•  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

প্রতি রবিবার​

Sunday Supplement 

BILINGUAL WEBZINE

02.08 2020

 

প্রবাসী জানালা

প্রবাসে নির্ভয়ে?

মৌসুমী দাস

(নিউ জার্সি)

দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সাংবাদিকতা জীবন, এই সময় পেশায় থাকলে নিশ্চয় ছুটে যেতাম লালবাজার,নবান্ন বা হাসপাতাল গুলোতে।নিউ জার্সিতে প্রায় পাঁচ বছর থাকতে থাকতে প্রায় প্রতিদিনই টুকরো টুকরো কলকাতাকে খুঁজে পাই।এখানকার মানুষও তো তাই, আনন্দ করতে ভালোবাসে। হাসি মুখে আপন করে নেয় সবাইকে কোনো একদিন ঘুম ভাঙল। আর ঘুম ভেঙেই নতুন সকাল— ছবি টা এইরকমই। নতুন দিন, নতুন স্বপ্ন। কে বলবে মাস চারেক আগেই এই শহরটাই ঘুমিয়ে পড়েছিল গভীর দু্:স্বপ্নের জালে। শুনশান সড়কে ছিল শুধুই শূন্যতা। আজ আবার প্রান ফিরে এসেছে। হাসি,গল্প,খাবারের গন্ধে আবার পুরোনো ছন্দে ফিরেছে শহর।করোনা অনেক প্রান কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু জীবন কে থামিয়ে দিতে পারেনি। এই আনন্দেই আবার থাবা মারতে পারে করোনা, আমরা প্রস্তুত তো ? কয়েক মাস আগেরই কথা বলছি। তখনও রাস্তায় লোকজনের খুব দেখা মিলত না।বাইরে হাঁটতে বেড়িয়ে দেখতাম সব কিছু বদলে গেছে।ঝড় থেমে যাওয়ার পর চারিদিক যেনো কেমন একটা শান্ত হয়ে যায় সেরকমই ভয়-জড়ানো নীরবতা ঘিরে ধরেছিল।মানুষ না দেখলেও কেমন একটা লাগত আবার দেখলেও অদ্ভূত ভয় ভয় লাগত।মনে হোত এই মানুষটা পজিটিভ নয় তো!’পজিটিভ’ এ নেগেটিভ অনুভূতি বোধহয় আগে কখনও হয়নি।

জুন মাসের শুরু, ধীরে ধীরে সেই শূন্য স্থানই পূরন হতে লাগল। ক্ষত-হয়রানি-আশঙ্কা নিয়ে মানুষ আবার বাঁচার স্বপ্ন বুনতে শুরু করল। শহরে আবার প‍‍্রাণ ফিরে এল।অনলাইন শপিং এর স্লট পেতে শুরু করলাম। ধীরে ধীরে মানুষ বাইরে বেরোতে শুরু করল। আমরাও একটু ভয় কাটিয়ে দেকানমুখী হয়েছি। মুখে মাস্ক, হাতে স্যানিটাইজার।গরমে ছাতা-টুপির মতো অপরিহার্য হয়ে উঠেছে এগুলোও। অদেখা শত্রু আমাদের রোজই কিছু শিখিয়ে যাচ্ছে।

এপ্রিলের শুরুতে নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সিতে চরম আকার ধারন করেছিল করোনা। পিক সময়ে একদিনে ৭০০০-৮০০০ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে।প্রিয়জনকে হারিয়েছে অনেকেই।সেদিনই একটা কফির দোকানে লাইনে দাঁড়িয়ে এক স্প্যানিশ তরুনী তার বান্ধবীকে পেয়ে ঠাকুমাকে হারানোর কথা বলতে গিয়ে কেঁদেই ফেলল। বহুদিন বাড়িতে থাকার পর কাজে যোগ দিয়েছে। চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ এখনও রয়েছে তার।

কোভিডে মৃত্যুমিছিল একটু কমতেই চারিদিকে রিওপেন করার তোড়জোর শুরু হয়ে যায়। মুদিখানা দোকান, খাবারের দোকান, বাস ট্রেন তো সবসময়ই খোলা ছিল। আস্তে আস্তে ছোটোখাটো আরও দোকানপাট, ক্যাফে। দুরত্ব বজায় রেখে মাস্ক পড়ে।আমরা ঐ সময়েও বাইরে থেকে খাবার আনিয়েছি- কনট্যাক্ট ফ্রী হোম ডেলিভারী। বিরিয়ানীও খেয়েছি, ফ্রায়েড চিকেনও।এখন রেস্তোঁরা গুলো রাস্তার কিছুটা অংশ জুড়ে আউটডোর ডাইনিং এর ব্যবস্থা করেছে। রাস্তাজুড়ে চেয়ার টেবিল পেতে বসেছে পসরা। অনেক জায়গায় অনলাইন বুকিং করে সোজা রেস্তোঁরা বা পাবের চেয়ারে বসার ব্যবস্থা আছে। ৪-৫ ফুটের দুরত্ব আছে বটে, তবে সব মিলিয়ে ব্যাপারটা বড্ডই গোলমেলে।আমরা এই সাহস এখনও জুটিয়ে উঠতে পারিনি।

কে বলবে কয়েকমাস আগে লোকজন গুটিসুঁটি মেরে ভয়ে বাড়িতে বসেছিল।চারিদিকে নির্মান কাজ শুরু হয়েছে পুরোদমে, রাস্তার ধারে গাছ লাগানো। মাসখানেক ধরে পার্ক পুরোপুরিভাবে খুলে গেছে।এখানে সোসাল ডিসট্যান্টিং এর কথা নাই বা বললাম।এখন এখানে স্কুলে গরমের ছুটি। সেপ্টেম্বর থেকে খুলছে স্কুল।এখন সবথেকে আলোচনার বিষয়া চলছে সেটা হল বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানো হবে নাকি অনলাইন ক্লাস চালু থাকবে। সেটা নিয়ে সার্ভে আর চলছে দিনভর। আর ফোনে মা বাবাদের একই আলেচনা।গরমের জন্য মানুষ মুখিয়ে থাকে এখানে। আগে থেকেই ঘোরা বেড়ানোর প্ল্যান করে রাখে, এবারেই ব্যতিক্রম নেই। বিচ খুলতেই তিলধারনের জায়গা নেই। সেই ভয়েই অনেক বিচ আবার বন্ধও করা হয়েছে।

এখন নিউ জার্সিতে কোভিডের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। তার মানে কিন্তু শূ্ন্য নয়।ফ্লোরিডা, ক্যালিফোর্নিয়া,টেক্সাসে চলছে মৃত্যু মিছিল।সেকেন্ড ওয়েভ আসতে পারে ফল এর সময়, কিন্তু আপাতত সেই চিন্তা ভাবনা তুলে রেখেছে লোকজন।হয়ত বুঝতে পারছি না বা বুঝতে চাইছিই না—এই মনোভাব নিয়েই মানুষজন বেঁচে আছে।নতুন করে বাঁচার আনন্দে মানুষ দূরত্বও ভুলে গেছে। জড়িয়ে ধরছে প্রিয়জনদের। আপন করে নিচ্ছে রোগ জীবানুকেও।

দিল্লির ভাঙা-গড়ার গপ্পো

মমতা নাগ

(নিউ দিল্লি)

আমি মমতা, দিল্লী এন সি আর এ প্রায় ৫ বছর বসবাস করছি, নানা ধরণের অভিজ্ঞতা হয়েছে এতো বছরে, তবে দীর্ঘ সাড়ে চার মাস ধরে চলতে থাকা লক ডাউন এই শহরের রোজনামচায় অনেক বদল এনে দিয়েছে..
দিল্লী এন সি আর নয়ডায় বর্তমান লক-ডাউন এর চিত্র কিছুটা বর্ণনা করছি ..রোজ দেখছি সাত সকালে পুলিশ ভ্যান টহল দিয়ে চলে যাচ্ছে প্রতি অলিতে গলিতে ..এখানে রাস্তা ঘাট জনমানব শূন্য,তবে গাড়ির সংখ্যা ভালোই চোখে পরছে, কিছু ভোগ্য পণ্যের দোকান খোলা দেখছি, তবে ক্রেতার সংখ্যা বেশ কম। এই লক ডাউন আমাদেরকে অনলাইন শপিং এ অভ্যস্ত করে দিয়েছে অফিস কাছারী খুলে গেছে এখানে।যারা অফিস যাচ্ছেন তাদের মুখ এবং নাকের উপর মুখোশ দেখছি, তবে যাদের নিজস্ব বাহন নেই তারা কি সাংঘাতিক ভাবে গায়ে গা ঘেঁষে বসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে; ভাগ করে নেওয়া গাড়ি তে যাতায়াত করছেন তা দেখে ভয়ে শিউরে উঠছি!….পরিবহনের অতিরিক্ত খরচ বাঁচাতে এ হেনো ঝুঁকি কে বরণ করছেন এরা ,যার পরিণতি ভয়ঙ্কর হতে পারে! বাড়িতে বাড়িতে কাজ করতে আসা ‘কাজের লোক নামক পেশার মানুষ গুলোর চরম দুর্গতি … লক ডাউন এর শিথিল সময়ে এদের অনেকেই নিজের গ্রাম এ ফিরে যেতে পারেনি, এইসব দুর্ভাগা মানুষ গুলো প্রায় অনশনে মরতে বসেছিল …এখন কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার আবেদনে আমরা যারা এখনো চরম দুর্দশার মুখ দেখিনি তারা রান্না করা সামান্য কিছু খাবার সংস্থাগুলির হাতে তুলে দিচ্ছি প্রতিদিন ,এই সংস্থা গুলো দুর্ভাগা মানুষ গুলোর জন্য কখনো একবেলা বা কখনো দুবেলা সামান্য খাবারের ব্যবস্থা করছে… তাই গলাদ্ধকরণ করে এরা এখনো বেঁচে আছে …সোসাইটি নামক উঁচু উঁচু দেওয়াল ঘেরা বাড়ি গুলোতে আমরা যারা বাস করি তারা বাড়িতে থেকেই অফিস এর কাজ করছি এবং অধীর আগ্রহে ভ্যাকসিন বেরুনোর এবং শপিং মল খোলবার অপেক্ষায় আছি।দেখছি ,লক ডাউন কারোর কারোর কাছে আবার আশীর্বাদ স্বরূপ, যেমন অনেকেই এই অবস্থা কে ব্যবসায়িক কাজ এ লাগিয়েছে .. তারা ভিন্ন ধরণের পণ্য কিংবা তাদের বাড়িতে তৈরী খাবার অনলাইন এ সরবরাহ করছে ..এবং লক ডাউন এর কৃপায় লাভবান হচ্ছে। আবার এই শহরেই দেখছি লক ডাউন কি ভাবে অভিশাপ রূপে দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ গুলোর ঘরে ঢুকে তাদের সন্তান দের কাঁদাচ্ছে … ওদের কাছে খাদ্য বলতে এখন শুধু জল। নেই কাজ নেই খাবার “ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় , পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি”…লক ডাউন ওদের না মরে বেঁচে থাকার এক গভীর যন্ত্রনাময় জীবন অভিশাপ দিচ্ছে …যার ফল ক্রমশ গভীর থেকে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করবে ..

উদাসীন

অতীশ রায়

জর্জ ডেনিস প্যাট্রিক কারলিন – একজন মার্কিন স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান খুব সুন্দর একটা কথা বলেছিলেন -“ইওর ইগ্নরেন্স ইজ দেয়ার পাওয়ার” – “তোমার ইগ্নরেন্স, তাহাদের শক্তি ! ” এই ক্ষেত্রে কিন্তু ইগ্নরেন্স শব্দটা উনি খুব সুন্দর ভাবে প্রয়োগ করেছেন, এটা ঠিক ‘অজ্ঞতা’ অথবা ‘অজ্ঞানতা’ অর্থে পুরোপুরি ব্যবহার হয়নি, এখানে ইগ্নরেন্স শব্দটার প্রয়োগ হয়েছে অনেক ব্যাপক অর্থে| এখানে ইগ্নরেন্স শব্দের প্রয়োগ হয়েছে – কিছুটা বুঝতে পেরেও না বুঝে থাকা, অন্যকে না বোঝানো, সচেতন না করা, তর্ক না করা, জানতে না চাওয়া, আর সর্বোপরি চরম আত্মকেন্দ্রিক হয়ে থাকা বোঝাতে | এই প্রসঙ্গে ওনার আরেকটা উক্তিও ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ এবং এইসময় ভীষণ প্রাসঙ্গিক – ” ইগ্নোরেন্ট সিটিজেনস ইলেক্ট ইগ্নোরেন্ট লিডার্স” | আজকের এই ভীষণ সময় দাঁড়িয়ে এই কথাগুলোর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে কোনো সচেতন মানুষের মনেই প্রশ্ন থাকা উচিত নয় |কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো ‘সচেতন মানুষ’ কেন এই সময় এরম বিলুপ্তপ্রায় হয়ে উঠলো সেটা নিয়ে ! এটা কি একটা সামাজিক ব্যাধি ? নাকি একটা শ্রেণীর তৈরী করে দেওয়া ব্যাধি ? এটা কি একটা জৈব অস্ত্রের মতনই নিষিদ্ধ অস্ত্র, যেটাকে বলা যেতে পারে ‘সাইকোলজিকাল ওইপন্স’, যা মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের কোষে কোষে ছড়িয়ে দিয়ে তার চেতনাকে বিকলাঙ্গ করে দেওয়া হয় !! এইটা হওয়ার কিন্তু প্রবল সম্ভাবনা আছে, কারণ যে নবীন বা মধ্যবয়সী জনসমষ্টি আমাদের ‘ভারত আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ট আসন লবে’ এই স্বপ্নে বিভোর করে রেখেছে, সেই জনসমষ্টি কি করে এত ‘অচেতন’ হয় ! তাহলে কি এই অচেতনতা ধীরে ধীরে খুব সুপরিকল্পিত ভাবে জনমানসে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ? নাকি এই অচেতনতা আসলে ভোগবাদের পার্শ্বপতিক্রিয়া, যা মানুষকে বৃহত্তর স্বার্থের প্রতি চরম উদাসীন করে তুলেছে? এইবার পাওয়া গ্যাছে প্রকৃত শব্দটা, এইটাই আসলে জর্জ বোঝাতে চেয়েছেন তার উক্তিতে – ‘ইগ্নরেন্স’ আসলে হলো ‘চরম উদাসীনতা’ | একটা মানুষ আজ আর ক্ষুদ্র স্বার্থের উর্ধে উঠে তার বৃহত্তর পরিবার, গোষ্ঠী, সমাজ, রাজ্য ও সর্বোপরি রাষ্ট্রের স্বার্থে নিজেকে নিবেদন করা তো দূরে থাক, তাদের তথাকথিত দুর্মূল্য ‘মি-টাইম’ ব্যায় করে, সামান্য ভাবতে অবধি চাইছেনা! যেটাকে কবির সুমনের গানের ভাষাতেও বলা যায় – মগজে কারফিউ | কিন্তু এই অবস্থার কি একটাই আঙ্গিক আছে ? না বিভিন্নতাও আছে ? কয়েকটি সাময়িক ঘটনা পর্যালোচনা করলে কিন্তু বোঝা যায় যে এই সমস্যা হলো বহুমাত্রিক | একটা নির্দিষ্ট মাত্রাতে বা আঙ্গিকে বেঁধে দিলে কিন্তু এই সমস্যার জবরদস্তি সরলীকরণ হয় | এইবার কয়েকটা কল্পিত ঘটনার (একেবারেই কষ্টকল্পিত নয় – আকছার চার পাশে ঘটছে ) মাধ্যমে এই সমস্যার বহুমাত্রিক রূপ উন্মোচন করা যাক |

ঘটনা ১
হিংসুটে শৈশব ঐশানির মা রূপরেখা, টিউশন ক্লাস এর বাইরে বার বার করে ঐশানিকে বুঝিয়ে বলে দিলেন – নোটস টি খুউব স্পেশাল, সুতরাং আদিখ্যেতা করে যেন তার বেস্ট ফ্রেন্ড আহেলী কে দিয়ে দেওয়া না হয় |শৈবাল অফিস ফেরত আজ একটা উইলও উড ক্রিকেট ব্যাট নিয়েছে পুত্র বিতানের জন্যে, এবং ড্রাইভ করতে করতেই ভাবছে, ওই পার্কের হাভাতে ছেলেগুলোর সাথে যেন এই ব্যাট টি নিয়ে বিতান খেলতে না যায়, সেটা পই পই করে বুঝিয়ে বলে দিতে হবে | আসলে এই অচেতনাতার ব্যাধি, উদাসীনতার ব্যাধি ফল্গু ধারার মতো বয়ে বেরিয়েছে আমাদের শিরা – ধমনীতে আশৈশব | একটু তলিয়ে দেখলেই দেখা যাবে এর পিছনে রয়েছে এক বিরাট ‘আমিত্বের’ অবদান | আপাতনিরীহ কিন্তু প্রবল বিষাক্ত এই কাজকর্ম গুলোই কিন্তু ছোট্টবেলা থেকে আমাদের মধ্যে এই ‘আমিত্ব’ নামের বিষ বৃক্ষের বীজ বুনে দেয় | সারাদিন ইঁদুর দৌড়ে সামিল হাওয়া বাবা-মা সেটাই বপন করে দেন তার সন্তানের মধ্যে, সজ্ঞানে ও সচেতন ভাবে | অজুহাত সেই – এই পৃথিবীতে অযোগ্যের কোনো জায়গা নেই, দুর্বলের মৃত্যু অবধারিত | সূচনা হয় আমিত্বের প্রভুত্ব, বহুত্বের উপর| এইভাবে শুরু হয় এক আত্মকেন্দ্রিক মনবজীবনের, সেই মানুষ যে কালের নিয়মে অবধারিত ভাবে হয় থাকবেন বহুত্বের স্বার্থে চরম উদাসীন, অচেতন, ইগ্নরেন্ট আর আমিত্বের স্বার্থে নিষ্ঠুর ভাবে অতিসচেতন |

ঘটনা ২
অদ্ভুত কৈশোর শ্যামল আজ বাড়ি ফিরেই অনুভবের ব্যাপারে গার্গীর সাথে কথা বলবে| অনুভব দিন দিন উচ্ছন্নে যাচ্ছে | বিড়ি,সিগারেটে, গাঞ্জা, গিটার অবধি ঠিক আছে, কিন্তু তা বলে চে গুয়েভারা ! টি-শার্ট পরে ফেইসবুক এ পোস্ট, একবার স্ট্যাম্প লেগে গেলে, কোনো কর্পোরেট এ ক্যারিয়ার করতে ফেটে যাবে | এইসব বিষ কোথা থেকে ভরে গ্যালো ওর মনে! ছেলেটার মধ্যে কেমন যেন একটা মানুষের প্রতি ‘ভালোবাসা’ ‘ভালোবাসা’ ভাব !!! শ্রেণীহীন সমাজ টমাজ না গড়তে বসে আবার | বিরাট চিন্তার বিষয় কিন্তু ! নাইকি জুতো পরা কৈশোর, পাব, নাইট ক্লাব জেনে যাওয়া কৈশোর কে জোর করে আমরা বহুত্ব বাদের কথা জানতে দি না | মানুষ কে মানুষের জন্যে দাঁড়াতে হয়ে এই সত্যটা জানতে দিতে চাই না, ভয় পাই, যদি সত্যি এটাই সবকিছু ভেবে বসে! যদি আমিত্ব টা কে সরিয়ে বহুত্ব কে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলে ? তাহলে সারাজীবন না খেয়ে কাটাতে হবে যে ! ইঁদুর দৌড় থেকে একচুল নড়লেও চলবেনা, কারণ আমরা সে ভাবেই সমাজ বানিয়েছি| সবাই মিলে জেতা যায় না| সবাই কে হারিয়ে, যেন তেনো প্রাকারেন জয় হাসিল করতে হয় | অতি সচেতন হতে হয় নিজের জন্যে, নিজের অনু-পরিবারের জন্যে, কিন্তু অবচেতনেও ‘অচেতন’ থাকা শেখানো হয় বাদবাকি সব কিছুতে !

ঘটনা ৩
উদাসীন যৌবন থেকে মাঝবয়েসএকটা বন্ধুদের হোয়াটস্যাপ গ্রুপ, নানা রকম রাজ্নৈতিক, অরাজনৈতিক, আর্থসামাজিক ব্যাপারে সেখানে তুমুল তর্ক বিতর্ক হয় | কিন্তু দিনের শেষে প্রতিটা মেম্বার মনে করে, এই ডিবেট প্রকৃত অর্থেই নিস্ফলা, সামাজিক মাধ্যমে এইসব রাজা উজির মেরে কোনো লাভ নেই ! তার চেয়ে উদাসীন থাকে ভালো, অচেতন থাকা ভালো, নিজে জানলেও, বুঝতে পারলেও সেটা নিয়ে অতিসক্রিয় হয় কোনো কাজের কাজ হয়না | কারণ এই আলোচনা কারো ইডিওলজি কে প্রশ্ন করে না , কারো জ্ঞান তো বাড়ায় না বরং অযথা মনো মালিন্যের কারণ হতে পারে | তার চেয়ে একটু রসালো জোকস ইত্যাদি বরং অনেক সেফ !

জীবনের এই পর্বে, যৌবন প্রকৃত অর্থেই যাপন হয় | চরম ভাবে আত্মকেন্দ্রিক যাপন | চরম সচেতন যদি নিজের জন্যে হয় আর বাকি পরে থাকে ততোধিক চরম উদাসীনতায় | বিষাক্ত পৃথিবীর দায় কিন্তু এই উদাসীন যৌবনের সবথেকে বেশি, কিন্তু সময় এর সাথে সাথে এই ঔদাসীন্য আরো চেপে বসে |একান্ত যাপন – মি- টাইম বাড়তে বাড়তে পুরো টাইম গ্রাস করে নেয় | তারপর কিন্তু আর সময় থাকে না – শেষ হয় যায় | অনুঘটক কিন্তু সেই একটাই সর্বনাশা মনোভাব -থোড়াই না দুটো হোয়াটস্যাপ আর ফেইসবুক পোস্ট দেশের পলিসি মেকিং এ প্রভাব বিস্তার করবে? করবে না, কিন্তু ওই যে ইগ্নরেন্স ! সেটা কমবে ! যুগ যুগ ধরে গনমাধ্যম সেটাই করেছে, আর তাতে যত বেশি আম জনতা অংশগ্রহণ করেছে, তত পলিসি মেকার রা সাবধান হয়েছে | এটা সেই ফরাসি বিপ্লবের সময় থেকেই প্রমাণিত সত্য | কিন্তু অদ্ভুত ভাবে আজকাল , যৌবন থেকে মাঝ বয়েসে এসে এই বোধ টা আরো শূন্য হয়ে যাচ্ছে | এইটাই হওয়ার কথা ছিল না ! কারণ পরিপক্ক মাথা, অভিজ্ঞ মাথা আরো আরো বেশি সমাজ সচেতন হয়ে ওঠে, বুঝতে শেখে যে দাবানল লাগলে কিন্তু সেই জঙ্গলে থেকে বাঁচা যায় না, পুড়েই মরতে হয়ে | কিন্তু আজকের সময় সেটা হচ্ছেই না ! অদ্ভুত উদাসীন আজকের তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ| এইখানেই কিন্তু প্রশ্ন যে এই উদাসীনতার যে অসুখ, সেটা কি আশৈশব লালিত সেই আমিত্ব, নাকি আরো বেশি আরো বেশি কিছু? সেটা কি সেই সাইকোলোজিক্যাল ওইপন্স, যা আমাদের মস্তিষ্কের, স্নায়ুর রন্ধে রন্ধে ঢুকে গ্যাছে কোনো এক অদ্ভুত মেকানিসম এর দ্বারা ! হতেই পারে, আর্থসামাজিক অবস্থা, পুঁজিবাদ, রাষ্ট্রযন্ত্র, আত্মকেন্দ্রিক সমাজ এই ভাবেই আমাদের ভাবতে শেখায় প্রতিনিয়ত | কখনো ধর্মের জুজু দেখিয়ে, কখনো জাত পাতের দোহাই দিয়ে, কখনো কিছু স্বল্প মেয়াদি, অদূরপ্রসারী সুবিধা দিয়ে, কখনো বা সরাসরি মগজে কারফিউ ডেকে ! হ্যা এই শেষের টাই বিরাট চিন্তার জিনিস | আসুন একটু দেখে নেওয়া যাক মগজে কারফিউ কি ভাবে ডাকা হয় ; এই পুরো ব্যাপারটাই প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে ঘটে চলেছে, একটু সচেতন হলেই উপলব্ধি করা যায় সেটা , এবং দল ও মত নির্বিশেষে সেটাই সব রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংগঠনিক শক্তি করে চলেছে | খুব সহজ তাদের লক্ষবস্তু ; উদাসীন মানুষ ! যে অবচেতন মনেও অচেতন !

মগজে কারফিউ মগজে কারফিউ করার প্রথম ধাপ হলো, একটা মিছি মিছি ফীল গুড আবহাওয়া তৈরী করা | কোনো যুক্তির, তথ্যের তোয়াক্কা না করে, বিরাট বিরাট স্বপ্ন দেখানো, যেটা আদপে অন্তঃসারশূন্য! সোজা কথায় প্রচুর বেহিসাবি মিথ্যে বলা | বার বার বলা | যাতে ওই মিথ্যে টাই শুনতে শুনতে একদিন সত্যি মনে হয় ! উচ্চ শিক্ষিত শ্রেণীও এই ফাঁদে পা দিয়ে মগজে কারফিউ ঘোষণা করে ও সমাজের সবথেকে বারো বিপদের কারণ হয়, কারণ এদের মাধ্যমে মানুষ প্রভাবিত হয়| ভোগবাদ দিয়ে চরম উদাসীন করে দেওয়া, যাতে সে বুঝেও কিছু না বলে,কারণ তার স্বার্থে ঘা লাগে নি, আপাত দৃষ্টিতে ! সুদূরপ্রসারী সর্বনাশ সে দেখতেই পায়না, কারণ সে কাকের মতো চোখ বুজে থাকে এইসময় | বেশি বিতর্কেও সে যায় না কারণ সে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে সে সচেতন হলেও যা হবে, না হলেও তাই হবে ! এটা তাকে ইচ্ছে করেই বোঝানো হয় ! সেও তার চার পাশে সেটাই বোঝানোর চেষ্টা করতে থাকে ক্রমাগত | আর একটা শ্রেণীকে ক্রমাগত বোঝানো হয় -ভালো এবং একমাত্র ভালোটাই হচ্ছে, এর আগে ও পরে কিছু ভালো নেই! ভালো এর চেয়ে বেশি কেউ কোনোদিন করেও নি আর করতেও পারবে না ! অদ্ভুত ভাবে সমস্ত তথ্য ইন্টারনেট এ সহজলভ্য থাকলেও,এইসময় এক অদ্ভুত অন্ধবিশ্বাস ও ঔদাসীন্য গ্রাস করে, এবং মানুষ কিছুই বাজিয়ে দেখে না ! শুনেই ভাবে এটার এমনি বুঝি শব্দ ! তারা ভিন্ন মতের প্রবল বিরোধিতা করে, এবং অদ্ভুত ভাবে সমস্ত বিরোধী মতের মধ্যে রাজনৈতিক সমীকরণ খোঁজার চেষ্টা করে | আফিমের নেশার মতো কিছু একটা নেশা তে বুদ্ হয়ে ভাবতে থাকে – আমি ঠিক বাকি ভুল . আমি ঠিক বাকি ভুল ! কিছুতেই ভাবতে পারেনা যে এই সমাজে নিষ্পক্ষ, সাধারণ মানুষ বলে কোনো বস্তু থাকতে পারে, যে বা যারা শুধুমাত্র সাদা কে সাদা ও কালো কে কালো বলছে মাত্র ! অদ্ভুত ভাবে একটা মেকী জাতীয়তা বোধ জাগ্রত করা হয় ( নাৎসি স্টাইল ) এবং যে কেউ ভিন্নমত পোষণ করলেই, ব্যক্তি, সমষ্টি অথবা প্রতিষ্ঠান কে জাতীয়তা বোধের বিরোধী তকমা দিয়ে অচ্ছুৎ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় ! মানুষ এইটা খায় ভালো, কারণ বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় মানুষ পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, জয় লাভ করেছে, আর সেই জয়ের মূল হাতিয়ার ছিল একাগ্র জাতীয়তা বোধ| ফলে এই ‘দেশ’ ও দেশ-প্রেম ব্যাপারটা কোনো কোনো সময় রাষ্ট্র যন্ত্র অদ্ভুত শানিত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ! যেকোনো বিরোধী শক্তি মাথা তুলে দাঁড়ালেই ও প্রশ্ন করলেই, তাকে দেশবিরোধী তকমা দিয়ে দমিয়ে দেওয়া হয় | সে যতই দেশের হিতাকাঙ্খী প্রশ্ন -মালা হোক, তার কপালে রাষ্ট্র বিরোধী, বিচ্ছিনতাকামী, দেশদ্রোহী ইত্যাদি ভারী ভারী উপাধি জোটে ! বহু শিক্ষিত মানুষ, আগ্র পশ্চাৎ বিবেচনা না করেই – হ্যা রে ব্যাটা দেশদ্রোহী বলে হা রে রে রে করে ওঠে!

তাহলে যেটা বোঝা গ্যালো যে শৈশবে বপিত সেই বিষ বৃক্ষের বীজ, ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হয়ে, শাখা প্রশাখা বিস্তার করে, মহীরুহে পরিণত হয়ে মাঝ বয়েসে এসে | তার সাথে যোগ হয়ে ‘মগজের কারফিউ ‘, ‘আমি’ ‘আমি’ করে, আগামী প্রজন্মের জন্যে আমরা রেখে যাই একটা বিষাক্ত আর্থসামাজিক ব্যবস্থা, পঙ্গু প্রশাসন, উদাসীন প্রজার ততোধিক উদাসীন রাজা, যে নগ্ন হয়ে রাস্তায় অবলীলায় হেটে যায়, জানে আজ কিন্তু সেই বাচ্চাটাও হারিয়ে গেছে উদাসীনতারআড়ালে, তাই কেউ জানতে চাইবে না চিৎকার করে,নির্ভয়ে – রাজা তোর কাপড় কোথায় ?

অন্তরীন

কল্যাণ ভট্টাচার্য

এই বোশেখ মাসে, এখানে ফুটিফাটা রোদ্দুরের দেখা নেই৷ তা ভেবেই সকালবেলা মনটা ভালো হয়ে গেল৷ বাড়ির সামনে ফুলের বাগান, ইঁট পাতা রাস্তা, বসার সিমেন্ট বাঁধানো ছোট্ট বেন্চি৷ এই বেন্চিটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু বহু বছর আগেকার অনেক স্মৃতির জলছবি৷ পাতার পর পাতায় সেই সব জলছবি সাঁটানো৷ একটা বোগেনভিলিয়া গাছ বেন্চিটার ওপর দিয়ে ঝুলছে, রোদ্দুরের ঝিলিক ফাঁকফোকর দিয়ে ঢুকছে৷
মা আমাকে শিখিয়েছিল সন্ধেবেলার পর সাপের নাম লতা হয়ে যায়৷ অপু দূর্গার গল্প পড়ে ইস্কুলের পেছনের রেললাইন দিয়ে যেতে যেতে মনে হত আমার দিদিটা অতবড় না হলে বেশ হতো৷প্রথম ফাউন্টেন পেনে লিখতে শিখিয়েছিল বাবা৷ বাবা শিখিয়েছিল কেমন করে তীর ছুঁড়তে হয়, কেমন করে বন্দুক ধরতে হয়, মৈশাল তিস্তার চরে কেমন করে থাকে৷ মা শিখিয়েছিল কাঁচালঙ্কা সবুজ আর শুকনোলঙ্কা নাকি লাল৷ উনুনের আঁচে নুন দিলে আঁচ ভালো হয়৷ বাবা শিখিয়েছিল স্কেচ কি করে করতে হয়, ইংরেজি লিখতে হয় কি করে৷ আর বেস্পতিবারের সত্যি নাম বিষুৎদবার!
বন্ধুদের ঢোলা হাফপ্যান্টের এক পকেটে হজমিগুলি আর আরেক পকেটে দুষ্টুমি৷ কে যে শিখিয়েছিল কী করে বাচ্চা হয়, সে কথা ভুলে গেছি৷কথা হলো এতো সব হওয়ার পর বাবা যা বলতেন সেটাই হলাম৷ চামচিকে৷

পজিটিভ

অপর্ণা মুখার্জী


…হটাৎ করেই আগ্রার এক অন্ধ গলির ঘুপচি ঘরটায় বসে মেল এ ইন্টারভিউ এর ডাকটা পেয়েছিলো মকবুল.. বন্ধ হয়ে যাওয়া জুটমিলের চাকরির আসা ছেড়ে মহারাষ্ট্রের এই অফিস জয়েন করে..নামকরা আইটি কোম্পানির সিইও অপূর্ব ব্যানার্জী র সাথে ওনার মেয়ে অপরাজিতা কে দেখে প্রথম দিনেই প্রেমে পরে সে.. তারপর অনেকগুলো দিন , নানান ঘটনা , অনেক তর্ক বিতর্কের পরেও অপরাজিতার বাবা মকবুল কে মেনে নিতে পারেন নি আর একমাত্র মেয়ে হয়ে বিপত্নীক বাবাকে একা ফেলে শুধু ভালোবাসার জন্য সব ফেলে নিজের ঘর বেঁধে উঠতে পারেনি অপরাজিতা..হাই রাইজের ছাদে তখন গোধূলি.. চরাচর জুড়ে অস্তমিত সূর্যের আভা যেনো লাজুক আজ .তীব্র চুম্বন শেষে বিব্রত হেসে অপরাজিতা বললো – ” বলা হয়নি…আমার আজ সকালে রিপোর্ট এসেছে…পজিটিভ …” মকবুল উদাসীন দৃষ্টিতে সিগারেট ধরালো – ” আমিও ভাবলাম শেষবার দেখাটা করে নি…আমিও আজই সকালে রিপোর্ট পেয়েছি…পজিটিভ…” .. নিস্তব্ধ সন্ধে নেমে গেল শহরে ..আজানের সুর খানখান করে দিলো ফোঁপানোর শব্দ.. 

Poem 

Akanksha Jha

We grew up! 
Somewhere between 
“5 toffees for 1 Rs”, and 
“1 toffee for 5 Rs”.
We grew up! 
Somewhere between 
“Ground mai aaja” , and
“Online aaja”
We grew up! 
Somewhere between 
“Stealing chocolate of our sister” and
“Buying chocolates for her kids”
We grew up! 
Somewhere between 
“Just 5 mins more maa” and 
“Pressing the snooze button”
We grew up! 
Somewhere between 
“Crying out loud just to get what we want”, and
“Holding our tears when we are broken inside”
We grew up! 
Somewhere between 
“Let’s meet and plan”, and
Let’s plan and meet
We grew up! 
Somewhere between 
“Being afraid of our parents”, and
“Praying for our parents”,  we finally grew up. 
As we grew up, we realise how silently our lives have changed.

শিবমের হারিয়ে যাওয়া

পৌলোমী নাথ

বাড়িতে মা-বাবার ঝগড়া দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে উঠেছে ছোট্ট শিবম। আজ- কাল কিছুই ভালো লাগেনা তার, সে শুধু মনে মনে ভাবে কবে থামবে এই ঝগড়া আর তার পরেই সে তার মা-বাবার সঙ্গে ঘুড়তে যাবে।

শিবম তার মা-কে মাঝে মধ্যেই জিজ্ঞাসা করে তোমরা কেন এত ঝগড়া কর মা? আমার ভালো লাগেনা। তার এই প্রশ্নের উত্তরে তার মা বলে বড় হও বুঝতে পারবে কেন আমরা ঝগড়া করি। আবার শিবম তার মা-কে জিজ্ঞাসা করে কবে থামবে মা তোমাদের এই ঝগড়া? তোমরা ভাব করে নাওনা। তোমাদের ভাব হয়ে গেলেই আমরা তিনজনে মিলে ঘুড়তে যাব অনেক দূরে। শিবমের এই প্রশ্ন শুনে তার মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একটা বড় নিশ্বাস ছেড়ে জানায় জানিনা বাবু। এই কথা বলেই শিবমের মা শিবমকে তাড়া দিতে থাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য। বলতে বলতেই বাসের হর্ণ বেজে ওঠে। হর্ণের শব্দ শুনেই শিবমের মা তাকে কোনও রকমে জুতো পড়িয়ে প্রায় টানতে টানতেই নিয়ে যায় বাসে তুলবে বলে। বাসে তুলে শিবমকে টা টা করে ঘরে ফিরে আসে শিবমের মা। এখানেই বলে রাখি শিবমের মায়ের নাম তনয়া, তনয়া অধিকারি, একটা অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সির গ্রাফিক্স ডিজাইনার আর শিবমের বাবা সপ্তর্ষি ব্যঙ্ক ম্যানেজার। সুতরাং তাদের সংসারে টাকা পয়সার অভাব একেবারেই নেই, যেটা আছে সেটা শান্তির অভাব। সপ্তর্ষি আর তনয়া প্রয় সব সময়েই কাজ নিয়ে ব্যাস্ত থাকে আর যে সময়টা তারা এক সঙ্গে থাকে সেই সময়টা পুরোটাই তাদের ঝগড়া করে কেটে যায়।

শিবমকে বাসে তুলে ঘরে এসে তনয়া অন্য দিনের মতই অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে সপ্তর্ষির জন্য টিফিন বানিয়ে রেখে বেড়িয়ে যায়।

শিবমের রোজ ৩ টের সময় ছুটি হয় আর ছুটির পরে সে তার ঠাকমা- দাদুর কাছে গিয়ে থাকে। সপ্তর্ষি বাড়ি ফেরার সময় সে শিবমকে নিয়ে বাড়ি ফেরে কারণ তনয়ার বাড়ি ফিরতে একটু দেরিই হয়। শিবমের রোজ ৩টের সময় ছুটি হয় আর তার পরে সে দাদু দিদার কাছে পৌঁছে একবার তার মা-কে ফোন করে দেয়। এখন প্রায় ৪টে বাজে, তনয়ার কাজ করতে করতে খেয়ালই নেই ৪টে বেজে গেছে কখন। হঠাৎ ফোনের শব্দে তার খেয়াল হল আজ তাকে শিবম ফোন করেনি এদিকে ৪টে বেজে গেছে। ফোনটা হাতে নিয়ে তনয়া দেখলো শিবমের দাদুর নম্বর। ফোনটা তুলেই তনয়া চোমকে গেল ৪টে বেজে গেছে অথচ শিবম নাকি এখনও বাড়ি পৌঁছাইনি। ফোনটা রেখেই তনয়া ফোন করল শিবমের স্কুলে, কেউ ফোন না তোলায় তনয়া সরাসরি পৌঁছিয়ে গেল শিবমের স্কুলে সেখানে গিয়ে কোনও বাচ্চাকেই দেখতে পেলনা সে আর গেটের সামনে দারোয়ানকে বসে থাকতে দেখে তনয়া জিজ্ঞাসা করল আপনিতো থাকেন এই গেটে, আপনি দেখেছেন আমার ছেলে শিবমকে ক্লাস টু-তে পরে। দারোয়ান তার কথার উত্তরে জানালো স্কুল অনেকক্ষন আগেই ছুটে হয়ে গেছে আর সব বাচ্চারাও বাড়ি চলে গেছে কেও নেই এখন স্কুলে। তনয়া তখন কিছুটা রেগে গিয়ে ধমকের সুরে বললো। আমার ছেলে পৌঁছাইনি বাড়িতে। তারপরে এক নিশ্বাসে তনয়া বলতে লাগলো, কি করেন আপনি গেটে বসে একটা বাচ্চা এই ভাবে কি করে উধাও হয়ে যেতে পারে আমি সব ক্লাসরুম ঘুরে দেখব আর প্রিন্সিপাল কোথায় ডাকুন তাকে, আমি কথা বলবো ওনার সঙ্গে। তার এই কথাতে দারোয়ান তাকে জানালো প্রিন্সিপাল অনেকক্ষন আগেই স্কুলে থেকে বেড়িয়ে গেছেন আর স্কুল ঘুরে দেখে কোনও লাভ নেই কেও নেই স্কুলে তার থেকে ভালো আপনি থানায় যান। তনয়া এই কথা শুনে আরও রেগে গিয়ে চেঁচামেচি শুরু করলে দারোয়ান তাকে স্কুলের ভেতরটা দেখাতে রাজি হল। কিন্তু ভেতরে গিয়ে অনেক খুঁজেও পাওয়া গেলোনা শিবমকে। স্কুলের ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়েই তনয়া দেখলো সপ্তর্ষি দাঁড়িয়ে আছে। তনয়াকে দেখতে পেয়ে সপ্তর্ষি জিজ্ঞাসা করল কোথায় বাবু পেলে ওকে। আমাকে মা একটু আগে ফোন করে সব জানালো। সপ্তর্ষিকে দেখে তনয়া কান্নায় ভেঙে পড়ল কাঁদতে কাঁদতেই সে জানালো স্কুলের মধ্যে কোথ্থাও নেই শিবম। দারোয়ানও জানালো সে নাকি তাকে আজকে স্কুলে দেখতেই পায়নি। ওদিকে আবার কাল থেকে স্কুলে গরমের ছুটি পরে যাচ্ছে আর এই গরমের ছুটিতে অনেকেই ঘুড়তে চলে যায় তাই কোনও খবর পাওয়াও এখন বেশ মুশকিল হবে। এই সব কথা ভাবতে ভাবতেই সপ্তর্ষি তনয়াকে ডেকে বললো এখানে দাঁড়িয়ে থেকে সময় নষ্ট করে আর লাভ নেই চলো আমরা থানায় যাই, ঠিক পাওয়া যাবে বাবুকে।

থানায় পৌঁছিয়েই তনয়া পুলিশকে দেখে নিজেকে সামলাতে না পেরে তাকে বলতে শুরু করলো ইনস্পেক্টর আপনি যেখান থেকে হোক আমার ছেলেকে খুঁজে বের করুন কোথ্থাও পাওয়া যাচ্ছে না ওকে। তনয়া এমন করছে দেখে পুলিশ তনয়াকে শান্ত হয়ে বসতে বলে সপ্তর্ষির কাছে জানতে চাইলো কি হয়েছে। সপ্তর্ষি সব কথা খুলে বললে পুলিশ তাদের আশ্বস্ত করে বললো চিন্তা করার কিচ্ছু নেই আপনারা একটা ডায়েরি করে যান আর তার সঙ্গে আপনাদের বাচ্চার এক কপি ছবি ও ওর বিবরণ দিয়ে যান আমরা যে করে হোক আপনার বাচ্চাকে খুঁজে ঠিক বার করবই।

সপ্তর্ষি আর তনয়া দুজনে একসঙ্গেই থানা থেকে বাড়ি ফিরে এল। কিন্তু আজকে তাদের দুজনের মধ্যে এক বারও ঝগড়া হয়নি আর সেটা হয়ত ওরা নিজেরেও খেয়াল করেনি বা করলেও আজ তাদের ঝগড়া করতেও ভালো লাগছিল না। এর পরে প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেলেও এখনও শিবমের কোনও খবর পাওয়া যায়নি। পুলিশরা জানিয়েছে তারা এখনও খুঁজছে, কোনও খবর আসলে তাদের ঠিক জানানো হবে। তবে এই সাত দিনের মধ্যে সপ্তর্ষি, তনয়া দুজনকেই অনেক বার মর্গে, হাসপাতালে যেতে হয়েছে কিন্তু কোথ্থাও নেই শিবম। হঠাৎ করেই কেমন যেন উধাও হয়ে গেল শিবম। এখন কোনও ফোন এলেই তনয়া ছুটে যায় শিবমের খবর পাওয়ার আশায় কিন্তু কোনও খবর নেই শিবমের। শিবমের হারিয়ে যাওয়ার পর থেকেই তনয়া কেমন যেন একটা হয়ে গেছে। অফিসে যায় না, খায়না ঠিক করে, রাতের পর রাত জেগে কাটিয়ে দেয় ঘুমায় না, শুধু তাই নয় ওই দিনের পর থেকে তনয়া আর সপ্তর্ষির ঝগড়া একেবারে থেমে গেছে। তবে তাদের ঝগড়াটা থেমে যাওয়ারই কথা কারণ তনয়ার যে কারণটা নিয়ে সবথেকে বেশি অভিযোগ ছিল, সময় না দেওয়া এখন আর সেটা করে না সপ্তর্ষি। এখন সব সময় তনয়ার খেয়াল রাখে সে। এখন প্রায় ঘরে বসেই কাজ করে সপ্তর্ষি তবে মাঝে মধ্যে অফিসে গেলে সপ্তর্ষির মা- বাবা এসে থাকেন তনয়ার কাছে।

তনয়াকে এমন ভাবে ভেঙে পড়তে দেখে সপ্তর্ষি ঠিক করে নেয় তারা দুজনে মিলে কদিন তনয়ার বাপের বাড়ি  শিলং থেকে ঘুরে আসবে। এই শিলংয়েই শিবম হয়েছিল আর শিবম পাঁচ মাস হতেই সে আর তনয়া আবার কলকাতায় চলে আসে। এরপরে  কাজের চাপে তাদের আর সেখানে যাওয়া হয়নি। যখনই কোনও দরকার হয়েছে তনয়ার মা এখানে এসে থেকেছেন কিন্তু তাদের আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

সপ্তর্ষি তনয়ার বাড়িতে ফোন করল, ফোন তুলেই তনয়ার মা জিজ্ঞাসা করল শিবমের কোনও খবর পেলে তোমরা? প্রশ্নের উত্তরে না জানিয়ে সপ্তর্ষি জানালো তারা দুজনে কদিনের জন্য সেখানে যাবে, বাড়িতে তাদের দম বন্ধ হয়ে আসছে। তনয়ার মা জামাইয়ের কথায় সম্মতি জানিয়ে বললো খুব ভালো একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছ তোমরা, অনেকদিন তোমাদের কোথাও ঘুড়তে যাওয়া হয়না এখানে আসলে মনটা হয়ত একটু ভালো হবে। দেরি না করে যত তারাতারি সম্ভব চলে এসো তোমরা এখানে, বলে তনয়ার মা ফোনটা রেখে দিল। সপ্তর্ষিও সে দিনই দুটো ফ্লাইটের টিকিট কেটে নিলো। তনয়াকাও সে জানালো তারা শিলং যাচ্ছে তবে কোনও উত্তরই দিলনা তনয়া যেন শুনতেই পেলনা। আজকাল এমনভাবেই থাকে তনয়া কোনও কথার কোনও উত্তর দেয়না। সপ্তর্ষি আর কোনও কথা না বলে ব্যাগ গোছাতে লাগলো কালকেই বিকেলে তাদের ফ্লাইট তাই হাতে আর বেশি সময় নেই।

বিকেল সাড়ে পাঁচটায় তাদের ফ্লাইট আর সল্টলেক থেকে এয়ারপোর্ট তেমন দূরেও না। তবুও হাতে সময় রেখে বেড়নোই ভালো কারণ কলকাতার রাস্তার কোনও ভরসা নেই আবার তারপরে অফিস টাইম। তাই সপ্তর্ষি ঠিক করলো ৪টের মধ্যে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাবে। সে তনয়া দুজনেই রেডি, ক্যাবও বুক করা হয়ে গেছে। তারা বাড়ি থেকে বেড়তে যাবে এমন সময় তনয়া সপ্তর্ষিকে বলে উঠলো শিবম যদি এর মধ্যেই ফিরে আসে এখানে আর তাদের খোঁজে তাহলে কি হবে। সপ্তর্ষি তনয়ার কথার উত্তরে জানালো যদি শিবম ফেরে তাহলে সামনের ফ্ল্যাটের রুমা কাকিমাকে বলা আছে তিনি ঠিক খবর দেবেন তাদের। সপ্তর্ষির কথাটা তনয়ার পছন্দ না হলেও টিকিট কাটা হয়েগেছে বলে তারা দুজনে বেড়িয়ে পড়লো। ফ্লাইট নির্দিষ্ট সময়েই পৌঁছল শিলংয়ে। শিলংয়ের এয়ারপোর্ট থেকে তনয়ার বাড়ি খুব বেশি দূরে নয় তবে সঙ্গে লাগেজ থাকার কারণে তারা একটা গাড়ি ভাড়া করে নিল। গাড়িটা তাদের বাড়ি পর্যন্ত পৌছে দিল গাড়ির ড্রাইভারটা বেশ ভালো ছিল, লাগেজ গুলোও সেই নামিয়ে দিল সেই কারণে সপ্তর্ষি তাকে দশ টাকা বেশি দিল। সপ্তর্ষির টাকা মেটানোর জন্য অপেক্ষা করছিল তনয়া। টাকা মিটিয়ে তারা এক সঙ্গে গিয়ে কলিংবেল টিপতেই দরজা খুলে গেল আর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শিবম। শিবমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সপ্তর্ষি-তনয়া দুজনেই চমকে উঠলো। যাকে সব জায়গায় তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয়েছে সে এখানে কি করে এলো এটা তারা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না। তনয়া শিবমকে দেখে নিজেকে সামলাতে না পেরে কেঁদেই ফেললো। ওদিকে সপ্তর্ষি তখনও বুঝে উঠেতে পারছিল না শিবম সেখানে একা একা কি করে এল। সপ্তর্ষির মনে হল হয়ত তনয়ার বাবাই শিবমকে এখানে এনেছেন আর সেই কারণে সপ্তর্ষি তনয়ার বাবার কাছে জানতে চাইলো শিবম এখানে কি করে এলো। শিবম তখন দাদুকে কোনও কথা বলতে না দিয়ে নিজেই বলতে শুরু করল কিভাবে সে তার মা-বাবার ঝগড়ায় বিরক্ত হয়ে উঠেছিল কিন্তু তবু তারা রোজ ঝগড়া করত, তাকে কোথাও ঘুড়তেও নিয়ে যেত না আর সেই কারনেই শিবম তার দাদু আর দিদার সঙ্গে মিলে এই প্ল্যানটা করে। আর এই সব কথা শেষ করেই শিবম আনন্দে লাফিয়ে উঠে বলে বলতে লাগলো দেখ আমি হারিয়ে গেলাম বলেইতো তোমরা এখন আবার একসঙ্গে আর এবার গরমের ছুটিতে আমাদের তিনজনের একসঙ্গে ঘোরাও হবে। শিবমের কথা শেষ হতে না হতেই তনয়া আর সপ্তর্ষি দুজনে মিলে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল আমরা  আর কোনও দিন ঝগড়া করব না প্রমিস।

” গু লু দা ”
কাঞ্চন কুমার গাঙ্গুলী

আমি ট্রেনে হকারি করি৷ দিন আনি দিন খাই৷ ট্রন বন্ধ৷ রোজ গার নেই৷ আশা ছিল ১৭ তারিখের পর লকডাউন উঠে যাবে৷ সেগুরে বালি৷ লকডাউন আরো দু সপ্তাহ বাড়িয়ে দিল৷ মাথাই হাত৷ রোজগার নেই৷ বিনা মূল্যে রেশন আর অপরের সাহাজ্যে কোন রকমে চলছে৷ এর পর গোদের ওপর বিষ ফোঁড়ার মত আছে অসুখ বিসুখ৷ সুগার, হাই প্রেসার ,থাইরয়েড৷ একদিন না খেয়ে থাকা যায়৷ কিন্তু এক বেলাও ওষুধ বাদ দেওয়া যায় না৷ এ সব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ে গেল গুলুদার কথা৷ ঠিক করলাম একবার ফোন করে দেখি যদি কোন উপায় বাতলে দিতে পারে৷
গুলুদাকে ফোন করলাম৷ ও প্রান্ত থেকে সব শুনে বলল, “যে কথা গুলো বলছি মন দিয়ে শোন৷ ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন গুলো ব্যাগে ভরে নে৷ এর পর পেট ভরে ঠাণ্ডা জল খা৷ যদি ফ্রিজের ঠাণ্ডা জল হয় তাহলে আরো ভাল৷ এবার ঘরের বাইরে রোদে গিয়ে আধ ঘন্টা দাঁড়া৷ ঘড়ি ধরে আধ ঘন্টা দাঁড়ানোর পর খালি মাথায় হেঁটে বাজারে মোড়ের মাথায় যা৷ দেখবি ওখানে পুলিশের পিকেট বসেছে৷ এবার তুই এক কাজ কর৷ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুটা সময় ধরে বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে ধপাস করে মাটিতে বসে পড়৷ দেখবি আশ পাশ থেকে পুলিশ তোর কাছে দৌড়ে আসবে৷”
গুলুদাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “এবার পুলিশ ব্যাটনের দুঘা দিয়ে ভ্যানে তুলে লকাপে চালান করে দেবে৷ লকাপে পঁচে মড়তে হবে৷” আমাকে থামিয়ে দিয়ে গুলুদা বলল, “অত খাবরাচ্ছিস কেন? তোর ব্যাগে প্রেসক্রিপশন আছেনা৷ পুলিশ যেই তোকে ধরতে আসবে ওগুলো দেখিয়ে বলবি, ওষুধ কিন্তে যাচ্ছি৷ দুদিন ধরে জ্বর জ্বর ভাব৷ মাথা ব্যাথা, গলা ব্যাথা৷ এখানে এসে প্রচণ্ড শ্বাস কষ্ট শুরু হল৷ তাই বসে পড়লাম৷”
গুলুদাকে আবার থামিয়ে বললাম, “কিন্ত এখনতো আমার গায়ে জ্বর নেই৷ গলা ব্যাথা, মাথা ব্যাথা বা শ্বাস কষ্টও নেই৷” গুলুদা খ্যাক খ্যাক করে বলে উঠল, “ঘটে একটু বুদ্ধি ধর৷ এবার দেখবি কি হয়৷ তোকে পুলিশ ঐ অবস্থায় দেখে Ambulance এনে এসকর্ট করে হাসপাতালে নিয়ে যাবে৷ দেখবি রাজার আদর কাকে বলে৷ তোকে আইসোলেশন বেডে দেবে৷ ইতিমধ্যে জ্বর জ্বর ভাব, গলা, মাথা ব্যাথা শুরু হয়ে যাবে৷ ডাক্তার আসবে৷ বিভিন্ন পরীক্ষা নিরিক্ষা শুরু হবে৷ তখন প্রেসক্রিপশন গুলো ডাক্তার বাবুকে দেখাবি৷ সব দেখে শুনে ডাক্তার বাবু তোর সুগার, প্রেসার, থাইরয়েড’র ওষুধ চালু রাখতে বলবে৷ কারণ ওগুলো হট করে বন্ধ করা যায় না৷ ওদিকে করোনার সেবা শুশ্রুষাও চলবে৷ রিপোর্ট আসবে৷ আমি জানি তোর রিপোর্ট নেগেটিভ আসবে৷ কিন্তু আইসোলেশন বেডে তোর খাওয়া বা ওষুধের কোন অভাব হবেনা৷”
একটু দম নিয়ে গুলুদা আবার বলল, “চোদ্দ দিন পর আইসোলেশান বেড থেকে যখন ছাড়বে, তোর আর্থিক অবস্থা বুঝে হাসপাতাল থেকে কম করে এক মাসের ওষুধ ফ্রি দিয়ে দেবে৷ ইতিমধ্যে লকডাউন উঠে যাবে৷ ট্রেন চালু হবে৷কাজ শুরু করবি৷ আর অসুবিধা থাকবেনা৷” শুনে বললাম, “কিন্তু আমার বউ৷” ও প্রান্ত থেকে গম্ভির গলা ভেসে আসল, “সে চিন্তা আমার!”

অলীক সংসার
সেঁউতি কর্মকার

ভালবাসা তুমি অন্য কারুর ভাত বার,
বিছানা-বালিশ, স্নানের ঘরের তোয়ালেও।
এখন তোমার নিত্যদিনের দিনযাপনে
তেল হলুদে নুনের ছিটে,
পদ্মপরাগ গন্ধমাখা তোমার শরীর,
শিউরে ওঠে নিজ মানুষের স্পর্শ পেলে।
এখন তুমি অন্যঘরে বাতি জ্বালো।
তবুও দেখো দেওয়াল ঘড়ির সাথে যেমন লেপটে থাকা টিকটিকিটা,
তেমনি আছি তোমার সাথে সর্বক্ষণই,
অবসরের শূন্যতা আর বিষাদ জুড়ে।
সাঁঝের আধার তোমায় যখন ক্লান্ত করে,
খুব থেকে যাই তোমার বুকের মনখারাপে।
নাইবা হলে অন্যকারুর
অন্যরকম সমর্পণে,
আমি থাকি খুব আঁকড়ে জাপটে ধরে,
আষ্টেপৃষ্ঠে নিজের মত তোমায় নিয়ে
অপার্থিব মনের ভেতরে
অলীক কোন সংসারে।

কেন এ বিষণ্ণতা
সেঁউতি কর্মকার

জানি হাজার অযথা কথার ফাঁকে হারিয়ে যেতে হবে একদিন
অনেক অযথা কাজে মিশে যাবে এই হাত
অনেক না বলা শব্দ সেদিনও থাকবে সংগোপন
সেদিনও ব্যাস্ত হাতে ছুঁয়ে থাকবে তোর হাত
কখনো ট্রাফিক শান্ত হবে মাঝরাতে
এ শহরের গলিতে ঘুমোবে তিস্তার ঘ্রাণ
আচমকা মেঘ, চাঁদ সাথে নিয়ে
ফিরে যেতে হবে ফেলে আসা কথাদের কাছে
সেদিনও হৃদয় হঠাৎ উষ্ণ হলে মনে পরে যাবে…
বয়স বাড়ছে কিছু কথার
আর কিছু চিরযৌবন।

ব্যবধান
সেঁউতি কর্মকার

যে দূরত্ব মাইল কলকে লেখা,
তারও বেশি দূর।
পাড়ি দিলে পথ যদি শেষ হয়
ব্যাবধান বহুদুর।
অতিক্রমহীন দূরত্বরাই কেবল জানে
নিহত সব ইচ্ছের মানে,
একই নদীর একই জমিন পাড়ে
এপাড়ার বালিশ ভেজে আশ্লেষ ঘামে
ওপাড়ার হেডফোন মাউথপিস,
রাঙা হয় মেরুন লিপস্টিক রঙে…

হেমন্ত কার
সেঁউতি কর্মকার

কোন বিদায়ী হাওয়ার বুকে উষ্ণ কিছু গল্প জমে,
কি অভিমান, কোন দোটানায় পারদ ওঠে – পারদ নামে,
পড়তি আলোর রশ্মি নাকি নিচ্ছে দখল যে অন্ধকার –
স্পষ্ট করে কেও বলে নি, হেমন্ত কার – হেমন্ত কার?

চাইবে কোথাও একটা জমি, জড়িয়ে গায়ে সবুজ পোশাক-
বুনছে রবিশস্য যারা- তারাও রুটির উৎসবে যাক,
সেও জানে না তার ফসলে কখন পাবে কে অধিকার-
প্রশ্ন শুধু তুলবে মাটি, হেমন্ত কার – হেমন্ত কার?

হারিয়ে যাবে একটু করে, থাকবে না আর মুখচেনা ভিড়-
নামবে অতীত, রাস্তা জুড়ে করবে মিছিল আবছা শরীর,
দখল নিলে দিন কুয়াশা, দূর বা কাছের সব একাকার,
কণ্ঠে অনেক উঠবে স্লোগান, “হেমন্ত কার -হেমন্ত কার ?”

সুযোগ দিলে নিবিড় হবে, হাত বাড়িয়ে আলতোভাবে
একটু দ্বিধায় হয়ত আবার মরসুমি জ্বর কপাল ছোঁবে;
সময় এখন মাথার কাছে জানালা যত বন্ধ রাখার,
কেউ জানে না কার সে আপন, হেমন্ত কার – হেমন্ত কার?

ফিনিক্স
পৌলোমী ভট্টাচার্য্য

কেন যে এতো বিশ্বাসের ওপর আস্থা
আমার…..
কেন যে ভুলতে চেয়েও বার বার মনে রাখি
তোমাকে…..
কেন আজকাল সোঁদামাটির গন্ধ নিতে গিয়ে
মেঘলা আকাশ দেখি;
একটা বিশাল সমুদ্র দেখলেই শুধুই মনে আসে,
পাহাড়ী ঝর্নার কথা,
এই বার বার,কেন কে বুঝতে গিয়ে দিন ফুরোয়
আমার,
রাতেরা কানে কানে এসে বলে সময় হয়েছে চলো,
পাড়ি দিতে হবে অনেক দূরে;
অনেক দূরে…
সুদূর অতীতকে আলগোছে টেনে নিয়ে চলি
অজানার দিকে।
থমকে যায় স্মৃতি;
চাওয়া-পাওয়া, লেন-দেন কে ভুলে মেনে নিই
অমোঘ নিয়ম।
ফিনিক্স হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে শুধু বেঁচে থাকে,
জীবন।

Hey you designers girls doesn’t come in one shape when will you understand stop show casing a single shape you are the reason girls are facing bodyshaming they don’t
Love their body because you have feeded in their mind that something called perfect body exist.
When will you understand dress should be designed to fit women women should not be redesigned to fit in a dress. 
We want to see more of models with all bodyshape on the ramp because every shape is beautiful diversity is beautiful.
Hey do you understand we want to see more of smiling, happy models not dummies with no expressions and full of insecurities. If you love to show dummies then keep an exhibition in a room full of lifeless dummies where clothes are hanging.listen hey you listen models are not dummies so stop treating them like one. Models comes in all shape.

Akanksha Jha

রেলগাড়ি

কল্যাণ ভট্টাচার্য্য

কে বলেছিল তোমাকে ওই পথে যেতে শ্রবনা?
কেন সেই ফুলওয়ালী মেয়েটি তোমায় নিয়ে গেল ডেকে সুন্দর সুগন্ধ মাখিয়ে ?
কেন তুমি চলে গেলে?
আজকাল মুঠোফোন নেই৷
ইচ্ছে করলেই অন্ধকার৷ তবু, তবু তোমার ফিরে আসার অদ্ভুত এক আকাঙ্খায় বসে আছি৷
রেলগাড়ি আসছে বোধহয়,
তুমি আসবে৷!!……….

আমার ডুয়ার্স
কল্যাণ ভট্টাচার্য্য

আটাত্তরের মাঝামাঝি, এগারো ক্লাসের লাস্টবেন্চার আমরা৷ সেই সময় হেল্প ট্যুরিজমের রাজদার সঙ্গে পরিচয় হলো৷ রাজদা সেই রকম লোক, যাকে প্রথম দর্শনেই ভালো লেগে যায় আর গুরু বলে মানতে ইচ্ছে করে৷ রাজদা, আমরা, আর ল্যান্ড কাস্টমস এর এক অফিসার অসম বয়েসের বন্ধু হয়ে গেলাম৷
ভারত বাংলাদেশের বর্ডার হলো হলদিবাড়ি, আর এখানদিয়েই সব ট্রাভেলাররা বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢুকতো দিনে দিনে, আর চলে যেত শিলিগুড়ি৷ তখনো হলদিবাড়িতে থাকার লজ বা হোটেল তৈরি হয়নি৷ এই রকম এক সময় একটি অষ্ট্রিয়ান ছেলে বাংলাদেশ থেকে আসে প্রায় বিকেলের দিকে৷ আমাদের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা হয়৷ আমাদের গ্রামের বাড়ি, কাঠের ঘর, টিনের ছাদ, পাতকুয়ো, আর উঠোনে তুলসীতলা৷ তো ছেলেটি, যার নাম পিটার, পিটার সেনেকোভিচ্, সে খুব আনন্দেই পাত পেড়ে বসে ডালভাত খেল, আর আমাদের বন্ধু হয়ে গেল৷ সেই সময় আমাদের মাথায় ট্রেকিংএর নেশা চেপে বসেছে, কিন্তু ক্লাশ কামাই করে বেশিদিন থাকা যাবেনা, আর অফবিট পথে যেতে হবে, এই চিন্তা৷ তো গুরুদেব রাজদা আমাদের ফোরম্যান টেন্ট দিলেন ডেইলি পাঁচটাকা ভাড়ায়, আর রুটও একটা বাতলে দিলেন ৷ দুদিন পর শিলিগুড়ি এসে পিটার একটা জুতো কিনলো, আমরা সবাই রাতে শিলিগুড়িতে থাকলাম৷ পরদিন সক্কালে প্রথম ডুয়ার্সের বাসটা ধরে সেভক ব্রিজের ডুয়ার্সের দিকের প্রান্তে পৌঁছে নামলাম৷ ব্রিজটা যেখানে শেষ হচ্ছে ঠিক ওখান থেকেই একটা পায়েচলা পথ ওপরে উঠতে শুরু করে৷ মাইলখানেক ওই ঘন জঙ্গলের শুঁড়ি পথে চলার পর একটা ঝর্নার জলের নল পাওয়া যায়৷ তেষ্টা মিটিয়ে আবার চলা৷ রাস্তা ক্রমশঃ চওড়া হয়, এবং জঙ্গল আরও গভীরতর হয়৷ সেভকের পথে গাড়ির হর্নের আওয়াজ আর শোনা যায়না৷ এই পথ ব্যবহার করে এই পাহাড়ের ওপারের বস্তির লোকেরা৷ শিলিগুড়ির বাজারে আসতে ভোর বেলা বেরোয় আবার বিকেল হওয়ার আগেই ঘরে ফেরা৷ আমাদের প্রথমদিনের লক্ষ্য ওই গ্রাম৷ হিমালয়ের অভ্যন্তরে এতো সৌন্দর্য্য, এতো ভালোবাসা, লুকিয়ে আছে, যা আমাদের কিশোর চোখকে টইটুম্বুর করে দেয়৷ পিটার আমি আর জিজি, তিনজন, এই অজানা গভীর জঙ্গলের রাস্তায় ভয়ও পাচ্ছি, বন্যজন্তুর ৷
প্রায় বিকেল বিকেল হবে, আমরা প্রথম গ্রামটার ধারে এসে পৌঁছুলাম৷ একটা ছোট্ট গুল্মছাওয়া সাঁকো পেরিয়ে নিচে নেমে খোলার ধারে মাঠের পাশে তাঁবু খাটালাম৷ একটু দুরে গ্রামের থেকে ডিম আর নুন কিনতে গেলাম পিটারকে নিয়ে৷ ওই গ্রামে আগন্তুক কেউ আসেনা, তায় তিনজন, একজন আবার সাহেব! খাতির একটু হলো বইকি! ডিম এর সাথে রাতে কষ্ট হবে ভেবে দুটো বড় লেপও দিলেন দোকান মালকিন৷ আমরা ফিরে টেন্টে এসে চারিদিকটা ঘুরে দেখছিলাম৷ আমাদের টেন্ট ছোট্ট একটা মাঠের ধারে, পাশ দিয়ে ঝর্নার জলে তৈরি হওয়া খোলা৷ ওই পাশে ঘন জঙ্গল, যেটা পেরিয়ে এলাম৷ অক্টোবরের শেষ৷ বাতাসে যথেষ্ট শীত৷ আমরা যখন বীরদর্পে বিদেশী বন্ধুকে নিয়ে ট্রেকে যাবো বলে ক্লাসে ঘোষনা করেছিলাম, তখন এযাবৎ উদাসীনী সহপাঠিনিদের অবিশ্বাস ও বিশ্ময়ভরা চাহনি দেখে বেশ আত্মশ্লাঘা অনুভব করছিলাম৷
সক্কালে উঠে দেখি আমাদের স্টোভ আর সসপ্যান কেউ উল্টে ফেলে বেঁচে যাওয়া ডিম আর খিচুড়ি গুলো খেয়ে চলে গ্যাছে৷ ভালুক হতে পারে, গ্রামের লোক বললো, এই অন্চলে অনেক আছে৷
দ্বিতীয় দিন, লেপ ফেরৎ দিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা আবার চলতে শুরু করলাম পরের গ্রামের উদ্দেশ্যে৷ পিটারেরও ইচ্ছে শুধু জঙ্গল বা পাহাড়ের পথে ঘোরাই নয়, ওই জনজাতির সঙ্গেও ভালোভাবে পরিচিত হওয়া৷ এবার পথে প্রচুর ক্ষেত পেলাম, ধান এবং রাই শাকের৷ দুপুর দুপুর একটা ক্ষেতে কয়েকজন কাজ করছিল, তাদের কাছে গ্রামের সন্ধান জেনে আমরা গ্রামের শেষতম বাড়ির পাশে টেন্ট বসাই৷ ওই বাড়িটির মালিক শিলিগুড়ি গিয়েছেন কিন্তু ফেরেননি৷ বাড়ির দরজা খোলা, ভেতরে তৈজসপত্র,সব ইনট্যাক্ট৷ অপার নিশ্চিন্ততা, যে কেউ চুরি করবে না৷ যা হোক আমরা রান্নাবান্নার আয়োজন করতে এক গৃহীনি এসে রাইশাকের তরকারী দিলেন, আরও কয়েকজন এসেপড়লেন, গল্প করবেন বলে৷ আমি আর জিজি ভাঙা নেপালি, আর হিন্দি, আর পিটারএর দোভাষীর কাজ ৷
তৃতীয় দিন আমরা পৌঁছুবো কালিংপং৷ হাঁটা সঙ্কীর্ন পাহাড়ী পথে৷ বেসামাল হলেই খাদে৷ কখোনো গভীর জঙ্গল৷ বহুক্ষন এভাবে চলার পর আবার একটু সমতল, আর পর বিকেল নাগাদ আমরা কালিংপং এর আলো দেখতে পেলাম৷
কালিংপং এ এসে আমরা একটা হোটেলে উঠলাম৷ সন্ধেয় আমি ও পিটার সিনেমাহলে গিয়ে একটা ডাবকরা জার্মান সিনেমা দেখলাম৷ পিটারের মা জার্মান, বাবা অস্ট্রিয়ান৷ ওর একটা বড় গাড়ি আছে, তাতেই ঘুমোয়, স্নান ইত্যাদি করে ক্লাব সুইমিংপুলে, আর খায় অফিস ক্যান্টিন আর হোটেলে৷ আমাদের ক্লোজনিট ফ্যামিলি দেখে খুব আনন্দ হয়েছিল ওর৷
শেষ দিন, আমরা বিদায় নিয়ে বাস ধরে ফিরে এলাম৷ সম্পুর্ন অজানা রুট, অসাধারন বন্ধুরা, অসাধারন গ্রামবাসী, অদ্ভুত পাহাড়, অবাক করা দিনরাত!

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •