর সাপের ন্যায় ধীরে ধীরে ওর হৃদস্পন্দন বন্ধ করতে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অমানুষিক কষ্ট সে যেন আর সইতে পারেনা। সে সত্যি পরিত্রাণ চায়। কিন্তু হতাশায় জর্জরিত মানুষের কাছে আলো পৌঁছানোর পূর্বে, যুগে যুগে অন্ধকার আগে উপস্থিত হয়েছে। তারা শেষ চেষ্টা করেছে মানুষকে নরধম করার। এবারেও  তার অন্যথা হয়নি। প্রভাতের শুভ বুদ্ধির উদয় হওয়ার পূর্বে মস্তিকের কোন এক গভীরতম কক্ষ থেকে যেন ডাক দিল স্বয়ং বকাসুর। ফিসফিসে কিন্তু কাষ্ঠকঠিন সেই নিরস ধ্বনি খিলখিল করে হেসে উঠেছে প্রভাতের অন্তরে।

সে বলল, কে নরাধম? এই অবিচার যুগে যুগে যারা সহ্য করে তারা। খিক খিক খিক

প্রভাত নিথর ভাবে ষ্টেজে দাঁড়িয়ে আছে। ওর রোলের কথা ও যেন সব ভুলে গিয়েছে। সে বকাসুরের পোশাকে ভেতর দরদর করে ঘামতে থাকে। মনে মনে ভাবে এই বকাসুরের শব্দ কার ? এর গলা যে, এর গলা যে…………

উত্তরে  সেই স্বর হেসেই চলেছে। খানিক পরেই সে বলে ওঠে হ্যাঁ। আমি তোমার মধ্যেই আছি প্রভাত। এই স্বর তোমার। আর আমি যে একান্তই তোমার নিজস্ব। তোমার একমাত্র সখা।

নিজের মানসিক এই টানাপোড়নে প্রভাত রীতিমত সন্ত্রস্ত। তার কয়েক মুহূর্ত পূর্বে দুর্দান্ত এন্ট্রিতে লোকজন যেমন খুশি হয়েছিল। এবার ওর পুতুলের মত দাঁড়িয়ে থাকা দেখে তারা আবার চিৎকার জুড়েছে।

এদিকে সাত্যকির মুখ যেন এই মুহূর্তে ওর কাছে পৃথিবীর সবথেকে বীভৎস মুখ বলে মনে হল। আর ক্ষণে ক্ষণে সেটা  যেন বদলে যাচ্ছে সে সব মানুষের মুখে যারা প্রভাতকে সারাজীবন নিচু করেছে, ওকে অপমান করেছে।

নিজের মস্তিস্কের এই ভ্রমে সে যেন এক দিকভ্রান্ত পথিক। আর ওর উদ্ধারকারী ওকে বারংবার বলছে,

ওকে শাস্তি দাও প্রভাত। ওকে শাস্তি দাও। 

 রাগে নিজেকে আর সম্বরণ করতে পারলনা সে। এযেন এক অসহ্য ঘৃণা। এর থেকে হয়ত মুক্তি নেই। মাথায় শুধু দামামার মত কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে,

“ওকে শাস্তি দাও প্রভাত। ওকে শাস্তি দাও।” ব্যাথায় কেঁপে উঠল সে। আর না চাইতেই উঠে এল ওর ডান হাতটা। সেটায় লাগানো স্টিলের নখ গুলো যেন কয়েক শতাব্দী ধরে তৃষ্ণার্ত। আর আজ যেন সেই চির অপেক্ষিত দিন। 

 হয়তো ত্রিনাথবাবু বুঝতে পেরেছিলেন কিছু একটা অঘটন ঘটতে চলছে। তাই ইশারাতে তিনি গার্ডদের ইঙ্গিত করতে যাবেন। কিন্তু সে সুযোগ তিনি পেলেন না। যতক্ষণে সিকিউরিটি গার্ডরা প্রভাতকে ধরবে তার আগেই সে ধুমকেতুর মত ছুটে গিয়ে সাত্যকির গলায় বসিয়ে দিল নিজের ধারাল নখ। এমনকি গার্ডরা ওকে মাটিতে ফেলে চেপে ধরতে গিয়ে যখন ওর বকাসুরের মুখোশ ভেঙে গিয়েছিল, ত্রিনাথবাবু কাঁপতে কাঁপতে দেখেছিলেন তখন ও আর  সেই নাম না জানা গাঁয়ের ছেলে প্রভাত ছিলোনা। ডানদিকটার কালো দাগটা ভীষণ বিশ্রী  দেখাচ্ছিল। সাথে কষ বেয়ে ঝরছিল রক্তমেশানো শ্লেষ্মা। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসেনি। সে তখন এক পূর্ণ মানসিক রোগী। সে প্রলাপ করছিল ত্রিনাথবাবুর উদ্দেশ্যে

“দেবতা নই আমি- আমি অসুর, আমি মর্ত্যের নরাধম বকাসুর” । আর সাথে সেই আসুরিক হর্ষধ্বনি। যেটা শুধু ত্রিনাথবাবু না পুরো শাম্ব আর কোনদিন ভুলতে পারেনি।

নমনীয় মনন 

পাভেল আমান

Leaf, Autumn, Wood, Contrast, Dark, Abstract, Fall
মননের নমনীয়তায় 
ছিড়ে ফেলেছি ব্যক্তিত্বের বিমুর্ত ধারণা 
আর পাঁচ জন সাধারণের মতো,
অবিরত মিশে চলেছি 
সুখকর পরিসরের নিরাপদ গণ্ডি থেকে-
মাটির সোঁদা গন্ধে জারিত হয়ে 
ক্রমশ ঢুকেছি জনগণে,
চেতনার স্ফুরণে গড়েছি নিজস্বতা 
এভাবেই অভিযানের সূচনা।
মানসিকতার টগবগে উদ্যমতায় 
নিরন্তর খুঁজে চলেছি অসহায়ের যাতনা 
যতটা সম্ভব প্রসারিত মানবিকতার জরুরি মলম 
সীমিত প্রচেষ্টার ছোঁয়ায়,
হয়তোবা বিধ্বস্ত শরীর গুলোয় 
আবারো জাগ্রত প্রাণের জিয়ন কাঠি!
আনন্দের কলগুঞ্জনে ভেসে যাবে 
সাময়িক মননের মরমী ভেলায় 
ফিরে পাবে প্রতিকূলতার আবহে 
বাঁচার একটু নিঃশ্বাস;
এখানেই ব্যক্তিত্বের বিনম্রতায় 
নতুনভাবে স্বপ্ন দেখবে 
সেই সব স্বপ্নহীনরা!

Publish Your Book with Kafe House 

Sell on Amazon, Google Books and Offline-Stores

Mail us: insightfulsite@gmail.com

সোয়ান সং

ইন্দ্রাণী পাল

Abstract, Aged, Backdrop, Cement, Concrete, Decor
কিছু কথা আর নাই বা লিখলাম
এই তো ছড়ানো ছেটানো বইপত্তর টেবিলে; আধশোয়া ল্যাম্প
আমি চেয়ে আছি বেড়ালের চোখে
কেমন একটা ফ্যাকাসে রক্তশূন্য ভাব
একটা ছেলে বাড়ি ফেরে রোজ রাত একটার পর
আর যতীনের বউ ভালবাসা ভালবাসা মুখ করে দরজা খুলে দাঁড়ায়
পাশ ফিরে বরকে জড়িয়ে ধরে শোয়
আর তাদের দূরাগত স্বপ্নগুলো আমি স্পর্শ করি
 
এইসব এলোমেলো কথাই আজ বড্ড মনে পড়ছে
তুমি খেলে বেড়াচ্ছ সমুদ্রের ধারে
আর আমরা সবাই শীতপোশাক গায়ে চড়িয়ে
একটা লম্বা রাত্রির অপেক্ষায় আছি; নৈঃশব্দ্য
পাতা ঝরারও নিজস্ব ঋতু আছে
নেই বোধহয় শুধু ভালবাসার
গলির কুকুর দুটোর বিশ্রী সঙ্গম দেখতে দেখতে
ঘুমোতে যাই রাতে; আর জেগে উঠে
একটা স্বপ্নের ওভারকোট গা থেকে টেনে খুলে ফেলি
 
আজকের দিনটা বড় বেমানান
জানলা খুলে আকাশ দেখি
একটা প্লেন আলো ঝিকমিক করে অন্ধকারের বুকে মিলিয়ে যাচ্ছে
যে জীবনটা ফেলে এসেছি তার টানে ছুটে গেছি
ছিঁড়ে ফেলেছি ফিনিশিং পয়েন্টের দড়ি
এইসব না-বলা কথা লঘু সংলাপ ভিড় করে আসে
মাথার ভিতর যখন শীতকালীন ঘুম বড্ড দেরী করে আসে
 
ফিফটি সেভেন বাই টু দু’কামরার ফ্ল্যাটে ঘুটঘুট করে অন্ধকার
আকাশে ধ্রুবতারাটা কিন্তু দিব্যি জ্বলজ্বল করে।

তুমি কাছে এলে

সমাজ বসু

Heart, Love, Romance, Valentine, Harmony, Romantic
 
তুমি কাছে এলে–
সবকিছু কেমন ওলটপালট হয়ে যায়,
ঝাঁ ঝাঁ দুপুরের রোদে ভাসে রঙের নির্যাস–
আমি কিছুতেই মনে করতে পারি না–
শহরের কোন্ দূতাবাস থেকে চুরি গেছে
কিছু দুষ্প্রাপ্য জিনিস,
বাংলা গানমেলার প্রথম জন্মতারিখ কিংবা
বেলঘড়িয়ার পিনকোড।–
তুমি কাছে এলে–
ক্রমশ শিথিল হয় মস্তিষ্কের কোষ,
শিরায় শিরায় দানা বাঁধে উন্মাদনা–
সব প্রসঙ্গই স্বল্পস্থায়ী হতে হতে একটা অস্থায়ী উপনিবেশ
গড়ে তোলে বুকের ভেতর–
বড় বেশি অবিন্যস্ত মনে হয়,গাছ পাখি–
আর কখন যেন আকাশটা পায়ে এসে ঠেকে।
 
তুমি কাছে এলে…….

কথা

ঐশ্বর্য্য কৃষ্ণ

Fisherman, Boat, River, Fishing Boat, Fishing, Water

প্রিয়জন সবাই হতে পারে না।
অথচ বৃষ্টির গান সবাই জানে।
সবাই কাছে আসতে পারে না।
অথচ কান্নার নদী সবার থাকে।


মন খারাপ হলে বিকেল জানলায়।
কখনও একাকী ভিজি বৃষ্টি বর্ষায়।
প্রথম দিকে প্রেমে থাকে যতটা মুগ্ধতা।
বিরক্ত হলেও নদী কাছে থাকে ততটা।

কে তোমার সাথে ভালবাসা লিখবে?
যে তোমার প্রতিটি নদীকান্নায় মিশবে!

Publish Your Book with Kafe House 

Sell on Amazon, Google Books and Offline-Stores

Mail us: insightfulsite@gmail.com

ফিরে দেখা…

পূর্ণিমা মুখার্জী

River, Stream, Curved, Prairie, Sunrise, Nature

পুরনো বছর চলে যায় পড়ে থাকে শুধু স্মৃতি… বছরটা শেষের দিকে,২০২১ আসতে আর বেশী দেরী নেই।তাই একটু ফিরে দেখা…

২০২০ শুরুটা অনেকেই মজা করে একে টি -টোয়েন্টি বছর বলেছিল।প্রথম দু-আড়াই মাস সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল।শুধু বাইরের দেশগুলো থেকে ‘করোনা’ নামেএকটা ভাইরাসের খবর পাওয়া যাচ্ছিল যা সাংঘাতিক ছোঁয়াচে।যেটার ব‍্যাপারে এদেশের সাধারন মানুষ অতটা সচেতন ছিল না।চীন দেশের এই ভাইরাস যে পুরো পৃথিবী অচল করে দেবে কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারে নি।ক্রমে ফ্রান্স,জার্মানি,ইটালি,স্পেন, ব্রিটেন,আমেরিকার মত উন্নত দেশগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে।টিভি খুললেই খালি করোনার আপডেট…প্লাস্টিকে মোড়া মৃতদেহ,সারিবদ্ধ লাশ।
আস্তে আস্তে এদেশেও মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ে। আন্তর্জাতিক বিমানে করে বিদেশ থেকে যাত্রী আসা বন্ধ করে দেওয়া হয়।তবুও শেষরক্ষা হয় না।আন্তঃ রাজ‍্য যাতায়াতও বন্ধ হয়ে যায়।  মানুষ সোশ্যাল ডিসট‍্যান্সিং,কোয়ারেনটাইন কথা গুলিতে অভ‍্যস্ত হয়ে পড়ে।২২শে মার্চ জনতা কার্ফু দিয়ে শুরু করে একদিন পর থেকেই বাইরের দেশ গুলোর মত এখানেও লকডাউন শুরু হয়ে যায়।ধর্মীয় স্থান,স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালত, দোকান, বাজার, মল সব বন্ধ করে দেওয়া হয়।জল,স্থল,আকাশ পথ সবরকম যাতায়াত ব‍্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়। খালি জরুরী পরিষেবা খোলা থাকে। কোথাও কোথাও লোকজনের বাইরে বেরোনো বন্ধ করতে কার্ফু জারী হয়।ভিন রাজ‍্যে কাজ করা কর্মহীন শ্রমিকরা কোথাও পায়ে হেঁটে,কোথাও সাইকেলে,কেউ  হয়ত অনেক টাকার বিনিময়ে ভাড়া করা গাড়িতে বহু কষ্ট আর আতঙ্কের মধ‍‍্যে নিজের রাজ‍্যে পৌঁছাতে পারে।পথে অনেক পরিযায়ী শ্রমিকের প্রান যাবার মত ঘটনাও ঘটে।
প্রথমদিকে আতঙ্ক এতটাই  ছিল যে সহযোগিতা ছিল কম।রোগী ও তাঁর পরিবারের লোকজনকে অনেক জায়গায় একঘরে করে দেওয়া  হয়।ততদিনে বিশ্বস্বাস্থ‍্যসংস্থা(WHO)রোগটিকে অতিমারী (world wide pandemic) ঘোষণা করে দিয়েছে।গত শতকের স্প‍্যানিশ ফ্লু এর তীব্রতার সাথে এর তুলনা শুরু হয়।তবে এইসময় ডাক্তার,নার্স ও স্বাস্থ্য পরিষেবার সাথে যুক্ত মানুষগুলো নিজেদের জীবন বিপন্ন করে,ছুটি বাতিল করে, অক্লান্ত পরিশ্রম করে আক্রান্তদের সুস্থ করার কাজ করে গেছেন।পিপিই পরা
এইসব দেবদূতরা সমানে মানুষকে সচেতন করে গেছেন।পুলিশ,আধা সামরিক বহু লোক,ব‍্যাঙ্ককর্মীরা,জরুরী পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত লোকজন এইসময় নিরলস কাজ করে গেছেন।তবে যারাই প্রত‍্যক্ষভাবে সামনের সারিতে কাজ করেছেন তাঁদের অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন।তার মধ্যে অনেককেই আমারা অকালে হারিয়েছি।এই বছর আমরা দেশ বিদেশের বহু বিখ‍্যাত ব‍্যক্তিকেও হারিয়েছি এই রোগের কারনে।সব ধর্মীয় উৎসব এই বছর আড়ম্বরহীন ভাবে পালিত হয়েছে।

বিষের এইবছরে অন‍্য আরো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মত আর একটি ঘটনা দুঃস্বপ্নে ও বহুদিন  দক্ষিণবঙ্গের মানুষ ভুলবে না।দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট অতি ঘনীভূত নিম্নচাপ সুপার সাইক্লোন ‘আমফান’ গাঙ্গেয় সুন্দরবন সহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় তান্ডব চালায় কয়েক ঘন্টা। প্রচুর ঘর বাড়ি ক্ষয়ক্ষতি হয়। মানুষ,গবাদি পশুর জীবন হানি হয়।বেশ কিছুদিন বিদ‍্যুৎবিহীন, জলবিহীন হয়ে যায় কিছু অঞ্চল।রাস্তাঘাটের অবস্থা আরো বেহাল হয়ে যায়।এই করোনা কালেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে বহু মানুষ ত্রাণ কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

মন খারাপের এই বছরে মানুষের সহযোগিতার রূপ বারবার সামনে এসেছে।বাড়ি বাড়ি খাবার, জল,ওষুধ, কাঁচা বাজার পৌঁছে দিয়ে মানুষ মানুষের পাশে দাড়িয়েছে।এই বছরে বহু কারখানা,অফিস,মল,ট্রেন,বাস  সব বন্ধ থাকায় বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে।কোথাও 
বেতন অর্ধেক করে দেওয়া হয়।মানুষ বাধ্য হয়েই মিতব‍্যয়ী হয়ে যায়। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কোন জিনিস কেনা নয়।আবার খুব প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বেরোনো নয়।যোগানের অপ্রতুলতা ছিল মিতব‍্যয়ের অন্য কারন।বাইরের হোটেল, খাবারের  দোকান  সব বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়েই মানুষ ঘরের তৈরী খাবারে কাজ চালাতে বাধ‍্য হয়ে উঠেছে।এতে ঘরের মহিলাদের কাজ বাড়লেও শরীরের জন‍্য খুব ভালো হয়েছে।অনেকেই বারবার হাত ধোওয়ার পাশে স্বাস্থ্য সম্মত খাবার,গরমজলে ভাপ ও গারগেল,ভিটামিন ওষুধ,গ্রীন টি খাওয়া,নিয়মিত হাঁটা ও শরীর চর্চা করা,সূর্যের আলো গায়ে লাগান এসব একটা রুটিন মেনে করে যাচ্ছেন। এই সচেতনতা স্বাস্থ্য রক্ষায় শেষ পর্যন্ত ভাল ফলই দেবে। যারা কর্মসূত্রে বা পড়াশোনা বা অন্য কারনে পরিবার ছেড়ে বাইরে থাকতেন তারাও এই লকডাউনে ঘরে চলে এসেছেন এবং ঘর থেকেই অনলাইনে পড়াশোনা বা অফিসের কাজ চালাচ্ছেন।এতে পরিবারের সান্নিধ্য পাচ্ছেন।
দীর্ঘকালিন লকডাউনের কারনেএই বছর পরিবেশ দূষণের হার অনেকটাই কমেছে।গঙ্গা সহ দেশের বিভিন্ন নদীর জল আগের থেকে  অনেকটাই পরিষ্কার হয়েছে।পরিযায়ী পাখির দল যারা আসা বন্ধ করছিল তাদের আবার দেখা যাচ্ছে।বৃষ্টিও হয়েছে প্রচুর।ঋতুর পরিবর্তন ও বেশ ভালোই বোঝা গেছে।তাপমাত্রার বৃদ্ধির হারও কমেছে কিছুটা।

ধাপে ধাপে আনলক শুরু হয়েছে বেশ কয়েকমাস।আস্তে আস্তে অনেক কিছুই খুলেছে।যদিও পঠন পাঠন এখনও অনলাইনেই হচ্ছে।স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা পুরো মোবাইল,কম্পিউটার নির্ভর হয়ে পড়েছে।আস্তে আস্তে অনেকেই জীবন জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে বেরোতে বাধ্য   হচ্ছেন প্রয়োজনীয় সাবধানতা নিয়েই। স‍্যানিটাইজার, মাস্ক, স‍্যোশাল ডিসট‍্যাংন্সি (SMS) এখন অবশ‍্য পালনীয় স্বাস্থ্যবিধি।মানুষের সচেতনতা বেড়েছে বলেই সুস্থতার হারও আগের থেকে অনেকটাই বেড়েছে।

প্রিয়জন বিয়োগের এই বছরে সবাই শঙ্কিত হয়ে আছে প্রানে বাঁচব কিনা এই চিন্তায়।বর্তমানে শোনা যাচ্ছে করোনার একটা দ্বিতীয় অধ‍্যায় আসতে পারে। এটাই সবার দুঃশ্চিন্তা আরো বাড়িয়েছে।মানুষ এখন ভ‍্যাকসিন নামক জাদুছড়ির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের কয়েক মাসের অক্লান্ত পরিশ্রমে শোনা যাচ্ছে সামনের বছরের প্রথমদিকেই হয়ত এসে যাবে ভ‍্যাকসিন।যে আসলে আবারও সব ঠিক হয়ে যাবে এটাই আশা।এই অভিশপ্ত বছরের শেষ পর্বে এই কথাই বলতে চাই  আবার সুস্থ হয়ে উঠুক পৃথিবী।ছন্দে ফিরুক পৃথিবী।স্পর্শের ভয় কাটিয়ে ফিরে আসুক বিশ্বাস,আসুক পূর্বের স্বাভাবিকতা।হোক জীবনের জয়গান।২০২০ শেষে এটাই প্রার্থনা– তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো পৃথিবী,আমরা তোমার অপেক্ষায়।ভালো থেকো,ভালো রেখো সবে…স্বাগত ২০২১

গল্প

দেবব্রত রায়  

Painting, Acrylic Paint, Background, Abstract, Painter
ববিতা জিগ্যেস করলো, ডিঙগো ডিয়ার, তুমি কি জান সত্যি এবং মিথ্যের মধ্যে পার্থক্য কতটা মানে, হাও মাচ ডিফারেন্স বিটুইন ট্র্যু অ্যান্ড ফলস ? ববিতা ডিঙগোর দিদুন অর্থাৎ ,মায়ের মা । স্কুলের বেবিদের মতন করে দিদুনের কাঁধ পর্যন্ত চুল ছাঁটা।মাঝে মাঝেই ডিঙগোর দিদুন তাতে আবার রঙিন হেয়ার-ব্যান্ড ব্যবহার করেন আর,  কথা বলার সময় সেই ঝাপঝুপো চুলগুলো খুবই ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে তিনি কথা বলেন। দিদুনের এইধরনের বেবি-বেবি অ্যাটিটিউড ডিঙগোর মোটেই ভালো লাগে না। ও ঘাড় শক্ত করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। ববিতা আবারও বলে, ডিঙগো, প্লিজ নটি বয়ের মতো অমন গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকো না ! কথাগুলো বলেই , সে ডিঙগো-র কার্লি চুলের একটা গোছা ধরে একটু জোরেই টান দেয়। বলে, “শোন, চোখে যা দেখবে  তাই সত্যি আর, কানে যা শুনবে জেনো তার সবটাই  মিথ্যে!…আর, যেহেতু আমাদের চোখ এবং কানের মাঝখানের দূরত্ব হচ্ছে চার আঙুলের তাই, সত্যি এবং মিথ্যের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে মাত্র চার আঙুলের ! ” বলেই, ববিতা একটা বিজ্ঞের হাসি হাসলো।                                                                                

দিদুনের এই কথাগুলোর লক্ষ্য যে আসলে জিকো সেটা বুঝতে একটুও অসুবিধা হলো না ডিঙগোর। কাল বাঁকুড়ার থেকে জিকো ফোন করে ডিঙগোর বাপি মানে, জিকো তার ছেলেকে হাঁটুর ব্যাথা নিয়ে ডাক্তার কী-কী অ্যাডভাইজ দিয়েছেন সেই বিষয়েই আলোচনা করছিল।                                             
 
অথচ, জিকো কিন্তু ,একেবারেই অন্যরকম কথা বলে। সে বলে, কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল তা পরীক্ষা করে বুঝে নিতে হয় ! প্রয়োজনে তুমি কারোর সাহায্য নিতে পার কিন্তু , সিদ্ধান্তটা নিতে হবে তোমাকেই !                                                                                                                           কলকাতার এই বাড়িতে জিকো খুব কমই আসে । সে থাকে অনেক দূরে। সেই বাঁকুড়ায়। মাঝেমধ্যে যখন সে ডিঙগোদের সঙ্গে এসে থাকে তখন ডিঙগোর খুব ভালো লাগে, ভিতরে ভিতরে ভীষণ আনন্দ হয় কিন্তু, মায়ের ভয়ে ডিঙগো সেটা প্রকাশ করতে পারে না। সেসময় বাবাও ওই ক-দিনের জন্যে ডিঙগোর মতোই যেন একেবারে ছোট্টটি হয়ে যায় ! অফিস থেকে ফিরেই ফ্রেশ হয়ে নিয়ে সটান জিকো-র কোলে শুয়ে পড়ে  বলে, মাথাটা একটু টিপে দাও দেখি মা ! ডিঙগো ক্লাস-টু পর্যন্ত জানত ,ওর ঠাম্মি-র নাম জিকো তাই, ঠাম্মি যখন ডিঙগোকে জিকো বলে ডাকত তখন ও বলত আমি তো ডিঙগো ,তোমার নাম তো জিকো ! ডিঙগো এখন জানে পৃথিবীর  একজন বিখ্যাত ফুটবলারের নাম জিকো।যাঁর জন্ম ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো শহরে। ঠাম্মি তাঁর নামেই ওর নাম রেখেছিল জিকো। কিন্তু, মা আর,দিদুনের সেই নামটা পছন্দ নয় !                                                                       
 
মা যখন ঠাম্মির সঙ্গে মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলে তখন হেসে হেসে  কী সুন্দরভাবে কথা বলে কিন্তু, ফোনটা নামিয়ে রেখেই সে যেন জায়ান্টের মতো গরগর করতে থাকে ! বলে, ডাইনি বুড়িটা মরলে বাঁচি ! ব্যাঙ্কের টাকাগুলো হাতে পেলে অন্তত এই সময় কাজে লাগাতে পারতাম….
ডিঙগো ওর মায়ের সব কথাগুলো-র মানে ঠিকঠাক বুঝতে পারে না কিন্তু , এটুকু সে বুঝতে পারে যে কথাগুলো খুবই নোংরা !  
একটা ছুটির দুপুরে সবাই যখন খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছে ডিঙগো তখন ওর বাবার ফোনটা নিয়ে  চুপিচুপি নিজের পড়ার ঘরে এসে ঢোকে । এইসময় খাওয়াদাওয়া সেরে ঠাম্মি তার প্রিয় ক্রেডলটাই বসে গল্পের বই পড়ে। ডিঙগো ওর অনভ্যস্ত হাতে ঠাম্মির ফোন-নাম্বারটা টেপে।ও পাশে একটা সুন্দর রিংটোন বেজে ওঠে, আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে……                                                     
 
” হ্যালো ! ” ঠাম্মির গলা শুনতে পায় ডিঙগো। সে বলে, আমি এখন জিকো বলছি !              ঠাম্মি ওপাশ থেকে হাসি হাসি গলায় বলে, ” এখন জিকো! ” বেশ, বলো !         
 
ঠাম্মির কথায় জিকো লজ্জা পায়। সে বলে, না, না , আমি জিকো-ই বলছি। তারপর, খুবই সিক্রেট একটা বিষয় আলোচনার মতো করে সে চুপিচুপি গলায় বলে, শোনো , আমি আর, আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আদ্রিজা রিসেন্ট একটা  ম্যাটার ডিসকাভার করেছি !                                             
ওপাশ থেকে ঠাম্মির কৌতুহলী গলা ভেসে আসে। বলে, তোমরা দুজনে ! তাই ! তা, কী ডিসকভার করেছো বল তো!                                                                     
না, মানে বিষয়টা আদ্রিজা-ই ডিসকাভার করেছে তবে,আমিও সেটা গ্রান্ট করেছি ! কথাগুলো আবারও লজ্জা পাওয়া গলাতেই বললো জিকো !                                     
 
 বেশ তো ! তা, বিষয়টা কী ? ওপাশ থেকে বিশেষ আগ্রহ নিয়ে জানতে চায় ঠাম্মি ।    আমরা ডিসকাভার করেছি, কথাটা বলেই, জিকো  কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে তারপর,বলে, না, মানে তুমি মোটেই নও কিন্তু, বেশিরভাগ বড়োরা-ই, মানে দিদুন,মায়ের মতো বড়োরা ফোনে যা কিছু বলে জেনো তার বেশিরভাগ-ই মানে 99.9% একেবারেই ফলস ! কিন্তু, এই যে আমি ফোন করছি আমি কিন্তু , সত্যি বলছি! মানে, আমি বলতে চাইছি আসলে , সব শোনা কথাই কিন্তু , মিথ্যে নয়…..                                                             
 জিকোর নরম মনের ভিতরে যে একটা নিদারুণ টানাপোড়েন চলছে সেটা আন্দাজ করতে পেরে জয়তীর বুকের কাছটা মুহূর্তে ভীষণ ভারি হয়ে ওঠে ! কোলের উপর রাখা বইখানা সে ধীরে ধীরে পাশে নামিয়ে রাখে । ছেলের মাত্র তিন বছর বয়সে নীলাঞ্জনকে হারায় জয়তী ! তারপর থেকে শুধুই লড়াই আর, লড়াই ! একদিকে অধ্যাপনা আরেকদিকে ছেলে মানুষ করা। সেসময় নীলাঞ্জনের মা, মানে জয়তীর শাশুড়ি ওদের ছেলে আর মাকে একেবারে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন অবশ্য,জয়তীও ছেলে আর, বৃদ্ধা শাশুড়ির প্রতি কর্তব্যে অবহেলা হবে ভেবেই একবারের জন্যেও ওর নিজের মাকে সংসারের বিষয়ে মাথা ঘামাতে দেয়নি কারণ, জয়তী খুব ভালো করেই জানত , ওর মা সংসারে এলে শুধু নিজের মেয়ের কথা-ই ভাববে !  না তার ছেলের কথা ভাবতো , না ভাবতো নীলাঞ্জনের মায়ের কথা ! জয়তীর মা অবশ্য এসবের মধ্যেই জয়তীর জন্য দু-দুটো সম্বন্ধও দেখে ফেলেছিল ! ডঃ অরুণাংশু-ও ওকে ভালোবাসার কথা বলেছিলেন । সেও ছিল আরেক লড়াই !মাত্র পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের জয়তীর মনের সঙ্গে সেদিন লড়াইটা হয়েছিল এক মায়ের, এক পুত্রহারা বৃদ্ধার বৌমার দায়িত্ববোধের ! জয়তী যদিও ,ওর মা, ডঃ অরুণাংশু বসু এদের কারোর ডাকেই সেদিন সাড়া দেয়নি !                                             
 
আজ পাঁচবছর হলো জয়তীর মা মারা গেছেন! শাশুড়ী তারও অনেক আগেই। ছেলে সেই সবে জয়েন্টে চান্স পেয়ে ডাক্তারিতে ভর্তি হয়েছে ! ডঃ অরুণাংশু বসু এখন সাউথ -অস্ট্রেলিয়ায়। ওখানকারই এক ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে বিবাহসূত্রে সেখানকার নাগরিকত্ব নিয়ে সেই কবেই দেশ ছেড়েছেন তিনি ।     
  জয়তী কনসিভ হওয়ার একেবারে প্রথম দিন থেকেই নীলাঞ্জনের ইচ্ছে ছিল ওদের ছেলেই হোক বা, মেয়েই হোক সে ডাক্তার হবে ! জয়তী  বলেছিল, ছেলে-মেয়েদেরও তো নিজস্ব একটা ‘সে ‘ থাকে ! নীলাঞ্জন কেন যে সেদিন হাসতে হাসতে বলেছিল, দেখো তুমি বললে সে ঠিক রাজি হয়ে যাবে ! তাহলে কি, নীলাঞ্জন আগে থেকেই বুঝতে পেরে গিয়েছিল তাদের সন্তান বড়ো হওয়া পর্যন্ত সে থাকবে না ! নীলাঞ্জনের অনেক কথাবার্তা জয়তীর কাছে আজও রহস্যই থেকে গেছে ! দেখতে দেখতে আটান্নটা বছর কীভাবে যে কেটে গেল, জয়তী এখন আর সেসব যেন ভাবতেই পারেনা ! হয়তো,এরকমই হয় কিন্তু, নিজের জীবনে একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিশ্চয়ই সেসময় ভীষণ জটিল বলেই মনে হয়েছিল তার !       
 
 নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া পুরানো কাঠামো কি ফিরে আসে,জয়তী বুঝতে পারেনা ! তার এইটুকু জীবনে ঘটে যাওয়া কত ঘটনায় না জমে ছিল কোনো এক অন্ধকার গুহার ভিতরে ! আজকাল  একে একে সব যেন ফিরে আসছে জোয়ারের কলস্রোতে ! নীলাঞ্জন আর, জয়তীর একমাত্র সন্তান শঙখসুভ্র চ্যাটার্জি এখন কলকাতায় ভীষণ ব্যস্ত একজন ইয়াং অ্যান্ড হাইলি প্রমিসিং কার্ডিওলজিস্ট ! জয়তী ভাবে নিজের শরীর থেকে ছিন্ন হয়ে সুদূর কক্ষপথে চলে যাওয়া উজ্জ্বল চাঁদের জন্য মাঝরাতে এই গ্রহটা যখন একেবারেই নিঃসঙ্গ ওহয়ে পড়ে তখন কি, সকলের চোখের আড়ালে তার খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে !  ক্রমশ এক নিরবচ্ছিন্ন ভাবনায় তলিয়ে যেতে যেতে জয়তীর কানে দূর উপগ্রহ থেকে যেন  একটা বার্তা ভেসে আসছিল, হ্যালো, হ্যালো….আমি জিকো বলছি ! হ্যালো…….হ্যালো…….. 

যা কিছু ফুরিয়ে গেছে 

কৃষ্ণ রায় 

Feathers, Bird, Animal, Art, Abstract, Watercolor
যা কিছু ফুরিয়ে গেছে তার খোঁজ নিই না আর
যা কিছু ফুরিয়ে যাবে বলে ছুঁয়েছিল হাত 
তাঁদের সাথে আর যোগাযোগ না থাক
কিছুই হওয়ার নেই। 
হতে পারত অনেক কিছু।
অথচ হয়নি কিছু 
অথচ যা কিছু হয়েছে মন্দ হয়নি মোটেও।
 
 
যা কিছু ফুরিয়ে গেছে, 
ফুরিয়ে যেতেই যাঁরা ছুটে আসে হঠাৎ 
তাদের সাথে আর যোগাযোগ না থাক 
সব স্বপ্ন কার পূরণ হয়? হয়েছে কারো?
হয়নি। বরং স্বপ্ন বুনেছে আরো।
 
যা কিছু ফুরিয়ে গেছে যাক না ক্ষতি কী 
যা কিছু আছে ভবিষ্যতের প্রতীকী 
তা নিয়ে আরো বহুদূর হাঁটা যায় 
আরো ছুঁয়ে দেখা যায় গন্তব্যের সবুজ 
আরো দেখা যায় অজস্র নদী।
 
যা কিছু ফুরিয়ে গেছে তাদের গল্প ফুরিয়ে যাক
যা কিছু আছে, নিশ্চুপ নির্বাক 
তাদের সাথে গল্প বানাই খুব
যা কিছু ফুরিয়ে গেছে তাদের গল্প থাক চুপ …

Circle

Ankita Basu

The flower returns in the morning noon…
This is quite a circle, of stones…
Let that go outside the circle…
Butterfly flying….
I will not go anywhere without circumcision…
This is pretty…
Exile continuous violin….

শূণ্যতা-মহল

বদরুদ্দোজা শেখু

Village, Town, Line Art, Landscape, Vintage, Retro, Old
 

গ্রামগুলো উবে যায় , শহর নগর ধ্বংসস্তূপ

প্রাচীন সভ্যতা। দেবতারা ঘুমন্ত মায়াবী ।
কায়াহীন ছায়া-ছায়া কা’রা যেন দৌড়ায়  নীলিমার 
করিডর ধ’রে, কবরে শ্মশানে
জায়গা হচ্ছে না ।সমুদ্র-বন্দরে নোঙর করেছে
কোনো এক ছায়াপথ থেকে আসা
মহাজাগতিক প্রাণী  , তারা মৃত ক্লীবলিঙ্গ করবে পত্তন।
ঘনঘন দুর্যোগের ঝড় খরা বন্যা ধ্বংস মহামারী
জারি করে লাল বিপদ-সঙ্কেত ।অবহেলা  বেড়ে উঠে
পাহাড়ের খুঁটে পরিত্যক্ত ফুলের বাগানে ,
কতোদিন পর্যটক নাই, শখ নাই, ঝিকঝিক
রেলগাড়ি নাই, খেচর বিমানগুলো স্থানুটে দানব,
জনমানব-বিরল ভবিষ্যৎ ভুবনডাঙা  প্রাণের কাঙাল।
মহাকাল গুণবার কারো কোনো দায় নাই, সমস্ত অকাজ।
কাজকর্মহীন আমাদের চালচুলো ভেস্তে যায়
ধূলো বালি জল স্বপ্ন দ্যাখে  সাগরে যাওয়ার
হাওয়ার আগে দৌড়ায় যতো আজব গুজব
যতোই আজব হোক, বাড়ছে করোনা, সরকার  
মিথ্যা-সত্য সান্ত্বনা দেওয়ার সংখ্যাতত্ব
আউড়াতে তৎপর,যেন সেগুলিই করোনাকে
দ্রুতই পাঠাবে আন্দামান সেলুলার জেলে ।
ছেলেমেয়েগুলো  হতাশায় পর্নো দ্যাখে, প্রেম পরকীয়া 
বাজি রাখে  গন্ধকের বনে,মনে মনে শুধুই সংক্রামক
 দাবানল । স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মুখ ঢেকে
 নাগাড়ে বিশ্রাম নিচ্ছে ভূতের আড্ডায় জীবনে প্রথম, 
আর সৌজন্য-বিদ্বেষী হতাশায় ঘুঁটে আসে পড়ুয়ার মন
ঘুঁটে আসে অসহায় শ্রম উদ্যম ও দম। কমসে-কম 
সঙ্গীসাথী উত্তেজনা ছাইভস্ম  পুরিয়া বোতল চায় ,বিরহী 
মাদল বাজে মনের জঙ্গলে।চলে  জলে স্থলে গগনতলে 
শূণ্যতা-মহল, মারাত্মক অতিমারী উপহার দিয়ে গেল
 দুহাজার বিশ সাল বিষ বিশ সাল
সবকিছু ছত্রখান ক’রে গেল হাহাকারে আর 
ভয়ে ত্রাসে গ্রাসে পয়মাল

শীত এলে 

গোবিন্দ মোদক 

Tree, Lonely, Sunset, Winter, Colors, Snow, Twilight
শীত এলে এসে যায় খেজুরের গুড়, 
নলেন  গুড়ের  বাস  আহা  সুমধুর !
শীত  এলে  বাগানেতে  মরশুমি  ফুল, 
শিশিরের ছোঁয়া পেয়ে  আহা তুলতুল !
শীত  এলে  কার্ডিগান  শাল  সোয়েটার, 
কম্বল আর আলোয়ানে  রঙের বাহার !
শীত  এলে  মাঠ  জুড়ে  সবজি  নানা,
বেড়ানো, বনভোজন, বাদশাহী খানা ! 
শীত এলে খালে বিলে পরিযায়ী পাখি, 
চিড়িয়াখানা, জাদুঘর কেউ যাবে নাকি ? 
শীত  এলে  হাত-মোজা, লেপের আদর,  
উলের  পোশাক  নানা  রঙিন   চাদর !
শীত এলে তিলেখাজা, পিঠে ও পায়েস, 
সরুচাকলি,পাটিসাপটা খাওয়ার আয়েশ ! 
শীত এলে নাটক, যাত্রা  আর বইমেলা, 
ময়দানে  ভলিবল  ক্রিকেটের  খেলা ! 
শীত এলে কুয়াশা  আর উত্তুরে হাওয়া, 
কনকনে  ঠান্ডায়  হি-হি  গান  গাওয়া ! 
তবে, শীত এলে গরীবেরা  কষ্ট যে পায়,
সবার  তো  উপযুক্ত  শীতপোশাক নাই ! 
শীত এলে ঝুপড়িতে হু-হু ঢোকে হাওয়া,
শীতে কেঁপে কোনমতে দিন কেটে যাওয়া !
তবু , শীত  রঙে – রসে – স্বাদেতেও বেশ,
বড়দিন  আর  নববর্ষে রেখে যায় রেশ !!

মুক্তির খোঁজে

আঁখি রায়

ঝাপসা সভ্যতা উঠছে বেয়ে আলোর সিঁড়ি ৷
বিস্বাদ স্বাদকোরকরা ছুঁতে চায় অমৃত গিরি |
ঘড়ির চাকা ভাসালো, বিষাক্ত কালো স্রোত ৷
চোষকের হুল রক্ত চুষে, নিয়েছে প্রতিশোধ I
বাঁধন ছাড়া মানব দল খোঁজে মুক্তির রস ৷
শঙ্খশুভ্র নব জীবনে যেন না নামে আর অশুভ ধস ৷

শূণ্যতা-মহল

বদরুদ্দোজা শেখু

Village, Town, Line Art, Landscape, Vintage, Retro, Old
 

গ্রামগুলো উবে যায় , শহর নগর ধ্বংসস্তূপ

প্রাচীন সভ্যতা। দেবতারা ঘুমন্ত মায়াবী ।
কায়াহীন ছায়া-ছায়া কা’রা যেন দৌড়ায়  নীলিমার 
করিডর ধ’রে, কবরে শ্মশানে
জায়গা হচ্ছে না ।সমুদ্র-বন্দরে নোঙর করেছে
কোনো এক ছায়াপথ থেকে আসা
মহাজাগতিক প্রাণী  , তারা মৃত ক্লীবলিঙ্গ করবে পত্তন।
ঘনঘন দুর্যোগের ঝড় খরা বন্যা ধ্বংস মহামারী
জারি করে লাল বিপদ-সঙ্কেত ।অবহেলা  বেড়ে উঠে
পাহাড়ের খুঁটে পরিত্যক্ত ফুলের বাগানে ,
কতোদিন পর্যটক নাই, শখ নাই, ঝিকঝিক
রেলগাড়ি নাই, খেচর বিমানগুলো স্থানুটে দানব,
জনমানব-বিরল ভবিষ্যৎ ভুবনডাঙা  প্রাণের কাঙাল।
মহাকাল গুণবার কারো কোনো দায় নাই, সমস্ত অকাজ।
কাজকর্মহীন আমাদের চালচুলো ভেস্তে যায়
ধূলো বালি জল স্বপ্ন দ্যাখে  সাগরে যাওয়ার
হাওয়ার আগে দৌড়ায় যতো আজব গুজব
যতোই আজব হোক, বাড়ছে করোনা, সরকার  
মিথ্যা-সত্য সান্ত্বনা দেওয়ার সংখ্যাতত্ব
আউড়াতে তৎপর,যেন সেগুলিই করোনাকে
দ্রুতই পাঠাবে আন্দামান সেলুলার জেলে ।
ছেলেমেয়েগুলো  হতাশায় পর্নো দ্যাখে, প্রেম পরকীয়া 
বাজি রাখে  গন্ধকের বনে,মনে মনে শুধুই সংক্রামক
 দাবানল । স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মুখ ঢেকে
 নাগাড়ে বিশ্রাম নিচ্ছে ভূতের আড্ডায় জীবনে প্রথম, 
আর সৌজন্য-বিদ্বেষী হতাশায় ঘুঁটে আসে পড়ুয়ার মন
ঘুঁটে আসে অসহায় শ্রম উদ্যম ও দম। কমসে-কম 
সঙ্গীসাথী উত্তেজনা ছাইভস্ম  পুরিয়া বোতল চায় ,বিরহী 
মাদল বাজে মনের জঙ্গলে।চলে  জলে স্থলে গগনতলে 
শূণ্যতা-মহল, মারাত্মক অতিমারী উপহার দিয়ে গেল
 দুহাজার বিশ সাল বিষ বিশ সাল
সবকিছু ছত্রখান ক’রে গেল হাহাকারে আর 
ভয়ে ত্রাসে গ্রাসে পয়মাল

করোনা এবং নতুন বছর

বিশ্বজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়

City, Urban, Slum, Favela, Buildings, Houses

ঘড়িতে রাত ১১.৩০ বাজে। বস্তিতে থাকা লোকগুলো শব্দবাজি ফাটিয়ে বছর শেষ উদযাপন করছে। বস্তির পাশে উঁচু চাকচিক্যময় ফ্ল্যাটবাড়ি। সেখানকার মানুষেরা ডিজে মিউজিক চালিয়ে পাগল করা নাচ নাচছে। ওরা সবাই গুনছে আর কতক্ষণ বাকি বারোটা বাজতে। ওরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কখন ২০২১ আসবে, ২০২০ সালের সমস্ত ময়লা মুছে ফেলা যাবে। কিন্তু সব ময়লা কি দূর হয়? কিছু ময়লা আমাদের স্মৃতিতে পরজীবীর মতো থেকে যায়।

লকডাউনের ছায়া আমাকে-আপনাকে সেই দিনের পর দিন অসহ্য অবস্থাগুলো ভুলতে দেবে না। বাড়িবন্দী জেলখানার স্মৃতি ফিরিয়ে আনবে। নতুন বছরেও বহুদিন আপনি ভাববেন যে রাস্তায় বেরোলে মুখে মাস্ক আছে তো? সমাজের কোরাপশানকে না পারুন, অন্তত নিজের হাতদুটো কিন্তু স্যানিটাইজ করে চলতে হবে আরও বহুদিন। গোটা ২০২০ সাল জুড়ে যে সামাজিক দূরত্বের কঠোর অনুশীলন আপনি করেছেন, ২০২১ এলেই আপনি পারবেন তো হাত রাখতে অন্যের হাতে, কাঁধ মেলাতে কাঁধে? কোথাও একটু বাধবে না? বাধবে। কোভিডের ভূত তাড়া করে বেড়াবে পথে-ঘাটে, ঘরে-বাইরে। সামাজিক ছাড়াছাড়ির পরে আমরা আবার আগের মতো এক হতে পারব না।

কত মানুষের চাকরি চলে গেল লকডাউনের জন্য। কত লোক কম টাকায় চাকরি করে গেল। হয়তো ভবিষ্যতে কোনও সরকারী বা বেসরকারী পরিসংখ্যানে এই কর্মহীনতার তথ্যগুলো স্পষ্ট হবে। কিন্তু উৎসব প্রিয় মানুষের তাতে কী? তথ্যের ভেতর যে অর্থনৈতিক হাহাকার লুকিয়ে আছে, তার খবর কি তারা রাখবে? তারা সব ডুবে যাবে আকণ্ঠ মদ্যপান বা দামি রেস্তোরাঁয় বছর শুরুর আহারে।

বহু মানুষের অমূল্য জীবন অতিমারীতে বেরিয়ে গেল। মৃতদের মধ্যে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষই আছে। ২০২১ এলে তারা আর বেঁচে উঠবে না, ফিরে আসবে না। নিষ্ঠুর অতিমারীর বিরুদ্ধে যে বিশ্বযুদ্ধ হল, সেই যুদ্ধের তারা শহীদ। অথচ মানুষ বড় স্বার্থপর। তাই ২০২০ সালের মৃত্যুমিছিলে মোমবাতি নিয়ে হাঁটার সময় তার নেই। সে কেবল ডিজের গানের সাথে কোমর দোলাতে পারে, কিম্বা শব্দবাজি ফাটাতে পারে। মানুষ ক্ষণিকের স্মৃতি ধরে রাখতে পছন্দ করে। অতএব, কে কবে মারা গেছে, করোনায় মৃত্যু কত লাখ, এই রোগের কোনও নতুন প্রবাহ আসবে কিনা, ভ্যাকসিন কতটা কর্মক্ষম হবে, সেসব ভাববার সময় তার নেই। মোচ্ছবই আসল, মৃত্যু নয়।

সুতরাং ২০২০ সালের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলাই যায় যে হাতে রইল পেন্সিল। আপনার হোয়াটস অ্যাপ মেসেজ, ফেসবুকের ইনবক্স ভরে উঠুক ‘হ্যাপি’ নিউ ইয়ারের মেসেজে। তবে বছর শুরুর হ্যাপি অবস্থাটি বছর শেষেও থাকলে মঙ্গল! 

স্মৃতি বিস্মৃতির অতল থেকে উদ্ধার এক মুঠো শুভ্রকান্তি তুষার  

সুদীপ পাঠক 

Elbe Philharmonic Hall, Hamburg, Concert Hall, Contrast
খবরে প্রকাশ : বিশিষ্ট সমাজকর্মী, পদ্মশ্রী শ্রী তুষার কাঞ্জিলাল আর আমাদের মধ্যে নেই ( জন্ম : ১ মার্চ ১৯৩৫ , মৃত্যু : ২৯ জানুয়ারী ২০২০ )  । চমকে উঠলাম ! যাহ শেষ হয়ে গেল একটা ধারা , একটা ঘরানা , একটা শৈলী , একটা বিশেষ রকমের জীবনচর্চা । তিনি এই সব কিছুর প্রতিষ্ঠাতা ও পথিকৃৎ । এমন এক দর্শন যা গড়পড়তা গেরস্তপোষা বাঙালি জীবনে খুবই অচেনা আর তাই যথেষ্ঠ অস্বস্তিকর । কিছু মানুষ থাকেন যারা চলে গেলে একটি মাত্র বাক্য প্রযোজ্য হয়ে ওঠে : লাস্ট অফ্ হিজ কাইন্ড । নিজের ফিলজোফিকে হাতে কলমে প্রমাণ করার স্বনিয়জিত দায়ভার কাঁধে তুলে নিয়ে যারা পথ চলেন আজীবন । 
 
সে সব আঠারো উনিশ বছর আগের কথা । পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য সংস্কৃতি দপ্তর ইতালির সেন্ত্রো ওরিয়েন্তামেন্ত এদুকেতিভো সংস্থার কাছ থেকে কারিগরী সহায়তায় নিয়ে ২০০২ সালে রূপকলা কেন্দ্র নামের প্রতিষ্ঠানের  যাত্রা শুরু করলো । গোড়ার দিকে অনেকেই ধন্দ্ধে ছিলেন এই ভেবে যে এই প্রতিষ্ঠানটির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রকৃতপক্ষে ঠিক কি ? এটিকে ফিল্ম স্কুল হিসাবে মান্যতা দেবার ব্যাপারে বহুজন সংশয় প্রকাশ করেন । হবে নাই বা কেনো ! তখন মেন গেটের ওপর গ্লো শাইনে জ্বলজ্বল করছে “এ্যান ইনস্টিটিউট অফ সোসিয়াল কমিউনিকেশন ইউজিং ভিডিও টেকনোলজি” এই শব্দবন্ধ । ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে স্বমহিমায় বিরাজমান যে সব বাঘা বাঘা ব্যক্তিত্ব প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রূপকলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাঁরা এই বিষয়ে যথেষ্ট উন্নাসিকতার পরিচয় দিয়েছেন সেই সময় । চিরাচরিত ধ্যানধারণা অনুযায়ী ফিল্ম স্কুল বলতে বোঝায় এফ টি আই এবং পরবর্তী কালে এস আর এফ টি আই । সেখানে রূপকলা কোনো রেশিওতেই আসে না ! অনেকেই ভাবতেন এটা বোধহয় মাসকম পড়ার জায়গা বা ঐ গোত্রের কিছু একটা হবে । অর্থাৎ পূর্বোক্ত দুটি জাতীয় স্তরের প্রতিষ্ঠানের তুলনায় নিতান্তই ব্ল্যাকশিপ । এই মনোভাব প্রথমেই আমাদের অনেকখানি দমিয়ে দিয়েছিল । কিন্তু সব জিনিসেরই দুটো বিপরীত অভিমুখ আছে , ভালো এবং মন্দ । সেটা তখন বুঝতে পারিনি , আজ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করি । কথায় আছে না শাঁপে বর , আমাদেরও তাই হয়েছিল । 
 
ক্লাস শুরু হওয়ার অল্প কিছু দিনের মধ্যেই প্রবল রকমের হতাশা ও নৈরাশ্যের কুয়াশা এসে আমাদের গ্রাস করলো । মনে হতে লাগলো আমরা ঠকে গেছি , দুধের বদলে পীটুলি গোলা গেলানো হচ্ছে ।        আমরা প্রথম শিক্ষাবর্ষের স্টুডেন্টরা হলাম গিনিপিগ । কর্তৃপক্ষ তাদের সমস্ত রকমের পরীক্ষা নিরীক্ষা আমাদের ওপর দিয়ে চালিয়ে নিচ্ছে একথা মানতেই হবে , ইত্যাদি ইত্যাদি । প্রতিদিন প্রবল বিরক্তি নিয়ে হাজির হতাম আর দাঁতে দাঁত চেপে বসে থাকতাম । কেনো এমনটা হলো সে বিষয়ে সামান্য ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন । ফার্স্ট ব্যাচে পাঁচটি স্ট্রিম নিয়ে পাঠক্রম শুরু হয় , যথা : ডিরেকশন , সিনেম্যাটোগ্রাফি , এডিটিং , এ্যানিমেশন এবং ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশন । সমস্যার সূত্রপাত এই শেষোক্ত বিষয়টি নিয়ে । গোড়া থেকেই কপালে সমাজ সংযোগের লেবেল সেঁটে থাকার ফলে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয় । বাকি চারটি বিভাগের পঠনপাঠনের বিষয় , পদ্ধতি ও কার্যকারিতা নিয়ে কারো মনে কোনো সংশয় নেই । শুধু শেষেরটি যে ঠিক কি বস্তু তাই নিয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই । কেউ কেউ নিজের মতন করে ব্যাখ্যা করে নিয়েছিল : এই বিষয়ে পড়ে এন জি ও তে  চাকরী করা যায় , এই রকম । আদতে ব্যাপারটা মোটেও তা নয় বলাই বাহুল্য । তৎকালীন রাজ্য সরকার একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন , যাকে পরিভাষায় ন্যারোকাস্ট বা নিকট সঞ্চার বলা হয় । স্যাটালাইট আপ লিংকিংয়ের মাধ্যমে রূপকলা কেন্দ্রের স্টুডিও থেকে সরাসরি বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া যাবে এই হল উদ্দেশ্য । গ্রামের বিভিন্ন পেশার মানুষ যেমন কৃষিজীবী , মস্যজীবি , তন্তুবায় থেকে শুরু করে একাধিক হস্তশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গ তাদের সমস্যার কথা তুলে ধরবে এবং স্টুডিও থেকে তার সমাধানের উপায় বাৎলে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে । তাছাড়া নতুন নতুন বিষয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে । গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনে এই প্রযুক্তির ভূমিকা অপরিসীম । উদ্যোগটি যে মহৎ এবং সাধুবাদ যোগ্য তাই নিয়ে কোনো দ্বিমত থাকার কথাই নয় । এই সামগ্রিক বিষয় নিয়ে কাজ করার জন্য যে সিস্টেমেটিক স্টাডি সেটাই ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশনের আওতায় পড়ে ; এ কথা ধীরে ধীরে বুঝতে পারি । 
 
মুশকিল হল অন্য দিকে । তখন ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশন বিভাগে সবেধন নীলমণি একটি মাত্র স্টুডেন্ট । একজনকে নিয়ে তো আর ডিপার্টমেন্ট চালানো যায় না । ফলে অন্য রকম ভাবে ক্লাসের আরেঞ্জমেন্ট করতে হলো । কমন সিমেস্টারে আমরা সবাই সমাজ সংযোগের পাঠ নিতে বাধ্য হলাম সঙ্গে ডি সির সেই স্টুডেন্ট । ফলে অচিরেই সেটা বোরিং মনে হতে লাগলো । যারা ফিল্ম মেকিং শিখতে এসেছে তাদের কাছে সেটাই তো স্বাভাবিক । একটা হার্ডকোর টেকনিক্যাল সাবজেক্ট শিখতে হবে , নিজেকে ইন্ডাস্ট্রির উপযুক্ত করে তুলতে হবে , তাও মাত্র দু’ বছরের মধ্যে অথচ সময় বয়ে যাচ্ছে হু হু করে । কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে যথা নিয়মে । এই রকমই এক বিরক্তি উৎপাদনকারী ও নিস্তরঙ্গ সময়ে হঠাৎ একদিন ক্লাসে দেখানো হলো একটি তথ্যচিত্র । বিষয় : সুন্দরবন । সঠিক ভাবে বলতে গেলে সেখানকার অধিবাসীদের জীবন সংগ্রাম নিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে বাস্তব খণ্ডচিত্র তুলে ধরা এবং সেই সঙ্গে জরুরী কিছু পরিসংখ্যান ও তথ্য পরিবেশন করা । ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম । কি দারুন উপস্থাপনা ! উপরন্তু বিস্ময়ের আরো এক ধাপ বাকী ছিল , সেটা হলো এই ছবিটা আমাদের ফ্যাকাল্টি মেম্বারদের হাতে তৈরী । বেশ একটা  ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে ভাবতে থাকলাম টিচাররা যদি এমন ছবি তৈরী করতে পারে তবে আমরাই বা পারবো না কেনো ? ছবি দেখা ও আলোচনা পর্ব মেটার পর জানতে পারলাম এই ছবি নির্মাণ হয়েছে যাকে কেন্দ্র করে সেই মানুষটি আগামীকাল আসবেন আমাদের সঙ্গে কথা বলতে । তিনি শ্রী তুষার কাঞ্জিলাল । কে ইনি ? কি এনার পরিচয় ? জানা গেলো ইনি হলেন সমাজকর্মী ও সুন্দরবন উন্নয়ন আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ ও পুরোধা পুরুষ । সেই সঙ্গে এটাও জানানো হলো যে ওনার সময়ানুবর্তিতা নাকি দৃষ্টান্ত স্থাপন করার মতন একটি বিষয় । পাঁচ মিনিটের দেরী উনি সহ্য করেন না । ফ্যাকাল্টি মেম্বারদের যে টিম রঙাবেলিয়ায় গিয়ে ওনার সঙ্গে কথা বলেছে তাদের নাকি সেই অভিজ্ঞতা হয়েছে । নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছতে দেরী হওয়ায় উনি সেখান থেকে চলে গেছেন । ফলে প্রতঃভ্রমণরত অবস্থায় ওনার সঙ্গে পা মিলিয়ে চলতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হয়েছে । তাই আমাদের সতর্ক করে দেওয়া হলো ক্লাসে আসতে দেরি যেনো মোটেই না হয় । 
 
পরের দিন সাক্ষাৎ হলো তাঁর সঙ্গে । টেগোর সোসাইটি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্টের কর্ণধার তুষারবাবু , মাষ্টারমশাই নামে যিনি সমধিক খ্যাত । আপাদমস্তক শুভ্রকান্তি একজন মানুষ । হ্যাঁ ঠিক তাই , পরনে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি আর এক মাথা ধপধপে সাদা চুল । সুপুরুষ এবং গৌরবর্ণ তাইতে দীর্ঘদিন ফিল্ড ওয়ার্কের ছাপ পড়েছে তাই টকটকে লালচে ভাব । শিক্ষা , বৈদগ্ধ , পাণ্ডিত্য , বয়েস ও অভিজ্ঞতার ভারে ঋদ্ধ এক আকর্ষণীয় ও সম্ভ্রম জাগানো ব্যক্তিত্ব । প্রথম দর্শনেই খুব কাছের ও আদরণীয় বলে মনে হয় । শুরু হলো আলাপচারিতা । জানা গেলো সুন্দরবনের নদীবাঁধ এবং সেখানকার ভাঙ্গন সম্পর্কিত বহু অজানা তথ্য । রাঙাবেলিয়াকে সেন্টার করে আসেপাশের দ্বীপবাসী মানুষজনের আশঙ্কা , সমস্যা , দৈনন্দিন জীবনযাপন । জলে কুমীর ডাঙায় বাঘ সহ বিচিত্র কর্ম ও জীবন প্রণালীর আলেখ্য । কিভাবে ঐ সমস্ত অধিবাসীদের কাছ থেকে পার্টিসিপেটারি ফরম্যাটে কি কি তথ্য সংগ্রহ করা হয় ও উন্ননের কাজে সেটার ইমপ্লিমেন্ট কি ভাবে হয় এই সমস্ত কিছু গল্পের ছলে বলে গেলেন আমাদের । সেই ভাষণে কোনো গেরেম্ভারি চাল নেই , সম্পূর্ণ বাহুল্য বর্জিত এবং তার সঙ্গে অনাবিল হাস্যরসের মিশেল । যদি খুব ভুল না হয় যতদূর মনে পড়ে উনি সাকুল্যে দিন দুই কি তিন এসেছিলেন রূপকলায় । নিজের সুদীর্ঘ ও সুবিস্তৃত কর্ম জীবনের নানান অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছিলেন । অসামান্য রসবোধের পরিচয় ছিল সেই কথার ছত্রে ছত্রে । গোড়াতেই বললেন : শোনো বাছারা আমার কাজ শুরুর প্রথম দিকের একটা গপ্পো তোমাদের বলি । তখন আমি যাকে বলে সত্যি সত্যিই ইয়াংম্যান , রক্ত গরম একেবারে টগবগ করে ফুটছে ।  একদিন এক পথ সভায় একটা চৌকি গোছের কিছুর ওপর উঠে খুব খানিকটা তেড়ে লেকচার দিলাম । যাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছিলাম তাদের কিসে মঙ্গল হয় সেটা বোঝানই ছিল আমার লক্ষ্য । গলা শুকিয়ে যখন কাঠ তখন বাধ্য হয়ে চৌকি থেকে নামতে হল । জল না পেলে আর প্রাণে বাঁচি না এমন অবস্থা । মুটামুটি ছোটখাটো বেশ একটা জমায়েত হয়েছিল , তার ভিতর থেকে এক বুড়ো মোল্লাচাচা এগিয়ে এসে বললে এই ছাওয়ালডার গলার ত্যাজ আছে হেইডা কিন্তু মানতেই হইব । বোঝো ঠ্যালা ! দিনের শেষে আমার কপালে তাহলে কি জুটলো তোমরাই ভেবে দেখো একবার ! 
এই রকম অসংখ্য মনিমানিক্য ছড়িয়ে ছিল তাঁর লেকচার সেশনে । একজন ফিল্ড ওয়ার্কারকে কি ভীষণ শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম করতে হয় তা বলতে গিয়ে ব্যঙ্গ মিশ্রিত ধমক দিয়ে বলেছিলেন : তোমরা তো জন্মেছ সব এক একটা যেন দেবশিশু , ননীরপুতুল । গায়ে দু ফোঁটা জল পড়লেই গোলে পাঁক হয়ে যাবে । 
অর্থাৎ একজন সমাজকর্মীকে হতে হবে ক্লান্তিহীন বিরামহীন সদা সর্বদা প্রস্তুত ও সজাগ । তার ছুটি বলে কিছু নেই , থাকার কথাও নয় । বলেছিলেন মনে রেখো একশো শতাংশ কাজের পর তোমার প্রাপ্তির ভাঁড়ারে জমা পড়বে হয়তো এক শতাংশ । ভেঙে পড়লে চলবে না , দোমে গেলে চলবে না । জানবে তুমি ঠিক ততটুকুই পেয়েছ যতটুকু তোমার প্রাপ্য । ওখানেই তোমার সাফল্য ওখানেই তোমার কাজ করার স্বার্থকতা । কি অমোঘ বাণী ! এতো দিন পরে ভাবতে গিয়ে শিহরন অনুভব করি । কথাগুলি যে খুব জোরালো ও মজবুত বিশ্বাসের ভীতের ওপর দাঁড়িয়ে বলা সেটা বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না । আগাগোড়া নিজের ব্যবহারিক জীবনে সেটাই তো প্রমাণ করে গেছেন ।  
 
আজকাল চতুর্দিকে একটা কথা খুব শোনা যায় : মোটিভেশনাল স্পীচ । সেটা প্রকৃত অর্থে কি এবং তার জোর কত তা আঠারো বছর আগেই উপলব্ধি করেছিলাম । মনে আছে সকলের ভিতর যে পাহাড় প্রমাণ ক্ষোভ ও অভিযোগ জমা হয়েছিল ; মাষ্টারমশাইয়ের ক্লাস এ্যাটেন্ড করার পর কমবেশি তার উপশম ঘটে । সর্বাংশে না হলেও বহুলাংশে তো বটেই । ব্যক্তগতভাবে বলতে দ্বিধা নেই ওনার কথা শোনার পর বুঝতে পারি সমাজ সংযোগের এই পাঠ ফিল্ম মেকিং এর অন্যতম জরুরী অধ্যায় , এ বিষয়ে না জানলে অন্য ধারার ছবি তৈরী করা অসম্ভব । প্রশ্ন উঠতেই পারে এতকাল ধরে প্রবাদপ্রতিম চলচ্চিত্রকারগণ দুনিয়া কাঁপানো সব ছবি বানিয়েছেন তাঁরা ডি সি পড়েছেন বুঝি ? উত্তর হল : হ্যাঁ পড়েছেন , তবে নিজের মতন করে । এখন যখন অর্গানাইজড সেক্টর তৈরী হয়েছে তখন তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা হবে না কেনো ? রূপকলা কেন্দ্রের আমার এক সহপাঠি ও সহকর্মী তার প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের কাহিনীচিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালকের জাতীয় পুরস্কার লাভ করে । একাধিক সাক্ষাৎকারে সে এই পড়াশোনার গুরুত্বের কথা বলেছে ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছে । আজ যখন তামাম দুনিয়ার বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদগণ বিশ্ব উষ্ণনায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ঙ্কর রূপ ও তার সুতীব্র প্রভাব নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তিত । তখন খুব প্রাসঙ্গিক ভাবেই মাষ্টার মশাইয়ের কিছু কথা মনে পড়ে : প্রকৃতি তার নিজের নিয়মে নিজের পথে চলবে তার স্বভাবজাত আচরণ করবে । তুমি প্রকৃতির বিরুদ্ধে যেতে পারো না । সব চাইতে ভালো যা তুমি করতে পারো তা হলো প্রকৃতির কাছ থেকে উৎকৃষ্ট কিছু সময় ক্রয় করতে পারো । নদীর এক ধারে যেমন ভাঙ্গন হচ্ছে তেমন অন্য ধারে আবার নতুন চর জেগে ওঠার ব্যাপারটাও রয়েছে । এমন ভাবেই চলবে , তার মধ্যেই আমাদের সব রকম পরিকল্পনা গুলোকে ঠিকঠাক ভাবে সাজিয়ে ফেলতে হবে । 
 
আঠারো বছর আগে অতি অল্প সময়ের জন্য যে ব্যক্তির সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম তাঁর প্রয়ান সংবাদ কেনো এভাবে বুকে বাজে ? যিনি অনায়াসে বলতে পারেন : মানুষকে ভালোবেসে মানুষের জন্য কাজ করলেই কি তুমি বিনিময়ে অঢেল ভালোবাসা পাবে , লোকে তোমাকে মাথায় তুলে ধেই ধেই করে নেত্য করবে বলে মনে করেছ ? তোমার মুন্ডু , ঠিক তার উল্টোটাই হবে ! যে কোনো ভালো কাজ করতে গেলেই তোমার কপালে অশেষ ঘৃণা , লাঞ্ছনা গঞ্জনা , কটূক্তি আর অপমান বরাদ্দ হয়ে আছে সেটা মনে রাখবে । তাই বলে কি তুমি হাত পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকবে ? সেটা তো আর হয় না , তোমাকে কাজ চালিয়ে যেতে হবে । সেই তিনি কবে পদ্মশ্রী পুরস্কার লাভ করেছেন , সেই সময় কেন্দ্রে কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন ছিল এসব সালতামামি আমার কাছে অবান্তর বলে মনে হয় তাই জানার প্রয়োজন বোধ করিনি । শুধু এটুকু বলা যায় ওনাকে সন্মান প্রদর্শন করে দেশবাসীর ঋণ খুব সামান্য হলেও পরিশোধ হয়েছে বলে মনে হয় । একাধিক গুণী মানুষের কাছে শুনেছি যাদের রবীন্দ্রনাথ কিম্বা সত্যজিৎ রায়ের সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য হয়েছে তাদের জীবনদর্শন আমূল পাল্টে গেছে । রূপকলা কেন্দ্রের কোর্স শেষ হওয়ার পর আমাদের মধ্যে অনেকেরই এক ধরনের অপূর্ণতা ও অতৃপ্তির বোধ জাগে । বিশেষত আমরা যারা সিনেম্যাটোগ্রাফি শিখতে চেয়েছিলাম তাদের । কারণ শুধু মাত্র ভিডিওগ্রাফি শিখে স্ট্রিংগার হিসাবে কাজ করতে রাজি ছিলাম না । তাই ‘ সিনেম্যাটোগ্রাফি এন্ড ফিল্ম মেকিং ইন দ্যা ট্রু সেন্স ‘  শিখতে ও জানতে আমার দুই সহপাঠী এফ টি আই , পুনের উদ্যেশ্য যাত্রা করে এবং আমি ; ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান এল ভি প্রসাদ ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন এ্যাকাডেমি , চেন্নাই তে গিয়ে হাজির হই । ফিল্ম স্কুলের ছাত্র হিসাবে আমাদের দেশের সেরা প্রশিক্ষকদের পেয়েছিলাম তো বটেই এমন কি হলিউডের স্বনামধন্য ও জগৎ বিখ্যাত প্রযুক্তিবিদদের কাছে তালিম নেওয়ার বিরলতম সুযোগ হয়েছে । কিন্তু চেন্নাইয়ের সেই দিন গুলোতে দ্বিতীয় আর একজন তুষার কাঞ্জিলালকে পাইনি এ কথা অনস্বীকার্য ।

কলকাতা

বিষ্ণুপদ ব্যানার্জী

Victoria Memorial, India, Kolkata, Victoria, Memorial
তুমি কলকাতা,
বহু বীরের জন্মদাতা,
তোমার আনাচে – কানাচে,
বীরের কথা আছে।
 
তবে আজ তুমি,
চুপ কেন?
ওঠো গর্জে,
হে বীরের মাতৃভূমি!
 
আশে – পাশে,
কত জেলা জেগে ভাসে,
তবুও তুমি,
কেন অভিমানী!
 
তোমার হাতে, মর্যাদা আজি,
রয়েছে একটু জাগি,
তবু ভাবি,
নীরব কেন তুমি!
 
তুমি ইতিহাস,
পারনা মরতে,
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়,
মৃত্যুতো নয়।
 
কলকাতা
তুমি তিলোত্তমা,
যাদু নগরী, মায়ানগরী
গর্বের ভূমি।
 
তবু হায়,
দেখিতে যে পাই,
নিদ্রিত তুমি,
আমার জন্মভূমি।
 
তবে শেষ হল কি!
তোমার গল্প – গাঁথা,
ভালোবাসা,
আজও ফিরে প্রতি জনে।

বাঁচার থেকে মরার ভয়

Son Joy

জুতো সেলাই সে চণ্ডীপাঠ
পালঙ্ক থেকে মড়ার খাট
সব জায়গাতেই আমার হাত
এই খাটে যেই শোবেন..
অমৃতলোক গমন করে
Pay-ছাপে পাপ ধোবেন..

বাঁচার থেকে মরার ভয়
জন্ম-মৃত্যু জীবন ক্ষয়
হাত বাড়লে এইতো জয়
পৌঁছে দেবো ঘাটে..
চুলোয় তোলার প্রাক্কালে
মাথা ছুঁইয়ে নেবো খাটে..

হরি হরি হরি বোল
মৃদঙ্গ বা ওই শ্রী খোল
দমিয়ে দেবে কাঁদার রোল
মুখাগ্নী মোর হাতে..
পার করিয়ে ভব-সাগর
আমি পবিত্র হবো প্রাতে..

আজন্ম কালো মাস

লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল

Abstract, Art, Background, Paint, Texture, Colorful

কাছের ভিটেয় তার জন্ম হলেও পারদের মতো উঠানামা করত তার ছিপছিপে কালো শরীর
স্বপ্ন বিষয়ে নতুন কৌশল ব্যস্তানুপাতিক – তবুও নিয়ম ভাঙছে – কেউ কেউ ফিরতে পারেনি এখনও
লক্ষভ্রষ্ট উল্কার সাথে এনামেল তারের তীব্র আকর্ষণে তীব্র দুঃখ আর জানালাহীন গুমোট
সম্পর্কের পূর্বাভাসও ছিল না – কেননা লেখচিত্রে দারিদ্র্যের পরিমান সব সময় মিউট থাকে
তাদের জন্য শুধু সাপের কান্না ভাসছে – টিপে যাচ্ছে কী বোর্ড – আর হাতে গ্লাভস
নিজস্ব আয়াস কাটাতে কত লেখালেখি – গোপন তকমায় ভাসাচ্ছে ওরাই সংক্রামক
ভিটের কাছে নিসর্গের মধ্যেও আঁধারবর্ণ মেঘের আর্তনাদ , দৈবপুত্রদের নাম পরিযায়ী কেন
এই সর্বস্ব উত্তেজনার জন্য প্রস্তুত নেই কোন প্রোটোপ্লাজম – ছিলাম না কেন ? সিন্ধুনদের কথা ভুলে গেল সবাই
নিঃশব্দের কাছে মৃতের গহ্বর পড়ে থাকে – সেখানে হিজলশাখা আর রাতশিল্পের যৌন কাতর রমনী
জ্বরাক্রান্ত হে ব্যবসাজনক দ্বিভূজ , ছোঁয়াচে শব্দে তোমার টি আর পিও উহানভূমি – তথাপি জেগে ঘুমাও ??

পাখি ২
প্রসাদ সিং

Hummingbird, Bird, Trochilidae, Flying, Plumage
১.
পাখিটি গাছে বসে বাড়িগুলোর দিকে তাকায়
আমি উঠোনে বসে গাছগুলোর দিকে তাকাই
পরস্পরের নদী পাড়ের ঘাস সবুজতর হয়
২.
চড়াইটি বাসা বাঁধছে ঘুলঘুলিতে
আমরা ট্রি হাউসে যাবো পিকনিকে
অজান্তেই চলছে এক সাময়িক অভিযোজন
৩.
গাছগুলো আমরা কেটে দিচ্ছি
পাখিরা আমাদের বাড়িগুলো ভাঙতে পারছে না
দিয়ে দিচ্ছে পরের জন্মে পাখি হওয়ার অভিশাপ
 

চমৎকারী তৈল

তনিমা সাহা

 ব্রজেশ্বরীর কেশরাজির সংখ্যাটা একেবারেই হাতেগোনা। কেশরাজির সংখ্যাবৃদ্ধির জন্য সমস্তরকম সম্ভব-অসম্ভব উপায় অবলম্বন করে নিয়েছেন। কিন্তু লাভেরলাভ কিছুই হয়নি। পরিবারের সকলেই ব্রজেশ্বরীর দাপটে থরহরিকম্প হয়ে থাকেন। তাই মুখফুটে কেউ কিছু ব্রজেশ্বরীর কেশবৃদ্ধিকলাপের বিপক্ষে বলতে পারেনা। ব্রজেশ্বরী কেশবৃদ্ধির জন্যে যা ফরমান জারি করেন তা তাকে এনে দিতেই হয়, নইলে আর রক্ষে থাকে না কারোর। এহেন ব্রজেশ্বরী একদিন বিজ্ঞাপনে ‘কেশপঞ্চবটি তৈল’ নামে এক চমৎকারী কেশরাজির সংখ্যাবর্দ্ধক তেলের সন্ধান পেলেন। সন্ধান পাওয়া মাত্র বড়োছেলেকে দিয়ে তেলটি কিনে আনালেন। বড়োছেলে তেলটি যাচাই পরখ না করে কিনতে বারণ করার একবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাতে তাকে প্রচন্ড তিক্ষ্ণ বাক্যবান শুনতে হয়েছে।যাইহোক তেলটি কিনে আনার পর তিনি তেলটি ব্যবহার করলেন। ব্যবহার করার পরেরদিনই ওনার অল্পসংখ্যক কেশরাজি শূন্যসংখ্যক কেশরাজিতে পরিনত হয়ে গেল।

কলকাতা

বিষ্ণুপদ ব্যানার্জী

Victoria Memorial, India, Kolkata, Victoria, Memorial
তুমি কলকাতা,
বহু বীরের জন্মদাতা,
তোমার আনাচে – কানাচে,
বীরের কথা আছে।
 
তবে আজ তুমি,
চুপ কেন?
ওঠো গর্জে,
হে বীরের মাতৃভূমি!
 
আশে – পাশে,
কত জেলা জেগে ভাসে,
তবুও তুমি,
কেন অভিমানী!
 
তোমার হাতে, মর্যাদা আজি,
রয়েছে একটু জাগি,
তবু ভাবি,
নীরব কেন তুমি!
 
তুমি ইতিহাস,
পারনা মরতে,
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়,
মৃত্যুতো নয়।
 
কলকাতা
তুমি তিলোত্তমা,
যাদু নগরী, মায়ানগরী
গর্বের ভূমি।
 
তবু হায়,
দেখিতে যে পাই,
নিদ্রিত তুমি,
আমার জন্মভূমি।
 
তবে শেষ হল কি!
তোমার গল্প – গাঁথা,
ভালোবাসা,
আজও ফিরে প্রতি জনে।

বাঁচার থেকে মরার ভয়

Son Joy

জুতো সেলাই সে চণ্ডীপাঠ
পালঙ্ক থেকে মড়ার খাট
সব জায়গাতেই আমার হাত
এই খাটে যেই শোবেন..
অমৃতলোক গমন করে
Pay-ছাপে পাপ ধোবেন..

বাঁচার থেকে মরার ভয়
জন্ম-মৃত্যু জীবন ক্ষয়
হাত বাড়লে এইতো জয়
পৌঁছে দেবো ঘাটে..
চুলোয় তোলার প্রাক্কালে
মাথা ছুঁইয়ে নেবো খাটে..

হরি হরি হরি বোল
মৃদঙ্গ বা ওই শ্রী খোল
দমিয়ে দেবে কাঁদার রোল
মুখাগ্নী মোর হাতে..
পার করিয়ে ভব-সাগর
আমি পবিত্র হবো প্রাতে..

আজন্ম কালো মাস

লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল

Abstract, Art, Background, Paint, Texture, Colorful

কাছের ভিটেয় তার জন্ম হলেও পারদের মতো উঠানামা করত তার ছিপছিপে কালো শরীর
স্বপ্ন বিষয়ে নতুন কৌশল ব্যস্তানুপাতিক – তবুও নিয়ম ভাঙছে – কেউ কেউ ফিরতে পারেনি এখনও
লক্ষভ্রষ্ট উল্কার সাথে এনামেল তারের তীব্র আকর্ষণে তীব্র দুঃখ আর জানালাহীন গুমোট
সম্পর্কের পূর্বাভাসও ছিল না – কেননা লেখচিত্রে দারিদ্র্যের পরিমান সব সময় মিউট থাকে
তাদের জন্য শুধু সাপের কান্না ভাসছে – টিপে যাচ্ছে কী বোর্ড – আর হাতে গ্লাভস
নিজস্ব আয়াস কাটাতে কত লেখালেখি – গোপন তকমায় ভাসাচ্ছে ওরাই সংক্রামক
ভিটের কাছে নিসর্গের মধ্যেও আঁধারবর্ণ মেঘের আর্তনাদ , দৈবপুত্রদের নাম পরিযায়ী কেন
এই সর্বস্ব উত্তেজনার জন্য প্রস্তুত নেই কোন প্রোটোপ্লাজম – ছিলাম না কেন ? সিন্ধুনদের কথা ভুলে গেল সবাই
নিঃশব্দের কাছে মৃতের গহ্বর পড়ে থাকে – সেখানে হিজলশাখা আর রাতশিল্পের যৌন কাতর রমনী
জ্বরাক্রান্ত হে ব্যবসাজনক দ্বিভূজ , ছোঁয়াচে শব্দে তোমার টি আর পিও উহানভূমি – তথাপি জেগে ঘুমাও ??

পাখি ২
প্রসাদ সিং

Hummingbird, Bird, Trochilidae, Flying, Plumage
১.
পাখিটি গাছে বসে বাড়িগুলোর দিকে তাকায়
আমি উঠোনে বসে গাছগুলোর দিকে তাকাই
পরস্পরের নদী পাড়ের ঘাস সবুজতর হয়
২.
চড়াইটি বাসা বাঁধছে ঘুলঘুলিতে
আমরা ট্রি হাউসে যাবো পিকনিকে
অজান্তেই চলছে এক সাময়িক অভিযোজন
৩.
গাছগুলো আমরা কেটে দিচ্ছি
পাখিরা আমাদের বাড়িগুলো ভাঙতে পারছে না
দিয়ে দিচ্ছে পরের জন্মে পাখি হওয়ার অভিশাপ
 

চমৎকারী তৈল

তনিমা সাহা

 ব্রজেশ্বরীর কেশরাজির সংখ্যাটা একেবারেই হাতেগোনা। কেশরাজির সংখ্যাবৃদ্ধির জন্য সমস্তরকম সম্ভব-অসম্ভব উপায় অবলম্বন করে নিয়েছেন। কিন্তু লাভেরলাভ কিছুই হয়নি। পরিবারের সকলেই ব্রজেশ্বরীর দাপটে থরহরিকম্প হয়ে থাকেন। তাই মুখফুটে কেউ কিছু ব্রজেশ্বরীর কেশবৃদ্ধিকলাপের বিপক্ষে বলতে পারেনা। ব্রজেশ্বরী কেশবৃদ্ধির জন্যে যা ফরমান জারি করেন তা তাকে এনে দিতেই হয়, নইলে আর রক্ষে থাকে না কারোর। এহেন ব্রজেশ্বরী একদিন বিজ্ঞাপনে ‘কেশপঞ্চবটি তৈল’ নামে এক চমৎকারী কেশরাজির সংখ্যাবর্দ্ধক তেলের সন্ধান পেলেন। সন্ধান পাওয়া মাত্র বড়োছেলেকে দিয়ে তেলটি কিনে আনালেন। বড়োছেলে তেলটি যাচাই পরখ না করে কিনতে বারণ করার একবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাতে তাকে প্রচন্ড তিক্ষ্ণ বাক্যবান শুনতে হয়েছে।যাইহোক তেলটি কিনে আনার পর তিনি তেলটি ব্যবহার করলেন। ব্যবহার করার পরেরদিনই ওনার অল্পসংখ্যক কেশরাজি শূন্যসংখ্যক কেশরাজিতে পরিনত হয়ে গেল।

Empty Moments

Gopal Lahiri

Daisy, Bellis, Multiannual Daisy, Tausendschön, Meadow

glass windows face the sunbeams,
pale fingers are over there
scratching the months and years,

screaming winds are sending their tails
and there is another dream building
in unopened letters, in blue envelopes,

hidden cries litter the empty chairs
phone calls are full of goodbyes
days and nights fill blank pages.

poison in the blood consumes the new rain,
shadows lick the wall like flames
in the silence of the morning.

in me no love, no dream, no desire
and everywhere ghost promises,
talk some sense perhaps in dead memories.

an earthly suffering that engulfs
the borders of the lane, the street,
the city and, finally distils even the time period.

ফিরে দেখা ২০২০

মুকুট রায়

Flower, Daisy, Meadow, White Flower, Bloom, Blossom

চলো না ফিরে দেখি একবার সেই ২০২০ বছর,
আমরা কি পেরিয়ে আসতে সত্যিই পেরেছি করোনার খপ্পর?
মনে এখনো জাগে কেন তবে সেই বিভীষিকা,
মন কাঁদে কেন আজও ভেবে স্বর্গগতের স্মৃতির লিপিকা?

পরিযায়ী শ্রমিকের দল যারা গেছিল পরবাসে,
ফিরতে পেরেছে কি তারা তাদের শান্তির নিজবাসে?
আকাশে ভাসে কেন আজও তাদেরি দীর্ঘশ্বাস,
অনাথ শিশুর কান্না মথিত বাতাস জানায় নেতাদের প্রতি অবিশ্বাস ।

কত তরুন হারিয়েছে তাদের চাকরি করোনার যাঁতাকলে,
ম্লানমুখে তারা ফেরে আজি,স্বপ্নভ্রষ্ট হয়ে দলেদলে।
দেশে উৎপাদন নেই, টাকার দর আজ নিম্নগতি,
দেশ চালানো মুস্কিল আজ তাই,দেশ কিনে নিয়ে যাকনা ঐ শিল্পপতি।

কত প্রবাদপ্রতিমরা এ বছর চলে গেল চোখের সামনে চোখের জলে,
আর কি কেউ পূর্ন করতে পারবে তাদের স্থান, জাগে প্রশ্ন মনে কুতুহলে।
যারা ভরেছিল আমাদের জীবন বিচিত্র সব নতুন ফুলে- ফলে
আজ তাঁদের অভাব বোঝা যায় জীবনের প্রতি পলে।

২০২০ বছর তো আমরা ফেলে এলাম পিছনে,
সত্যিই কি বদভ্যাস ভুলে মিলতে পারব মোরা, নতুন বর্ষের নতুন ভুবনে?

গৌরধাম নবদ্বীপের রাসমেলা

স্বরলিপি দাস

Diya, Light, Flame, Celebration, Diwali, Deepavali

নিত্যানন্দ মহাপ্রভু অদ্বৈত শ্রীবাস
জগাই মাধাই সবে মিলে করিলেন রাস।
উৎসব মুখর হল নবদ্বীপ শ্রীধাম
আনন্দে পাগল মানুষ জপে হরিনাম ।
চক্ররাস,যুগল মিলন আর কৃষ্ণকালী
‘বড় শ্যামা’ দেখতে চলে নিয়ে অর্ঘ্যের থালি ।
চণ্ডীমাতা,শ্যামা ,গঙ্গা- হরগৌরী
হরেক রকম দেবদেবীর দর্শনে হুড়োহুড়ি
ভদ্রকালী কাত্যায়নী কিংবা ডুমুরেশ্বরী 
সব প্রতিমাই সুন্দর লাগে এই কদিন ভারী
তোতাপুরী -বিন্ধ্যবাসিনী -ভারতমাতা -তারা মা
‘রণকালী’-‘বামা কালী’ বিখ্যাত প্রতিমা ।
জন্মাষ্টমী -কালিয়াদমন আর ধ্রুব নারায়ণ 
 কৃষ্ণের বিভিন্ন রূপের যায় পাওয়া দর্শন।
কমলে-কামিনী -রণচণ্ডী – মহিষাসুরমর্দিনী
আমরা মাকে ভুবনেশ্বরী রূপেও চিনি।
অন্নপূর্ণা -অকাল বোধন আর হরি-হর মিলন 
এখানেই দেখতে পাবে অর্জুনের বিশ্বরূপ দর্শন,
কখনো তিনি দেবীগোষ্ঠো ,কখনো কৃষ্ণ মাতা 
বিশ্বজননী রূপে তুমিই সকলের ত্রাতা।
মহিরাবণ বধ- পার্থ সারথী আর নটরাজ
অগুণিত প্রতিমার যে সুসজ্জিত সাজ।
পূর্ণিমা তিথিতে হয় পূজার আয়োজন
হরেক দেশের দর্শনার্থীদের হয় আগমন।
ব্যান্ড তাশা ঢাক আর নিয়ে ঢোল সানাই 
নৈবেদ্য আর শোভাযাত্রায় পোড়ামাকে প্রণাম জানায় 
পরদিন কাঁধে চড়ে আসেন গৌরাঙ্গিনী
ঘুরতে থাকেন দেব-দেবীরা চলে প্রদর্শনী
পাশে চলে দর্শনার্থীরা করে নৃত্য কোলাহল
 ফুচকা,ঘুগনীর দোকানেও  তখন মানুষের ঢল।
বহুরূপে পূজিত মূর্তির এরপর হয় ভাসান
ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করে মিটিয়ে মুশকিল আসান।।
  •  
    49
    Shares
  • 49
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •